নগ্ন চিত্রকলা আর আঁকিয়েরা

ন্যুড পেইনটিং অথবা নগ্ন চিত্রকর্ম যে নামেই ডাকা হোক বিষয়টা নিয়ে পৃথিবীতে আছে মহা বিতর্ক। বড় বড় চিত্রকরেরা নারী-পুরুষের নিরাভরণ শরীরকে তুলির অসাধারণ টানে জীবন্ত করে তুলেছেন তাদের ক্যানভাসে। শিল্পবোদ্ধা আর দর্শকরা সেইসব চিত্রকর্ম নিয়ে জড়িয়েছেন নানা বিতর্কে। মাইকেল অ্যাঞ্জেলো  সেই কবে সিসটিন চ্যাপেলের গায়ে নগ্ন নারী-পুরুষের ছবি এঁকে ধর্মীয় পান্ডাদের রোষানলে পড়েছিলেন। এডোয়ার্ড মনে‘র আঁকা ‘অলিম্পিয়া’ ১৮৬৫ সালে সমালোচনার ঝড় তুলেছিল প্যারিসে।

টেম্পটেশন

‘উলঙ্গ’ আর ‘নগ্নতা’ এ দুটি বিষয় নিয়ে শিল্পকলায় সবসময়ই দুটো মত আছে। কেউ বলে থাকেন, এ দুটি বিষয় আসলে এক ধরণের প্রতিক্রিয়া, যে যেভাবে দেখেন। আবার অন্যরা বলছেন, ‘নগ্নতা হচ্ছে শিল্পসম্মত ভাবে নিরাভরণ একটি ব্যাপার। আর উলঙ্গ হচ্ছে, একটি উন্মোচিত শরীর যা পোশাক বঞ্চিত। খুব কঠিন বিষয় হয়ে যাচ্ছে নিশ্চয়ই পুরো ব্যাপারটা। এদের ফারাক ধরতে পারাটাও বেশ শক্ত। হয়তো শিল্পীর চোখেই ধরা পড়ে এই সুক্ষ্ণ পার্থক্য। তবে এটা ঠিক যে যুগ যুগ ধরে এই উন্মোচিত শরীরের চিত্রকর্ম দর্শকদের মাঝে জন্ম দিয়েছে কৌতুহল, আগ্রহ আর বিতর্ক। কারণ এই বিশেষ ধরণের চিত্রকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীর শরীর। প্রাচীন গ্রীসে প্রথম এ ধরণের শিল্পকর্মের সূচনা হয়। প্রথমে ভাস্কর্য পরে ছবি। মধ্য যুগের আগ পর্যন্ত চিত্রকলায় এই নগ্ন ছবির আধিক্য দেখা যায়। এরপর ইউরোপে নবজাগরণের সময় আবারও শিল্পীদের হাত ধরে এই মাধ্যমের উত্থান ঘটে।

এ লেডি ইন এ রেড আর্মচেয়ার

আঠারো শতকের শেষদিকে শিল্পী উইলিয়াম স্ট্র্যাং এঁকেছিলেন তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য টেম্পটেশন’। এই ছবিটির মূল বিষয় ছিল আদম ও ইভের প্রথম নিজেদের নগ্নতা উপলব্ধি করার বিষয়টি। বোদ্ধারা বলেন এই চিত্রকর্মের মধ্য দিয়েই দর্শক প্রথম উপলব্ধি করতে পারলো বসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শরীরের রহস্য এবং চিত্রকলায় প্রথম পা রাখলো নগ্নতা।

স্যার জন এভার্ট মিলিয়াস ১৮৭০ সালে এঁকেছিলেন ‘নাইট ইরান্ট’। শিল্প সমালোচকরা বলেন, এই ছবিটি হচ্ছে বৃটিশ চিত্রকলার প্রথম ন্যুড পেইন্টিং। সেই সময় শিল্পী আর তাঁর শিল্পকর্মটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তখনকার দিনে একজন শিল্পী কোন নগ্ন নারীকে সামনে বসিয়ে ছবি আঁকবেন এই বিষয়টা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল প্রায় অগ্রহণযোগ্য একটি বিষয়।

দা ব্ল্যাক হ্যাট

ফিলিপ উইলসন স্টিয়ার ১৯০০ সালে আাঁকা ‘ব্ল্যাক হ্যাট’ ছবিটি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ করতে চান নি। শিল্পীর বন্ধুরাও ছবিটি প্রদর্শনীতে ঝোলাতে বাঁধা দিয়েছিল। তাদের আপত্তির জায়গাটা ছিল সেই নগ্নতার প্রশ্নে। ছবির বিষয়বস্তু হচ্ছে মাথায় একটি কালো টুপি পরিহিত এক নারী সম্পূর্ণ নিরাভরণ হয়ে বসে আছে। শিল্পীর বন্ধুরা প্রশ্ন তুলেছিল, ছবিতে টুপির ব্যবহারি নিয়ে। কারণ তখন ওই ধরণের টুপি সমাজের অভিজাত মহলের নারীরা পরিধান করতো। তাহলে এভার্ট মিলিয়াস কাকে এঁকেছেন? শিল্পীর সামনে বসে থাকা এই মডেল কি তবে বাস্তব জীবনের কেউ? এই প্রশ্নের সমাধান কিন্তু আজও হয় নি। সমাধান হয় নি কালো টুপি আর নারীর পরিচয় রহস্য।

ন্যুড পেইনটিং নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের তীব্রতা একটু কমে আসে বিংশ শতাব্দীতে। ছবি আঁকতে নগ্ন নারীকে ব্যবহারের বিষয়ে আপত্তিও কিছুটা স্তিমিত হয় মানব সমাজে। কিন্তু তারপরও ভ্রুঁ কুঁচকে তাকানো ব্যাপারটা একেবারে বিদায় নেয় নি।

অলিম্পিয়া

অগাস্টে র‌্যঁদিনকে নিয়েও আছে অনেক সমালোচনা। ১৯০১ সালের পর তিনি এঁকেছিলেন বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য কিস’ যেখানে একজোড়া মানব-মানবী চরম অশ্লেষে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। শিল্পীর তুলিতে ভালোবাসার গভীর প্রকাশ যেন জীবন্ত হয়ে উঠলো ক্যানভাসে। কিন্তু ঝামেলা শুরু হলো সেখানেই। বিংশ শতাব্দীর শিল্পবোদ্ধাদের অনেকেরই ভ্রু আবার কুঁচকে গেলো। তাদের কথা ছিল, চুম্বন তো মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। সেটাকে এভাবে জনসমক্ষে নিয়ে এসে শিল্পী কিছুটা অন্যায়ই করে ফেলেছেন। ব্যাস, শুরু হয়ে গেলো সমালোচনা।এই সমালোচনার বিপক্ষেও একটা দল দাঁড়িয়ে গেলো। তারা বললেন, র‌্যঁদিন তাঁর ছবিতে শারীরিক ভালোবাসাকে এক অদ্ভূত তীব্রতা দিয়ে প্রকাশ করেছেন। ছবিতে মানব-মানবীর চুম্বনকালের শারীরিক প্রতিক্রিয়া বিশদভাবে ফুটে উঠেছে। র‌্যঁদিন সেই শ্বাশত ছবিকেই ফুটিয়ে তুলেছেন রঙ আর তুলিতে। সেখানে অপরাধের কিছু নেই। সেই তর্ক মিটে গেছে বহুকাল আগে। কিন্তু র‌্যঁদিনের ছবিটি বিতর্কিত হয়েই আছে চিত্রকলার ইতিহাসের পাতায়।

চিত্রকলার ইতিহাসে আরেক বিতর্কিত শিল্পী পাবলো পিকাসো। ১৯৩২ সালে এঁকেছিলেন ‘এ ন্যুড ওমেন ইন এ রেড আর্মচেয়ার’। চিত্রকলা বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি চেয়ারে উপবিষ্ট নারী দেহের মধ্যে প্রায় জাদু বাস্তবতার মতো পিকাসো জুড়ে দিয়েছেন আরেক পুরুষের ছায়া। খুব লক্ষ্য করলে এই চিত্রকর্মটির দ্বৈত চরিত্র ধরা পড়ে। সরাসরি এভাবে উন্মোচিত নারী শরীরের মাঝে আরেক পুরুষের শরীরের অস্তিত্ব সমালোচনার কলমকে সচল করে তোলে। তাতে অবশ্য পিকাসোর কিছু আসে যায় নি। তাঁর চিত্রকর্ম পৃথিবীর শিল্পকলাকে ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে গেছে।

মনসুর রহমান

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি কালচার

ছবিঃ বিবিসি কালচার