নাজিম হিকমতের দুটি কবিতা

298435তুরস্কের কবি নাজিম হিকমত। সারা জীবন মানুষের মুক্তি আর সমাজতান্ত্রিক আদর্শ কায়েমের জন্য লড়াই করেছেন। লিখে গেছেন অবিরাম। রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য নিক্ষিপ্ত হয়েছেন কারাগারে। তিনি একটি লেখায় বলেছিলেন-‘‘সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে জীবন প্রতিফলিত। তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে যা কিছু সংঘাত, সংগ্রাম আর প্রেরণা, জয়, পরাজয় আর জীবনের ভালোবাসা, খুঁজে পাওয়া যাবে একটি মানুষের সবকটি দিক। সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প, যা জীবন সম্পর্কে মানুষকে মিথ্যে ধারণা দেয় না’’।  ১৫ জানুয়ারী ছিল এই কবির জন্মদিন। ১৯০২ সালে তৎকালীন অটমান সাম্রাজ্যে তাঁর জন্ম। কবিতার পাশাপাশি নাটক ও উপন্যাস লিখেছেন। নাটক নির্দেশনাও দিয়েছেন।
আজও কবিতা-প্রিয় পাঠকের মুখে মুখে ফেরে তার কবিতার চরণ। শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে সামিল মানুষ অনুপ্রেরণা পায় তার কবিতায়।
কবির জন্মদিন উপলক্ষ্যে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনূদিত ‘নির্বাচিত নাজিম হিকমত’ গ্রন্থ থেকে দুটি কবিতা পুনঃমুদ্রন করা হলো প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য।

জেলখানার চিঠি

প্রিয়তমা আমার,
তোমার শেষ চিঠিতে
তুমি লিখেছো;
মাথা আমার ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে
দিশেহারা আমার হৃদয়।
তুমি লিখেছো;
যদি ওরা তোমাকে ফাঁসি দেয়
তোমাকে যদি হারাই
আমি বাঁচব না।

তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধূ আমার,
আমার স্মৃতি কালো ধোঁয়ার মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে
তুমি বেঁচে থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী,
বিংশ শতাব্দীতে
খুব বেশী হলে এক বছর
মানুষের শোকের আয়ু।

মৃত্যু…
দড়ির একদিকে লম্বা হয়ে ঝুলবে শরীর-
আমার কাম্য নয় সেই মৃত্যু।
কিন্তু প্রিয়তমা আমার, তুমি জেনো,
জল্লাদের লোমশ হাতbidrohi
যদি কখনোও আমার গলায়
ফাঁসির দড়ি পরায়
ওরা বৃথাই খুঁজবে
নাজিমের নীল চোখে
ভয়।
অন্তিম ইষার অস্ফুট আলোয়
আমি দেখব আমার বন্ধুদের,
তোমাকে দেখব।
আমার সঙ্গে কবরে যাবে
শুধু আমার
এক অসমাপ্ত গানের বেদনা।

বধূ আমার,
তুমি আমার কোমলপ্রাণ মৌমাছি
চোখ তোমার মধূর চেয়েও মিষ্টি।
কেন তোমাকে আমি লিখতে গেলাম
ওরা আমাকে ফাঁসি দিতে চায়
কেন লিখতে গেলাম।

বিচার সবে মাত্র শুরু
আর মানুষের মুন্ডুটা তো বোঁটার ফুল নয়
যে, ইচ্ছে করলেই ছিঁড়ে নেবে।

এখুনি ও নিয়ে ভেবো না
ওসব অনেক দূরের ভাবনা
হাতে যদি টাকা থাকে
আমার জন্য কিনে পাঠিও গরম একটা পাজামা
পায়ে আমার বাত ধরেছে।
ভুলে যেও না
স্বামী যার জেলখানায়
তার মনে যেন সর্বদা ফূর্তি থাকে।

165597_10150109675233623_253424898622_7681257_8262372_n
রবিবার

আজ রবিবার
ওরা আমাকে রদ্দুরে বেরোতে দিয়েছে
আজ এই প্রথম।
জীবনে এই প্রথম দেখে অবাক হলাম
আকাশ কত দূরাতিদূর
কত নীল
কত বিরাট।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম নিশ্চল নিস্পন্দ হয়ে।
তারপর একরাশ বিষ্ময় নিয়ে মাটিতে বসলাম।
দেয়ালের চুনে এলিয়ে দিলাম পিঠ।

এখন ঠিক এই মুহূর্তে কোন অলস স্বপ্ন নয়
বধূ নয়, সংগ্রাম নয়, স্বাধীনতা নয়।
পৃথিবী
সূর্য
আর আমি…

আমি আনন্দিত, আমি সুখী।