নতুন আলোর দিন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেষ দিনগুলোতে এসে ঠাণ্ডা পড়লো।শীত প্রায় চড়াও-ই হলো লোকালয়ে। সকালে আলো ফোটে না, নিভু নিভু চায়ের দোকানের মোড়ে সামান্য কয়েকজনের ভীরু উপস্থিতি;দিনগুলোকে ছুটির আপন বলে মনে হয়। শীত সব চলাচলের ওপর জারি করেছে সান্ধ্য আইন।রাতে পথ জনবিরল। সারি সারি দোকানপাট আর বড় বড় উঁচু ভবন তাদের বিশাল ভৌতিক আকৃতিকেও যেন পারলে গুটিয়ে নেয়। শীতে নিজের নাম ভুলে যাওয়া কুকুর বেপাড়ার কোনো বারান্দার সামনে নাক ডুবিয়ে দিয়েছে ঘুমে, বেশি রাতে পলাতক পাহারাওয়ালাদের বাঁশিও। শুধু জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষতলে শীত বয়ে চলেছে বিশাল জাহাজে চড়ে।

আরেকবার ফুরিয়ে এলো আমাদের তিন’শ পয়ষট্টি দিন। এবার শীতের আক্রোশের ভেতর দিয়েই শেষের পথে তার যাত্রা। ভাবছিলাম বসে বসে, নতুন বছরে কত কী পাল্টে যাবে আমাদের। ফোনের রিং টোন থেকে শুরু করে ডাক ঠিকানা, বাড়ি, অফিসের পথ, বাসের ভাড়া, চশমার পাওয়ার, মুখশ্রী ।জায়গা পাল্টে নিতে পারে এক বছর ধরে দেয়ালে ঘুরতে থাকা টিকটিকিটাও। আচ্ছা, কী পাল্টায় না মানুষের?মনে হয় পিঠের দিকটা, বদলায় না জুতায় ফিতেরে ফুটো।পিঠটা দেখতে পাই না বলে মনে হয় একইরকম আছে। জুতায়ও প্রতিদিন একই ফিতা বাঁধার কাজ। বদলে যাওয়া সময়ের চিহ্ন এসবকে ছুঁতে পারে না।

পত্রিকার জন্য সালতামামী লেখা খুব একঘেয়ে কাজ। পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি মানে তো সেই রাজনীতির চোরাস্রোত, লুটতরাজ, খুন, রক্তপাত, ধর্মান্ধদের আস্ফালন, ফুল ফোটা, ফুল ঝরে পড়া, ক্ষয়, তারপর জীবন বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়…সেই একই গল্প এপাড়া-ওপাড়ায়।

গত এক বছর ধরে পৃথিবীতে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। সব ঘটনার বিবরণী মনেও পড়ছে না এই মুহূর্তে। প্রিয় বাংলাদেশের মানচিত্রকে ক্ষতবিক্ষত করেছে অনেক হতাশাজনক সংবাদ। পাশাপাশি আশার আলোও জ্বলে উঠেছে। গোটা বিশ্বও এই প্রবণতার বাইরে ছিলো না। মানুষ খুন হয়েছে, ক্ষোভে, আন্দোলনে ফেটে পড়েছে মানুষ রাজপথে, রুদ্র প্রকৃতিও তুলে এনেছে দুর্যোগ, আপন ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। কিন্তু গত এক বছরে একটা বই আমাদের আলোড়িত করতে পারেনি। এমন একটি সিনেমা পর্দায় উন্মোচীত হয়নি যা দেখে দর্শক নড়েচড়ে বসতে পারে। সম্ভবত লেখা হয়নি এমন একটি কবিতাও। তাহলে সাংবাদিকতার ভাষায় বড় সংবাদ কী? মানুষের বেঁচে থাকা, বেঁচে থাকবার ইচ্ছাটাই মনে হয় বড় সংবাদ। এত ঘটনা, দূর্ঘটনার বেড়া টপকে অনেক মানুষ বেঁচে আছে। লড়াই করছে নিজস্ব ভূমিতে দাঁড়িয়ে এটাই বোধহয় বছরের সবচাইতে বড় সংবাদ বলে ধরে নেয়া যায়।

সময় এক আশ্চর্য সমন্বয় প্রক্রিয়া। কাটাছেঁড়া, ব্যর্থতা, সফলতা, আনন্দ, বিষাদ, হেরে যাওয়া, জিতে যাওয়া-কতকিছুই যে জুড়ে রাখে সময়! সূর্যকে আরেকবার গুনে গুনে প্রদক্ষিণ করলো পৃথিবী, তিনশ পয়ষট্টি দিনের প্রায় পুরোটাই শেষ হবার মুখে। আরেকটা বছর আমরা পেছনে ফেলে যাচ্ছি। এগিয়ে আসছে নতুন সময়, আসছে নতুন প্রেক্ষাপট। এবার বদলে যাবে ক্যালেন্ডার। পৃথিবীজুড়ে কত ঘটনা, কত গল্প। ক্যালেন্ডারের বারোটা পাতা উল্টে যে সময়ের ভ্রমণ আমাদের তার মাঝে কত বিস্ময়ই তো লুকিয়ে থাকে।ঘটনার পর ঘটনা আমাদের বিস্মিত করে, অবাক করে। আমরা ভাবি এমনটাও ঘটে! তারপর ঘটনাগুলো স্মৃতি হয়ে জমা হয় ঝুলিতে। তারপর এক সময় স্মৃতির ওপর ধূলো জমে। ভুলে যাওয়ার হাওয়া আসে। আমরা ভুলে গিয়ে আবার অপেক্ষা করি সময়ের অন্য উদ্দীপনার জন্য।ভবিষ্যত আমরা জানি না। বছর শেষে রাশিচক্রবিদদেরও একটা বড় ভূমিকা থাকে ভবিষ্যত বর্ণনা করার ক্ষেত্রে। কিন্তু সবক্ষেত্রে সব ভবিষ্যতবাণী কি মিলে যায়? মেলেনা। তাই নতুন করে অনিশ্চিত সময়কে আমরা সম্ভাষণ জানাতে প্রস্তুত। কিন্তু কোথায় যেন এই উৎসব আমেজের ভীড়ে বিদায়ের করুণ সুরও বেজে চলেছে মনের গভীরে। বিদায়, বিদায় বলে কে যেন ডেকে ফিরে যাচ্ছে। সে হয়তো সময়। সে হয়তো অনেকের দীর্ঘশ্বাস, অনেকের ব্যর্থতা, হয়তো আরও কোন গভীর বেদনা। উৎসবের আয়োজনকে সফল করতে খানিকটা করুণ সুরও প্রয়োজন হয়। এই বেদনার বাঁশি হয়তো বেজে বেজে সেই আনন্দের সুরকে পূর্ণতা দিতে চলেছে। কোথায় কে কী পেলো না তার হিসেব হয়তো প্রাপ্তির হিসেবের তলায় চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু মনের মধ্যে থেকে যাবে। নতুন বছরের নতুন আলোর ভেতরে সেই বেদনার কাহিনীও থেকে যাবে অন্তরে।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]