নব গ্রহ’ র মধ্যপ্রদেশ-পর্ব শেষ

সুব্রত গোস্বামী

বাস টার্মিনাস হোটেলের কাছেই। সকালে সকলে মিলে অপেক্ষায় আছি। আমরা ন’জন ছাড়া আর জনা দশেক ভারতীয়। বাকি কাউকেই এদেশের মনে হচ্ছিল না। “রাজা, শ্যাষম্যাশ এগো লগে যাইতে হইবো? বাসের মইধ্যে তো বিরি-ফিরি কিছুই খাইতে পারুমনা। দোম বাইর‍্যায়া যাইবো তো!” হ্যাঁ, তখন বাসে বাসে ট্রেনে ধূমপান করা যেত। ওই অসভ্যতাগুলো মানুষ তখন মেনেও নিতেন! হাওড়া থেকে জব্বলপুর আসার সময় শক্তিপুঞ্জে আমাদের কারো একটা বার্থে এক বয়স্ক ভদ্রলোক পেছনটুকু ঠেকানোর অনুমতি পেয়েছিলেন। লোয়ারবার্থে। সম্ভবত বাবু শুয়েছিল, তার পায়ের দিকে ওই লোকটি চরম অপরাধবোধ নিয়ে বসে রয়েছেন। টিকিট কনফার্ম হয়নি বা জেনারেলের টিকিট কেটে স্লিপারে উঠেছেন হয়ত। ঠিক তার ওপরের মিডলবার্থে সজল, তারওপর সঞ্জীৎ। আমি তার উল্টোদিকের আপারবার্থে। দুজনে গল্প করছি। রাত ভালোই হ’বে তখন। আলো নেভানো ছিল সব। সঞ্জীৎ পাইপে তামাক ভরে খাচ্ছে। আমি ইশারায় সঞ্জীৎকে নীচে বসে থাকা লোকটির নাইটবাল্বের আলোয় চকচক করতে থাকা টাকটা দেখালাম। ও মাথা নীচু করে দেখতে গিয়ে বিপত্তিটা ঘটালো। মুখে ছিল পাইপ, সেখান থেকে জ্বলন্ত একঢ্যালা তামাকলোকটির ঠিক টাকের ওপরে গিয়ে পড়ল। হাইট অফ সৌজন্য দেখেছিলাম সেদিন। লোকটি কিচ্ছু বললেন না। উনি বোধহয় মেনেই নিয়েছিলেন, অন্যের সিটে বসলে এমন বাঁদরামো সহ্য করতেই হ’বে।

বাস এল। খাজুরাহো পৌঁছতে এখান থেকে তিনঘণ্টার কিছু বেশি সময় লাগবে। বাসে ওঠার আগে থেকেই ওই বিদেশিদের মুখ থেকে শুনে আমরা উদ্ভট উচ্চারণে খাজুরাহোকে “ক্ষ্যাজ্রোঁ” বলতে শুরু করে দিলাম। সমীর জানলার সিট পায়নি দেখে বাকিরা চিন্তিত। গতরাতের পেটের গ্যাস যদি থেকে যায়, সেই চিন্তায় জানলার পাশের সিটটা ওকে এবং সকলকে একটু স্বস্তি দিতে পারে। পূজারীকে বলল, “তুই জানলার ধারে কী করছিস। পিপারিয়া আসার সময় তো ঠাণ্ডা লাগালি”। জব্বলপুর থেকে পিপারিয়া আসার সময় পূজারী একখানা গোলগলা পাতলা গেঞ্জি গায়ে ট্রেনের দরজায় বসেছিল, বলেছিলাম না? আর তার পরদিনই ডাচেস ফলসের জলে ‘উদোম স্নান’। ব্যস, আর যায় কোথায়! ঠাণ্ডা-ফাণ্ডা লাগিয়ে একসা। দেখেছেন…এই ঠাণ্ডার কথায় মনে পড়ল, আমি একটা দারুন জায়গার কথা বলতেই ভুলে গেছি! নাহ্‌, ভ্রমণকাহিনী লেখা আমার কাজ নয় দেখছি! শুনুন তবে। জায়গাটার নাম ‘অপ্সরা ভিহার’। ভেবেই আফশোষ হচ্ছে যে এই জায়গাটাই আমি ভুলে বসেছিলাম! এখানেও অনেকটা হেঁটে নীচে নামতে হয়। একটা পুষ্করিণী রয়েছে। সেই পুকুরের বুকে পাহাড়ের ওপর থেকে ঝরণা ঝরে পড়ছে। দৃশ্যটা মনে মনে কল্পনা করুন। আরেকটা কথা বললে তো এক্ষুণি ছুটে যেতে চাইবেন অপ্সরা ভিহারে। পুকুরটায় কিছুটা সাঁতার কেটে ঝরণাটার কাছে যেতে হয়। পাথরের ওপর জল পড়ে ঠিকরে যাচ্ছে অনবরত। জলরাশির পিছনদিকে যে বিরাট প্রস্তরখণ্ডটা রয়েছে তার ওপর দেখি একটা রামধনু। সূর্যটা একটু জায়গা বদলালেই হয়ত রামধনুটা আর থাকবে না। তাই আমি আর সঞ্জীৎ চেঁচিয়ে সবকটাকে ডাকলাম। মজার কথা হ’ল আমাদের টিমের ন’জনের মধ্যে বাবু, কালু, সজল সাঁতার জানেনা। পূজারী, জ্বর এসেছে বলে পাড়ে দাঁড়িয়ে। পাঁচজন মিলে যে দৃশ্য সেদিন দেখেছিলাম তা জীবনে ভুলবনা। কিন্তু ওরা চারজন যেহেতু সাঁতার জানেনা বলে দেখতে পারেনি সেহেতু মানলনা। বিশ্বাসই করলনা। সে নাই বা করল, তাতে রামধনুর কিচ্ছু যায় আসে না। এখানে আমি একখানি ক্যাদ্দানি মেরেছিলুম মনে আছে। অল্পবয়সে করা কিছু কাজকম্মের কথা মনে পড়লে বড় হয়ে বেশ গা ছমছম করে ওঠে। যেমন ছোটোবেলার কিছু বাসেট্রেনে ঝুলে যাওয়ার স্মৃতি মনে করলে এখন কেমন শিউরেই উঠি। পাহাড়ঘেঁষা অমন একখানা ঝরণা ওয়ালা পুকুর দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না। পাহাড়ের ওপর থেকে জলে দিলাম এক ঝাঁপ। ঝাঁপ মানে ওই ঝুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জলে লাফ দিলাম তেমন নয়। সাঁতার শিখতুম বলে সত্যিকারের ‘ডাইভ’ দিতে জানা ছিল মোয়াই। একেবারে থিয়োরি মেনে হাতের আঙুল আগে জল ছোঁবে। ছবিখানা বাবু একঘর তুলেছিল বটে! সঠিক টাইমিং না’হলে এটা সম্ভব হ’তনা। তবে ও যেহেতু আমাদের রামধনু দেখার কথা বিশ্বাস করেনি, আমিও ওর ছবি তোলাকে কৃতিত্ত্ব দিইনি। আজও দিইনা। “ওটা বাইচান্স হয়ে গেছে রে ভাই।”

খাজুরাহো পৌঁছনোর পথে গাড়ি একজায়গায় ব্রেকফাস্ট-ব্রেক দিল। জানতে পারলাম কাছেই একটা ন্যাশনাল পার্ক রয়েছে। পান্না। কান্‌হার কথা শুনেছিলাম। তবে আমার লিমিটেড জেনারেল নলেজ পান্নার নাম শোনেনি কখনও। বাবু বলল, “নাম করা জঙ্গল বে। ভেতরে ঢুকলে বাঘ শিওর শট”। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে আমার কাছে জঙ্গল বলতে তারাপীঠ যাওয়ার পথে পানাগড়। এর বেশি জানিনা। আমাদের ট্যুর প্ল্যানে পান্না নেই। যদ্দূর মনে পড়ছে আমরা যেইসময় গেছিলাম তখন জঙ্গলটা বন্ধও ছিল। এগারোটার মধ্যে খাজুরাহো পৌঁছলাম। সত্যি বলতে খাজুরাহো আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। শুধু আমার কেন আমাদের কারুরই তেমন মনে ধরেনি। তবে বিদেশিগুলো যেভাবে হাঁ-করে দেখছিল তাতে এ’টুকু বুঝেছিলাম ব্যাপারটা কিছু একটা ‘ব্যাপার’ বটে। মনে আছে এইখানেই এক বিদেশী ভদ্রলোক আমাদের একটা গ্রুপফটো তুলে দিয়েছিলেন। ক্লিক করার আগে সব্বাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “রে এ এ এ এ দি ই ই ই ?” তারপর থেকে বাকি ট্যুরটা আমাদের একে অপরকে ‘রেদি’ বলতে বলতেই কেটে গেল। ঢোকার সময়ই “গাইড গাইড” বলে চেঁচিয়ে গাইডরা নিজেদের বিকোতে লাগলেন। আমরা নিইনি। “মাইয়্যা মানুষগো লগে ব্যাটাছেলেগো লটরবটরের মূর্তি বোঝার জন্য গাইড লাগবো ক্যান?”, পিন্টু গাইড নেওয়ার পক্ষে নয় বুঝলাম। একটা বিদেশী দলের পাশেপাশে চলতে শুরু করলাম। দলটিতে বিদেশিনীই বেশি। মজার ব্যাপার হ’ল ওদের গাইড ওদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন আর আমি আড়ি পেতে আমার ইংরিজি জ্ঞানের সাধ্যমত সেগুলো বোঝার চেষ্টা করছিলাম। যা বুঝতে পারছিলাম দলটি পুরো ব্যাপারটা নিয়ে মজাই করছিল।

খাজুরাহোতে এখন অডিও গাইড পাওয়া যায়। গাইডদের মনগড়া নয়, সত্যিকারের তথ্য পাওয়া যায়। শুনেছি খাজুরাহো সত্যিই এদেশের এক অগ্রগণ্য দর্শনীয় স্থান। তা সে পিণ্টু যতই বলুক, “শুইন্যা রাখ, এইসব বাৎসায়ন ফায়ন আমাগো বাও হাতের খেল”। যদিও প্রত্যুত্তরে সজল বলেছিল, “দেখিস, সারাজীবন না ওটা হাতের খেলই রয়ে যায়।”

যেহেতু আমাদের কোনও রিটার্ণটিকিট কাটা ছিলনা, ট্যুরটা আরও ক’দিন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতেই পারত। কিন্তু ওই যে, “কলকাতা কলকাতা মন কেমন”। এরপর অমরকণ্টক-এর পথে যাওয়া হবে কি হবে না এই নিয়ে দল দ্বিধা-বিভক্ত। মানে আমরা যে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিলাম তা নয়। আমাদের প্রত্যেকের মন দ্বিধায় বিভক্ত ছিল। মনের একটা ভাগ বলছে অমর কণ্টক, আরেকটা ভাগ মায়ের হাতের রান্নার জন্য কাঁদছে। রাজা বলল, আমরা যদি জব্বলপুর গিয়ে আরেকবার মার্বেলরক ট্রাই করি সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমাদের এই বেড়ানোর মূল উদ্দেশ্যই কিন্তু মার্বেলরক। তাই হ’ল। রাজ-আজ্ঞা পালন করাই রাজধর্ম। সেই হেতু “চলো জব্বলপুর”।

ধুয়াধার ফলস

জব্বলপুর পৌঁছতে একটু রাতই হ’ল। স্টেশনেই হ’ল রাত্রি উদ্‌যাপণ। সিগারেট টানতে টানতেসজলের সেই “মুঝকো পিনা হ্যায় পিনে দো” আজও কানে বাজে। প্ল্যাটফর্মের এক ভিক্ষুকের বিছানায় সজল পেছনটা সামান্য ঠেকিয়ে বসার সুযোগ পেয়েছিল। “ছুঁচ ও ফাল” তত্ব মেনে রাত যত বাড়তে থাকল সজলের পেছন ভিক্ষুকের সেই বিছান গ্রাস করতে শুরু করল। শেষমেশ যেটা দেখা গেল সেটা হ’ল, ভিক্ষুক ভদ্রলোক বিছানার বাইরে এবং সজল সেই বিছানায় ভিক্ষুকের চাদরটি মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে।

সকালে উঠে আমাদের টার্গেটই ছিল কাউণ্টারে লাইন দেওয়া। “টিকেট-টু-হাওড়া”। রাতে এক টিকিট কালেক্টারকে শুধোতে তিনি বলেছেন শক্তিপুঞ্জের টিকিট টুহাণ্ড্রেড পার্সেণ্ট শিওর পাওয়া যাবে। পেয়েও গেলাম। দিনের দিন ন’খানা টিকিট, বেশ অবাক করা ব্যাপারই বটে! স্টেশানের বাথরুমে একেএকে চানধুতি সেরে নিয়ে ক্লোকরুমে মালপত্তর রেখে এবার আমাদের গন্তব্য সেই চাঁদের পাহাড়, মাথায় যাহার কী জানিনা তবে পায়ে আছে নর্মদা নদি। ফেরার ট্রেন রাতে তাই এবার দিবালোকেই সাইট ভিজিট। তাছাড়া এই ক’দিনে চাঁদও ক্ষয়ে গেছে অনেকটা। কাজেই রাতে গিয়ে কাজ নাই। আমাদের সারাটা দিন আজ ডিভোটেড টু নর্মদা অ্যাণ্ড “মার্বুলরক”। এক লোক আমাদের বললেন চোরাপথ দিয়ে পাহাড়ের মাথায় মাথায় ঘুরিয়ে আনবেন। নৌকো করে যাবার প্রয়োজন নেই। সমীর বলল, “পয়সাও দেব আবার খেটেখুটে পাহাড়েও উঠব, এটা হয়না”। ঠিক হ’ল নৌকো করে ঘুরব। অনেক সময় রয়েছে হাতে।

মার্বেল রক

কালুর প্রিন্স-হেনরির গন্ধে পাড়ের মাঝিরা সব মাতোয়ারা। ফিসফিসিয়ে বলতেও শুনলাম, “ইয়ে কালা ওয়ালা আদমি গাঞ্জা পি রাহা হ্যা”। দেখলাম ওখানকার বিড়ি বেশ লম্বা। মধ্যপ্রদেশ তো কেন্দুপাতার বাপেরবাড়ি কাজেই বিড়িশ্রমিকেরা পাতা খরচের ব্যাপারে দরাজহস্ত। প্রাচুর্যে যা হয় আরকী। যাইহোক বিড়িতে-প্রিন্স হেনরিতে মাঝিদের সাথে আমরা আবার পৃথিবীর বুকে বার্টার সিস্টেম ফিরিয়ে আনলাম। সে আবার ব্র্যাণ্ডেড বিড়ি! টেলিফোন তার ব্র্যাণ্ডনেম। যাকগে বিড়িফিড়ি বাদ দিয়ে এবার সৌন্দর্যের কথায় আসি। নৌকো তো শ্বেতপাহাড়ের ভাঁজেভাঁজে নর্মদার বুকের ওপর ভেসে বেড়ানো শুরু করল। সঙ্গে উপরিপাওনা মাঝির ছড়া। সাদাসাদা, নরমনরম পাহাড় আর জলের ওপর তারই প্রতিবিম্ব। আগেই বলেছিলাম, আমার জীবনের প্রথম হাই-ভোল্টেজ বেড়ানো এটা। কাজেই যাহাই অবলোকন করিতেছি তাহাই প্রথম এবং তাহাই আমার মানশ্চক্ষুকে শুধুই বিস্ময় প্রদান করিতেছিল। বহুবছর পরে একটা সিনেমায় এই শুভ্র-পাহাড়ের সৌন্দর্যে এক নায়িকাকে নৃত্যগীতস্নানরত অবস্থায় দেখেছিলাম। “রাত কা নেশা আভি আঁখ সে গয়া নেহি”। সেদিন বুঝেছিলাম আমরা যদি লক্ষ্মীপুজোর রাতে এ’পাহাড় দেখতে পারতাম সে নেশা কেমন হ’তে পারত যা দিবালোকেই এমন অপূর্ব!

আজ কুড়ি বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে যাবার পর এই স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসারই কথা। অথচ লিখতে বসে দেখলাম প্রায় সবই বেশ মনে আছে। এমনকী একটা প্যাকেটের সব বিস্কুট একাই খেয়ে নিয়েছিল বলে কালুকে রাজার দেওয়া সেই বিচ্ছিরি খিস্তিটাও। এখনও যদি এই ন’জনের যেকোনও চারজন একসাথে বসি, কিছুটা সময় মধ্যপ্রদেশের জন্য বরাদ্দ থাকে। আমাদের অবচেতনে মধ্যপ্রদেশ নিজেই তা করে নেয়, সে সজল, পিণ্টু যতই দূরে চলে যাক না কেন। স্মৃতি বড় বেয়াড়া যে।

ছবি: লেখক