ধর্ম বনাম মানবতা

আঞ্জুমান রোজী

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু বদলেছে। বদলেছে পৃথিবীর বিবর্তনের ইতিহাস। শুধু বদলায়নি ধর্মীয় অনুশাসনের অনুভূতি। বর্বর যুগে ধর্ম এসেছিলো মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে অসভ্য মানুষকে সভ্য করার তাগিদে। মানুষের মনে ধর্মীয় বিশ্বাস আর ধর্মের নামে অলৌকিক ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে জীবনের পরিমিতি বোধ , যা থেকে মানুষ পেতে পারে নিরবচ্ছিন্ন সুখ আর আত্মার পরিতৃপ্তি । কিন্তু যুগ যুগ ধরে এমন ধর্মচর্চার ধারাবাহিকতায় মানুষ হয়েছে ধর্মের দাস । আর শৃঙ্খলিত জীবনযাপনে মননে মগজে হয়েছে অনুর্বর শংকর ।কারণ হাজার বছরের ধর্মীয় অনুশাসনের বিশ্বাস গেঁথে গেছে মানুষের বোধিমূলে, মিশে গেছে রক্তে মাংসে অস্থি-মজ্জায়।যেখানে অপমৃত্যু হচ্ছে মানবতার। শিক্ষা দীক্ষা জ্ঞান গরিমায় মানুষের মন ও মগজে সুস্থধারার চিন্তা চেতনার বিকাশ যতটা না ঘটছে তারচেয়ে বেশী ধর্মের নামে কালো অন্ধকার থাবা আরো আচ্ছন্ন করে রাখছে । তাই ডঃ আহমেদ শরীফের ভাষাতেই বলতে হয়, ‘কেন না, আস্তিক ও সংসারী মানুষের উদারতা একটা সঙ্কীর্ণ পরিসরেই থাকে সীমিত, মুক্ত চেতনা-চিন্তাচালিত হতে পারে না কোনো আস্তিক মানুষই’। যদিও সব ধর্ম এমন কি বড় বড় ঋষি মনিষী্রাও বলেছেন, সব কিছুর উর্ধে হলো মানব ধর্ম । তাহলে এ কেমন ধর্ম যেখানে মানুষে মানুষে হানাহানি, কাটাকাটি, অপবাদ অপমান অপব্যবহারের ডংকা বাজে ! ধর্মের রং যত গাঢ় হবে , সম্প্রীতির রং ততো ফিকে হতে বাধ্য ।

দেশ-কাল-পাত্রভেদে ধর্মানদ্ধতা নির্মম এবং নৃশংসভাবে পদদলিত করছে মানবতাকে । বিশেষত যা শুরু হয়েছিলো বিশ শতকে ধর্মের নামে দেশ বিভাগের প্রাক্কাল থেকে । এই বিভাজনের নৃশংসতা বংশ পরম্পরায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আজ অবধি বিদ্যমান । বিভক্তির নামে ধর্মের এই বিভাজনে প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার যেমন হচ্ছে অবলুপ্তি তেমনই মানবতাকে করছে লাঞ্চিত।

বৈষম্যমূলক ধর্মচর্চা আর অর্থনৈতিক টানাপোড়নের কারণে তৈরী শ্রেণীবৈষম্য মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরী করেছে।যা আজকের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভাবিয়ে তোলে চরমভাবে। মানুষের মুক্তি কোথায়? ধর্মে ,নাকি অর্থনৈতিক মুক্তিতে, নাকি মুক্ত চিন্তা চেতনার জ্ঞান-গরিমায় উদ্বুদ্ধ প্রগতির ধারাবাহিকতায় ! কৌতুহলী মনে জানার আগ্রহ বেড়ে যায় দ্বিগুণ। কিন্তু শুধু ধর্মচর্চায় থাকে তার সীমাবদ্ধতা। তাছাড়া ধর্মচর্চা বা ধর্ম পালনে অন্যের সমস্যা না থাকলেও , কিছু ধর্মান্ধ মানুষ অন্যের উপর জোরপূর্বক ধর্মের নামে বাইপাস সার্জারী চালাতে সচেষ্ট হয়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজই সমাজ সংসারের জন্যে সুস্থ ফলদায়ক হতে পারে না । যা হয়, তা হয় নির্মমতা। যেখানে মানবতারই মৃত্যু হয়।

ছবি: গুগুল