ধর্ম পুরুষের একচেটিয়া নয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফরিদা আক্তার, সভানেত্রী নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা

আফগান নারীরা তালিবানদের শাসনামলে পিছিয়ে ছিলেন, তাদের কোন ‘অধিকার’ ছিলো না, শিক্ষা, কর্মজীবন (ঘরের বাইরে) সহ নারীর স্বাধীন ভাবে চলাফেরার ওপর কঠোর বিধি নিষেধ ছিলো। মার্কিন ও ন্যাটোভুক্ত পাশ্চাত্যের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আফগান পুরুষদের হাত থেকে আফগানিস্তানে নারীদের ‘রক্ষার’ নামে দেশটি দখল করে রেখেছিলো প্রায় ২০ বছর। এই সময়ে তারা সম্পদ লুট করেছে, বোমা মেরেছে বৃষ্টির মতো, কাবুলের বাইরে দিনের পর দিন হাজার হাজার মানুষের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তাদের বোমা কোন শিশু বা নারীকে ছাড়ে নি। তারা

প্রথম আফগান নারীর হিন্দুকুশ জয়।

আফগানিস্তানে হানাদার, দখলদার ও আগ্রাসী শক্তি হিসেবেই ছিলো। তাই তাদের বিরুদ্ধে লড়াই , তাদের হটানো এবং আফগানিস্তান হানাদার ও দখলদার মুক্ত করার প্রয়োজন অবশ্যই ছিলো। কোন দেশই দীর্ঘদিন কোন দখলদার শক্তির কাছে পরাধীন হয়ে থাকতে পারে না। কাজেই দখলদার ও হানাদার মুক্ত আফগানিস্তানকে স্বাগত জানাচ্ছি। মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর পরাজয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা।

এখন আফগান মোজাহিদদের নেতৃত্বে যে আফগান আমিরাত বা সরকার গঠিত ও আফগান শাসন কায়েম হতে যাচ্ছে তাদের অধীনে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা থাকবে কি না এবং মানবাধিকার রক্ষা হবে কিনা — এইগুলোই প্রশ্ন। নারী আন্দোলনের মধ্যে এই ক্ষেত্রে পরিষ্কার দুটো ধারা রয়েছে। একপক্ষ ‘নারী অধিকার’-এর নামে কার্যত হানাদারি ও দখলদারির পক্ষে দাঁড়ায়, আরেকটি ধারা আফগান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার নিঃশর্তে সমর্থন করবার পরও আফগান সমাজের বিদ্যমান পুরুষতন্ত্র, নারী ও শিশু নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে কোন মতেই আপোষ করতে রাজি না। শুধু আফগানিস্তানে নয়, সারা দুনিয়া থেকে পুরুষতন্ত্রের বিলোপ ঘটাতে হবে। সেখানে কোন ছাড় দেওয়া যাবে না।

বিগত ২০ বছরে আফগান নারীরা নিজেদের উদ্যোগে এবং আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তায় লেখা পড়া করা এবং বিভিন্ন পেশায় যেমন পুলিশ, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক হয়েছেন। স্কুলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের ৪০% মেয়েরা আছে। ফলে এখন ফের তালেবানরা ক্ষমতা দখল করে সরকার গঠন করছে দেখে নারীদের আবার পুরানা অবস্থায় ফিরে যেতে হবে কিনা সেই আশংকা করা হচ্ছে। এই আশংকা থাকবেই। এই আশংকা অমূলকও নয়। তবে জানা গেছে তালেবানরা ইতোমধ্যেই নারীদের সরকারি কাজে যোগ দেবার আহবান জানিয়েছেন। বিবিসি-সিএনএন সাংবাদিকরাও এখনো নারীদের ওপর কোন ধরনের নেতিবাচক আচরণের কথা তুলে ধরেন নি। যদিও এতে সকলে আশ্বস্ত হতে পারছেন না।

আফগান নারী ফুটবলার

একজন আফগান নারী নেত্রীর কথা উল্লেখ করছি। Mahbooba Seraj, যিনি আফগান নারীদের নেটওয়ার্ক এর প্রতিষ্ঠাতা, এবং দীর্ঘদিন বিদেশে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে আফগান নারীদের নিয়ে কাজ করেছেন গত প্রায় ১৫ বছর। তিনি একদিকে তালেবানদের ফিরে আসায় নারীদের অর্জন আবার ২০০ বছর পিছিয়ে যাবে বলে মনে করেন, অন্যদিকে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন আফগান সরকার এবং আন্তর্জাতিক মহলের ওপর। তিনি বলছে্ন, “বিশ্বের এই সব ক্ষমতাধর পুরুষরা আমাদের এতোদিনের অর্জন ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারা আরও একটি স্টুপিড সিদ্ধান্ত নেবে এবং আমাদের বরবাদ করে দেবে”।

আফগান নারীদের নিয়ে আমরা উৎকন্ঠিত হতে পারি, কিন্তু এটাও সত্য যে অন্যের কাছ থেকে ধার করা “মুক্তি” দিয়ে বেশি দূর এগুনো যাবে না। বিশেষ করে মনে করার কোন কারণ নাই যে দখলদার শক্তি আসলেই আফগান নারীদের প্রতি দয়াবান হয়ে এসেছিল। তারা এসেছিলো তাদের অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থে; তাদের স্বার্থ ফুরিয়ে গেছে, তাই তারা চলে গেছে। যখন তাদের দখল করার দরকার ছিলো তখন কোন একটা কারণ হিশেবে নারীর মানবধিকার লংঘনের প্রশ্ন তুলেছিলো তালেবানদের বিরুদ্ধ্বে। অথচ সেই সময় নারীর ওপর একই ধরনেরর মানবাধিকার লংঘন কি আফগানিস্তান ছাড়া আর কোন দেশে ছিলো না? এখনও কি নাই? সব দেশে কি তারা গিয়ে নারীদের উদ্ধার করছে? এই ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে যাবার আগে নারীদের কথা কি একবারও ভেবেছে? না, ভাবে নি। ভাববার কথাও নয়। নিজের প্রাণ বাঁচাতেই তারা ব্যস্ত। কারন মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে তাদেরকেও এখন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

তাই আমাদেরকে অবশ্যই আফগান নারীদের পক্ষেই দাঁড়াতে হবে। তবে সেটা হবে সবার আগে আফগান নারীদের যুদ্ধ, আগ্রাসন, হানাদারি থেকে মুক্তি এবং আফগান নারী হিশাবে তাদের নিজেদের সমাজের সকল প্রকার পুরুষতান্ত্রিক সম্পর্ক ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির লড়াইয়ের পক্ষাবলম্বন। নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। পাশ্চাত্য ‘অধিকার’ প্রায়ই আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সম্পর্ক থেকে নারীর মুক্তির প্রশ্নকে আড়াল করে ফেলে, পাশ্চাত্য ব্যক্তিতান্ত্রিক চিন্তার আধিপত্যই বহাল রাখে। তাই নারীর মর্যাদা এবং সমাজে নারীমূলক গুণাবলী বিকাশের মধ্য দিয়ে নতুন ধরনের সমাজের কথা আমাদের ভাবতে হবে।

নতুন আফগানিস্তান দাবি করছে তারা এখন এক নতুন প্রজন্ম, তারা আগের মতো হবে না। তারা প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই ঘোষণা দিয়েছে যে শরীয়া আইন মেনে নারীদের সব সুযোগ দেয়া হবে। এতে নারীদের আশংকা কাটে নি, কারন ইসলাম মানে স্রেফ ‘শরিয়া আইন’ নয়। তাঁরা দাবি করেছেন নারীর প্রতি কোন বৈষম্য করা হবে না। তারা নারীদের নতুন সরকারে যোগদানের আহবানও জানিয়েছেন। ভাল। কিন্তু তারা কিভাবে নারীর মর্যাদা রক্ষা করবেন সেটা দেখার বিষয়।

তেমনি তাদের এটাও জানা দরকার যে আফগান নারীরাও এখন নতুন প্রজন্ম। তাদেরও আগের মতো ধর্মের দোহাই দিয়ে দমন করে রাখা যাবে না। কারন ধর্ম পুরুষের একচেটিয়া নয়।

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box