ধর্ষণকারী যেন কোন ধরনের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নে জঘন্য নারী নির্যাতনের কথা দেশের সচেতন মানুষ অবশ্যই ভাল করে জানেন। এ ব্যাপারে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আজ সারা দেশে ধর্ষণসহ নারী নির্যাতন এতটাই বেড়েছে যে, যা দেখলে কিংবা শুনলে মনে হয়, আমাদের অর্থাৎ দেশের জনগণকে দেখে শুনে রাখার কেউ কিংবা কোন কর্তৃপক্ষ নেই। কেন জানি মনে হয় ধর্ষকদের অপরাধ করে যাওয়ার জন্য অবাধ লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এই ধর্ষণকারীরা ধর্ষণের মত যে কোন কাজ অবাধে করে যেতে পারবে। আজ দেশে সত্তর বছরের বৃদ্ধা থেকে এক বছরের নীচের শিশুরা পর্যন্ত ধর্ষণকারীদের হাত থেকে মুুক্তি পাচ্ছে না। আবার নেতারা বলছেন কোন ধর্ষণকারী যেন কোন ধরনের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়। কথাটা খুবই সুন্দর এবং বাস্তব সম্মত। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দেখা যায় যারা আমাদের নারী সমাজকে মানুষ মনে না করে ভোগের বস্তু বলে মনে করে, তারা অর্থাৎ জঘন্য ধর্ষণকারী অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েই তাদের অপরাধের ডালপালা বিস্তার করে থাকে। কেউ কেউ বলছেন ধর্ষণকারীরা হচ্ছে মানসিক রোগী। তাদেরকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দাও। আবার আমাদের সমাজে এমন লোকজনও আছেন, যারা মনে করে একটা পক্ষ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। যারা মনে করছেন, দেশে চলমান ধর্ষণের উৎসব সরকারের বিরুদ্ধে একটা পক্ষের ষড়যন্ত্র, তারা কিন্তু কথাটা জোর গলায় বলতে পারছেন না।

কেন না তারা দেখছেন শাহবাগে ছাত্র-ছাত্রী এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষজন নেমে স্লোগান দেয়া শুরু করেছে। তাই তারাও মনে হয় মানুষের মনের কথা বুঝে ফেলেছেন। আজ হয়তোবা বলা হচ্ছে ধর্ষণকারীরা যেন রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখছি! একটা সমাজে যখন ধর্ষকরা মাথা উঁচু করে কোন কিছু হিসাবের মধ্যে না নিয়ে চলাফেরা করে তখন আমাদেরকে বুঝে নিতে হবে, ধর্ষণকারীরা বুঝে নিয়েছে তারা যতই অপরাধ করুক না কেন, তাদেরকে কিছু বলার কারো সাহস নেই। অপরাধীরা এটাও বুঝে যদি তারা প্রকাশ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয় মানুষ তাদের কিছু বলবে না। কেননা মানচিত্রের কর্তাব্যক্তিরা তাদের পক্ষে আছেন এবং তারাই তাদেরকে সময় মত রক্ষা করবেন। আজ আমরা এমন এক অবস্থার মধ্যে বসবাস করছি, যেখানে কোন নারী বলতে পারবে না সে কোন মুক্ত সমাজে বাস করছে। যেখানে সে নির্ভয়ে রাস্তা-ঘাটে, স্কুল-কলজে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে কিংবা কোন শপিং মলে চলতে পারবে।

বলছিলাম ক্ষমতাবানদের কথা। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের নির্যাতিত নারীকে যে নির্যাতনকারী জঘন্য ভাবে নির্যাতন করেছে, সেই দেলোয়ার খুবই ক্ষমতাবান। তাকে এলাকার সবাই ভয় পায়। পুলিশ থেকে শুরু করে কেউ তাকে কিছু নাকি বলে না। বলবে কেমন করে, এলাকার মানুষ দেখে দেলোয়ারের মত অপরাধীরা ক্ষমতাবানদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে তাদের অপর্কম চালিয়ে যায়। এলাকার মানুষ নিশ্চয়ই তা জানেন বলেই ভয়ে কিছু বলেন না। আশেপাশের মানুষ যখন দেখে এলাকার সংসদ সদস্যদের সঙ্গে দেলোয়ারের মতো লোকদের ভাল সম্পর্ক, তখন দেলোয়ারের মতো লোকদেরকে সবাই ভয় পাবেই। তাকে কে ঘাটাতে যাবে। মানুষের ঘাড়ের ওপর তো একটা মাথাই থাকে। পত্রিকায় দেখলাম ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। বলা হচ্ছে তদন্তে কোন ধরনের গাফিলতি হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা হবে। এমনও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোন অবস্থাতেই যেন কোন ধর্ষকের প্রতি সহানুভূতি দেখানো না হয়। আবার এমন কথাও বলা হচ্ছে ধর্ষণের শাস্তির ব্যাপারে পরিবর্তনেরও চিন্তা করা হচ্ছে। যাবজ্জীবন পরিবর্তন করে মৃত্যুদন্ডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অনেকেই অনেক কথা বলবেন। কেউ হয়তোবা বলতে পারেন আইন করে কি কোন অপরাধ বন্ধ করা যায়? দেখা যাবে এখন যেমন নারী নির্যাতন আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে, ঠিক তেমনি নতুন আইনেরও অপপ্রয়োগ হচ্ছে।

তবে এটা সত্য শাস্তির বিধান পরিবর্তন করে অপরাধ নির্মুল করা যাবে না। আমরা তো দেখলাম মাদক নির্মূলের ব্যাপারে অনেক ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটলো। তাই বলে কি মাদকের নির্মূল হয়েছে? সবাই বলবেন হয় নাই। বাজারে ঠিকই মাদকের ব্যবসা চলছে। রাঘব বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। ছেলেমেয়েদের হাতে ঠিকই ইয়াবা, ফেনসিডিলের মতো মাদক চলে আসছে। বরং এখন যেনো মাদক বহনের নতুন নতুন কৌশল নেয়া হচ্ছে। এখন শোনা যায় লাশের গাড়ীতে করে মাদক পাচার হয়। তাহালে বুঝুন আমরা কোথায় আছি। ক্রস ফায়ার করতে গিয়ে আমরা দেশবাসী দেখলাম, প্রদীপ কিংবা লিয়াকতের মতো মানুষরা কিভাবে আমাদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। অভিযোগ আছে, ক্রসফায়ারের অপব্যবহার করে অনেক মানুষই লাভবান হচ্ছে। মূল কথা হলো, যারা সমাজে মাথা উঁচু করে অপরাধ করে বেড়ায়, তারা কোন না কোন রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। তারা অর্থাৎ অপরাধীরা জনপ্রতিনিধিদের ফুল দিতে পারে, জনপ্রতিনিধিদের আশেপাশে সব সময় থাকতে পারে এবং এসব অপরাধীরা মাথায় বড় বড় মামলার পরোয়ানা নিয়েও এলাকায় ঘুরে বেড়াতে পারে যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য মতে, দেলোয়ার ভয়ঙ্কর অপরাধী, তার বিরুদ্ধে কয়েকটি হত্যা মামলা রয়েছে। এছাড়া সে চাঁদাবাজী, মারামারি মামলার আসামী। সে এসব মামলার পরোয়ানা নিয়েই এলাকায় ঘুরে বেড়াত। পুলিশ বলত দেলোয়াকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না। এলাকার মানুষের ভাষ্য হচ্ছে সে অর্থাৎ দেলোয়ার মামলার পরোয়ানা নিয়ে ঠিকই এলাকায় ঘুরে বেড়াত। অভিযোগ আছে, দেলোয়ার এলাকার ক্ষমতাবানদের ছত্রছায়ায় থেকে তার অপকর্ম করে যেত। একটা অপরাধী যখন এলাকার কিংবা রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের নিবিড় ছায়ায় থেকে তার অপকর্ম চালিয়ে যায়, তখন কি পুলিশের পক্ষে সম্ভব তাকে খুঁজে পাওয়ার? সবাই এক বাক্যে বলবেন, পুুলিশের পক্ষে সম্ভব নয় তাকে ধরা। আমাদের সকল রাজনৈতিক নেতারা যদি অপরাধীদের মাথার উপর থেকে ক্ষমতার ছাতা সরিয়ে ফেলেন তখনি সম্ভব হবে সকল অপরাধের নির্মূল করা এবং দেলোয়ারের মতো নারী-নির্যাতনকারী অপরাধীদের বিনাশ করা। এসব অপরাধীদের বিনাশ করলেই আমাদের আগামীকাল সুন্দর হবে। তাই বলছিলাম আইনের পরিবর্তন করে কোন লাভ হবে না। আইন পরিবর্তন করে যে অপরাধের বিনাশ হয় না।আবারও বলছি তার প্রমাণ তো আমরা দেখেছি মাদক নির্মূলের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ দেখে।
ঠিক তেমনি করে ধর্ষণের মতো অপরাধ নির্মূল করতে হলে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের মাথার উপর থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের শক্ত হাতে ধরে রাখা ছাতাটি সরিয়ে ফেলতে হবে। তবেই দেখা যাবে দেলোয়ারের মত লোকরা সাহস পাচ্ছে না কোন নারী কে জঘন্য ভাবে বিবস্ত্র উলঙ্গ করে নির্যাতন করার। দেলোয়ারের মতো লোকরা তো শুধু একজন নারীকে উলঙ্গ করে নির্যাতন করে নি, সে পৃথিবীর সকল নারীকে উলঙ্গ করে চরম অপমান করেছে। যার কোন ক্ষমা নেই।

লেখক: আইনজীবি


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box