ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সৈকত প্রকৃতি,
সংস্কৃতিকর্মী,মানবাধিকার কর্মী, সংগঠক

বাংলাদেশে ধর্ষণ বাড়ছে। বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতাও ৷ কি পরিবার, কি সমাজ, কি রাষ্ট্র? সব ক্ষেত্রেই নারীর প্রতি সহিংসতার করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতি পদে পদে নারীরা হেনস্তার স্বীকার হচ্ছে। পরিবার থেকে সমাজ,সমাজ থেকে রাষ্ট্র,সবক্ষেত্রে নারী বিরোধী বার্তা ভেসে আসে। ধর্ষণ নিয়ে সুশীল সমাজ বলছে, নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিরব বর্বর অত্যাচার,আর কতদিন চলবে? মাঝে মাঝে পিতা,সন্তান,প্রেমিক হিসেবে পরিবারের নারী সদস্যদের কাছে মাথা নিচু করে থাকতে হয়, পুরুষ নামক কিছু অমানুষদের বিকৃত মনস্ক আচরণের কারণে।কি এক ভয়ানক, ভয়াবহ পরিস্থিতি!

ধর্ষণ নিয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ ড.আনোয়ারা আলম বলেন -ভোগবাদী সমাজ নারীকে ভোগ্যপণ্য মনে করছে।ধর্ষণের শিকার শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত।ধর্ষণের প্রথম কারণ গুলোর মধ্যে – মাদকাসক্তি , বখাটে ,অশিক্ষা অন্যতম।মাদকাসক্ত ব্যক্তির বোধ শক্তি থাকে না।এবং অশিক্ষিত ব্যক্তিরা ও ধর্ষণ করছে। অফিস আদালত,মাদ্রাসায় যেসব ধর্ষণ হচ্ছে তার জন্য দায়ী বিকৃত মনস্ক তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তিরা। ধর্ষণের জন্য সেই সঙ্গে দায়ী পর্ণোসাইড।পর্ণোসাইড গুলো জৈবিক প্রবৃত্তিকে উস্কে দিচ্ছে।আমাদের পারিবারিক শিক্ষার নৈতিক জায়গা গুলো নড়বড়ে হয়ে গেছে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও আমরা নৈতিক শিক্ষা কতটুকু প্রদান করছি ছাত্র -ছাত্রীদের সেটা নিয়েও সন্দিহান।ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ায় বিজ্ঞাপণ,নাটক- চলচ্চিত্রে নারীকে সমাজের কাছে কিভাবে উপস্থাপন করছি সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এতে সমাজে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।ধর্ষণ প্রতিকার হিসেবে প্রয়োজন,পারিবারিক মূল্যবোধ,নৈতিক শিক্ষা,সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক চর্চার। সেই জায়গায় পরিবার এবং সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।ধর্ষণ মামলায় আইনের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে আইনের বাইরে চলে যাচ্ছে অপরাধীরা। ধর্ষকের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তিই হয়তো ধর্ষণের মতো ঘটনা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিগত পাঁচ বছরের ধর্ষণের পরিসংখ্যান বলছে ২০১৪ সালে মোট ধর্ষণ ৭০৭টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৩৮৭টি, গণধর্ষণ ২০৮। ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬৮, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ১৩ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৮১টি। ২০১৫ সালে মোট ধর্ষণ ৮৪৬টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৪৮৪টি, গণধর্ষণ ২৪৫, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬০, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ২ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৯৪টি। ২০১৬ সালে মোট ধর্ষণ ৭২৪টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৪৪৪টি, গণধর্ষণ ১৯৭, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৩৭, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৮ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৬৫টি। ২০১৭ সালে মোট ধর্ষণ ৮১৮টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৫৯০টি, গণধর্ষণ ২০৬, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৪৭, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ১১ আর ধর্ষণ চেষ্টা ১০৪টি। ২০১৮ সালে মোট ধর্ষণ ৭৩২টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৫০২টি, গণধর্ষণ ২০৩, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬৩, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৭ আর ধর্ষণ চেষ্টা ১০৩টি। আর ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মোট ধর্ষণ ৩৫৪টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ২৫৬টি, গণধর্ষণ ৯৪, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ১৮, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৬ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৫৫টি।(সূত্র দৈনিক ইত্তেফাক)।

ধর্ষণ বিষয়ে নারী নেত্রী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন,বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে।ধর্ষণের মামলা তদন্তে বা ভিকটিমের অভিযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি হচ্ছে কিনা, তা মনিটরিং থাকতে হবে।কেননা, বিচার ব্যবস্থা সার্বিকভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল না হওয়ায় পাওয়ার ম্যানুপুলেশনের সুযোগ থাকে আর অনেক সময় ভুক্তভোগীরা লোক লজ্জার ভয়ে এবং পরিবারের বাঁধার কারণে থানায় মামলা করতে যান না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিচারহীনতাকেই দায়ী করেন৷ তবে রাষ্ট্র ও সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতার আরো অনেক উপাদান আছে বলে মনে করেন তিনি৷ তিনি বলেন, ‘‘ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটে তার একটি অংশ জানা যায় না৷ এ বিষয়ে কোনো মামলা হয় না৷ আর যেগুলোর মামলা হয় বিশেষ করে ধর্ষণের ক্ষেত্রে সেখানে শতকরা মাত্র তিন ভাগ ঘটনায় শেষ পর্যন্ত অপরাধী শাস্তি পায়৷ আর ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় শাস্তি হয় মাত্র শূন্য দশমিক তিন ভাগ৷ তাহলে বোঝা যাচ্ছে এ ধরনের কোনো ঘটনায় বিচার হয় না৷’’ তবে এর বাইরেও আরো অনেক বিষয় আছে বলে মনে করেন তিনি৷

এ মানবাধিকার নেত্রী বলেন, ‘‘যারা ধর্ষক তারা ধর্ষণের শিকার নারীর চেয়ে শক্তিশালী৷ অন্যদিক বাদ দিলেও লৈঙ্গিকভাবে পুরুষ শক্তিশালী৷ তারা সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবেও শক্তিশালী৷ নারীদের সামাজিকভাবে সুরক্ষা দেয়ার রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্র তা পালন করছে না৷ আর নারীদের বাইরে বের হওয়া কিংবা কাজে যাওয়ার বিষয়গুলোকে সমাজে এখনো ভালো চোখে দেখা হয় না৷ নারীর বাইরে বের হওয়াকে পুরুষের ক্ষমতা খর্ব হওয়া হিসেবে দেখা হয়৷ আর প্রতিদিন নানা জায়গায় নারীর বিরুদ্ধে কথা বলা হয় কিন্তু সরকার ব্যবস্থা নেয় না৷ ফলে নারীর প্রতিহিংসতা ও বাড়ছে৷’’ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা কমছে না। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যে ধর্ষণের খবরগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তার কয়টির বিচার হয়েছে? ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধ করে যখন ধর্ষক পার পেয়ে যায়, তখন তা অপরাধকে উৎসাহিত করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ধর্ষণ কমবে এমনটা আশা করা ঠিক না।’ রোকেয়া কবীর বলেন, ‘প্রথমত, ধর্ষণের ঘটনার বিচার হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে ভিকটিম যেন নির্ভয়ে বিচার চাইতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

নারীরূপ আমাদের কাছে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ পায়।মা,বোন,প্রেমিকা,স্ত্রী, কন্যা সন্তান।আসুন আমরা সবাই মিলে নারীবান্ধব একটা বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলি- যেখানে পরিবার, সমাজ সব জায়গায় নারীরা নিরাপদ থাকবে। স্বাচ্ছন্দ্যে যেকোন কর্মক্ষেত্রে কাজ করবে ও পথ চলবে।জয় হোক নারী জাতির জয় হোক মানবিকতার।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]