দ্রোহ প্রেম বেদনা আর জীবনের রুদ্র

লুৎফুল হোসেন, কবি, লেখক

তখন বিকেলগুলো দীর্ঘ হতো না। দেখতে দেখতে সন্ধ্যার কোটরে ঢুকে পড়তো। আমরা তবু টিএসসির অর্ধবৃত্ত দেয়ালে, তার দুই ধারে বেঞ্চিতে, ভিতরের আহত ঘাস-চামড়ার মাটিতে গোল হয়ে বৈঠকে মেতে থাকতাম। জাতিসংঘের কোনো গোল টেবিল বৈঠকের চেয়ে একটুও কম গুরুত্বের ছিলো না সেইসব আলাপ ব্যস্ততা মাখামাখি হল্লা। একের পর এক সারি বেঁধে শূন্য হওয়া চায়ের পেয়ালা।

রোদের তেজ বেশি থাকতো যতোক্ষণ, এই দুপুর ছুঁই ছুঁই সকালের সীমান্ত থেকে ছায়াকে দীর্ঘ করে এলিয়ে পড়বার আগে, আমাদের টান ছিলো হাকিম চত্ত্বরের ঘ্রাণে। সেখানে চায়ের সঙ্গে ধোঁয়ার প্রেমে কাবাব মে হাড্ডি থাকতো ভাবের নৌকা ভাসাবার ধূম্র নদী, সেই সঙ্গে কারো কারো কয়েক দানা ম্যাণ্ডি (ম্যুরের নয়) মন্ত্রণার বাহাদুরি।

সময়টা এমন, যখন; এইসব আড্ডার মচ্ছবে লেখাপড়া হয়ে যেতো শহরের একর একর জমি, রাজপথ, পার্ক ও উদ্যান, স্ন্যাক বার। এমন কি রাতের সঙ্গে বিপ্রতীপ পাল্লায় জনশূন্যতায় থিতু হয়ে আসা ফুটপাত কিংবা সাকুমনির সুনির্দিষ্ট টেবিলের সমবাহু চেয়ার, সব। সেইসব সবকিছুর মালিকানা তখন কিছু হল্লাবাজ দুরন্ত তরুণ যুবক ছাড়া এক বিন্দুও অন্য কারো নয়।

গোটা শহরের জমিদারি লিজ নেয়া এইসব দাঙ্গাবাজ তরুণরা আর কেউ নয়, শহরের প্রিয় কবি, খ্যাত গল্পকার, জনপ্রিয় নাট্যশিল্পী, গুণী গায়েন, তরুণ বিপ্লবী, বিপদজনক প্রেমিক এইসব নানাবিধ উজ্জ্বল চাঁদ ও সূর্য। আর এই অদম্য দঙ্গলের বাদশাহ যেনো কেউ না, একজনই। শ্মশ্রুমণ্ডিত এক সাধারণ তামাটে লোক। যার হাতে ও কলমে সারাক্ষণ লেগে থাকে মাটি ও নোনাজল, ফসল ও চিংড়ির গন্ধ। পাহারা চৌকির নিঃসঙ্গ মাচায় যার অবহেলায় পড়ে থাকে অসীম সাম্রাজ্য।

এক বিকেলে হাকিম থেকে টিএসসির দিকে কয়েক কদম আগাতেই চোখ আটকে যায় গাঢ় বাদামী প্যান্ট আর তার পাতলা খোসার লালচে মেটে রঙ ঘেঁষা ডাবল বুক পকেটের ফৌজি ডিজাইন জামায়। দুহাত কনুইয়ের কাছাকাছি পর্যন্ত গোটানো। ঋষির মতোন ধ্যানস্থ বসে আছে ঋজু, কাঁধে ঝোলানো একটা পুরু ক্যানভাস ব্যাগ। দুই চোখে তার জ্বলজ্বল করে জ্বলে থাকে জীবন। বুকে স্তুপ স্তুপ গনগনে কয়লার উনুন। কাবাব কিমার মতোন সারাক্ষণ সে পোড়ায় স্বপ্ন সাধ প্রেম ভালোবাসা, দ্রোহ ও দহন। সারাক্ষণ চেতনার শরীর কেটে সে ব্যস্ত গড়তে শব্দকল্প শরীর চেঁছে তার ভাব ও ভাবনার ভাস্কর্য।

হ্যা, এই লোকটার নামই রুদ্র। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। সামান্য ক্ষুদ্র এক জীবনে যে গড়ে গেছে অসামান্য গভীরতার কিছু কবিতা আর গল্প। তারুণ্যেই দূর-দূরান্ত থেকে কবিতার ভক্তরা আসতো যাকে দেখতে। তার কবিতায় শুধু রূপক উপমার ইমেজারি নয়, জীবন উঠে এসেছিলো মাটি জল ঘাম শ্রম কাম ভালোবাসা প্রেম ও উপেক্ষা সকল কিছুর আপাত স্পষ্ট বিম্বে সহজ এক জলছবি হয়ে। যার কবিতায় ভীষণ প্রানবন্ত হয়ে বারবার জেগে উঠেছে দ্রোহ। বিপ্লবের শরীরে অনায়াসে যে পরিয়ে দিয়েছে, ভালোবেসে ত্যাগের এক আশ্চর্য মোহ।

কবিতাকে যে শুধু কাগজে কলমে আর শব্দময় নির্মাণের শৈলীতে নয়, তিলে তিলে যাপন করে গেছে জীবনের পল-অনুপলে। আবার সেই কবিতাময় যাপিত জীবনকেই সদ্যোজাত শিশুর মতোন যতনে বুনে দিয়েছে কবিতার শরীরে। যেনো সেই কোনটা আমি আর কোনটা আমার বিম্ব এই বিভ্রমে মেরে ফেলতে চেয়েছে কখনো কখনো সে আপন সত্ত্বাকে। চেয়েছে কি! চায়নি হয়তো। অথচ কবিতায় একটা জীবনকে ছুঁড়ে দিয়ে কোনো অবাধ যাপনে, বাতাস কাঁপিয়ে হেসেছে অট্টহাসি। যেনো নিজেকেই তুলে দিয়েছে সার্কাসের রিঙে অনায়াসে। নিজেই খেলা দেখানেওয়ালা, নিজেই বাঘ সিংহ হাতী। নিজেই নিজের জীবনটাকে সঁপে দিয়ে হেসেছে তার ভূবন ভোলানো সেই হাসি; বলেছে এই নাও, যাপন তোমায় দিলাম এক জীবনের চড়ুইভাতি।

নইলে কি করে কেউ লিখে যায় অমন অনায়াসে –

‘প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে,
নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর বেলা-
এই খেলা আর কতোকাল আর কতটা জীবন!
কিছুটাতো চাই- হোক ভুল, হোক মিথ্যো ও প্রবোধ,
অভিলাষী মন চন্দ্রে না-পাক জোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই,
কিছুটাতো চাই, কিছুটাতো চাই।

আরো কিছুদিন, আরো কিছুদিন- আর কতোদিন?
ভাষাহীন তরু বিশ্বাসী ছায়া কতটা বিলাবে?
কতো আর এই রক্ত তিলকে তপ্ত প্রণাম!
জীবনের কাছে জন্ম কি তবে প্রতারণাময়?

এতো ক্ষয়, এতো ভুল জমে ওঠে বুকের বুননে,
এই আঁখি জানে, পাখিরাও জানে কতোটা ক্ষরণ
কতোটা দ্বিধায় সন্ত্রাসে ফুল ফোটে না শাখায়।
তুমি জানো নাই- আমি তো জানি,
কতটা গ্লানিতে এতো কথা নিয়ে, এতো গান,
এতো হাসি নিয়ে বুকে নিশ্চুপ হয়ে থাকি।

বেদনার পায়ে চুমু খেয়ে বলি এইতো জীবন,
এইতো মাধুরী, এইতো অধর ছুঁয়েছে সুখের সুতনু সুনীল রাত।’

কি করে বেদনার নদী বইয়ে দিয়ে প্রবল খরস্রোতা নির্মাণ করে অমন যাপিত নির্যাসের সংলাপ! যাকে নিজেই সুর দিয়ে সে বেঁধে গেছে কোটি ভক্তের গলায়!

‘ভালো আছি, ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো
দিও তোমার মালা খানি। বাউলের এই মনটারে
ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।

পুষে রাখে যেমন ঝিনুক খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ।
তেমনি তোমার নিবির চলা ভিতরের এই বন্দরে
আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।।

ঢেকে রাখে যেমন কুসুম পাপড়ির আবডালে ফসলের ধুম।
তেমনি তোমার নিবির ছোঁয়া গভীরের এই বন্দরে
আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।’

বিরহ ভালোবাসা আনন্দ বেদনার পিঠে একই মুদ্রায় তার অনায়াসে ধরা ছিল দেশপ্রেম ও দ্রোহ। যাপনে ভালোবাসার প্লাবনে মগ্ন ও নির্মোহ। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তাই বার বার উঠে এসেছে তার দ্বিধাহীন স্পষ্ট উচ্চারণ।

‘আমি জানি, সম্মিলিত মানুষের চেয়ে
কখনোই বেশি নয় অস্ত্রের ক্ষমতা।
আমি জানি, মিলিত মানুষ হচ্ছে পৃথিবীর
প্রকৃত প্রকাশ—’

তারপর দেখতে দেখতে অকস্মাৎ কোনো একদিন সে ছেড়ে গেলো তার এই সুবিশাল রাজ্যপাট।

‘আকাশের নীল কণ্ঠে দুলছে পাখির নেকলেস।
অফিস ফেরত সূর্যটি
দিগন্তের বাসস্ট্যান্ডে একাকি দাঁড়িয়ে আছে,
আঁধারপুরের বাস এখনো আসেনি—

আমি হৃদয়ের সমস্ত বোতাম খুলে দাঁড়িয়েছি,
যেমন দাঁড়ায় নারী পিপাসার প্রথম প্রহরে।’

তারপর ঠিক ঠিক অনেক অসময়ে একদিন ‘আঁধারপুরের বাস’-এ উঠেই পড়লো সে। পড়ে রইলো তার এক সমুদ্র শব্দের ভাস্কর্য। পড়ে রইলো স্মৃতির শহর, উদ্যান, পানশালা। পড়ে রইলো মাছের ঘের, মিঠেখালি, মংলা। পড়ে রইলো স্মৃতির অযুত নিউরন মালা গাঁথা অগুন্তি মানুষ। সখ্যের স্মৃতির আকাশে যারা নিত্য উড়ায় তার সঙ্গে কোনো এক সন্ধ্যার রঙিন ফানুস।

রুদ্র বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো বাষট্টি।

ছবিঃ ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর ও গুগল