নাগরিক-এর গ্যালিলিও : অনবদ্য মঞ্চায়ন

আবদুল্লাহ আল মোহন

দৃশ্য : এক. – ‘বিজ্ঞান হল- সন্দেহের মাধ্যমে সত্যের অনুসন্ধান’। -গ্যালিলিও

দৃশ্য : দুই. – ‘অভাগা সে দেশ যার বীরপুত্র নেই’-আন্দ্রিয়া।গ্যালিলিওর পাল্টা উত্তর, ‘তুমি ভুল বললে আন্দ্রিয়া- আসলে অভাগা সেই দেশ যার বীরপুত্রের প্রয়োজন’।

পোষ্টার

উপরের দৃশ্যদু’টি আমাকে ইদানিং তাড়া করে ফিরছে, ঘোরের ঘরে আবদ্ধ করে রেখেছে। নিজের কাছেই নিজের অনুভবের ব্যাখা-বিশ্লেষণে বিপর্যস্ত হতে হয়। তখন আমার অস্বীকার করার কোন কারণই থাকে না- ‘নাটক আমাদের জীবন যুদ্ধের হাতিয়ার’! ‘নাটক আমাদের জীবনের প্রকাশিত সত্য’! আর এই চরম সত্যেরই মঞ্চ দৃশ্য অভিঘাত মনকে দারুণভাবে নাড়া দেয়, আঘাত করে। নিজের কাছেই আত্মজিজ্ঞাসা তীব্র হয়, খুঁজি আপন সত্তার সঠিক অস্তিত্বকে। তখনই সংশয়ী মনে জাগে অজস্র অমিমাংসিত জিজ্ঞাসা। সংশয়ীদের ঈশ্বর ভর করে চেতনাজগতে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে পা রাখতেই হয়। তখনই দেখা দেন পৃথিবীর মহাবিজ্ঞানীরা- যাদের বুদ্ধির ছোঁয়ায় পাল্টে গিয়েছিলো আমাদের হাজার বছরের লালিত, প্রচলিত বিশ্বাস, বিজ্ঞান আর ইতিহাস ব্যাপকভাবে। সে সকল বিজ্ঞানীদের মধ্যে থেকে সংশয়হীনভাবে প্রথম সারির অন্যতম একজন গ্যালিলিও গ্যালিলি। প্রত্যেক যুগেই এমন কিছু মানুষ জন্মান যারা সৎ সাহসী এবং সত্যান্বেষী। বিজ্ঞানী গ্যালিলিও ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। বিখ্যাত ইতালীয় পদার্থবিদ, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক গ্যালিলিও গ্যালিলি ইতালির পিসা শহরে ১৫৬৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৬৪২ সালের ৮ জানুয়ারি ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এ বিজ্ঞানী। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের উন্নতি সাধনের মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানিক অগ্রগতিতে তিনি অবদান রাখেন। বিস্ময়কর প্রতিভা বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের মতে, আধুনিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের এত বিশাল অগ্রগতির পেছনে গ্যালিলিওর অবদানই সবচেয়ে বেশি। আধুনিক পর্যবেক্ষণনির্ভর জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক বলা হয় তাকে। ভেনাসের অবস্থানের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে দূরবীক্ষণিক নিশ্চয়তা, মঙ্গলের চারটি বৃহত্তম উপগ্রহের আবিষ্কার এবং সৌরজগতের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ এক্ষেত্রে তার পর্যবেক্ষণনির্ভর জ্যোতির্বিজ্ঞানের অবদানেরই স্বীকৃতি। গ্যালিলিওকে আধুনিক দর্শনের জনকও বলে থাকেন অনেকে।

অনেকদিন পর মনকে দারুণভাবে দাগকাটা একটি মঞ্চ নাটক দেখার আবার সুযোগ হলো। প্রিয় নাট্যজন কাওসার ভাইয়ের সৌজন্যে গত ২০ জানুয়ারি, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সাড়াজাগানো নাটক ‘গ্যালিলিও’ দেখলাম। গ্যালিলিও নাটকটি নিয়ে লিখতে গেলে সংক্ষিপ্ত পরিসরে প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার বলে মনে হয়। সুতরাং সে চেষ্টা নিশ্চয়ই করবো না এখানে। কেবল একজন অভাজনের একান্ত অনুভবের যৎসামান্য প্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা করবো মাত্র। ব্রেটল ব্রেখটের ‘দ্য লাইফ অব গ্যালিলিও গ্যালিলি’ অবলম্বনে নাটকটির অনুবাদ ও নাট্যরূপ দিয়েছেন অধ্যাপক আবদুস সেলিম এবং নির্দেশনা দিয়েছেন পান্থ শাহরিয়ার। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় এ নাটকটি প্রথম প্রযোজনা করেছিল ১৯৮৮ সালে। খ্যাতিমান নাট্য নির্দেশক ও অভিনেতা আতাউর রহমান তখন নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এবার ২০ বছর পর নাগরিকের প্রযোজনায়ই মঞ্চায়িত হলো নাটকটি। তবে আগের আড়াই ঘণ্টা ব্যাপ্তির নাটকটি এবার কমিয়ে আনা হয়েছে দেড় ঘণ্টায়। আলী যাকের ছাড়াও নাটকটির অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাট্যজন আসাদুজ্জামান নূর, কাওসার চৌধুরী, পান্থ শাহরিয়ার, রুহে তামান্না লাবণ্য, শফি আলম বাবলু, অভি বিশ্বাস, মাহফুজ রিজভী, আবদুর রশীদ, কামরুজ্জামান পিন্টু। এ নাটকে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মঞ্চের খ্যাতিমান অভিনেতা আলী যাকের। প্রাণবন্ত অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মিলনায়তনপূর্ণ নাট্যপ্রেমী দর্শকদের প্রাণিত করেন বাংলাদেশের মঞ্চের কীর্তিমান এই অভিনেতা-নির্দেশক। ‘গ্যালিলিও’ নাটকে তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন আসাদুজ্জামান নূর- পোপ, অধ্যক্ষ ও বিচারপতি। এছাড়া নাটকটির মঞ্চ পরিকল্পনা করেছেন অপি করিম এবং প্রযোজনা অধিকর্তা হিসেবে রয়েছেন সারা যাকের। সংলাপ, আলো, রূপসজ্জা, অলঙ্কার, নাট্যদ্রব্য, মঞ্চ, অঙ্গবিন্যাস, সঙ্গীত, নৃত্য, কোরিওগ্রাফি, পোশাক, মেকআপ, দৃশ্যপরম্পরা সব কিছুতে সারল্য, সৌন্দর্য ও পরিমিতিবোধের স্বাক্ষর রেখেছেন নাটকটির নির্দেশক ও কলাকুশলীরা। বিন্দুমাত্র রসভঙ্গ না করে এই নাটক দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে দর্শককে রস থেকে রসান্তরে নিয়ে যায়। অনেক দিন স্মৃতিতে জাগরুক থাকার মতো একটি অনবদ্য প্রযোজনা ‘গ্যালিলিও’। বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বে এই নাটকের বহুল প্রচার ও প্রদর্শনী হওয়া প্রয়োজন। অসাধারণ নাটকটির জন্য ধন্যবাদ সংশ্লিষ্ট সকলকে। সেই সাথে আন্তরিক কামনা- জয় হোক মঞ্চ নাটকের। কারণ নাটক আমাদের রক্ত-ঘামের ফসল। কোপার্নিকাসের জয় হোক। জয় হোক বিজ্ঞানের, গ্যালিলিও’র। নাটক হোক জীবনের প্রকাশিত সত্য। আমাদের মঞ্চ নাটকের জয় হোক। জয় হোক নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়-এর।

পূর্ববর্তী মঞ্চায়ন আলী যাকের ও খালেদ খান

নাটকটি দেখতে গিয়ে মনে পড়েছে খালেদ খান যুবরাজকে। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন বেশ ক’বছর আগেই! খালেদ খান এই নাটকে গ্যালিলিওর ছাত্র আন্দ্রিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করতেন। অসাধারণ পারফরমেন্স করতেন যুবরাজ। ‘গ্যালিলিও’ দেখতে গিয়ে প্রিয় যুবরাজদার স্মৃতি মনে ভাসছিলো খু্ব। খুব মনে পড়ছে ধানমণ্ডির ২ নম্বর রোডে গ্যেটে ইনস্টিটিউটের মঞ্চে দেখা বিখ্যাত জার্মান নাট্যকার ব্রেখটের লেখা ও আতাউর রহমানের নির্দেশনায় নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের অসাধারণ নাটক ‘গ্যালিলিও’-র স্মৃতি। গ্যালিলিও-এর ভুমিকায় শক্তিমান অভিনেতা আলী যাকের-এর অভিনয় দক্ষতা আজো মুগ্ধ করে আমাকে। বলা হয়ে থাকে, এই গ্যালিলিও চরিত্রে অভিনয়ই আলী যাকেরের জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয়। আসলেই তাই! আমার চোখে ভাসছে একটি দৃশ্য- অত্যাচারের পর গির্জাই ঠিক, আমি ভুল বলে ধুঁকতে ধুঁকতে ক্লান্ত শরীরে বেরোচ্ছেন গ্যালিলিও, তখনই সেই সংলাপ। তাঁর ছাত্র আন্দ্রেয়া বলছেন ‘অভাগা সে দেশ, যেখানে বীর নেই।’ গ্যালিলিওর পাল্টা উত্তর, ‘অভাগা সেই দেশ, যেখানে শুধু বীরেরই প্রয়োজন হয়।’ ব্রেখটের নাটক এতটুকু না বদলে প্রতিটি যুগ তার নিজের মতো মর্মোদ্ধার করে নিতে পারে, গ্যালিলিও-র মতোনও এখানে তিনিও ক্লাসিক। গ্যালিলিওকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তাই আমার কাছে নাটক আর তার জীবনী একাকার হয়ে মিশে যায়। মনোমুগ্ধকর এই প্রযোজনায় আলী যাকের যেভাবে চরিত্রায়ন করেছেন, তা নতুন শিল্পীদের আবারও উজ্জীবিত করবে। নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তিনি যা উপহার দিলেন মঞ্চে এ যেন চোখ ধাঁধানো, মন মাতানো। এ কেবল কিংবদন্তি নাট্যাভিনেতার দ্বারাই সম্ভব। কাহিনীর পরিবর্তন অর্থাৎ চার্চের বন্দী জীবনে প্রবেশের পূর্বাপর নিজেকে পরিবর্তন অর্থাৎ চরিত্রায়নে ছিল যথাযথ উপস্থাপন। একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে নিজের ভেতর ধারণা করা আর তার বহির্প্রকাশ ঘটানো যেন আলী যাকের দ্বারাই সম্ভব। দুই বাংলায় আজো অনেকেই মনে করেন- এই গ্যালিলিও নাটকে এর নামভূমিকায় অভিনয়ই-ই ছিল আলী যাকের-এর সেরা অভিনয়। আমার স্থির বিশ্বাস, আলী যাকের আগের বারের চাইতেও এবারে অনেক ভালো পারফরমেন্স করেছেন। তিনি আগের চাইতেও অনেক বেশী প্রাঞ্জল, অনেক বেশী দাপুটে! ‘গ্যালিলিও’ নাটকে আলী যাকের অভিনয়ে এক আশ্চর্য ছন্দের উত্তরণ ঘটিয়েছেন। সব মিলে সবার অভিনয়ের সুর-ছন্দ-মাধুর্যে এক বিস্ময়কর মুগ্ধতা জাগে, নান্দনিক চেতনায় স্নাতক হতে হয় একজন অভাজন দর্শক হিসেবে। মানবমহিমার কোনো সত্যপ্রকাশে যেমন ভালোলাগার ঘোর নামে। প্রায় ততটাই এই অভিনয়। মানুষের অমলিন সত্তাস্বরূপের নান্দনিক রূপায়ণে আপ্লুত হওয়ার অভিজ্ঞতা এত কম ঘটে জীবনে, শিল্পে। অন্যদিকে পোপের ভূমিকায় ছিলেন আরেক বলিষ্ঠ অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর। অভিনেতা হিসেবেই যিনি মানুষের হৃদয় কেড়েছেন। সকলের কাছে নন্দিত হয়েছেন। ভিন্ন ভিন্ন পোশাকে এক মানবিক পোপ থেকে যে স্বৈরাচারী পোপের রূপান্তর তার শতভাগ সফলভাবে তিনি দর্শকদের দিতে পেরেছেন। এ অভিনয় শুধু অভিনয়ই নয়, নাট্যজগতের উদাহরণ। আমাদের তরুণ শিল্পীদের পাথেয়।

অনেকেই বলে থাকেন আমাদের মঞ্চ নাটকে ভালো নাটকের বড় অভাব। তবে যখনই ভালো নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে দর্শক তখনই হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন মঞ্চে। সে কথারই যেন প্রমাণ দিলো মঞ্চ নাটক ‘গ্যালিলিও’। ২০ বছর পর নতুন করে নাটকটি প্রযোজনায় যে ইতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হয়েছে তা হলো দর্শকের উপচেপড়া ভিড়। টিকেটের জন্য হাহাকার। দর্শকদের নানা আকুতি মিনতি যেন দাঁড়ানোর টিকেট দেয়া হয়। দর্শকের মাঝে অভূতপূর্ব সাড়া দেখেছি। প্রদর্শনীর আগেই সব টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। অনেক দর্শক টিকেট না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন। সত্যি ভাল শিল্পের গ্রহণ যোগ্যতা কমে যায়নি। গল্প এবং অভিনয় যদি শিল্পমান বজায় রাখতে পারে তবে দর্শকের কমতি হয় না। বেঁচে থাকে শিল্প। আজ অনেক কথা হয়ত ওঠে মঞ্চপাড়ায়। দর্শকরা নাটক দেখতে চায় না। কথাটা একেবারে সত্যি নয়। ভাল প্রযোজনা সে যে ফরমেটেই হোক না কেন তার দর্শক চাহিদা থাকবেই। কারণ, মঞ্চ জীবনের চলমান ক্যানভাস। দৈনন্দিন জীবনের হাসি-কান্না, ঘাত-প্রতিঘাত, প্রেরণা-ক্ষোভ-সবকিছুরই প্রতিফলন ঘটে মঞ্চে। জীবন থেকে কুড়িয়ে নেওয়া ছোট ছোট গল্পগুলোই অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে দর্শকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া মঞ্চ নাটকে মূল উদ্দেশ্য। বলা হয়ে থাকে, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন নাটক। তবে এখন আমাদের নতুন করে ভাবা দরকার, সেই গৌরব কি সত্যি সত্যিই আমরা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পেরেছি? না পারার অনেক কারণ রয়েছে। খেলাধুলা কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে যে পরিমাণ সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে, নাটকের ক্ষেত্রে তার বিন্দু পরিমাণও নেই। সংস্কৃতি খাতে সরকারের বাজেট নগণ্যাতিনগণ্য। বেসরকারি কিংবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানে অনাগ্রহী। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ফসল হিসেবে মঞ্চনাটককে প্রত্যাশিত স্থানে দেখতে চাইলে দরকার এর সুষ্ঠু পরিচর্যা, পৃষ্ঠপোষকতা।

মঞ্চের বলিষ্ঠ অভিনেতা, বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব কাওসার চৌধুরী নাটকটির দু’টি চরিত্রে অভিনয় করেন। ‘সাগরেদো’ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন কাওসার চৌধুরী। গ্যালিলিওর সাথে তার কিছু উক্তি কানে বাজে, ‘ক্ষমতায় যারা আছে, সত্য জানা লোককে তারা পছন্দ করে না, হোক না সেটা দূরের নক্ষত্র সম্বন্ধে। তুমি কি মনে করেছ, তুমি যখন বলে বেড়াবে যে পোপের কথা ভুল, সে ভালো মানুষের মতো মেনে নেবে? একটু আগে টেলিস্কোপ দিয়ে তুমি যখন ওই নক্ষত্রগুলো দেখছিলে, আমি তোমাকে লক্ষ করেছি। আমি দিব্যচোখে দেখতে পেলাম তুমি জ্বলন্ত খড়ের ওপর দাঁড়িয়ে। যখন বললে তুমি প্রমাণে বিশ্বাস করো, তখন যেন পোড়া মাংসের গন্ধ পেলাম। বিজ্ঞানকে আমি ভালোবাসি। কিন্তু তার থেকে বেশি ভালোবাসি তোমাকে। ফ্লোরেন্সে তুমি যেয়ো না গ্যালিলিও।’ নাটকটি নিয়ে একান্ত আলাপচারিতায় কাওসার চৌধুরী একদিন বলছিলেন, ‘দু’টি চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছি। মজার ব্যাপার (আসলে চ্যালেঞ্জের বিষয়) হল- আমার প্রথম চরিত্রটি (সাগরেদো) গ্যালিলিও’র পরম বন্ধুর। কিন্তু, মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে আমাকে পরবর্তী একটি চরিত্র (বিচারপতি বেলারমিন) চিত্রিত করতে হয় যেটা গ্যালিলিও’র চরম শত্রুর! বিষয়টিকে আমি একদিকে যেমন ভয় করি, অন্যদিকে বিষয়টিকে ‘লাইভ-পারফরমেন্সের’ একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে বেশ উপভোগও করি বটে। জানিনা, পারফরমেন্সটুকু কেমন হয়ে থাকে!’

এই নাটকের চতুর্দশ দৃশ্যে ‘বিজ্ঞান’ প্রসঙ্গের অবতারণা। বিজ্ঞানী গ্যালিলিও এবং তাঁর পুরনো ছাত্র আন্দ্রিয়ার মাঝে কথোপকথনের এক পর্যায়ে আসে ‘বিজ্ঞান’ প্রসঙ্গটি। বিজ্ঞানী গ্যালিলিও আসলে মানুষ বলেই তো বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। নাটকটির চতুর্দশ দৃশ্যে গ্যালিলিও তাঁর পুরনো ছাত্র আন্দ্রিয়াকে বলছেন- “আন্দ্রিয়া, বিজ্ঞান আসলে কি? বিজ্ঞান হল সন্দেহের মাধ্যমে সত্যের অনুসন্ধান! … বিজ্ঞান তো সাধারণ মানুষের জন্য। অথচ, এই ‘সাধারণ’কে জমিদার, রাজা, জোতদার আর ধর্মযাজকদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়! … অথচ ‘সাধারণে’র এই দুঃখ-কষ্ট-অজ্ঞতা হাজার বছরের পুরনো। … স্বার্থপর আর প্রচন্ড ক্ষমতাবান মানুষগুলো বিজ্ঞানকে লোভীর মত নিজেদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করছে। কিন্তু, ওই ক্ষমতাবান মানুষেরা এটাও বুঝতে পেরেছে যে, বিজ্ঞান প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের হাজার বছরের এই কৃত্রিম দুঃখ-কষ্টকে সহজেই দূর করতে পারে, যদি ‘তাদের’ সমাজ থেকে নির্মূল করা যায়। ফলে ‘তারা’ আমাদের ভয় দেখিয়েছে- লোভ দেখিয়েছে বিজ্ঞানের জগত থেকে আমাদের সরিয়ে রাখতে! … সে ক্ষেত্রে, বিজ্ঞানীরা যদি স্বার্থান্বেষী ক্ষমতাবানদের ভয়ে শুধু জ্ঞানের কারনে জ্ঞান অর্জন করে তৃপ্ত হয়, তবে বিজ্ঞান হবে একটি অর্থহীন বিষয় মাত্র”! যে ধর্ম-আদালতের চাপে গ্যালিলিওকে স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়েছিল তিনি ‘যা বলেছেন তা ভুল’। তার পরও বিড়বিড় করে বলেছিলেন, ‘আমাদের বলা না বলাতে কিছু আসে যায় না, তবুও পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে।’ বিজ্ঞানী এবং শিল্পীরা যে বেঁচে থাকার তাগিদে ক্ষমতার দ্বারস্থ হলেও কখনও স্বধর্মচ্যুত হন না, সেটাই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন নাট্যকার।

বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর জীবনী নিয়ে লেখা নাটকটিতে দেখানো হয় সে সময়ের সমাজ ব্যবস্থাকে। ধর্মান্ধতা, মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচারের চেষ্টা, সত্যকে প্রচার না করা বা সত্য প্রচারকারীকে নির্মম শাস্তি দেয়া। বিষয়গুলো এখনো আমাদের সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। সেই জায়গা থেকে আজকের তরুণদের এই গল্পটা আবার নতুন করে জানা জরুরি বলে মনে করি। কেন এবং কীভাবে সত্যকে আড়াল করে মিথ্যা প্রচার করা হয়, আমরাই বা সেটা কীভাবে গ্রহণ করি এই গল্পে সেটা বলা হয়েছে। আবার সত্য কখনো চাপা থাকে না। এটাও এই গল্পে দেখানো হয়েছে। নাটকের কাহিনির মাঝে খুঁজে পাই, বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়েছেন যিনি সেই বিজ্ঞানীকে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রপথিক এবং মানব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্রকে- তার কর্মে স্বীকৃতি পাওয়ার পরিবর্তে দাঁড়াতে হয়েছিল আসামির কাঠগড়ায়। কারণ তিনি সৌরকেন্দ্রিক বিশ্ব মডেলকে সমর্থন করেছিলেন। তার আবিষ্কৃত টেলিস্কোপ দিয়ে এ সমর্থনের পক্ষে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। নাটকের প্রকৃত নায়ক তো আসলে বিজ্ঞান তথা যুক্তিবাদ। ‘সূর্য নয়, পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘোরে।’ এই সত্য আবিষ্কার করাও ছিল পাপ। তথাকথিত রাষ্ট্রনীতির বিপরীতে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক গ্যালিলিও তার এই আবিষ্কারকে উপস্থাপন করতে পারেননি। প্রচলিত বিশ্বাস ভঙ্গে যদি ক্ষমতা নড়বড়ে হয়ে যায় সেই ভয়ে চার্চ এই আবিষ্কারকে অস্বীকার করে। খড়গ এসে পড়ে তারই মাথার ওপর। ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকার করাতে বাধ্য করে এতদিন যা বলেছেন সবই ভুল। পরিণতি বন্দীদশা। তবে বন্দী অবস্থায় রাত জেগে লিখেছেন এবং তা কপি করে রেখেছেন গ্লোবের ভেতর। এরপর তার ছাত্র আন্দ্রেয়ার হাতে পাচার করে দেন দেশের বাইরে। তিনি যা বিশ্বাস করতেন বা আবিষ্কার করেছেন, ‘ডিসকোর্সি’ নামের লেখায় তাই তিনি বর্ণনা করেছেন। তার এই কাহিনী নিয়েই নাটক লেখেন বার্টল্ড ব্রেখট। গ্যালিলিও যখন কারাগারে বন্দি, তখন আন্দ্রেয়ার মাধ্যমেই তিনি তার লিখিত বইটি প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বইটি তিনি কারাগারে লুকিয়ে লুকিয়ে লিখেছিলেন। তিনি বইটি প্রথম তার ছাত্র আন্দ্রেয়ার হাতে তুলে দেয় এবং বইটি যেন পাঠকের হাতে পৌঁছায় সে ব্যবস্থা করতে বলে। আন্দ্রেয়া সেই কাজটি করেছিলেন।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে সংস্কৃতির অন্যতম একটি অংশ মঞ্চনাটক। নাটকের মাধ্যমে আমাদের জীবনে যে বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয় তা অবাক করার মতো। এক জীবনের বাস্তবিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির বা আত্মিক রসবোধের জন্য মঞ্চনাটকের দর্শকপ্রিয়তা রয়েছে- এ কথা অনায়াসেই বলা যায়। তাই দেখতে পাই- ইতিহাসের উত্তরাধিকারসূত্রে এখনকার মঞ্চনাটকেও থাকছে কমেডি, রোমান্টিকতা, সমাজ-রাজনীতিসহ সাংস্কৃতিক বিবিধ বিষয়। যেখানে মানুষের বোধেরও প্রকাশ ঘটে। আবেগ এবং ভাবাবেগের চরম শিখরে পৌঁছে মানুষ নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় ব্যাকুল, একে আত্মিক জাগরণও বলা যেতে পারে। এ সবকিছুই মঞ্চনাটকের কল্যাণে সম্ভবপর হয়েছে। দৃশ্যে অভিনীত ব্যক্তির অভিনয় দর্শক সারির প্রতিটি মনের ভাবনাকে একেকভাবে ভাবাতে সহায়ক হয়। খেয়ালি মন কতকিছুই তো খোঁজে। কখনো ভাবুক রূপে, কখনো অতি আনন্দের বিবিধ পথে। এ সবকিছুরই বাস্তবচিত্র ফুটে ওঠে মঞ্চে। এ অবস্থায় এই গ্যালিলিও নাটকটি কলাকুশলীদের অভিজ্ঞানযাত্রায় নতুনভাবে প্রাণের সঞ্চার করে দেবে বলেই আশাবাদী প্রবলভাবে।

লেখক:সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

ভাসানটেক সরকারী কলেজ, ঢাকা

ছবি:কাওসার চৌধুরী (অভিনেতা,পরিচালক)