নারীর মানসিক রোগ…

শারমিন শামস্

আমাদের সমাজে নারী মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে আমার ধারণা। এদেশের মেয়েরা প্রচন্ড সামাজিক, পারিবারিক চাপে থাকে, কষ্টে থাকে। এইসব চাপ, কষ্ট শেয়ার করার কেউ নাই, সমাধান দেবারও কেউ নাই। বরং চারপাশে অসহযোগিতা করার লোকই বেশি। দিনের পর দিন নিজের নানা কঠিন কঠিন সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে নিজের দিকে ভালবেসে তাকানোর সময় হয়না মেয়ের । এইসব পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে চলতে একসময় সে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, সেটা কেউ ধরতে পারে না, সে নিজে তো নাই-ই।
পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত কারনে নানা ধরনের সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে হাবুডুবু খাওয়া অনেক মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একসময় আবিষ্কার করি, মেয়েটি মানসিক রোগাক্রান্ত। কিন্তু সে নিজে তা জানে না, মানেও না।
সাধারণত সন্দেহপরায়নতা, অবিশ্বাস, সবাইকে শত্রু মনে করা, নিজেকে একেবারে একা ভাবা, সবকিছু অসম্ভব মনে হওয়া, কোন কাজে উৎসাহ না থাকা, কোন কাজ শুরু করে শেষ না করা, নিজের যত্ন না নেয়া, আশেপাশের সবার ভুল ধরা, কারো প্রতি কৃতজ্ঞ না থাকা ইত্যাদি লক্ষণই সাধারণত সবার মধ্যে বেশি দেখেছি। এসব নিয়ে ভয়াবহ সব সমস্যা তৈরি হয়। কারণ মেয়েটি যে মানসিক অসুস্থতার কারণে এসব করছে, তা আমরা সহজে ধরতে পারিনা। পরে যখন টের পাই, তখন অনেকটা দেরি হয়ে যায়।
এর ফলাফল আরো খারাপ। যেহেতু তার রোগটা কেউ জানে না, সবাই ভাবে, সে মানুষ হিসেবেই এমন। তাকে সবাই অপছন্দ করতে থাকে। ধীরে ধীরে বন্ধুবান্ধবরা দূরে সরে যায়, আত্মীয়, সহকর্মী ইত্যাদিরা বিরক্ত হয়। একসময় মেয়েটি প্রকৃত অর্থেই একা হয়ে যায়।
এই একাকীত্ব তার রোগ আরো বাড়ায়। এই একাকীত্ব তার রোগের সব লক্ষণ দিন দিন আরো প্রকট করে। সে যার সঙ্গেই মেশে, কথা বলে, এক সময় তাকেই শত্রু জ্ঞান করতে থাকে। তার চিন্তা ভাবনা, কথা কোন কিছুই যুক্তি মানে না। অযৌক্তিক, অদ্ভুত সব চিন্তা, কথা, সন্দেহ করা একজন বাতিকগ্রস্থ মানুষে পরিনত হয় সেই নারী।
আমি এমন অসংখ্য নারীর দেখা পেয়েছি। কারো মধ্যে এইসব লক্ষণ তীব্র। কারো অল্প। অল্প লক্ষণই বাড়তে বাড়তে চরম আকার ধারণ করে।
সমস্যা হল, এদের জন্য প্রকৃতপক্ষে কোন ভাল কাউন্সেলিং সার্ভিস এদেশে নাই। বেশিরভাগই চিকিৎসা নেয় না, কারণ জানেই না যে সে অসুস্থ। আর যে চিকিৎসা নেয়, সে ক’দিন পরেই আরো হতাশ আর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ততদিনে রোগ আরো বিকট আকার পেয়েছে। তার আচরণ হয়ে উঠেছে বিষময় আর পুরো জগৎ সংসারের চোখে সে হয়েছে বিরক্তিকর, যুক্তিহীন, বুদ্ধিহীন, বিবেকহীন মানুষ।
এই মানসিক রোগে সে নিজে মস্ত ক্ষতির শিকার হয়। মূলত পুরো জীবনটাই এলোমেলো হয়ে যায়। একইসঙ্গে সে আরো অনেকের ক্ষতি করে। সে ঢালাওভাবে লোকের নামে কুৎসা করে, মিথ্যে বলে, দুর্ব্যবহার করে। আর যেহেতু সে যে মানসিক রোগী এটা কেউ জানে না, ফলে এইসব কুৎসা বদনামে অনেকের ক্ষতি হয়; দুর্ব্যবহার, অকৃতজ্ঞতায় অনেকে মনে আঘাত পান।
একটি নারীর ভিতরে লুকিয়ে থাকা মানসিক রোগ আসলে শুধু তারই ক্ষতি করে না,তার সঙ্গে সম্পর্কিত আরো মানুষের জন্য যন্ত্রনা বয়ে আনে।
সমাজ নারীর প্রতি বিরূপ। সমাজ, পরিবার,রাষ্ট্র নারীকে কোন অনুকূল বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ দিতে ব্যর্থ। বরং তারা নানাভাবে নারীকে যন্ত্রনা দিতে উদগ্রীব। এজন্য নারীর ভেতরের চাপ ও বেদনা রোগে রূপ নেয়৷ সেই রোগ কোন চিকিৎসা পায় না, সুশ্রুষাও না।

জানি না, নারীর মনের রোগের এই ভয়াবহ দিকটা কবে সবাইকে নাড়া দেবে, নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করবে।

এই সমাজ কবে সভ্য হবে, কে জানে!!

ছবি: গুগল