নটরডেম ক্যাথেড্রাল নয়, পুড়ে যাচ্ছে ইতিহাস

মাসুদুল হাসান রনি

(মন্ট্রিয়েল থেকে): দুইহাজার নয় থেকে দুইহাজার আঠারো। প্রায় দশ বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরতে গিয়ে অনেক শহরে পা দেয়ার সুযোগ হয়েছিলো। এরমধ্যে প্যারিস আমাকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডেকেছে। আমিও সময় সুযোগ করে প্রতিবারই ছুটে গিয়েছি শিল্প-সাহিত্যের নগরী প্যারিসে। মোট ১৪ বার প্যারিস যাওয়া হয়েছে শুধুমাত্র ভালবাসার টানেই। প্যারিসের প্রায় সব দর্শনীয়স্থান আমার কয়েকবার করে ঘোরা। আইফেল টাওয়ার, ল্যুভর মিউজিয়াম,ভার্সাই রাজপ্রসাদ, এনভারস রাজবাড়ি, রিপাবলিক স্কোয়ার, নটরডেম চার্চ, মুজে নাসিওনাল দিস্তোয়ার নাতুরেল, পার্ক দো লা ভিলেত, এভিন্যু দ্যু শঁজেলিজে,প্যারিস গেইট,মিতেরা বিবেলথেক, লুই পাস্তুর গবেষনাগার, ইউনেস্কো সদর দপ্তর, বাস্তিল, গার্দুনর্দ সহ কত দর্শনীয় এবং ইতিহাস সমৃদ্ধ স্থানে ঘুরেছি তা এখন আর মনেও নেই। একটু আগে খবর পেলাম ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পুড়ে যাচ্ছে নটরডেম চার্চ। খুব মন খারাপ হয়ে গেলো। আমার শৈশবে পড়া ভিক্টর হুগোর ‘হাঞ্চব্যাক অব নটরডেম’ । সেই সময় থেকে প্যারিসকে চেনা -জানা।তখনই প্রথম জেনেছিলাম নটরডেমকে। সেই নটরডেম, হুগোর তৈরি এসমেরালদা আর কোয়াসিমোদো, আমার আবেগী কৈশোর বয়সের দুই চরিত্রকে খুঁজেছি যৌবনে প্যারিসে এসে। পথে পথে খুঁজে ফিরেছি আমার দুই প্রিয় লেখক ভিক্টর হুগো, জুলভার্নের স্মৃতি। প্যারিস আমার কাছে ক্লদ মোঁনে, রেনোঁয়া ,কামিল এর যতো না, তার চাইতে বেশী ডিঁ আরতানা বা জুলভার্ন এর শহর। সেই শহরে নটরডেম আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। কি অদ্ভুত, আমার মন বলছে নটরডেম পুড়ছে না, পুড়ে যাচ্ছে আমার শৈশবের পড়া ” হাঞ্চব্যাক অভ নটরডেম’’। ১১৬০ সালে নটরডেম চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।গথিক স্ট্রাকচারে তৈরি, নটরডেম মূলত অন্যান্য চার্চ থেকে তার ভিন্নতা ও নতুনত্বে ভরা নির্মাণরীতির জন্য বিখ্যাত, বিশেষ করে গথিক কাঠামোতে বাইরে থেকে সাপোর্ট দেয়া প্রবৃদ্ধি আর বেলফ্রাইগুলো। নটরডেমের পূর্বের টাওয়ার থেকে দেখা যায় প্যারিস নগরী আর সেঁইনে নদী। দূরে দেখা যায় আইফেল টাওয়ার , ফ্রেঞ্চ স্থাপত্যের বাড়িঘর। কোয়াসিমোদোর চোখে কেমন ছিলো এই শহর ? সেন্ট নিকোলাস চার্চ এর বিশালত্ব এখানে নাই। কিন্তু একসময় ফ্রেঞ্চ রাষ্ট্রকাঠামো আর্চবিশপ অব প্যারিসকেই মুখ্য করে প্রাধান্য দিতো, ভ্যাটিকানের প্রভাব কমানোর জন্য। নটরডেম তাই ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর অনেক ঘটন-অঘটন – পরিবর্তনের স্বাক্ষী। নটরডেমের কারুকার্যময় জানালা, বিভিন্ন সন্তদের ছবি আর নানা কাহিনী খোদিত আছে জানালাগুলোতে। সূর্যের আলো যখন জানালার মাঝ দিয়ে আসে অপূর্ব সুন্দর লাগে। অলঙ্কৃত করা জানালাগুলো লম্বা । ভ্যাটিক্যান,প্রাগ, রোম,বন ও বার্লিন মিট্টে’র আরো কিছু চার্চ এ গিয়েছিলাম – সেগুলো ছিলো ষোড়শ শতাব্দীর। সেইগুলোতে প্রায় একই ধরনের জানালা। খুবই সুন্দর কারুকার্যময়। নটরডেমের কোয়াসিমোদোর ঘন্টা যে না শুনেছে, সে কখনো বুঝবে না তার মাধুর্য্য। আমার শোনার সৌভাগ্য হয়েছিলো কোয়াসিমোদোর ঘন্টা। ছুঁয়ে দেখেছিলাম, কি যে অদ্ভুত লাগছিলো! জন্মকালা ও আধাঅন্ধ কোয়াসিমোদোর প্রিয় শব্দ ছিলো এই ঘন্টার শব্দ। মন খারাপ করা দুপুরে দূর থেকে শুনতে পাচ্ছি নটরডেম ক্যাথেড্রালের বিশাল ঘন্টার ঢং ঢং ঢং শব্দ । নিউজ দেখতে দেখতে বারবার মনে হচ্ছে, নটরডেম পুড়ছে না,পুড়ছে ইতিহাস।

ছবি: গুগল