নব গ্রহ’ র মধ্যপ্রদেশ-পর্ব ৩

সুব্রত গোস্বামী

সন্ধ্যেয় মার্বেলরক দেখে রাতে ট্রেন ধরে সোজা পাঁচমারি। না, সেদিনও চন্দ্রালোকে ‘শুভ্রাচল’ দেখা হয়নি। রাতে, বেশ রাতে একটা ট্রেন পেলাম যেটা পিপারিয়া যাবে। পিপারিয়া থেকে অন্য গাড়ি নিয়ে পাঁচমারি যেতে হয়। যদ্দূর মনে আছে আমরা যে ট্রেনটায় চড়েছিলাম সেটা মুম্বইমেলই ছিল। কিন্তু আজ নেটে দেখে সময় মিলছে না। হতে পারে সেদিন কোনও কারণে লেট বা তখন শিডিউল অন্যরকম ছিল। যাইহোক নো রিজার্ভেশান। ন’খানি বঙ্গতনয় জব্বলপুর থেকে জেনারেল কম্পার্টমেণ্টে উঠবে, থিকথিক করছে লোক। মেঝেতে বসে সব। উঠতে গেলে প্রথম-কদম লোকগুলোর ঘাড়েই রাখতে হবে। কোনওক্রমে উঠলাম। আমাদের মিঠুনফ্যান সঞ্জীৎ এমন সব ধমক টমক দিল ওই লোকগুলো দেখলাম জায়গা টায়গা ছেড়ে দিল। ন’টা ছেলে, তাদের ন’টা লাগেজ। তারওপর কালুর আবার শক্ত স্যুটকেস! তারও-ওপর ও নিজে। গুঁতিয়েগাঁতিয়ে উঠে সব দাঁড়িয়ে রয়েছি। পূজারী আর সঞ্জীৎ এখানেও দরজায় বসল, বাইরে দু’জনের চারখানি পা ঝোলানো। পূজারীর গায়ে একটা ফিনফিনে গোলগলা গেঞ্জি। বাবুকে দেখলাম অনেকটা ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে। সজল ওকে ইশারায় জিজ্ঞাসা করল যে ও জানলা দিয়েই ঢুকেছে কি না। কালু ভেস্টিবিউলে জায়গা করে নিয়েছে। সমীর আর পিণ্টু আওয়াজ দিয়েছিল যে উঠেছে, কিন্তু দেখতে পাচ্ছিনা। আমি আর রাজা বাথরুমের আগের প্যাসেজটায় দাঁড়িয়ে রয়েছি। আমাদের পায়ের পাতার ওপরে লোক বসে। একবার পা’টা চুলকোবো বলে তোলার পরে অনেক কসরত করে জায়গায় ফেরাতে হ’ল।

বী ফলস

জানিনা কতক্ষণ লাগে! কোন স্টেশানের পরে লাগেজ নিয়ে তৈরি থাকতে হবে নামার জন্য তাও জানিনা! কোত্থেকে একটা খবর পেলাম এর পরের স্টেশানই পিপারিয়া। প্ল্যাটফর্ম উইল বি অন দ্যা কোন হ্যাণ্ড সাইড তাও জানিনা! সঞ্জীৎ সবকটা বসে বসে ঘুমন্ত লোককে তুলে দিল। “উঠো উঠো, সব উঠো। হামকো উতারনা হ্যায়।” ঘড়িতে সম্ভবত রাত দেড়টা দু’টো। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন বেচারা লোকগুলো। খবর ঠিকই পেয়েছিলাম, পরের স্টেশানই পিপারিয়া। তবে তা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর। ট্রেন থামল। আমরা পিপারিয়ায়।

ভোর হ’তে তখনও ঢের দেরি। পিপারিয়ায় যাবার জিপ সেই ভোর বেলাতেই। ছোটো বাসও যায় বটে। ভাড়াটা একটু কমও। তবে সেও ভোরে ছাড়ে। একটা ভ্যান যেতে রাজি কিন্তু রাত তিনটের পর ছাড়বে। দশজনের সিট। আমাদের সাথে এক আর্মি জুটে গেলেন। তিনিও পাঁচমারির গাড়ি খুঁজছিলেন। এ’দিকটায় একটু ঠাণ্ডাঠাণ্ডা। সেপাই ভদ্রলোক বললেন পাঁচমারি পৌঁছলে আরও ঠাণ্ডা লাগবে। “উপর হ্যায় না, ইসলিয়ে।”  মাথায় ন’জনের মালপত্তর বেঁধে গাড়ি ভোররাতে গাড়ি রওনা দিল। সজল সিগারেট মুখে নিয়ে সামনের সারির উইণ্ডোসিটে। তারপর বাবু। ড্রাইভারের পাশে কালু। একপা গিয়ার লিভারের এদিকে আরেকপা ওদিকে। পিছনে ফুটবোর্ডে দাঁড়িয়ে গাড়ির খালাসী। বাচ্চাছেলে। গাড়ি চলছে। কিছু পরে গাড়ি পাহাড়ি পথ ধরল। ততক্ষণে সামান্য আলো ফুটেছে। দেখলাম ছেলেটা ঠাণ্ডায় জবুথবু। সিপাই ভদ্রলোক একদম পিছনের আড়াআড়ি সিটে ছিলেন। “আবে আন্দার আজা। জুখাম হো জায়েগি।” ছেলেটা এলনা।

সবে ভোর। আমরা পাঁচমারি পৌঁছলাম। এটা নাকি এমপি’র স্কটল্যাণ্ড। কারা যে এইসব নাম দেওয়ার জন্য খাতাপেন নিয়ে বসে পড়ে কে জানে! পাঁচমারি পাচমারিই, স্কটল্যাণ্ড হ’তে যাবে কোন দুঃখে! গাড়িতে আসার সময় হাল্কা আলোতেই একটু একটু টের পেয়েছিলাম যে পৃথিবীর এক অন্যতম মিষ্টি সুন্দর জায়গায় পা রাখতে চলেছি আমরা। রাজা আর বাবু মিলে ভ্রমণবই ঘেঁটে এমন একটা জায়গা প্ল্যান করেছিল যার নাম আমরা আগে কোনওদিন শুনিনি পর্যন্ত। চাঁদের আলোয় মার্বেলরক ভেস্তে যাওয়ার পরে পিণ্টু বলেছিল, “রাজা শুইন্যা রাখ, ওই পাচমারি না সাতমারি কীসব কস তরা, সেইটা যদি ভুলভাল হয়, আমি কিন্তু স্যাংস্যাং ব্যাক করুম। খাজুরাহো ফাজুরাহো কিসস্যু দেখুমনা কয়্যা দিলাম।” রাজার উত্তরটা ছিল, “আমি ঠাকুরের কাছে প্রার্থণা করি পাঁচমারি যেন জঘন্য হয়। তোকে আর সহ্য করতে পারছি না ভাই। তুই আয়।” যাকগে, এত বড় টিমে একটু খুটুরমুটুর তো হবেই। কী বলেন?

অপ্সরা বিহার

আমরা যে সময় পাঁচমারিতে, তখন ওখানে পাঁচমারি উৎসব চলছে। এতে অবশ্য খারাপই হয়েছিল। সারা পাঁচমারি জুড়ে পুলিশ, নেতামন্ত্রীর গাড়ি। আরও খারাপ যেটা হয়েছিল সেটা হ’ল আমাদের বুক করা গাড়ি সরকার থেকে ছিনতাই করে নেওয়া হচ্ছিল। যেখানে দু’দিনে সবকটা পয়েণ্ট ঘোরা হয়ে যায়, আমাদের লেগেছিল চারদিন। চারদিনই লাঞ্চের পরে গাড়ি উধাও! তবে ওই চারদিনের বিকেলগুলো বেশ নিজেদের মত করে এনজয় করেছিলাম। আমাদের হোটেলটার পাশেই লছমণ হোটেল নামের একটা খাবারের হোটেল ছিল। ও’রকম একটা মিষ্টি ঠাণ্ডায় চায়ের গেলাস হাতে নিয়ে আড্ডা মারছি! বিষয় এক, মানুষগুলোও এক। শুধু স্টেজটা বদলে যেতেই আড্ডার রঙ, গন্ধ সব যেন কেমন বদলে যাওয়া মতন। দিনপাঁচেক আগের মুরারীপুকুরের বোমারমাঠ এখন পাঁচমারির সবুজঘেরা পাহাড়। অমলের ঘুমটি দোকান এখন লছমণ হোটেল। কিন্তু ওই যে, স্বভাব যায়না মলে। একটা সিগারেট কেউ মনে মনে ধরাবে বলে হয়ত ভাবছে। নিমেষে পাঁচখানা শব্দ পরপর ভিন্নভিন্ন মুখ থেকে নামতার মত বাজতে থাকল। “কাউণ্টার-কণ্ট্র্যাক্ট-ওভার-কভার-ফিল্টার”। তবে কালু এইসবে নেই। পকেট থেকে প্রিন্স-হেনরির প্যাকেটটা বের করে ধীরগতিতে নিজের বিড়ি পাকাতে পাকাতে বলে ওঠে, “অ্যালান মুলালি ইণ্ডিয়ায় খেলতে আসুক, গাঙ্গুলী ওকে ছাতু করবে দেখিস। অবশ্য তার আগে ফুটবল ওয়ার্ল্ডকাপ আছে। দেখেনিস, এবার ফ্রান্স কাঁপাবে।”

পাঁচমারিকে ভাল করে দেখতে গেলে চারপাঁচদিন বা একহপ্তা নয়। অনেকদিন থাকতে হবে। এ’কথা অবশ্য সব বেড়ানোর জায়গার ক্ষেত্রেই সাজে। আমরা যে বেড়াতে গিয়ে সাইটসিইং-এ যাই, সেটা কিন্তু আসলে দেখা নয়, জায়গার নামের পাশে টিকমার্ক করা। “আমি অ্যাত্তো অ্যাত্তো সব জায়গা দেখেছি”র আত্মপ্রসাদ। প্রথমদিন ড্রাইভারটি আমাদের একটা জায়গায় ছেড়ে দিয়ে বলল, “ইয়াঁহা সে আপলোগ নীচে উতার যাও। এক ঝর্ণা মিলেগা। ডাচেস ফলস। উয়ো দেখকে ফির আপ বাপস আজাও, হাম ইঁয়েহিপে রহেঙ্গে।” জংলা, পাহাড়ি পথ বেয়ে নীচে নামা শুরু করলাম। সে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই! সজল বলল, “নেমে তো যাচ্ছিস সব মনের আনন্দে। এতটাই উঠতে হবে কিন্তু। তখন কী কী ফাটবে একটু নোট করে রাখ এখন থেকে”। সজল এইভাবেই কথা বলে। আজও। অনেকটা নামার পর দেখলাম একটা লোক “নিম্বুপানি” বিক্রি করছেন। উনার থেকেই জানতে পারলাম যে যতটা এসেছি ঠিক ততটাই বাকি এখনও। একটা জলপ্রপাত আছে। ব্যাস এই পর্যন্তই খবর। কথায় বলেনা, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে? সত্যিই, আওয়ার ট্রু এণ্ডেভার ব্রট আস টু আ বিউটিফুল ফলস! কীকরে বোঝাই জায়গাটা আপনাদের? যেন প্রকৃতি নিজের একটা সৃষ্টি লুকিয়ে রেখেছে। মুরারীপুকুর থেকে ন’জন ভালোছেলে আসবে বলে শুধুমাত্র এতদিন যেন কাউকে এখানে ঢুকতে দেয়নি। ঘেরা একটা জায়গা, ঝরঝর শব্দে জল পাহাড়ের শরীর থেকে বড় একটা পাথরে আছড়ে পড়ছে, শুধুমাত্র আমাদের জন্য। আর কেউ কোত্থাও নেই। এমন সৃষ্টি ছুঁয়ে না দেখলে বড় অন্যায় হয়ে যাবে। অথচ স্নানের জন্য জলের পরেই যার প্রয়োজনীয়তা সবথেকে বেশি সেটিই কেউ আনেনি। গামছা। আনবেই বা কেন? কবে মানুষ “সাইডসিনে” গামছা নিয়ে গেছে শুনি? তা আনেনি কেউ তো হয়েছেটা কী? চান করতে আপত্তি কোথায়? সঞ্জীৎ বলল, “ন’পিস টারজান নেমে পড় জলে। কিমি কাটকার না এলেই হ’ল। আর এই যা রাস্তা, কারুর আসার কোনও চান্স নেই। স্যাণ্ডো গেঞ্জি দিয়ে গা মুছে নেব”। প্রকৃতিমায়ের কোলে সেদিন ন-ন’খানা বঙ্গতনয় ডারউইন তত্ত্বকে হাতেনাতে প্রমাণ করে এল।

প্রিয়দর্শিনী

এমন অভিজ্ঞতার সাক্ষী এ’পৃথিবীর ক’টা দল হ’তে পেরেছে জানিনা। আমরা পেরেছিলাম। সে আপনি অসভ্যতাই বলুন আর যাই বলুন, বেসিকইন্সটিংক্ট-এর স্বাদ চাখতে বেশ লেগেছিল। তা, চানটান সেরে হাঁফাতে হাঁফাতে আবার ওপরে ওঠা। এবার সেই হাফ-ওয়ে-মার্কে এসে ওই লোকটার কাছে নিম্বু-অম্বু পান করব বলে দাঁড়িয়েছি। রাজা কথায় কথায় জিজ্ঞেস করল, “ইয়ে পানি আপ লাতে কাঁহাসে? অ্যায়সি জগাহ্‌পে পানি লানা তো বহুত মুশকিল কি বাত হ্যায়।”

-“কিউঁ, উয়ো নীচে বালে ঝরণে সে। ওহি সে উঠাকে লাতে হে। কুছ দের পেলে হি তো গেয়ে থে। আপ সবলোগ নাহা রে থে, দেখা মেনে”।    ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি খেলে গেল সরবত ওয়ালার।

পাঁচমারিতে যে কত ঝরণা আছে, কী বলব। আর যেহেতু দু’মাস আগেই বর্ষা গেছে, ঝরণারা বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়ে রয়েছে। লিরিল সাবানের যে বিজ্ঞাপণটা টিভিতে দেখতেন না, একটা মেয়ে ঝরণার জলে কচুপাতা নিয়ে নাচছে? সেই ঝরণাটাও পাঁচমারিতে। বী-ফলস্‌ নাম। এটাও অনেকটা নীচে। তবে আগেরদিনের অভ্যেসবশতঃই হবে হয়ত, এটা কিছুটা কম কষ্টের মনে হল। এখানে কালু একটা ব্যাগ এনেছে, আমাদের সকলের গামছা আর হাফপ্যাণ্ট তাতে রাখা। কালু ছিল বলেই না আমাদের বীফল-এ স্নান সফল হ’ল। অনেক উঁচু থেকে পড়ছে জল। কয়েকটা ধারা তো একদম সরাসরি। মাঝে কোথাও পাহাড়গাত্রে ছোঁয়াছুয়ির বালাই নেই। পিঠে পড়লে বুঝবেন। এখানে অনেক ভীড়। লোকজন কিলবিল করছে। “নে, এখানেও কালকের মত শুরু কর। দেখি কত দম” বলে সজলকে দেখলাম কোমরে গামছা, গলায় পৈতে আর বাবুর থেকে একসাইজ মোটা শরীর নিয়ে বাইসেপ ফোলানো পোজ দিচ্ছে। “অর একটা ছবি তুইল্যা দে কেউ”, পিণ্টুর বক্রোক্তি। আমরা কেউই আগে এমন ঝরণাটরনা দেখিনি। বুঝতে পারছিলাম প্রকৃতি তার মায়াবী, উচ্ছল রূপের জাদুকাঠি দিয়ে সজলের মত ছেলেকেও কিছুক্ষণের জন্য হলেও কেমন সরল মানুষ বানিয়ে দিয়েছিল। ( চলবে )

ছবি: লেখক