নাজমা বিবির জীবনগাঁথা

শিলা চৌধুরী

 (কলকাতা প্রতিনিধি): পরনে শতচ্ছিন্ন একটা নাইটি।একবার এদিক থেকে ওদিক সেই ছেঁড়া অংশ গুঁজে শরীর ঢাকতে ঢাকতে অন্য হাতে ইট পাথর সিমেন্টের মিশ্রণ মাথায় করে নিয়ে অট্টালিকা গড়ায় ব্যস্ত ।বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই সকাল থেকে দেখে যাচ্ছিলাম ।পাশে মাঝে মাঝেই দুটো ছোট্ট বাচ্চা এসে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে থেকে আবার মাঠে চলে যাচ্ছে ।একটু পরেই একটা চৌদ্দ পনেরো বছর বয়সি মেয়ে হলুদ মেরুন রঙের শাড়ি পরে ওই মাঝ বয়সী মহিলার মাথার বোঝা ওর মাথায় করে এগিয়ে দিচ্ছে ।বেলা একটু গড়িয়ে যেতেই ঠিকাদারের লোক চা আর দুটো করে মারি বিস্কুট দিয়ে গেল ।মহিলাকে দেখলাম সেই ছোট্ট মাটির ভাঁড়ের চা আর দুখানা বিস্কুট নিয়ে মাঠের দিকে যেতে ।একটু ঝুঁকে কৌতুহল বশে দেখে অবাক হবার সঙ্গে সঙ্গে চোখের জলকে আর বাঁধ মানাতে পারলাম না ।সেই দুটো বিস্কুট আধ টুকরো করে ওই বাচ্চা দুটো আর শাড়ি পরা মেয়ের সঙ্গে খাচ্ছে ।বাচ্চা দুটো সেই আধখানা বিস্কুটের টুকরো চেটে চেটে খেয়েই যাচ্ছে ।ফিরে এলাম ঘরে বারান্দা ছেড়ে নিজের রোজকার রুটিন মাফিক জগতে ।কিন্তু বারবার বারান্দাটা আমায় চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।দুপুরের খাবার সময় চারখানা মাত্র শুকনো রুটি জলে ভিজিয়ে চারজনে খাচ্ছে ।বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো ।ফ্রিজে রাখা সুজির হালুয়া আর সবজি….পাউরুটি নিয়ে নিচে গেলাম ।তখনও অবাক করার মতো অনেক কিছু জানতে বাকি ছিল সামান্য সেই খাবার হাতে তুলে দিতেই বুঝতে পারলাম । একাই ভেঁজা ছলছল চোখে বলতে শুরু করলেন । আমি নাজমা বিবি….স্বামী নেই তো তাই বিবি…আগে নাজমা বেগম ছিল ।আমার সাত সন্তান, তার মধ্যে পাঁচটা ছাওয়াল আর দুইটা মাইয়া।থাকি বেলেঘাটা খাল ধারে। প্লাস্টিকের বেড়ার ঘরে ছোট দুই ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে সংসার ।এটুকু বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ মুছতে মুছতে বলে চলেছেন – বড় তিন ছাওয়াল বিয়ে করে একজন বেলেঘাটাতেই আলাদা সংসার পাতিছে আর বাকি দু’জন মুর্শিদাবাদে।আর বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি,সে ও মুর্শিদাবাদে শ্বশুরবাড়িতে আছে । একটা সময় আমার সব ছিল স্বামীসহ দিদিভাই ।সেই দশ বছর বয়সে বাংলাদেশে বিয়ে হয়ে সাতক্ষিরা জেলার কালিগঙ্জ থানার সেকান্দরনগরে প্রতিটা মেয়ের মতো দু চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে আসি।কদিন পরেই স্বামীর সংসারের অভাব সেই স্বপ্ন চুরমার করে দেয় ।অভাবের তাড়নায় দিনমজুরের কাজ নিয়ে স্বামীর হাত ধরে কাঁটাতারের বেড়া টপকে ইছামতী পেড়িয়ে বশিরহাট হয়ে কলকাতা ।স্বামী বেকার ,খাবার জুটেনি, না খেয়ে খেয়েই প্রথম সন্তানের জন্ম হয় ।শেষ পর্যন্ত স্বামী কাজ পায় ইটভাটায়।সেই ইটভাটার পাশেই ইটভাটার মালিক একটা বেড়ার ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দেন ।ওখানেই একে একে বাকি ছয় সন্তানের জন্ম হাজারো অভাবের মাঝেই ।কখনো ভাবিনি জন্ম নিরোধকের কথা ।বুদ্ধিহীন ছিলাম ।ভয়ে যাইনি. ..বিনা নাগরিকত্বে ভারতে থাকছি।বাংলাদেশে ফেরত পাঠালে বা হাজতে পুইরলে কে বাঁচাতে আসবে। খাবো কি এই সাত সন্তান নিয়ে দেশে ফিরে । দুপুরের খাবার বিরতি শেষ. ..ঠিকাদারের লোক হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছে বেশ কিছু সময় ধরে ।তাই চলে এলাম অসমাপ্ত কথা না শুনেই।মনটা খচখচ করেই যাচ্ছে. ..বাকিটুকু শোনার জন্যে ।তাই সন্ধ্যে হতেই ছুটির আগে থেকেই গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম নাজমা বিবির কথা শুনতে । আবার শুরু হলো নাজমা বিবির ওড়না চাপা দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বেঁচে থাকার নশ্বর পৃথিবীতে আজো ধুঁকতে ধুঁকতে টিকে থাকার কথায়।এইএইভাবে একে একে তেত্রিশ বছর স্বামীর ঘর করলাম ।এখন আমার পয়তাল্লিশ বছর ।আচানক দুই বচ্ছর আগে আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিন আইসলো।(এতো বছর কলকাতার জীবনে তবু ও অনেকটাই সাতক্ষিরার কথার উচ্চারণ থেকেই গিয়েছে, একেই বুঝি বলে জন্মভূমির জন্মের পরের যা মানুষকে যতই আধুনিক জীবন যাপন করেনা কেন তার ছোঁয়া থাকবেই)। একদিন সন্ধ্যায় আমার স্বামী ইটভাটায় কাজ করতো এক মহিলাকে….ভুল বইল্লাম মহিলা না দাদী আমার স্বামীর থেইক্যা নয় দশ বছরের বড় ওরে নিকাহ কইরা ঘরে ঢুকে আর আমারে দুধের শিশু সহ ঘর থেইকা বাইর কইরা দেয়।জানেন দিদিভাই একটা তেরো বছরের জোয়ান মেইয়্যে আর দুইটা ছোট ছোট ছাওয়াল নিইয়্যে রাইত ভর ফুটপাতে বইয়্যা রইছিলাম।ডরে কইলজা ঠকঠক কইরা কাঁপছিল ।নিজের জইন্যে না মাইয়াডার লাইগ্যা।যদি কোন শয়তানের নজর পড়ে. …? একটা ছেঁড়া কাপড়ের টুকরা দিয়া রাইতভর মাইয়াডারে ঢাইক্যা রাখছি আর মাইয়াডার উপরে ছোট ছাওয়াল দুইডারে শোয়ায় রাখছি।দিদিভাই জানেন না ঐ রাইত যেন আজরাইলের রাইত আছিলো।স্বামী ছাইড়া দিয়া ঘর ছাড়া কইরছে এর লাইগা চোখের পানি ফাইলমু না পোলাপান সামলামু….হেই চিন্তায় হাত পাও কাঁপছিল ।শেষে সকাল হইলো. …পুলিশ আইসলো. ..রাস্তা থেইক্যা সরায়া দিলো।পোলাপান তিনটৈইর হাত ধইরে হাঁটতে লাগলাম, ,কোন ঠাঁই জুটে কিনা খুঁজতে খুঁজতে ।বেলা বাড়তেই ওরা ক্ষুধায় কাঁইনত্যে লাইগলো।কোনও পয়সা নাই হাতে ।সারা দিন ধরে ঘুইরলাম……রাস্তার রাস্তায় ।আবার সইন্ধ্যে লাগলো এক ফোঁটা খাবার ও কোনখানে জুটাইতে পাইরলাম না।রাইতভর পোলাপান গুলা ফোঁপাইতে ফোঁপাইতে কাইনলো ক্ষিধার জ্বালায় । পরের দিন ও একই রকমে গেল ।শেষে আবার হাঁটতে থাকলাম …থামলাম বেলেঘাটা খাল পাড়ে।দেখলাম আমার মত অনেকেই আছেন ওইখানে, কারোর ঘর নাই ।একটু পরেই আইসলো কয়জন লোক।টাকা তুইলছে আর একেক জনের জায়গা দেখাই দিছে ।আমার কাছে নাই কোন টাকা তার উপরে দুই দিন না খাওয়া ।পায়ে পড়ি কাইনলাম।শেষে একজন কইলেন ঠিক আছে আজকে থাকো ।কাল সকালে আমার কাছে আসবে কাজ দেবো।একটা প্লাস্টিকের টুকরা কুড়ায়্যে চারটে লাঠি দিয়ে বাইনধ্যে আবার না খাইয়া শুইয়ে পড়িলাম । একটু চিন্তা কম হচ্ছিল কাজের কথা শুইন্যে।খানিক পরে পাশের বেড়ার ঘর থেইক্যে তিনটে রুটি দিল আর এক বোতল পানি ।পরদিন সকালে উঠে গেলাম ওনার কাছে কাজের জইন্যে ।যাইতেই একটা সিলভারের ভাঙাচোরা একটা থালা হাতে ধইরে দি বইল্লে ওইখানে গিয়ে বস তোমার ছোট ছেইল্লেরে সামনে শোয়ায় রাইখি লোকের থিকা ভিক্ষে চা।আসমান ভাইঙ্গা পড়লো মাথায় দিদিভাই ।কি কইরবো কিছু ভাবতে পারলাম না ।না খাওয়া দুই দিন ধইরে তিন তিনটা পোলাপান নিয়া ।বইসে পড়িলাম ভিক্ষে করতে ।লজ্জার চোটে দুপুর পর্যন্ত কারো থিকা চাইতি পাড়লাম না ভিক্ষে ।রোদে ছাওয়াল আমার কাইনতে কাইনতে গলা শুকিয়ে ফেইলছে।লজ্জা ভুইলে হাত পাইতলাম একটা টাকা দিলো একজন ।সন্ধেবেলা থালার টাকা গুইন্যে দেখি বাইশ টাকা ।কাজ দেয়া লোকের কাছে নিয়ে গেল একজন আইসে।দশ টাকা হাতে দিয়ে বইল্লে কালকে একশো টাকার বেশি চাই ।দশ টাকা দিয়ে কি খাবার কিনবো চার জনের বুঝতে পারলাম না ।দুই প্যাকেট পাউরুটি কিনে পানি দিয়ে খাই।দুই বছর ধরে আছি এই ভিক্ষে করে ।আজ ভিক্ষে করতে না যেয়ে এই কাজে আইসলাম।বেশি টাকা দরকার তাই বেড়াতে যাব বলে আইসলাম। জানতে চাইলাম স্বামীর খবর কি এখন ।তালাক হয়েছে কিনা। দিদিভাই তালাক দেয় নাই আমারে।না দিয়েই নিকাহ করিছে ।আমার সতীনের নাতি নাতনীর ও সাদি হয়েছে জানেন।এতো বড় বয়সে সে।এখন ওরে নিয়ে সাতক্ষিরার পেটকিলঘাটায় আছেন আমার স্বামী ।কোনও খোঁজ নেন না পোলাপানের ও।মেইয়্যে রাফিজা ডারে রাস্তার উপর রাখতে আর পারিলাম না দিদিভাই ।শয়তানের চোখ পড়িছে।সাতদিন আগে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।সামনের এক শ্রমিককে দেখিয়ে বললেন – ওইটে মেয়ের জামাই । মুর্শিদাবাদে বাড়ি এখনও তুইল্যে নেয়নি ।নেয়নি বইল্লে ভুল, আমি বিদায় দিতে পারছিনে।টাকা জোগাড় করতে পারছিনে।আর আজকে ঐ কারণেই এই কাজে আইসলাম ।সন্ধের অন্ধকার বেড়ে যেতেই মেয়ের জামাই তাড়া দিচ্ছিল বাড়ি ফেরার ।শেষ মুহূর্তে জানতে চাইলাম সাতক্ষিরায় পেটকিলঘাটায় তুমি যাবে? থমকে দাঁড়িয়ে -দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন -কোথায় যাব দিদিভাই তালাক দেয় নাই তবু ও ওটা আর আমার ঘর না ওটা সতীনের ।আর সেকান্দরনগর ওটা তো আমার ভাইয়ের আর শ্বশুরের ভিটে ।আমার কববে যাবার আগে প্লাস্টিকের বেড়ার ঘরই আমার ঘর আর সম্বল ভিক্ষের থালা ।তিন ছাওয়াল গেছে নিজের সংসারে, ছোট দুইটাও যাবে বড় হয়ে আরেকটু।থাকবো রাস্তার উপর পড়ে ।কবরের কথাটা বলেছি দিদিভাই আপনারে ঠিকই কিন্তু শেষ ঠিকানা তো আমার বেওয়ারিশ লাশের…. এগুতে শুরু করলেন নাজমা বিবি। ..পলকহীন তাকিয়ে রইলাম নাজমা বিবির পথের শেষ টুকু দেখা যাওয়া পর্যন্ত । যে পথের শুরু ছিল ,শেষ গন্তব্য কোথায় নাজমা বিবির বুঝতে বাকি নেই. ..তা বেওয়ারিশ লাশের ।

ছবি: লেখক