নাইওর

রুখসানা আকতার

আজ কয়েকটা দিন ধরে মনটা খুব খারাপ মোমেনার।সেই যে সে দিন ফজরের আজানের আগ দিয়ে কী একটা দুঃস্বপ্ন দেখলো।সেই থেকে মনটা কেবল থেকে থেকে কু ডাক দিচ্ছে। কি জানি বাপটার কিছু হলো কিনা। পাঁচ মাস ধরে বিছানায় । খারাপ বাতাস লেগে নাকি  শরীরের বাম পাশ অবশ হয়ে গেছে।গতকাল  রাতে অনেক সাহস সঞ্চয় করে স্বামী মোন্নাফ মিয়াকে স্বপ্নের কথাটা বলেছিলো। মোন্নাফ উল্টা দাঁত মুখ খিঁচিয়ে চুপ করে ঘুমাতে বলে । কিন্তু আজ সকাল থেকে মনটা আর বাঁধ মানছে না। ঘরে বাইরে কত কাজ । নিজেকে এক প্রকার জোর করে  ঠেলে  কাজ করাচ্ছে । কিন্তু থেকে থেকে হাত থেমে যাচ্ছে। শাশুড়ির বাজখাই গলার ধমক শুনে সম্বিৎ ফিরে পায়। আরে তাইতো গোয়াল ঘরই তো এখন পর্যন্ত সাফ সুতরো করা হয়নি। মোমেনা ঝাটা আর টুকরি হাতে গোয়াল ঘরের দিকে ছুট দেয় ।

আজ বছর প্রায় দুই হয়ে গেলো মোমেনা এ বাড়িতে মোন্নাফের বৌ হয়ে এসেছে। মোমেনার বাবা পেশায় দর্জি। গায়ের বাজারে খুপরির মতো একটা দোকান ভাড়া নিয়ে তাতে দর্জির কাজ করেন। জমি বলতে বাপদাদার ভিটে বাড়ি টুকু আর বাঁশ ঝাড়ের লাগোয়া আঠারো শতক খালি জমি। মোমেনার মা সারা বছর ধরে সেখানে বিভিন্ন শাক সবজি ফলান। স্বামীর যত সামান্য আয় দিয়ে সংসারে পাঁচটা পেট কোনোরকম দুইবেলা দুইমুট জোগাড় হয়। আর বাড়তি যোগান আসে এই সামান্য জমিতে ফলানো শাক সব্জি থেকে।
তিন ছেলে মেয়ের মধ্যে মোমেনা দ্বিতীয়। বড় ছেলে বাপের দোকানে কাজ শিখছে। তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলো। বাপ বিছানায় পড়ার পর থেকে সে-ই দোকান সামলাচ্ছে। ছোট ছেলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। এখন ভাইয়ের সঙ্গে দোকানে যায়। সুতাটা কাঁচিটা এগিয়ে দেয়।

দু’মাস আগে বড় ভাইটা মোমেনাকে নিতে এসেছিলো । বাপ নাকি এক মাত্র আদরের মোমেনারে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু বিয়ের সময়ে একমাত্র মেয়ে জামাইয়ের আবদারের সাইকেলখানি যখন বৎসর পার হওয়ার পরও মেটাতে অক্ষম হন তখন মোমেনার বাপের বাড়িতে নাইওর যাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
সাইকেল না পাওয়ার দুঃখে মোন্নাফ মিয়া নতমুখে বসে থাকা সম্বন্ধীর সামনে বসেছিলো আর শাশুড়ি  থেকে থেকে ঝাঁঝালো কথায় হুল ফোটাচ্ছিলেন। ছেলে তার একখান জিনিস-ই তো শখ করে চেয়েছিলো। যদি জানতেন তবে এমন হাভাতের ঘরে সম্বন্ধই করতেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। এদিকে রান্না ঘরে চুলায় ফুটন্ত ভাতের নিচে শুকনো বাঁশ পাতা ঠেসে চোখ মুছতে মুছতে তরকারি কুটছিলো মোমেনা। ভাইয়ের কাছে গিয়ে যে দুইটা কথা শুধাবে সেই সুযোগ বা সাহসটুকু ছিল না। শাশুড়ি,  মোন্নাফ আর ছোট দেবরের সঙ্গে ভাইকে দুপুরের ভাত বেড়ে দিয়ে যখন হাত পাখায় বাতাস দিচ্ছিলো তখন ভাইবোনের কয়েকবার বোবা কান্না মেশা চাহনিতে চোখাচোখি হয়েছিলো।

গতকালের আধা শুকনা সিদ্ধ ধান ফাউরি দিয়ে টেনে টেনে  ভিতর  বাড়ির   গোবর  মিশানো লাল মাটির নিকানো  ছোট  উঠানে বিছিয়ে দিচ্ছিলো আর বাপের বাড়ির কথা মনে পড়ছিল মোমেনার। ইস্কুলে পড়ার বড় শখ ছিলো । কিন্তু বাপের সামান্য আয়ে শুধু বাড়ির পাশে মক্তব পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো ।  মাঝে মাঝে মক্তব শেষে সকালে অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে কখনো রাস্তার পাশে বেতফল পাড়তে গিয়ে অথবা রহিম চাচার বাগিচা থেকে জামরুল, পাকা জাম অথবা  পেয়ারা কুড়িয়ে  ফিরতে দেরি হতো। তখন মায়ের লাল চোখ থেকে একমাত্র বাপ-ই বাঁচাতে পারতেন। যেই মাসে মাসে শরীর খারাপ হয়ে শুরু হলো অমনি মক্তবে যাওয়া ও বন্ধ হলো। বাপ সন্ধ্যাবেলা মাগরিবের নামাজের পর কোরান শিক্ষা দিতেন। মেয়ে কোরান শরীফ পড়তে পারে না ।এই  মেয়ের বিয়ে তে তো কথা উঠবে। তাই বাপের চেষ্টায় মেয়ের মোটামোটি ধর্মীয় কায়দা কানুন এবং আরবী শিক্ষা সমাপ্ত হয়। বাপ ভালো গৃহস্ত ঘর আর ছোট পরিবার দেখে মেয়ের সুখের চিন্তা করে জামাই পক্ষের  সাইকেলের আবদার নিজ সামর্থ্য বাইরে গিয়ে মেনে নেন। কিন্তু যা মেটানো তার পক্ষে আসলেই কঠিন।

মোমেনা ঠিক করে আজ রাতে সাহস করে স্বামীকে কথাটা বলবে । কিন্তু কেমন জানি অজানা আশঙ্কায় বুক ধুক পুক করে। ছোট দেবর বাজার থেকে ফিরলে শাশুড়ি মোমেনাকে ডেকে উনার ঘরে রাখা চালের মোটকি থেকে চাল ,তেল ইত্যাদি দিতে দিতে নির্দেশ দেন কী এবং কিভাবে রান্না হবে । মোমেনা রান্না  আর ঘরের কাজ শেষে পুকুর ঘাটে নাইতে যায়। চাচাতো ননদটাও আসে । একমাত্র এই ননদটার সঙ্গে একটু মন খুলে কথা বলে। মোমেনার হাতে করে নেয়া পোড়া তামাকে দুজনে দাঁত মাজতে মাজতে নিচু গলায় কথা বলে। মোমেনা তার বাপকে নিয়ে দেখা দুঃস্বপ্নের কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলে। ননদ আঁচলে চোখ মুছিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে মোমেনাকে দোয়া করতে বলে। দুজনের নাওয়া শেষ হলে গামছায় চুল বেঁধে ভেজা কাপড়ে  কলসী ভরা পানি কাঁখে নিয়ে ঘরে ফিরে। মোমেনা দুপুরের নামাজের সঙ্গে দুই রাকাত নফল ও পড়ে। কিন্তু মন কেন জানি তারপরও অজানা আশংকায় ছেয়ে থাকে।

রাতে খাওয়া দাওয়ার পাট চুকলে শাশুড়ির দেয়া পান হাতে নিজের ঘরে ঢুকে দেখে মোন্নাফ মিয়া বসে আছে । পান হাতে নিয়ে মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে মোন্নাফ মিয়া  বলে, তেলের বাটি এনে হাত পা মালিশ করে দিতে। আজ নাকি তার অনেক ধকল গেছে ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে । মোমেনা বুঝে সবই। সে হাত-পা মালিশ করতে থাকে । হারিকেনের আলোয় মোমেনার নাকফুল চকচক করে। বৌ এর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন ঝিম ধরা নেশা লাগে মোন্নাফ মিয়ার । জিজ্ঞেস করে মা ঘুমিয়ে পড়েছে কি না । নিশ্চিত হয়ে তেলের বাটি সরিয়ে মোমেনার হাতধরে কাছে টানে। মোমেনা আস্তে করে বলে ,যে সে স্বামীকে একটা কথা বলতে চায়। মোন্নাফ মিয়ার মন এবং শরীর দুই চঞ্চল তখন। সব শুনে তাড়াতাড়ি বলে আগামী কাল রাতে খাওয়ার পরে যেন মোমেনা তাকে মনে করিয়ে দেয় ।সে মাকে কথাটা বলে দেখবে। বলতে বলতে মোন্নাফ মিয়া বৌয়ের শরীর ঘাটতে ঘাটতে উপরে উঠে আসে। মোমেনার মন কেমন একটা ভালোলাগা বোধে আচ্ছন্ন হয়। সে দুহাতে স্বামীর পিঠ আঁকড়ে ধরে। মোন্নাফ মিয়ার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস আস্তে আস্তে উষ্ণ আর ঘন হয়ে আসে।
কাক ডাকা ভোরে মোমেনা ঘুম থেকে উঠে কাপড় আর গামছা হাতে পুকুর ঘাটে নাইতে যায়। তাড়াতাড়ি শেষ করে মোন্নাফকে ডেকে তোলে ঘাটে যাওয়ার জন্য। সে চুলা ধরায়। চাল ধুয়ে ভাত চড়িয়ে শাশুড়ির  ওযুর বদনায় পানি নিয়ে জলচৌকি বিছিয়ে দেয় পিছনের দাওয়ায়। শাশুড়ি ডাক দিতেই চুলার জ্বাল কমিয়ে ছুটে গিয়ে ওযুর পানি ঢালতে থাকে। তিনি শোয়ার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলেন চায়ে গুড় আরেকটু বেশি দিতে। এই একটা জিনিসই তো একটু শখ করে খান তাই ভালো করে যেনো বানানো হয়। মোমেনা মুড়ির বাটি আর তিন কাপ চা শাশুড়ির ঘরে দিয়ে যায়।রান্না ঘরে গিয়ে তাড়াতাড়ি নিজের মুড়ি আর চা শেষ করে ফেন গালা ভাত আবার চুলোয় চাপিয়ে রাতের বাসি সালুন গরম করে । ,মোন্নাফ ছোটভাই আর গোমেস্তা ছেলেটাকে নিয়ে গরু গোয়াল থেকে বের করে বাইরে বেঁধে ভাইটাকে রান্না ঘরে গরুর জন্য রাখা ভাতের ফেন আনতে পাঠায়। মোমেনা রান্না ঘরে চারটা কাঠের পিড়ি বিছিয়ে ভাত সালুন বাড়ার আয়োজন করে। একটা বাটিতে  পোড়া  আলুমরিচ আর পেঁয়াজ  নিয়ে লবন আর সরিষার তৈল মেখে ভর্তা বানিয়ে নেয়। গোমেস্তা সহ সবাই আসতেই সে একহাত ঘোমটা দিয়ে ভাত বেড়ে দেয়। সকালে খাওয়ার পাট চুকলে মোন্নাফ মিয়া ভাই আর গোমেস্তাকে নিয়ে জমিতে চলে যায় আর মোমেনা রান্না ঘর থেকে সব কিছু পুকুর ঘাটে জমা করে মাজতে বসে। মনে মনে সূরা ফাতিহা পড়ে । যেন মাবুদ তার শাশুড়ির মনটা নরম করে দেন আর তার বাপের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি মেলে।

দুপুরের খাবার পাতিলে ভরে মোমেনা অপেক্ষা করছে কখন ছোট দেবর এসে ক্ষেতে খাবার নিয়ে যাবে । ছোট দেবরের সঙ্গে মোন্নাফ মিয়াকে ফিরতে দেখে সে অবাক হয়ে এগিয়ে যায়।দুই ভাইয়ের পিছনে নিজের বড় ভাইকে দেখে অজানা আশংকায় বুক কেঁপে উঠে। শাশুড়ি মোন্নাফের ডাকে বের হয়ে আসেন। নীরবতা ভাঙে মোমেনার ভাই। সালাম করে মাওঈ আম্মাকে আর বোনকে জানায় দুদিন আগে তাদের বাপজান ইন্তেকাল করেছেন। মোমেনার যখন হুঁশ ফিরে দেখে বড় ভাই তার মাথায় বাতাস করছে ।সে ভাইকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদে। মোন্নাফ মিয়া এক পাশে দাঁড়িয়ে থেকে দেখে। তারপর মাকে বলে মোমেনাকে তার ভাইয়ের সঙ্গে বাপের বাড়ি পাঠাতে। পরে সে গিয়ে নিয়ে আসবে।

ভাইবোনকে নদীর ঘাটে ইঞ্জিনের নৌকায় তুলে দিয়ে সম্বন্ধীকে বলে দুই সপ্তাহ বাদে সে গিয়ে মোমেনাকে নিয়ে আসবে। মোমেনা কাঠের পুতুলের মতো বোরকার ভিতর স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। নৌকা ছেড়ে দেয়। ইঞ্জিনের আওয়াজে মোমেনা সম্বিৎ ফিরে পায়। কেমন জানি সব শূন্য মনে হয়। কষ্টে বুক শরীর জ্বলছে। আবার চোখ বেয়ে পানি নামছে। কেমন জানি বিশ্বাস হতে চায় না মানুষটা আর নেই । মনে হয় আছেন। বাড়ি পৌঁছালে সেই আগের মতোই দোকানে মোমেনার নাইওর আসার সংবাদ পেয়ে খুশিতে বাপ তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে আধা কেজি জিলাপি নিয়ে বাড়ির পথে ছুটবেন। মেয়ে যে তার জিলাপি বড় পছন্দ করে।  কতদিন পর মেয়েটাকে দেখবেন আজ। মোমেনা বাস্তবে ফিরে আসে। পৃথিবীটাকে খুব নিষ্ঠুর আর ধূসর মনে হতে থাকে…।

ছবি: প্রাণের বাংলা