নজরুল একান্তই আমার, আমাদের বাঙালির

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

মুসলমান আল্লাহু আকবর বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল হিন্দুর উপর
হিন্দু বন্দে মাতরম বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল মুসলমানের উপর
মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে তারা একটি কথায় বলল
মাগো !!মা..

কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় লেখা।

১৯৪০ খৃষ্টাব্দে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের কিছুকাল আগেই কাজী নজরুল ইসলাম নবযুগ পত্রিকায় একটি কলাম লিখেন ‘পাকিস্তান নাকি ফাকিস্তান’। তিনিই সর্বপ্রথম ফাকিস্তান শব্দটি ব্যবহার করেন। এই কলামে তিনি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে কাফির সম্বোধন করেন।

বস্তুত, সাম্যের কবি নজরুল পাকিস্তানের হবু শাসকদের মাঝে দেখেছিলেন অশনি ছায়া। কিন্তু তাঁর এই দূরদর্শিতাকে মেনে নেয়নি মুসলিম সমাজ! তারা নজরুলের বিরোধীতা করলো। নজরুল আতংকিত হলেন বাংলা ভাষার মানুষদের জাতীয়তাবোধহীন উচ্ছৃঙ্খলতা দেখে। ফলশ্রুতিতে তিনি ১৯৪২ সালে নবযুগ (দ্বিতীয় পর্যায়, প্রথম প্রকাশ ১৯৪০) পত্রিকা এপ্রিল সংখ্যায় প্রবন্ধ লিখলেন নাম- ‘বাঙালি বাঙলা’। প্রবন্ধে তিনি শ্লোগান তুললেন, ‘বাঙলা বাঙালির জয় হোক। বাঙলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক!’

সেই থেকে জয় বাংলা স্লোগানটি আমাদের , বাঙালির মুক্তির স্লোগান।

নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের অন্যতম প্রধান ঋণ এই যে, নজরুল তাদের ‘ভাষাহীন পরিচয় ঘুচিয়ে দিয়ে তাদের সামাজিক ভাষাকে সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেন।

আর নজরুলের কাছে সমগ্র বাঙালি সমাজের ঋণ এই যে, নজরুল বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যকে বাঙলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ভাষা হিসাবে সার্বজনীনতা দিয়েছেন ।

১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতা এলবার্ট হলে বাংলার হিন্দু-মুসলমানদের পক্ষ থেকে সংবর্ধিত করা হয় কাজী নজরুল ইসলামকে। উক্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্যের একাংশে তিনি বলেছিলেন-‘বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। ওই অভিযান-সেনাদলের তূর্যবাদকদের একজন আমি। এটাই আমার বড় পরিচয়। যাঁরা আমার নামে অভিযোগ করেন তাঁদের অনুরোধ, আকাশের পাখিকে, বনের ফুলকে, গানের কবিকে তাঁরা যেন সকলের করে দেখেন। আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই; আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। যে কুলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি।’

নজরুলের প্রতি সম্মান রেখে অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন- ‘ভাগ হয়ে গেছে বিলকুল/ভাগ হয়ে গেছে সব কিছু আজ/ভাগ হয়নিকো নজরুল।’

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সিপাহী নজরুল ইসলামকে নিয়ে গেছেন শান্তিনেকেতন। পরদিন দেখা হলো ৬০ বছর বয়েসী কবির সঙ্গে ২২ বছর বয়েসী সিপাহী। এ তরুনের অনেক গুণ, সে পুরা গীতাঞ্জলী মুখস্থ করে রেখেছে। কবি যে গানই শুনতে চান, তাঁকে সেটা তাৎক্ষনিকভাবে শুনিয়ে দিচ্ছেন সেনাবাহিনীর সিপাহী এই কবি।
রবীন্দ্রনাথের খুব পছন্দ হলো ছেলেটাকে। বললেন, তুমি বরং এখানে থেকে যাও, আমাদের ছেলে-মেয়েদের ড্রিল শেখাও আর দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গান শিখো।নজরুল এ প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। চলে আসেন শান্তিনেকেতন ছেড়ে।

এর দেড়যুগ পরে রবীন্দ্রনাথের কাহিনী নিয়ে ছবি বানানো হবে কলকাতায়, নজরুলকে করা হলো সঙ্গীত পরিচালক। রবীন্দ্রনাথের ৭টি গান তিনি সুরারোপ করলেন। পরিচালকের পছন্দ হলোনা সুর। বললেন- মূল রবীন্দ্র সুর নাই এখানে।

নজরুল পরদিন রওয়ানা দেন শান্তি নিকেতন। সবগুলো গান শুনালেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ শুনে বললেন, তোমার সুর আগের সুরের চেয়ে ভালো, এটাই থাকবে।

মানবমুক্তির চিরকালের বংশীবাদক দুখু মিয়া আজন্ম গেয়েছেন মানুষের মিলন

‘সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি’
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।’

দুখু মিয়া আমার শৈশবে মায়ের চোখে পৃথিবী দেখিয়েছেন , কৈশোরে স্বপ্ন এঁকে দিয়েছেন , যৌবনের দ্রোহকে জাগিয়ে দিয়েছেন ।

আমাদের দুখু মিয়া আমি তোমার মাজারের খাদেম নই, তুমি একান্তই আমার , আমাদের , বাঙালির ।

শুভ জন্মদিন দুখু মিয়া।

 ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]