নব গ্রহ’ র মধ্যপ্রদেশ-পর্ব ৪

সুব্রত গোস্বামী

পাঁচমারির পাহাড়ে অনেকগুলো গুহার ভেতর মন্দির রয়েছে। সে কী সব নাম একেকটা! জটাশঙ্কর, গুপ্তমাহাদেও, মাহাদেওকেভ! উফফ! তবে জায়গাগুলো বেশ গা-ছমছমে! গুপ্তমাহাদেও যেটা,সেটায় তোকালু ঢুকতেই পারলোনা।একটা ফাটল, যেটা মেরে কেটে পনেরো-ষোলো ইঞ্চির বেশি হবেনা, ওর’ম একটা ফাঁক দিয়ে সব এক এক করে গলে গিয়ে দেখি শীর্ণকায় এক সাধক বসে রয়েছেন। পরনে লাল শালুর পোষাক।গলায়, হাতে রুদ্রাক্ষ। কপালে লাল লম্বা  টিপ। বড় বড় চুলদাড়ি। এই এত কিছু সাজগোজের মধ্যে লোকটা আবার ট্যারা চোখো! এই এমপিট্রিপ আমাকে অনেক কিছু জীবনে প্রথমবার দেখাল।ঝরণা, গুহা, সাদাপাহাড়, তিরিশ সিটের ট্যাক্সি, ট্যারাসাধু। তখনও জানিনা আর কী কী দেখা বাকি ছিল।

যাতা সংকর

জটাশঙ্কর মন্দিরটা সত্যিই অসাধারণ! পাহাড়ের গুহার ভেতরে মন্দির। সেখানে এক হাঁটু জল। আরও ভেতরে গেলে নাকি ডুবেই যেতে হবে, নদীর সঙ্গে যোগ, ইত্যাদি শুনে বাবুতো যাবেই যাবে। বলে  রাখা ভালো বাবু সাঁতার টাতার জানেনা কিন্তু মনের আর মুখের জোরে বর্ষার দামোদর টামোদর ওর কাছে অ্যাকোয়াটিকা। মন্দিরে ঢোকার আগেই গুহার বাইরে আটপৌঢ়ে গলায় গান ভেসে এল। এক ভিখারিনীর কণ্ঠ। “শংকরতেরেজটাসেনিকলেইয়েসারাসনসার”।এ’টুকুই মনে আছে। তবে গানের গলাটা এখনও কানে ভাসে।বাবু আজও মাঝে মাঝেই গানটার কথা বলে। আমায় গেয়ে শোনাতে বলে। পারিনা। কিছু কিছু গান এমন হয় দেখবেন, আপনি হাজার চেষ্টাতেও গলায় বসাতে পারবেন না। ঠিক যেমন “রাইট হেয়ার ওয়েটিং ফর ইয়্যু” গানটা। আজও অমন অনুভবে গাইতে পারলাম না।

এই পাঁচমারি নামটা যে’কারণে সেই বস্তুটির দর্শণ হ’ল এবার। পাণ্ডব গুহা।পাঁচ মানে তো পাঁচই, আর মারিহ্‌’র অর্থ হ’ল গুহা। পাণ্ডুর পাঁচ পুত্র নির্বাসনকালে এখানে এসে পাঁচটি গুহা বানিয়ে থেকেছিল। এমনটাই কথিত রয়েছে। তবে পাণ্ডভকেভ খুব একটা দৃষ্টি নন্দন ঠেকেনি আমার কাছে।তার থেকে পাঁচ মারিতে অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা রয়েছে। সিলভার ক্যাসকেড। দূর থেকে দেখে মনে হবে সবুজ পাহাড়ের শরীর বেঁয়ে রূপো গলে পড়ছে। ভীষণ উঁচু জলপ্রপাত! হাণ্ডিখোনামের একটা জায়গা রয়েছে।সে এক বিশালাকায় হাঁড়ির মত খাদ। দেখলে অবাক হয়ে যাবেন। তবে প্রিয়দর্শিণী নামের যে জায়গাটা সেটা অসাধারণ! মানে, একটা ভিউপয়েণ্ট। আলো বাতাসের সঙ্গে যদি সময় ম্যাচ করে যায় আপনি মুগ্ধ হয়ে দূরের পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে থাকবেন। আমরা যেমন দেখেছিলাম। বিকেল পাঁচটা সাড়ে পাঁচটা হবে।কনে দেখা আলো যেমন হয়, তেমন একটা আলো কিছুক্ষণ থেমে রইল আমাদের চোখের সামনে। আমরা হাঁ হয়ে দেখছি আকাশে একটা পাহাড় আঁকা। তার নীচে আরেকটা খাদ। চেঁচিয়ে কথা বললে ইকো হচ্ছে। শুনেছি যাদের প্রেমিকা টেমিকা থাকে তারা এরকম জায়গায় এলে চিৎকার করে “নীতু আই লাভ ইয়্যু” টাইপের কিছু একটা বলে। কালু সেটা জানতো দেখলাম। চিৎকার করে বলল, “মেরা দেস মাহান হ্যা”। আমরা বাকি আটজন সেদিন কালুর উদ্দেশে প্রকৃতিকে “ হ্যা হ্যা হ্যা হ্যা” করে হাসতে শুনলাম।

“সাত পুরা পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম ধূপগড়”। আমাদের ভূগোল পটু পিণ্টু মনে করিয়ে দিল।আমাদের সেখানে গিয়ে সান রাইজ দেখার কথা। পরে জেনেছিলাম এখানকার সূর্যোদয় নয়, আসলে সূর্যাস্ত বিখ্যাত। কিন্তু দুপুরের পরে যদি সরকার গাড়ি ছিনিয়ে নেয় তাতে সূর্যের আর দোষ কোথায়।নাসিরভাই আগের রাতেই বলে গেছেন ভোর রাত থাকতেই বেরিয়ে পড়তে হবে।সেইমত গাড়ি চলে আসবে।নাসির হলেন আমাদের হোটেল মালিক। তাঁর বাড়িও হোটেলের নীচ তলাতেই। বছর চারেকের একটি পুত্রসন্তান। তিনজনেরই রূপ একেবারে ঝরে ঝরে পড়ছে।দারুণ দেখতে গোটা পরিবার। আমাদের গাড়ির ড্রাইভারটি মিষ্ট এবং মিতভাষী। বাইশ কি পঁচিশ। খুউব আস্তে আস্তে কথা বলে।ওর নামটা মনে নেই তবে মুখটা মনে আছে।এখনকার অভয় দেওলের মত।তা যাই হোক, অন্ধকার থাকতে থাকতেই রওনা দিলাম। এখানকার কোনও গাড়িতে নাকি চাবি নেই। গাড়িরা সব সময় ঢালু জায়গায় রেখে গিয়ারে ফেলে হ্যাণ্ড ব্রেক লাগিয়ে রাখে।এটাই এখানকার দস্তুর। “চোরি নেহি হোতা হ্যায়?” বাবু জিজ্ঞাসা করল।

যাতা সংকর

“নেহি নেহি, পাঁচমারিহ্‌মে চোর নেহি হ্যায়”। ক’দিন আগেও মধ্যপ্রদেশ গেলাম অফিসের কাজে।সেদিনও স্থানীয় এক লোকের মুখে একই কথা শুনে পাঁচমারির এই কথাটা মনে পড়ে গেছিল। আকাশ ফর্সা হওয়ার আগেই আমরা ধূপগড় পৌঁছে গেলাম। ড্রাইভার বলেছিলো পথে ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল দেখা যেতে পারে। একটা সজারু আর একটা বন মুরগি দেখেছিলাম।পরে অবশ্য “সাইট সিয়িং” এর চিড়িয়াখানায় কতক নীল গাই দেখেছিলাম। সেখানেও বন-মুরগি ছিলো। ধূপগড়ের উদিত ভানু দেখে ফেরার পথে কোন একটা জায়গা, নাম মনে নেই, আমরা ধুম্রযোগ কাম জল বিয়োগ ব্রেকে একটু দাঁড়িয়েছি। এক দলনেতা মন্ত্রীর গাড়ি সার দিয়ে এলো।তখন মনে হয় এত সব এক্স-ওয়াই-জেড ক্যাটাগরি-ফরি ছিলো না। চোখের সামনে দিয়ে মন্ত্রীদের গাড়ি চলে যাচ্ছে আর পিণ্টু বিড়ি ফুঁকে চলেছে।রাজা পিণ্টুর মুখ থেকে বিড়িটা টেনে ফেলে দিয়ে বললো, “আরে জানিস তুই কার সামনে বিড়ি খাচ্ছিস? ওটা দিগ্বিজয় সিং, এখানকার মুখ্যমন্ত্রী”।

-“উনি মুখ্যমন্ত্রী তো আমি কী করুম। উনির আর আমার মধ্যে মিল কী ক তো?উনিও আমারে চেনেনা, আমিও উনারে চিনিনা।ব্যাস, মিট্যাগেল।

সত্যিই, পাঁচমারি উৎসব শুধু আমাদের সাইট-সিইং এর গাড়িই কেড়ে নেয়নি।পিণ্টুর বিড়িও কেড়ে নিয়েছিলো।

সাড়ে চারদিন কাটানোর পর পাঁচমারির পালা শেষ। জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়া। পিপারিয়া থেকে ঘণ্টা ছয়েকের জার্ণি। সাতনা  যেতে হবে আমাদের।

খাজুরাহোর নিয়ারেস্ট রেল স্টেশান সাত নাই।তা যাই হোক, পাঁচমারি থেকে পিপারিয়া স্টেশান যাবার জন্য যে গাড়িটায় উঠলাম সেটাতেও পিণ্টুর পাশে এক আদিবাসী মহিলা এবং এখানেও সঙ্গে একটি ছাগল।সজল বললো, “রতনে রতন চেনে, ছাগলে পিণ্টু”।সমীর বললো, “বেপাড়ার ছাগলদের উল্টো-পাল্টা বলছিস কেন ফালতু? ছাগলটার কি কোনও মান-সম্মান নেই?” পূজারী আবার সরল মানুষ।একটা বাঁকা চুটকির মানে যদি উদ্ধার করে ফেলেছে, এবার সবাইকে ভেঙে ভেঙে বলবে পুরো ব্যাপারটা।বললো, “ছাগলটাই তোদের কাছে বড় হ’ল? পিণ্টুর কি কোনও দাম নেই?” আচ্ছা, তখন থেকে পূজারী পূজারী করে যাচ্ছি, ওর আসল পরিচয়টাইতো দেওয়া হয়নি। ওহ’ল কৃষ্ণেন্দু পূজারী। ডাকনাম বুড়ো।দূউউউরের একটা সম্পর্কে আমার মামা হয়, তবে একসঙ্গে খেলাধুলা, আড্ডা মারার সুবাদে আমরা বন্ধুই। তবে আমরা সবাই পূজারীই ডাকি। ওর বাবাকেও ওর বাবার বন্ধুরা পূজারী ডাকতো।

রাত্রি যাপন জব্বলপুর

দেড়টা-দু’টো নাগাদ পিপারিয়া থেকে সাতনা যাবার ট্রেন পেলাম।এবারেও নো-রিজার্ভশান। জেনারেলে উঠে সিটও পেয়ে গেলাম। এখানে আবার কিঞ্চিৎ বাওয়াল ওহ’ল।এক ভদ্রমহিলা উল্টোদিকের সিটে পা তুলে বসে আছেন।উনি পানামালে সঞ্জীৎ বসতে পারে।কিন্তু কিছুতেই পা নামাবেন না।তারপর যাও বা পা নামালেন, নিজের লাগেজটা সিটের ওপর তুলে দিলেন। অর্থাৎ সঞ্জীৎকে কিছুতেই বসতে দেবেন না।সঞ্জীৎও বসেই ছাড়বে। এইসব নিয়ে খানিক বাগ-বিতণ্ডা আর ট্রেনের হকারদের থেকে টুকটাক খাবার খেতেখেতে সাড়েসাতটা-আটটায় সাতনা পোঁছলাম। আর কোনও অটোফটোর চক্করে না পড়ে হেঁটেই হোটেল খুঁজতে শুরু করল ন’জন নওজোয়ান। কিছুটা হেঁটে একটা হোটেল পাওয়া গেল। যার নাম আমরা দিয়েছিলাম ‘মচ্ছড় হোটেল’। বাপরে-বাপ! এমন হোটেলে আগে কখনও থাকিনি। বলছি বটে, তবে সাতানব্বইয়ের আগে আমি পুরী আর দীঘার বলাকা হোটেল ছাড়া সত্যিই কি অন্য কোথাও থেকেছি? যাক, এই হোটেলটা খুব, খুউব খারাপ। কেমন যেন একটা। যাই হোক, “আজকের রাতটুকু তো”র সান্তনায় নিজেদের ভুলিয়ে রাখলাম। এবারেও ভোরে উঠতে হ’বে কারণ সক্কালবেলায় বাস। কিন্তু কপালে ঘুম না থাকলে যা হয়। একে মশা তারওপর সমীরের পেটে গ্যাস নিয়ে সঞ্জীতের সাথে মনোমালিন্য। শেষবেলায় কিছুটা ঝগড়াও বটে। তারপরসমীর তিনতিনখানা ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে একটায় নিদ্রা গেল। তবে যাই বলুন, যদ্দূর মনে পড়ছে মশাদের কিন্তু আর দেখা যায়নি। ( চলবে )

ছবি: লেখক