নাম মাহাত্ম্য

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগর চৌধুরী, সাংবাদিক

(কলকাতা থেকে): ঘটনাটা নতুন নয় একেবারেই, কয়েক যুগ আগেকার। এই ঘটনার বিবরণ নিশ্চয়ই সে’সময়ের সংবাদমাধ্যমে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গেই প্রচারিত হয়েছিলো এবং সর্বসাধারণের মনে যুগপৎ অপার কৌতূহল ও বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটিয়েছিলো। কালক্রমে এই ঘটনা মানুষের স্মৃতি থেকে প্রায় মুছে গেছে অথবা অন্যান্য বহু নাটকীয় এবং আশ্চর্য ঘটনার নিচে চাপা পড়ে গেছে। আজকের যুগের অনেকেই এই ঘটনার বিষয়ে কিছু জানে না, আমি নিজেও জানতাম না কিছুদিন আগে পর্যন্ত।অতি সম্প্রতি আন্তর্জালে একটি ইংরেজি সাময়িক পত্রিকার আর্কাইভ ঘাঁটার সময়ে হঠাৎই এটা আমার চোখে পড়ে যায়। বিষয়টা বিশদভাবে খুলে বলি তাহলে, তবে তার আগে সামান্য প্রাক্কথা।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সমসাময়িক বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্বন্ধাতিশয্যে শিশুদের বা নানা দ্রব্যের নামকরণ করতেন, সে’কথা আমরা জানি। দু-একটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের ভাষ্যও তিনি রচনা করেছেন। যেমন সেকালের স্বনামধন্য উদ্যোগপতি হেমেন্দ্রমোহন বসুর আবিষ্কৃত ভেষজ কেশ-তেল, তরল সুগন্ধী এবং পান সুবাসিত ও সুস্বাদু করার মশলা – এই তিনটি সামগ্রীর বিজ্ঞাপনের জন্য রচিত একটি ছড়া  “কেশে মাখো ‘কুন্তলীন’, রুমালেতে ‘দেলখোস’, পানে খাও ‘তাম্বুলীন’, ধন্য হউক এইচ বোস” স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের লেখনীপ্রসূত বলেই কথিত আছে। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ কলকাতার বিখ্যাত মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারী ‘জলযোগ’এর মিষ্টি দইএর নাম দিয়েছিলেন ‘পয়োধি’। আমার বাল্যকালে আমি একাধিকবারই কোন প্রবীণ ব্যক্তিকে জলযোগ-এর দোকানে এসে বলতে শুনেছি- “এই যে ভাই, পয়োধির আধসেরি ভাঁড় দাও তো একটা।” এমন আরো অনেক কিছু আছে যাদের নাম রবীন্দ্রনাথের দেওয়া। আবার বেশ কিছু সামগ্রী বা প্রতিষ্ঠান রবীন্দ্রনাথের নাম বহন করছে সেটাও আমরা জানি। রবীন্দ্রভবন, রবীন্দ্রসদন, রবিতীর্থ ইত্যাদি তো আছেই, রবীন্দ্র সরণী নামে রাজপথ

কলকাতায় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট-এ সংরক্ষিত Barapasaurus Tagorei-এর কঙ্কাল

ও রয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই কলকাতার জোড়াসাঁকো এলাকায়। আবার এই শহরের অন্যতম প্রধান হৃদরোগ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নাম ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সেস্’ (Rabindranath Tagore Institute of Cardiac Sciences), লোকমুখে সংক্ষেপে ‘আর এন টেগোর হসপিটাল’।

তবে এসবই তো সাধারণ ও স্বাভাবিক ঘটনা। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ‘সেলিব্রিটী’দের নাম চিরকালই দুনিয়ার সর্বত্র এইভাবেই ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের নামানুসারে নামকরণ হয়েছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও বিস্ময়কর একটি বস্তুর। অবশ্য ‘বস্তু’ বলাটা হয়তো ভুল, কারণ এটি বস্তু নয়, ‘প্রাণী’ এক বিশালদেহী ডাইনোসর, যে পৃথিবীর বুকে বিচরণ করতো আনুমানিক এক কোটি ষাট লক্ষ বছর আগে। বিশ্বকবির নামে ডাইনোসরের নাম , ভাবা যায়!

কীভাবে এই অদ্ভূত নামকরণ হলো? ১৯৫৮ সালে একদল ভূবিজ্ঞানী ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (ISI)-এর তরফে রাজস্থানের চম্বল নদীর পার্শ্ববর্তী ‘কোটা’ এলাকায় খননকার্য চালাচ্ছিলেন। বছর তিনেক ধরে এই কাজ করে যাওয়ার পর তাঁরা এই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মাটির নিচে চাপা পড়া fosilised বা প্রস্তরীভূত কঙ্কাল আবিষ্কার করেন। সেটা ছিল ১৯৬১ সাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম শতবার্ষিকী। ISI -এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সখ্যের সম্পর্ক ছিলো, যদিও বয়সে প্রশান্তচন্দ্র কবির চেয়ে কমপক্ষে ত্রিশ বছরের ছোট ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ISI -এর একজন শুভানুধ্যায়ী ও পৃষ্ঠপোষক। ইংরেজি Statistics শব্দটির বাংলা অর্থ তিনি করেছিলেন ‘রাশি-বিজ্ঞান’ বা ‘রাশি-বিদ্যা’, এই সংস্থার ইংরেজি মুখপত্র ‘সংখ্যা’ (Sankhyā) নামক পত্রিকাটির প্রথম সংস্করণে তিনি একটি ভূমিকাও লিখেছিলেন। প্রশান্তচন্দ্রও রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বভারতী’র প্রথম দশ বছরে ঐ প্রতিষ্ঠানের যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। উল্লিখিত প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরের দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হওয়ার পর প্রশান্তচন্দ্রেরই ইচ্ছায় ও নির্দেশে রবীন্দ্রনাথের নামানুসারে এই প্রাণীর নাম দেওয়া হয় Barapasaurus Tagorei –  এটাই ছিল কবির জন্ম শতবার্ষিকীতে ISI -এর তরফে শ্রদ্ধা নিবেদন।

Barapasaurus Tagorei নামটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। ‘Barapa’ আসলে দুটি হিন্দি শব্দ – ‘বড়া’ ও ‘পা’, এবং ‘saurus’ হলো জীববিজ্ঞানে গিরগিটি-জাতীয় প্রাণীর generic name বা বর্গনাম। সুতরাং ‘Barapasaurus’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ করা যেতে পারে ‘বৃহৎ পদবিশিষ্ট গিরগিটি’, তবে সাধারণ গিরগিটির তুলনায় এই ডাইনোসরের আকার ও আকৃতি ছিল অনেক-অনেক গুণ বড়, তার কঙ্কালেরই মাথা থেকে পা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৪৭ ফুট এবং ওজন প্রায় ৭ টন। ‘Tagorei’ শব্দটির তাৎপর্যের ব্যাখ্যা তো নিষ্প্রয়োজন।
Barapasaurus Tagorei – এর কঙ্কাল সংরক্ষিত রয়েছে কলকাতার বরাহনগর এলাকায় অবস্থিত ISI-Gi  Geology Museum বা ভূবিজ্ঞান-সংক্রান্ত যাদুঘরে।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]