নর্থ বেঙ্গলে প্রথম পা…

সাবিহা হক

তখনো ভোরের আলো ফোটেনি,এমন সময়ই বের হয়ে গেলাম ঘর থেকে। কুয়াশাচ্ছন্ন মায়াবী ভোর দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট স্থানে সঠিক সময়ে। সেখানে আর সবাই জড়ো হয়েছে, সবাই গাড়ির অপেক্ষায়। রাজু ভাইয়ের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আমরা আট জন যাচ্ছি যেনো এক অনন্ত যাত্রা….. অসীমের উদ্দেশ্যে!!!ঠিক যেমনটা বলা যেতে পারে চৈত্রের খরো দুপুরে গাঁয়ের মেঠো পথ ধরে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলা…..গন্তব্য দিগন্ত রেখায় মাথা উঁচু করে থাকা এক বট বৃক্ষের পানে। যার ছায়ায় বসে থাকলে সব ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়, তনুমনে প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে। ভালোলাগা- ভালোবাসায় ভরে যায় মন অন্যরকম এক প্রশান্তিতে।বাস্তবে আমাদের গন্তব্যটাও ছিলো সেই বটবৃক্ষ মানব তারেক ভাইয়ের কুড়িগ্রামের উলিপুরে ‘ছায়াবীথি’ নামের রাজপ্রাসাদে।

পথের মাঝে দু জায়গায় যাত্রা বিরতি। নাস্তা শেষে  বগুড়ায় মিলনের অসাধারণ আতিথেয়তায় দুপুরের খাওয়া পর্ব। নানারকম খাবারের সঙ্গে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ভান্ডারের এক অপুর্ব আয়োজন।

তিস্তা ব্যারেজ

রাজশাহী থেকে আসা রাজ্জাক ভাই আর বগুড়ার মিলনকে নিয়ে আমরা ছুটে চললাম রংপুরের ‘তাজহাট জমিদার বাড়ীর প্রাঙ্গণে। সেখানে হুমায়ুন ভাই,বিশ্বজিত দা, সিফাত ভাই ও ডালিমের ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়াটা ছিলো অপ্রত্যাশিত পাওনা। ঠিক তেমনি চমক অপেক্ষা করছিলো জমিদার বাড়ীর চত্বরে মাননীয় বানিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশীর সঙ্গে রাজু ভাইয়ের মাধ্যমে রংপুরের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে কিছুক্ষণের আলাপচারিতা।তখন রাত বাজে ন’টা। তারেক ভাইয়ের ছায়াবীথি নামক রাজপ্রাসাদে অপেক্ষা করছিলো আপ্যায়নের নানারকম জাকজমকপূর্ণ বনেদী পসরা। পথের ক্লান্তি ভুলে শুরু হলো আড্ডাবাজী আর গানবাজনা। এরপর রাতের খাবারের বিশাল আয়োজন ও ভুঁড়িভোজ শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে ঘুমুতে যাওয়া। রাজু ভাইয়ের চিরাচরিত হুংকার…. সকাল আটটায় নাস্তার টেবিলে সবাইকে চাই।

দ্বিতীয় দিন সকালে নাস্তা সেরে, তারেক ভাইয়ের নেতৃত্বে আমাদের গন্তব্য ঐতিহাসিক চিলমারি বন্দরে।সেখানে অপেক্ষা করছিলো এক বিশাল আকারের কাঠের বজরা। ঐতিহ্যবাহী ব্রহ্মপুর নদের শান্ত শীতল জলে শুরু হলো আমাদের নৌ বিহার। কখনো কখনো নীল জল আর একপাশে সবুজ ফসলের ক্ষেত, অন্য পাশে ঝিকমিকে বালুচর। মাঝেমাঝে জমির পাড় ভেঙে যাওয়ার ছপছপ শব্দ নাকি নদীভাঙা কোনো কিষাণীর চাঁপা কান্না….. জানিনা।

ব্রহ্মপুত্রের বিশুদ্ধ বাতাস চিরে বজরা এগিয়ে চলছে আসামের সীমান্তরেখার দিকে। চলছে গান আড্ডা। দুপুর যখন দু’টো, নদের পাড়ের সুবিস্তীর্ণ বালুচরে দিগন্তরেখার প্রান্তে দেখতে পেলাম এক লাল পতাকা পতপত করে উড়ছে। তার নীচে ঠিক বিন্দুর মতো জমে থাকা কিছু মানুষের অবয়ব। ওটাই খেউয়ার চর। জানিনা কতক্ষণ ধরে এই প্রখর রোদকে উপেক্ষা করে আমাদেরই জন্য তাদের এই উৎসুক অপেক্ষা। নৌকা ভীড়লো চরের ঘাটে।

সান পানির ফ্যাক্টরি

সেখানে ভ্যান করে চারপাশের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার আতিথেয়তা গ্রহণ করলাম। এরপর নৌকায় তুলে দেয়া হলো দুপুরের খাবারের পসরা। মাটির চুলায় রান্না করা অজপাড়া গাঁয়ের নাম না জানা কোনো বঁধুর রান্না খেয়ে মুগ্ধ হলাম।এখন একটা “ভাত ঘুম” হলে ভালো হতোনা? কিন্ত বিধিবাম বাসু ভাই ও রাজুভাইয়ের চেচামেচিতে আবার শুরু হলো নদী, মাটি আর প্রকৃতির গান।সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে অনেকটাই হেলে পড়েছে। আমরা ফিরে চলেছি স্রোতের প্রতিকূলে, সেই চিলমারি বন্দরের দিকে।আজকের দিনটি ছিলো আমাদের সবার জন্য মনেরাখার মতো অন্যরকম একটা সুন্দর স্বচ্ছ দিন। ছিলোনা কোনো ক্লান্তির রেশ ছিলোনা প্রকৃতির বিরূপ মনোভাব।

সন্ধ্যা নেমে এলো। আমরা ছায়াবীথি” আঙিনায় ফিরলাম। কিছুটা বিশ্রাম শেষে তারেক ভাইয়ের ভাই- ভাবীর আগমনে নীচে বিশাল বৈঠকখানায় চলে আসলাম। পরিচয় পর্ব শেষে গান আনন্দ মুখর আড্ডায় কেটে গেলো অসাধারণ মুহুর্ত। রাতের খাবার শেষে ঘুমাতে যাবার পালা। কারণ পরদিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে চরম ব্যস্তময় একটা দিন। কিন্ত কে শুনে কার কথা। আবার আঙিনায় পূর্নিমা চাঁদের আলো আঁধারিতে চললো পপি ও স্বপনের অপূর্ব জোছনার গান।তৃতীয় দিন সকাল আটটায় ব্যাগ গুছিয়ে নাস্তা সারলাম তারেক ভাইয়ের কথা মতো পেট পুরে না খেয়ে। কারণ দ্বিতীয় দফা নাস্তা খেতে হবে উনার বড় ভাই ভাবীর বাসায়।

তাজহাট জমিদার বাড়ী

প্রথমে পরিদর্শন করলাম পরিপাটিভাবে গোছানো তারেক ভাইদের চক্ষু হাসপাতাল। কল্পনাও করিনি উলিপুরে এতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এমন ছিমছাম চোখের হসপিটাল হতে পারে। রংপুরেও আছে তাঁদের আরো কয়েকটি চক্ষু হাসপাতাল। হাসপাতালের দেয়াল ঘেঁষেই ভাই ভাবীর আরো এক চমৎকার রাজপ্রাসাদে হেঁটে গেলাম। বিশাল সবুজে ঘেরা উঠান। হরেক রকম পিঠা খেয়ে রসনার স্বাদ নিলাম আয়েস করে। ভাবীর দরদী কন্ঠে গান শুনে বিস্মিত হয়ে গেলাম। একজন সফল হৃদরোগের ডাক্তার তিনি। ইউনাইটেড হসপিটালে কর্মরত। ভাই ও অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও সফল ব্যবসায়ী। তাদের আন্তরিক আতিথেয়তায় পরিপূর্ণ হয়ে এবার আমাদের গন্তব্য তারেক ভাইয়ের “সান পানির ফ্যাক্টরি পরিদর্শন। অসম্ভব সুপরিকল্পিত ভাবে আধুনিক মেশিনের মাধমে বিশুদ্ধ পানি বোতলজাত করা হচ্ছে। মুগ্ধতা অশেষ। সেখান থেকে এবার আমাদের গন্তব্য তিস্তা ব্যারেজে।

সুদীর্ঘ যাত্রার পর দুপুর নাগাদ পৌঁছে গেলাম সেই ঐতিহাসিক তিস্তা ব্যারেজে। ব্যারেজ অতিক্রম করার পর মনোরম ও প্রাকৃতিক পরিবেশে ‘অবসর’ নামের ভি আই পি গেস্ট হাউজে আমাদের বিশ্রাম ও মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করে রেখেছেন রংপুরের সেই সদস্যবৃন্দ। তারা নিজে উপস্থিত থেকে আমাদের অভ্যর্থনা জানানো সহ সর্বত্তম সেবা দিয়ে নিয়ে গেলেন রংপুরের পর্যটন মোটেলে। সেখানে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় গেলাম অসম্ভব সুন্দর “চিকলি পার্কে” যা আগে ‘চিকলি বিল’ নামে পরিচিত ছিলো। কফি খেয়ে, ছবি তুলে ফিরে আসলাম মোটেলে। রাতে আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে খাওয়া আর ক্রেস্ট প্রদান ও উপহার দেয়ার মাধ্যমে শেষ হলো আমাদের বৃহত্তর রংপুর ভ্রমণ।এতো সুন্দর ও আন্তরিক একটা ভ্রমণের সঙ্গী হতে পেরে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি শ্রদ্ধেয় রাজু ভাই ও তারেক ভাই সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সদস্য বৃন্দকে । নর্থ বেঙ্গলে এটা ছিলো আমার প্রথম পদচারণা। একটা স্মৃতিময় ও আনন্দময় ভ্রমণ ছিলো আমাদের সবার জন্য।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box