ধর্ষণ : প্রসঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তন্দ্রা চাকমা
উন্নয়ন ও মানবাধিকার কর্মী

আজকাল ধর্ষণ নিয়ে লিখতে ভাল লাগে না । এর আগে ২/১ টা লেখা লিখেছি । আজ যখন এই লেখাটা লিখছি তখন শাহবাগ ও সংসদ ভবনের সামনে ধর্ষণের প্রতিবাদ চলছে । নোয়াখালীর ভাইরাল ভিডিও সোশাল মিডিয়াতে শেয়ারের পর গোটা দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এমন প্রতিবাদী যদি আমরা সবাই হতে পারতাম তিন পার্বত্য জেলায় যতগুলি ধর্ষণ হয়েছে সেসবের বেলায় তাহলে হয়তো এ বছর পত্র পত্রিকায় যে সব ধর্ষণের রিপোর্ট হয়েছে তার সংখ্যা শুন্য হতো । আইন ও সালিস কেন্দ্রের মতে ২০২০ সালে সারাদেশে ৯৪৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতিদিন গড়ে ৪ জন ধর্ষণের শিকার হয় । এই হল সারা দেশের অবস্থা । তাহলে আমাদের পার্বত্য এলাকার নারীদের কথা ভাবুন একবার। ওখানের পিছিয়ে পড়া নারীদের কথা প্রায় উপেক্ষিত থাকে। তবুও কিছু কথা তো না বললেই নয় ।

দুই বছর আগে পূণাতি ত্রিপুরাকে নিয়ে লিখেছিলাম । সেই মেয়েটিকে শুধু ধর্ষণ করা হয়নি রীতিমত তাকে ক্ষত বিক্ষত করে মেরে ফেলা হয় । পাহাড়ী ছাত্র/ছাত্রীরা আর কিছু সমমনা ননপাহাড়ী মানুষ এ প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলো । কিছু আসামী ধরা পড়েছিলো, কিন্তু কোনো বিচার হয়নি। সেরকম ২০১২ সালের ৯ই মে তে একটা ঘটনা ঘটেছিল রাঙ্গামাটি জেলার লংগুদু উপজেলাতে ।ইব্রাহিম নামে এক ধর্ষক একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক চাকমা মেয়েকে ( তার নাম উল্লেখ করলাম না ) ধর্ষণ করে, উক্ত ঘটনাটি দেখে ফেলায় সে তার চাচাত বোন ৮ বছরের সুজাতা চাকমাকে হত্যা করে । এখানে উল্লেখ্য, এই মামলাটি প্রায় ৫ বছর চলে ও স্থানীয় আদালতে অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হয়েও অর্থের জোরে ইব্রাহিম  হাইকোর্ট থেকে খুব সহজে জামিন লাভ করে । এরকম  লিখতে গেলে অনেক কেইস-এর কথা বলতে হয়।

আমি এখানে আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার সংস্থা কাপেং ফাউন্ডেশনের কেবল গত মাসের নারীর প্রতি সহিংসতার রিপোর্ট তুলে ধরছি। কাপেং এর মতে গত সেপ্টেম্বর মাসে ৭জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়, এছাড়া তার মধ্যে দুজন গ্যাং রেপের শিকার হয় ও ৪ জনকে যৌন নির্যাতন করা হয় ।

এর মধ্যে সবচাইতে আলোচিত ধর্ষণটি সংঘটিত হয় ২৪শে সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে । ওই দিন রাত ১০টার দিকে খাগড়াছড়ির বলপিয়ে আদামে ৯ জন বাঙালি সেটেলারের একটি দল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী এক নারীকে রাতভর ধর্ষণ করে ও মালামাল লুট করে পালিয়ে যায়। ।

ঘটনা ঘটার পর পরই খবরটা জাতীয় গণমাধ্যমে  আসেনি। আমি প্রথম নিউজটা ফেসবুকে দেখি। পরে যখন এটা স্যোশাল মিডিয়াতে অনেক শেয়ার হয় এবং মানব বন্ধন হয় তখন ন্যাশনাল মিডিয়াতে এটি রিপোর্ট হয় । এর পরপরই ২৭শে সেপ্টেম্বর আসামী রা ধরা পড়ে এবং তাদেরকে কোর্টে হাজির করা হয়। অজ্ঞাত কারণে বাকী দুজন ধরা পড়েনি । এরপরও আরও অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমি আর সেগুলো লিখে পাঠকদের ভারাক্রান্ত করতে চাচ্ছি না ।

আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থায় নারীকে ধর্ষণ এক ধরনের পেশী শক্তির বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।

এছাড়া ধর্ষণ করলে কোন বিচার হয় না এবং দীর্ঘমেয়াদী কোন প্রতিবাদও হয় না। ধর্ষকদের মধ্যে নারীকে এক ধরনের ভোগের বস্তু ভাবাও একটা বড় কারণ । আর তাদের টার্গেট দুর্বল বা প্রতিবাদ করতে করতে পারবে না বা করবে না এই ধরনের নারীরাই থাকেন। যেমন- আদিবাসী নারী ও শিশু। ধর্ষকরা ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাক্তিদের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে। পাহাড়ের মেয়েদের ধর্ষণের বিচার না-পাবার একটা কারণ তাদের ভাষাগত সমস্যা । বিচার যারা করেন বা যারা মামলা নেন তারা সবাই বাংলাভাষাভাষী । ফলে আদালতে জেরার জবাব বুঝতে সমস্যা হয় । আদালত তো আর পাহাড়ী দোভাষী দিয়ে মামলা পরিচালনা করে না। তাই পাহাড়ী নারীরা বিচার পান না। ধর্ষণের বিচারতো দূরে থাক এমনি বিচার থেকেও তারা বঞ্চিত হন।

তবে একটা ভাল দিক হচ্ছে পরপর কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা মিডিয়াতে আসার পর এখন দেশে অতিমারীর পরিস্থিতিতেও আন্দোলন করে ধর্ষণের   ধর্ষণের হার কমাতে হলে কিছু কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। ধর্ষণ নিয়ে প্রচলিত আইন কী আছে সেটা রিভিউ করা দরকার । ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুকে সম্মান দিয়ে বিচার কাজ পরিচালনা করা দরকার এবং দ্রুত বিচার কাজ সম্পাদন করে ধর্ষককে প্রচলিত আইনে সাজা দেওয়া উচিত ।

সবশেষে আমি আশা করব, বর্তমানে সারা দেশ জুড়ে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে ঢেউ জেগে উঠেছে, যে প্রতিবাদ চলছে তার জোয়ারে প্রতিটি ঘটে যাওয়া ধর্ষণের বিচার হয়, শাস্তি পায় ধর্ষকরা।

তথ্যঋণঃ 

১। Kapaeeng Foundation Indigenous Peoples’ Human Rights Report, September 2020

    Published on October 2, 2020 ( web version)

2। The Business Standard 27th September, 2020 ( online version)

৩। যমুনা টিভি ( আইন ও সালিশ কেন্দ্র রিপোর্ট)


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box