নব গ্রহ’ র মধ্যপ্রদেশ-পর্ব ২

সুব্রত গোস্বামী

পরদিন সকালে উঠেই চানধুতি করে তৈরি হয়ে নিতে হবে। হোটেলের লোকটা বলেছে বাসস্ট্যাণ্ডে গেলে ট্যাক্সি মিলবে। সেই ট্যাক্সি করে প্রথমে ধূঁয়াধার ফলস তারপর সন্ধেবেলা “মার্বুলরক”। হ্যাঁ, এটা কোজাগরী লক্ষ্মীপূর্ণিমার দিনের ঘটনা। যেটা বলছিলাম, ট্যাক্সি। এককালে কলকাতায় টেম্পো নামের একটা গাড়ি চলতো, মনে আছে? আমরা যেটাকে ট্যাম্পু বলতাম। ত্রিচক্রযান। ড্রাইভারের পাশে গিয়ার-লিভারটা ঠিক ঘাড়নাড়া বুড়োর মত নড়তো। ওটা দিয়ে কীভাবে যে গিয়ার ফেলতো ওরা, সেটা ওরাই জানে! সেই “ট্যাম্পু”ই এখানে ট্যাক্সি। লোহার শিট দিয়ে সিট বানানো। বিপরীতমুখি দু’সারিতে গাঁতিয়ে লোক ধরানো।

নর্মদায় নৌকা ভ্রমন

বাকিরা মাঝে দাঁড়িয়ে। দু’জন ড্রাইভারের পাশে। এরকম জনা পঁচিশেক নিয়ে “ট্যাক্সি” স্বমহিমায় এগিয়ে চলেছেন। সজলের সবসময় সবকিছু সবথেকে ভালোটা চাই নীতি মেনে ও সামনে। ড্রাইভারের পাশে। পূজারী স্পোর্টসম্যান, সঞ্জীৎ মিঠুনফ্যান তাই ওরা “রিক্স” নেওয়ার নীতি মেনে ডালায় বসলো, পা বাইরের দিকে বের করে। আড়াই মণের কালু “ধরতি কা বোঝ” তকমার গ্লানি বুকে নিয়ে মাঝে দাঁড়িয়ে। পাইপ ধরে। আমি আর রাজা “বেশি ক্যাদ্দানিতে কাজ নেই” মনোভাবে লৌহাসনে আসীন। “আমাগো যেইখানে দিবি সেইখানে ফিট” বক্তিমে ঝেড়ে পিণ্টু এক আদিবাসীর পাশে বসে। যিনি আবার সঙ্গে একটি ছাগলও নিয়ে উঠেছেন। “চান্স পেলে আমার সামনে বসতে ক্ষতি নেই। সজল বোর হলে আমার ভালো লাগবে না” সংলাপে সমীর সজলের পাশে। বাকি রইল বাবু। আমাদের কাকা-কাম-জ্যাঠা। “তোরা সবাই আগে ঠিকঠাক বসে নে, আমি সবার হ’লে উঠছি। দরকার হলে পরেরটায় আসবো” বলে বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি। বাবু এত রোগা, এতটাই রোগা যে ড্রাইভারের স্টিয়ারিং-এর ওপরেও বসে যেতে পারবে এবং তাতে বাবু ও ড্রাইভার কারোরই কোনওরকম অস্বাচ্ছন্দ বোধ করার কথা নয়। শেষমেশ বাবু সজল-সমীরের পাশে জায়গা নিল। সেটা কিন্তু গাড়ি পুরো ভরে যাওয়ার পরেই। কোথাও কোনওরকম অদলবদল না করেই।

ধুয়াধার ফলস

ঘণ্টাদেড়েকের খাটারা সফর শেষে পৌঁছলাম ভেড়াঘাট। এখানে “ধূঁয়াধার ফলস” নামের এক জলপ্রপাত রয়েছে। নামটা শুনেই বুঝতে পারছেন, ধোঁয়ার ধারা। তীব্র গতিতে জল পতিত হওয়ার সময় বিভিন্ন জায়গায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েই বারিধূমের সৃষ্টি করছে। জানিনা হয়ত অন্য কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে, তবে আমার এটাই মনে হয়েছে। নর্মদা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ঝরণাটা দেখতে হয়। সাহস করে পাথর টাথর ডিঙিয়ে কিছুটা যাওয়া যায় অবশ্য। অন্যান্য জলপ্রপাত যেমন নীচ থেকে দেখা যায়, এটা ঠিক তেমন নয়। আপনাকে ওপর থেকে দেখেই তুষ্ট থাকতে হবে। হুড়মুড় করে নর্মদার জল একটা খাদে নেমে যাচ্ছে আর মিহি বারিবিন্দু ধোঁয়া সেজে আপনার সাথে খুনসুটি করে যাচ্ছে। বেশ অন্যরকম একটা ফিলিং!

দুপুরের খাওয়ার সময় হ’ল এক অদ্ভুত কেলো। একটা হোটেলে গিয়ে রাজা জিজ্ঞাসা করল, “ভাইসাব ইধার বাঙ্গালী খানা কিধার মিলেগা?” দোকানি বললেন, “আপ আদার্স হোটেল চলে যাইয়ে।”  পিণ্টু বলল, “দ্যাখছস রাজা, এইরম একটা অবাঙ্গালী জায়গায় এই একটা হোডোল ছাড়া আদার্স সবক’টা বাঙ্গালী হোডোল? ভাইবাও ভাল্লাগতাছে!” আদার্স, অর্থাৎ অন্যান্য যেকোনও হোটেলই বাঙালি হোটেল। বাবু বললো, “যদি পোস্তো পাওয়া যায় তাহলে আমি শুধু বিউলিরডাল আর পোস্ত দিয়েই আজকে মেরে দেব। শালা কালকের ওই পাউভাজি খেয়ে মনের ভেতরেও অম্বল হয়ে আছে”। কালু ওর বুদ্ধির দৌড় অনুযায়ী বললো যে ও চিকেন কষা আর ভাত খাবে। হোটেলে না ঢুকেই মেনু ঠিক করতে করতে অবশেষে একটা হোটেলে ঢুকলাম। না, সেটা বাঙালি হোটেল নয়। আরেকটায় ঢুকলাম, সেটাও নয়। এইভাবে গোটা চারেক হোটেলের “দর দর কি ঠোকরে” খেয়ে অবশেষে আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত বাঙালি হোটেলে পৌঁছলাম। হ্যাঁ এই সেই “আদর্শ হোটেল”। সম্পূর্ণ বাঙালি খানা।

মার্বেল রক

ধূঁয়াধার ফলস থেকে মার্বল-রকের এরিয়াল ডিস্টেন্স খুব বেশি না হলেও, একটু ঘুরপথে আসতে হয়। দুপুরে পেটপুরে ঘরোয়া খাবার খেয়ে আমরা ছায়ায় বসে যে যার মত একটু ঢুলেই নিলাম। ভেজাভেজা হাওয়ায় তন্দ্রা চটকালো। কোথাও বুঝি বৃষ্টি হচ্ছে! আলো থাকলেও সুর্য দেখা যাচ্ছেনা। ঠিক মনে পড়ছেনা, সবাই মিলে হেঁটেই গিয়েছিলাম না গাড়ি নিয়েছিলাম। তবে বিকেল বিকেলই মার্বল-রকে পৌঁছলাম। তখন তো ইণ্টারনেট ফেট ছিলনা, কাজেই পৌঁছনোর পর চোখের সামনে যেটা দেখলাম তা আমাদের কেউই কোনওদিন ছবিতেও দেখিনি। ভ্রমণবই থেকে যদিও রাজা একটা ছবি দেখিয়েছিল সবাইকে, তবে তার সঙ্গে এর বেশ তফাৎ। এই ধরুন কালুভিথারাণের সাথে গিলখ্রিস্টের যতটা তফাৎ, ততোটা মতোন। চোখের সামনে এক অন্যরকম ছবি! ডানদিক বাঁদিক যেদিকে তাকাচ্ছি, সাদা রঙের পাহাড়! জলের ওপর সার দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়। যেন জলের আয়না দেখে সারা দেহে শাঁখের গুঁড়ো মেখে সেজেছে! না ছুঁয়েও পাথরগুলোর মসৃণতা উপলব্ধি করতে পারছিলাম। খুউব মোলায়েম যেন! হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আলো কমে এল। প্ল্যান অনুযায়ী আজ চাঁদের আলোয় আমাদের এই ‘ধবলগিরি’ দর্শণের কথা। পাহাড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে নর্মদার বুকের ওপর বয়ে চলবে নৌকা! আমরা ন’জন তা’তে সওয়ার হ’ব। রাজা বই পড়েই আমাদের একটু একটু করে পিপাসা ধরিয়ে রেখেছিল। বাড়ি থেকে একটা তামাক খাওয়ার পাইপ নিয়ে গেছিলাম। ওর’ম একটা রোম্যাণ্টিক সিচুয়েশানে বসে ফ্লাইং-ডাচম্যান পুরে খাব বলে। ভুরভুরিয়ে গন্ধ ছড়াবে আর আমরা ওই শ্বেতাদ্রির দিকে চেয়ে থাকব। সে অনেক অনেক রোম্যাণ্টিক কারবার মোশাই।

প্রিয়দর্শিনী

তা হ’লটা কী, কিছু পরে অন্ধকার তো হ’ল, কিন্তু চাঁদের দেখা নেই। যে ভিজে হাওয়াটা দুপুরের ভাতঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল, আবার সেটা টের পেলাম। এবার ঘাড়ে মাথায় দু-তিন ফোঁটা করে অনুভবও  করতে শুরু করলাম। পিণ্টু শুধু বলল, “রাজা, তরা কীসব প্ল্যানপ্লুন বানাস কোনও ছ্যাদপ্যাদ নাই। খাইট্যাখুইট্যা আইলাম, সকালসকাল দেইখ্যা লইলেই হইত।” রাজার মন খারাপ। ভেতর ভেতর ও যেন কেমন একটা দায়িত্ত্ব নিয়ে ফেলেছে। এমনকী চাঁদ কেন উঠলনা, সেই দায়টাও।

ওখান থেকে বাসে জব্বলপুর ফিরেছিলাম। আমাদের সকলের মধ্যেই ততক্ষণে একটা “কী যেন পেলামনা”র মনখারাপ সংক্রমিত। শুধু সমীর বলল, “আরে একইতো ব্যাপার। চাঁদের আলোয় দেখিনি তো কী হয়েছে? সুর্যের আলোতে তো দেখেছি। দুটোই তো মামা। চাঁদমামা-সুর্যমামা। ভিড় বাসেই সমীর একটা সিট ম্যানেজ করে ফেলেছে দেখলাম। “কালু, তোরটা তো এইখানে আঁটবেনা। আমিই বসি। কী বলিস?” কিছুক্ষণ পরে দেখলাম পাশের লোকটিকে, কালুকে দেখিয়ে কীসব বোঝাচ্ছে। “বো কালা বালা গতর কো দেখতা হ্যায়? বো সৌরভ গাঙ্গুলীকে ঘরকে বগলমে রাহেতা হ্যায়। সৌরভকে সাথ একসাথ দাঁতব্রাশ করতা হ্যায়। সৌরভ আপনে ব্যালকনি মে, ইয়ে আপনে ব্যালকনি মে।” গাঙ্গুলি তখন সবে গরমগরম ইংল্যাণ্ড কাঁপিয়ে ফিরেছে। পিণ্টু হঠাৎ সমীরকে বলে উঠল, “চাদমামা-সুর্যমামা একই জিনিস? সুর্যমামা পড়ছস কোনওদিন?”

ঠিক হ’ল পরদিন আরেকবার চান্স নেওয়া হবে।(চলবে)