ধূসর পাণ্ডলিপি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জীবনানন্দ দাশ কি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন?প্রশ্নটি ঘুরেফিরে বহুবার উত্থাপিত হয়েছে। উত্তর মেলেনি। উত্তর খুঁজে পাবার কথাও নয়। কারণ বাংলা সাহিত্যের সবচাইতে রহস্যময় এবং নির্জনতম এই কবির মিানসিক চিকিৎসা নেয়া বা কোনো অ্যাসাইলামে ভর্তি হওয়ার কোনো সূত্র কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। জীবনানন্দ দাশ আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো মুখে বন্দুক ঢুকিয়ে ট্রিগার টেনে দেননি। সিলভিয়া প্লাথের মতো কলেজ জীবনেই মানসিক অবসাদে দীর্ণ হয়ে ভর্তি হতে হয়নি মানসিক হাসপাতালে। চলচ্চিত্রকার ও লেখক ঋত্বিক ঘটক অথবা বাংলা ভাষার আরেক কবি বিনয় মজুমদারের মতো মানসিক হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক শক নিতে হয়নি তাকে।কিন্তু তবুও সব পাখি আর নদীর ঘরে ফিরে আসা দেখতে বের হয়েছিলেন জীবনানন্দ, আর ফিরে আসেননি। বাংলা কবিতার নির্জনতম চরাচর ধরে হেঁটে গিয়েছিলেন কবি একাকী,নিঃসঙ্গ অবস্থায়।

জীবনানন্দ দাশ

তাঁর শরীর থেকে ঝরে পড়েছিলো কবিতার অবিশ্বাস্য সব লাইন, খাদসম নির্জনতা। ট্রামের তলায় চলে যাওার আগেও এমনি নির্জনতা, একাকীত্ব ঝলমল করে উঠেছিলো তাঁর মাথার ভেতরে? কেউ জানে না। জানতো কি সেই ট্রাম যা অনেকদিন আগে আগুন লেগে ছারখার হয়ে গিয়েছিলো? সেই বহুল আলোচিত ‘নকড ডাউন’-এর কোনো শারীরিক উপস্থিতি এখন আর খুঁজেও পাওয়া যাবে না। হয়তো এটাই নিয়তি। কবির ঘাতক অজ্ঞাত কারণে নিজেই পুড়ে ভস্মীভূত হলো? নাকি সে জানাতে চায়নি আমাদের সেদিন কেউ নিজে নিজেই এসে দাঁড়িয়েছিলেন ট্রামের সামনে-মরিবার সাধ হয়েছিলো তার।

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর কারণ আজো অজানা। কিন্তু তাঁর কবিতার শরীর, প্রতিটি শব্দ, উপমার মৃদু অথচ তীব্র উপস্থিতি তৈরি করে সন্দেহের অবকাশ। সত্যিই কী ঘটেছিলো সেদিন?

 

জীবনানন্দের মতো মানসিক যন্ত্রণায় ক্ষয়ে গিয়েছিলেন আরেক কবি বিনয় মজুমদার। প্রায় ৩০ থেকে ৩১ বার তার মাথায় দেওয়া হয়েছে ইলেকট্রিক শক।

বিনয় মজুমদার

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো মানসিক হাসপাতালের আশ্রয়ে থাকা কবি, লেখকদের অদ্ভুত সব কাহিনি ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’।

বিনয় মজুমদার কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এজরা ওয়ার্ডে থাকার সময় দেয়ালে লিখেছিলেন কিছু কবিতা। জীবন তাকে পুড়িয়ে দিয়েছিলো বলেই ছাইয়ের স্বাক্ষরে লিখেছিলেন ‘ক্ষত সেরে গেলে ত্বকে/পুনরায় কেশোদগম হবে না কখনও’।

পাগলা গারদ, মানসিক হাসপাতাল, উন্মাদদের আশ্রয়স্থল এক অদ্ভুত জায়গা। সাহিত্য জগতের কাকে না আটকে রেখেছে এর চার দেয়াল? লর্ড বায়রন, এজরা পাউন্ড, সিলভিয়া প্লাথ, ডিলান টমাস ন্যুট হ্যামসুন, ফ্রাঞ্জ নিৎসে, কাফকা, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, পাবলো পিকাসো।

ফ্রেডারিখ নিৎসে

আদিম যুগে মানুষ শারীরিক ব্যাধি আর মানসিক অসুখের পার্থক্য জানতো না। তখন ভাবা হতো কোনো এক অশরীরী শক্তি মানুষ, প্রাণী ও বস্তুর ভেতরে বসবাস করে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানসিক বা শারীরিক রোগগুলোও সেইসব অতিপ্রাকৃত শক্তির কাজ।

অনেক পরে মানুষ মানসিক ও শারীরিক রোগকে আলাদা করতে পেরেছে।পৃথিবীতে প্রাচীনকালে মানসিক রোগের চিকিৎসালয়ের ধারণা প্রচলিত ছিলো।মধ্যযুগে আরবে এ ধরণের মানসিক সংকটে ভোগা মানুষদের জন্য ছিলো নিরাময় কেন্দ্র। সেখানে তাদের গান শুনিয়ে সেবা দেয়ার ব্যবস্থাও প্রচলিত ছিলো বলে কয়েকজন পরযটকের লেখা থেকে জানা যায়।এগুলিই হয়তো ছিলো এখনকার মানসিক হাসপাতালের পূর্বধারণা।

এই মানসিক হাসপাতালগুলো পৃথিবীতে তৈরি হয়েছিলো উনিশ শতকের গোড়ায়। ইংল্যান্ড এবং আমেরিকায় তখন স্যানেটরিয়াম কথাটার প্রচলন শুরু হয়। এসব স্যানেটরিয়াম নিয়ে বহু গল্প প্রচলিত আছে।সেখানকার চারদেয়ালের ভেতরে রয়ে গেছে বহু কাহিনি। লেখা হয়েছে উপন্যাস।

সত্তর দশকের কাছাকাছি সময়ে বিনয় মজুমদার যখন গোবরা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তখন পাশে পেয়েছিলেন কিংবদন্তী চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটককে। সেখানে ঋত্বিক ঘটকের লেখা ‘জ্বালা’ নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনব অভিনয় করেছিলেন। সেখানে বসেও নাকি বিনয় মজুমদার পত্রিকা বের করেছিলেন। ঋত্বিক ঘটক বিনয় মজুমদার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি সাম্প্রতিক কালের এক কবির সম্পর্কে আশা রাখি, যিনি কবিতার জন্য যথার্থ জন্মেছেন। আমার মনে হয়, একালে বাংলাদেশে এতো বড় শক্তিশালী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কবি আর জন্মাননি। তিনি হলেন বিনয় মজুমদার।’ ঋত্বিক ঘটক সমালোচনায় বন্ধুকৃত্য করেন না। নিজে যা ভালো বোঝেন তাই লেখেন।

অর্নেস্ট হেমিংওয়ে

মানসিক হাসপাতালে থাকাটা যে খুব একটা  সুখের ছিলো না তা বিনয় মজুমদারের একটি চিঠি থেকে বোঝা যায়। চিঠি লিখেছিলেন হাসপাতালে বসে মহকুমা শাসককে। তাতে উল্লেখ করেছিলেন, বাড়ির লোকেরা না চাইলেও তিনি এখন বাড়ি ফিরতে চান। সে ব্যবস্থা করা হোক। কারণ, ডাক্তারদের মত অনুযায়ী তিনি এখন সুস্থ। জীবন তাকে হাসপাতাল আর বাড়ি এই চক্রে ঘুরিয়েছে।’

এজরা পাউন্ড

বাড়ি ফিরে দেখেছিলেন বাড়িতে ডাকাতি হয়ে গেছে। বিনয় মজুমদারের জবানীতে জানা যায়, টাকার অভাবই তার বিয়ে না-করার কারণ। তিনি লিখেছেন, ‘সারাদিন টাকার চিন্তায় আমার সময় কাটে। অর্থের অভাবেই আমার জীবন মরুভূমি হয়ে গেলো। আমার অতি পরিচিতরাই আমাকে ঠকিয়েছে। আত্মীয়দের কাছ থেকে মানসিক রোগীর যোগ্য প্রয়োজনীয় সহানুভূতি পাইনি।’

এই গল্পগুলিই তো মানসিক হাসপাতালের দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলছে আজও।

আমেরিকার কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর্নল্ড লুডউইগ বেশ কয়েক বছর আগে মানসিক রোগের ওপর সাংস্কৃতিক চর্চার কোনো প্রভাব রয়েছে কি না সে বিষয়ে গবেষণা চালাতে গিয়ে দেখেছেন, মননশীল পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষরা মানসিক রোগে আক্রান্ত হন বেশি।

১৯৪৫ সালে ইতালীতে আটক হন কবি এজরা পাউন্ড। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো দেশদ্রোহীতার। তোঁকে আটক করার পর পাঠিয়ে দেয়া হয় আমেরিকায়। সেখানে সেন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কবিকে। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানিয়ে দেন এজরা পাউন্ড স্কিৎযোফ্রেনিয়ার রোগী। সেখানেই তিনি মানসিক রোগীদের ওয়ার্ডে আটক থাকেন ১৩ বছর। ওই প্রকোষ্ঠে বসেই পাউন্ড লিখে ফেলেন তাঁর বিখ্যাত ক্যান্টুস কবিতাগুলো। ১৯৫৪ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান সাহিত্যে এবং ১৯৫৮ সালের এপ্রিল মাসে সেখান থেকে মুক্তি মেলে তার।

সিলভিয়া প্লাথ

জার্মান দার্শনিক ফ্রেডারিখ নিৎসে প্রায় পুরো উন্মাদ হয়ে যান ১৮৮৯ সালের দিকে। তার আগেই বন্ধুদেরকে তিনি অর্থহীন চিঠি লিখতে শুরু করেছিলেন। ওই সময়ে একদিন নিৎসে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকে। সেখানেই এক বছর চিকিৎসাধীন ছিলেন এই দার্শনিক। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন তিনি সিফিলিস রোগে আক্রান্ত। কিন্তু আরো নিবিড় পরীক্ষার পর বোঝা গেলো নিৎসে বাইপোলার ডিজর্ডার রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

২০০২ সালে ক্যালিফর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জেমস কাউফম্যান ১ হাজার ৬২৯ জন লেখককের উপর একটি নীরিক্ষা চালনা করেন। আর তাতে দেখা যায়, কবি বিশেষ করে নারী কবি, নাট্যকাররা একটি বিশেষ ধরণের মানসিক রোগে আক্রান্ত হন বেশি। এই রোগটির তারা নাম দেন ‘সিলভিয়া প্লাথ এফেক্ট’।সিলভিয়া প্লাথ কলেজ জীবনেই বিষন্নতার নির্মম আক্রমণের শিকার হয়ে মানসিক হাসপাতালে বন্দী ছিলেন বহুদিন। তার পরের গল্প তো সবারই জানা। নিজের বাড়িতে ওভেনে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে ওভেন চালু করে দিয়েছিলেন এই মার্কিন কবি।আর তাতেই মৃত্যুর নিপুন নাটক তাঁকে গ্রাস করেছিলো।

অর্নেস্ট হেমিংওয়ের মনে নিজস্ব নরক তৈরি হয়েছিলো ক্রমাগত হতাশা, বাইপোলার ডিজর্ডার এবং এক ধরণের আত্মপ্রেমের অসুখ থেকে। বিষন্নতার জাল কাটতে মদ ধরলেন হেমিংওয়ে। লিখতে বসেও তখন তার একান্ত সঙ্গী মদ। কিন্তু তাতে খুব কোনো লাভ হলো না। সুরায় আসক্ত হয়ে পড়লেন তিনি। ১৯৬০ সালে তাঁকে ভর্তি করা হলো একটি মানসিক হাসপাতালে। ইলেকট্রিক শকই ছিলো তখন তার একমাত্র চিকিৎসা। হাসপাতালে বসে অবশ্য হেমিংওয়ে কিছু লিখে যাননি। কারণ তার মনের উত্তাল তরঙ্গ লেখার চেতনাকে দখল করছে একটু একটু করে। আর সেই তরঙ্গের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ১৯৬১ সালে হেরে গেলেন তিনি। নিজের বাড়িতে মুখে বন্দুকের নল পুরে দিয়ে গুলি ছুঁড়লেন। হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন হেমিংওয়ে।

কেন কেসির উপন্যাস ‘ওয়ান ফ্লিউ ওভার দি কাক্কুস নেস্ট’ একদা হৈচৈ ফেলেছিলো পৃথিবীতে। মানসিক হাসপাতাল নিয়ে লেখা আলোচিত দশটি উপন্যাসের মধ্যে এই বইটিও ছিলো। পৃথিবীর সাহিত্যেও এই মানসিক হাসপাতালের গল্প এসেছে ঘুরেফিরে। মানসিক হাসপাতালের এই অচিন পাখিদের গল্পই তো এখনো ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে। হয়তো পুরো পৃথিবীটাই এখন এক পাগলা গারদে পরিণত হচ্ছে ধীরে ধীরে।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়িান, আনন্দবাজার পত্রিকা, উইকিপিডিয়া
ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]