ধর্মনিরপেক্ষতা শিশু শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুশফিকা লাইজু

একজন মানুষ জন্মসূত্রে যে কয়টি বিষয় অজর্ন করে তার অন্যতম হল ধর্ম বিশ্বাস। পিতামাতা যে ধর্ম অনুশীলন করেন, অনুসরণ করেন, একটি শিশু প্রথম আশ্রয় নেয় সেই ধর্মের ছায়াতলে। সে জ্ঞানত কিংবা অজ্ঞানত, বুঝে না বুঝে শান্তিতে-প্রশান্তিতে, বিপদে-আপদে, প্রাপ্তিতে-অপ্রাপ্তিতে এই ধর্মেও কোলেই আশ্রয় নেয়। একজন শিশু পূর্ণ মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আগে এবং তার শিক্ষার সঙ্গে প্রাজ্ঞ জ্ঞান এবং বিজ্ঞানভিত্তিক যৌক্তিক জ্ঞানে সংমিশ্রিত হওয়ার পূর্বে এবং পরবর্তীতে শিক্ষালয় ও পরিবার থেকে যে বিশ্বাস, যে শিষ্টাচার অর্জন করে- পরবর্তীতে সেটাই সে সামাজিক মানুষ হিসেবে চর্চ্চা করে। এবং তারই প্রতিফলন ঘটে তার পরিবেশ এবং প্রতিবেশে। ১৯৭১ সালে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের মানুষের পূর্বাপর মনস্তাত্বিক বিকাশে ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শাসক, প্রশাসক পরিপোষকরা এসে রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য এদেশের আবেগপ্রবণ বাঙালীর হৃদয়ঘটিত আবেগকে ধর্মীয় মোড়কে বন্দি কিংবা মতলব হাসিল করার জন্য নৈতিকতা মূল্যবোধের শিকর থেকে, কান্ড থেকে এবং পত্র-পল্লব থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা সমূলে উৎপাটন করার জন্য মহান সংবিধান, জাতীয় শিক্ষা পাঠ্যক্রম এবং অতি সাধারণ ধর্মপ্রান মানুষের চেতনার মধ্যে নিষ্ঠুর কুঠারাঘাত হেনেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে সমসাময়িক সময় এত ধর্মীয় হানাহানি, এত বাদ-বিবাদ, এত বিভৎস খুনোখুনি। তাই আজ দেখা যাচ্ছে ধর্মকে মর্মে না নিয়ে মানুষ, বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে। ভাল ফলের জন্য ভাল বৃক্ষ যেমন দরকার তেমনি ভাল বৃক্ষের জন্য ভাল চারা আর ভাল চারার জন্য ভাল বীজ অনিবার্য। সমাজের ইতিবাচক পট পরিবর্তনের জন্য একজন সুশিক্ষিত শিশু ভাল বীজের পরিপূরক। বর্তমানে বাংলদেশের সামাজিক ও চলমান বাস্তবতা বড়ই হতাশাগ্রস্থ এবং গোলমেলে। আমি শুধু অধর্মকে ধর্মীয় পুঁজির দিকেই আলোকপাত করবো। ডাইভরসিটি ইজ বিউটি- ভিন্নতাই সমাজের সৌন্দর্য। মানুষের জন্যই ধর্মের উন্মেষ, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। এই ধ্রুব সত্যের কোন অপলাপ নেই। সুতরাং ভাল ফলের জন্য ভাল বীজের যেমন বিকল্প নেই, তেমনি একটি সুন্দর সহনশীল আলোকিত, উৎপাদনশীল সমাজ বিনির্মাণের জন্য একজন সুশিক্ষত শিশুর কোন বিকল্প হয় না। সমাজ প্রবর্তকদের জলটা ঢালতে হবে একেবারে গোড়ায়। আগা কেটে দিলে তার কোন ইতিবাচক ফল আসবে না-আসেও না। বিজ্ঞানভিত্তিক মানবিক সুশিক্ষাই আগামীদিনের সুন্দর সমাজ গঠনের প্রথম এবং প্রধান হাতিয়ার। ধর্ম মানুষের আশ্রয়, ক্ষমতা নয়। ধর্ম হানাহানির জন্য নয়, ধর্ম শান্তির জন্য, সহাবস্থানের জন্য। অন্যের মতকে সম্মান করার জন্য, সাদরে গ্রহন করার জন্য। যার যার কাছে তার তার ধর্ম শ্রেষ্ঠ। ধর্ম হলো তুলনার্ধ্বো এক অদেখা অর্নিবচনীয় অনুভূতি। সেখানে কোন দল ভারী করার ব্যাপার নেই। প্রতিটি ধর্মেই স্পষ্ট নির্দেশনা আছে- যার যার কর্মফল সে সে ভোগ করবে। এখানে দল ভারী করার বা দলগতভাবে বসবাসের কোন আলাদা অর্থ করে না। একজন শিশু তার শিক্ষার সূচনা লগ্নেই অর্থাৎ তার শৈশবেই যদি এই শিক্ষা পায় যে সমাজ হবে ধর্মনিরপেক্ষ পরধর্মমত সহিষ্ণু এবং রাষ্ট্রযন্ত্র এই নীতি, রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে দেয়, তবে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই ধর্মকেন্দ্রিক মৃত্যুর মিছিল আর আমাদের দেখতে হবে না। তখন বাঙালী শুধুই বাঙালী পরিচয়ে বাঁচবে। যেমন বাঙালী মুসলিম, বাঙালী বৌদ্ধ, বাঙালী খ্রিষ্টান, বাঙালী হিন্দু, বাঙালী আস্তিক, বাঙালী নাস্তিক। শিশু যেমন বিদ্যালয়ে তার পাঠক্রমের সাথে নিজ ধর্মের নিয়মকানুন ও শিষ্ঠাচার শেখে তেমনি তার পাঠ্যক্রমের সাথেই যুক্ত করতে হবে অন্য ধর্ম বিষয়ে সম্যক জ্ঞান, সম্মান, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ন সহাবস্থান বিষয়ক বিবেচনা বোধ।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]