দ্বীপের সেই সব মানুষেরা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

রুজভেল্ট দ্বীপে আবাস গাড়ার ক’দিন পরের কথা। হেমন্তের এক ভারী সুন্দর বিকেলে সবাই মিলে হাঁটতে বেরিয়েছি। বসেছি চারজনে ব্ল্যাকওয়লদের বাড়ীর সামনের রাস্তার উল্টোদিকের বেঞ্চিতে। হঠাৎ দেখি, এক চলন্ত গাড়ী থেমে গেছে রাস্তায়। আর তার জানালা থেকে মুখ বার করে হাসছেন কে একজন। কে আবার – ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী অশোক নিগাম। আট বছর বাদে মন্ট্রিয়াল থেকে বহুদূরে এই ছোট্ট দ্বীপে আবার অশোকের সঙ্গে দেখা হবে কে ভেবেছিলো? হৈ হৈ করতে করতে গাড়ী থেকে বেরিয়ে এলো অশোক, ওর স্ত্রী অঞ্জলি, ওদের দু’কন্যা। আমরা যখন মন্ট্রিয়াল ছাড়ি, তখন অশোক অকৃতদার – অঞ্জলি এবং ওদের কন্যাদের সঙ্গে তাই এই আমাদের প্রথম পরিচয়।তারপর সবাই মিলে গাল-গল্প, হাসি-ঠাট্টা, সংবাদ আদান-প্রদান করি। অশোকও নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কাজ নিয়ে এসেছে – কর্মরত সে জাতিসংঘ শিশু তহবিলে এবং ওদেরও অধিষ্ঠান এ দ্বীপে। জানে সে, আমি জাতিসংঘ উন্নয়ণ কর্মসূচীতে যোগ দিয়েছি এবং বাড়ীও নিয়েছি এ দ্বীপে।

যাঁর মাধ্যমে অশোক আমার খবর পেয়েছে, আমার সে সহকর্মী স্বরস্বতী মেনন দ্বীপে আমাদের থিতু হতে যে কি সাহায্য করেছিলেন! সরসের (তাঁর বন্ধুরা তাঁকে এ নামেই ডাকতো) কথা আগেই বলেছি। আসলে পুরো মেনন পরিবারই সহায়তা হাত বাড়িয়েছিলেন আমাদের পরিবারের দিকে। সরসের বর কৃষ্ণ আমাদের দোকান-পাট চিনিয়েছে, ওঁদের ছেলে-মেয়ে উদেয় এবং অরুনা আমাদের কন্যাদ্বয় রোদেলা-মেখলাকে ইস্কুলে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। প্রায়শ:ই ওঁরা আসতো আমাদের বাড়ীতে, খোঁজ খবর করতো, বেড়াতে নিয়ে যেতো এ

কোফি এ্যানান

খানে-ওখানে। আমাদের সে সখ্য এখনও বিদ্যমান।

আমাদের আবাস ছিল ৩০, রিভার রোডে – ২০ তলায়। একতলায় পুরো তলাটি নিয়ে আবাসন ছিলো জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্হায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবীরের। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী ভারী স্নেহময় ছিলেন আমাদের প্রতি। তাঁদের কন্যাদ্বয় আম্বরীন ও শারমীন আমাদের কন্যাদ্বয়ের বন্ধু হয়ে গেলো। সেই পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার কথা এখনও স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

৪০, রিভার রোডে থাকতেন আমাদের দূতাবাসের একাধিক কর্মকর্তা – মঞ্জুর করিম, ফজলুল করিম, জাহিদুর রহমান। জাহিদের কথা বড় মনে হয়। জাহিদের সঙ্গে গিয়েই জ্যাকসন হাইটস থেকে আমার সঙ্গীত-যন্ত্রটি কেনা হয়েছিল। এখনও আছে সে’টি। জাহিদের কাছেই শিখেছিলাম যে, হলুদ ট্যাক্সি ভিন্ন যে সব গাড়ীর নম্বর T দিয়ে শুরু হয়, সেগুলোও ভাড়া করা যায়। পরে জাহিদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফিরে যায় ঢাকায়। সেখানে এক বিকেলে তাঁর দপ্তরের প্রক্ষালণকক্ষে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে সে আমাদের ছেড়ে যায় অতি অল্প বয়সে।

জাতিসংঘের বহু কর্মকর্তা তখন রুজভেল্ট দ্বীপে বসবাস করার কারণে নব্বুইয়ের দশকে এ দ্বীপে ৩৭টি দেশের মানুষ থাকতেন। এ সব সহকর্মীদের লঙ্গে পরিচিত হতে বেশী সময় লাগলো না। তারমধ্যে মনে আছে পল ও রানী ম্যাথুস, নোওলীন হ্যাইজার, রিচার্ড জলির কথা। তবে বিশেষভাবে মনে আছে জাতিসংঘের তৎকালীন শান্তিবিষয়ক বিভাগ প্রধান কোফি এ্যানানের কথা। ভারী স্নেহময় ছিলেন তিনি। দেখা হলেই মৃদু নরম স্বরে গল্প করতেন, আমার স্ত্রী-কন্যার খবরা-খবর নিতেন। তাঁর হাতেই আমি প্রথম এক ঢাউস মুঠোফোন দেখেছিলাম – তার আকার দেখে তাকে আর মুঠোফোন বলা চলে না।

প্রথম থেকেই রুজভেল্ট দ্বীপের মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও আর্থ-সামাজিক বৈচিত্র্য আমাদের আকর্ষণ করেছিলো। উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আবাসন গৃহের সঙ্গে সঙ্গে নিম্নবিত্তের পরিবারের জন্যে স্বল্প ভাড়ায় সরকারী আবাসনের ব্যবস্থা আছে এ দ্বীপ। আছে বৃদ্ধাশ্রম এবং প্রতিবন্ধীদের জন্যে গৃহের ব্যবস্থা। ফলে এ দ্বীপে যেমন নানান বর্ণের ও নৃতাত্ত্বিক পটভূমির জনগোষ্ঠী আছে, তেমনি আছে নানান আর্থ-সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষ। সত্যিকার অর্থে, রুজভেল্ট দ্বীপ একটি ক্ষুদ্র জাতিসংঘ এবং একটি ক্ষুদ্র বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে।

এ দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা ভিন্নও এখানে আসেন নানান মানুষ। আসেন প্রতিদিন কাজে বা বেড়াতে। হাসপাতালে যাঁরা কাজ করেন, কাজ করেন পুলিশ হিসেবে, দোকান-পাটে যাঁরা কর্মরত, তাঁরা সবাই দ্বীপের বাইরে থেকে আসেন।দ্বীপের বাইরে বসবাস করেন নানান ভবনের কর্মীরা, নিরাপত্তা প্রহরীরা, বাসের চালকেরা, বর্জ্য যাঁরা নিয়ে যান তাঁরা।এ ছাড়া প্রতি শনিবারে যে কৃষি-হাট বসে, সেখানে পণ্য নিয়ে আসেন ২ ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে ফিলাডেলফিয়ার কৃষকেরা।

কিছুদিনের মধ্যেই এ দ্বীপের বহু মানুষের সঙ্গে মুখচেনা হয়ে যায়। পথে-ঘাটে, নদীর পাড়ে, দোকান-পাটে, লাল বাসে, চলাচলের ঝুলন্ত বগিতে। চিনে ফেলি দোকানের কর্মী, পুলিশদের, হাসপাতালের সেবিকাদের। কুশল জিজ্ঞেস করি ভবনের কর্মীদের, নিরাপত্তা প্রহরীদের। ভাব জমে যায় বাস আর ঝুলন্তবগীর চালক আর ডাকহরকরার সঙ্গে। গল্প জুড়ি ফিলাডেলফিয়া থেকে আসা কৃষককুলের সঙ্গে। বন্ধুত্ব গড়ে ওঠা নানান জনের সঙ্গে।

পরবর্তী ২৭ বছরে আমাদের জীবন ও জগতকে এঁরা সবাই ভরে রেখেছিলেন। আমাদের সুখে-দু:খে, হাসি-কান্নায় তাঁরা ছিলেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। আমার জীবনের অনেক গল্প তো তাঁদেরকেই নিয়ে। পূর্বী নদীর বাতিঘর-দ্বীপের মানুষদের নিয়েই আমাদের ‘এই সব দিনরাত্রি’ – আগামীতে সেই সব গল্প।

লেখক: ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box