নারী ভয়ংকর

উল বুনতে বুনতে ডিকেন্সের ‘টেল অফ টু সিটিজ’ উপন্যাসের সেই ভয়ংকর নারী চরিত্র মাদাম দেফার্জ গুনে চলতেন গিলোটিনে কাটা পড়া মুণ্ডুর সংখ্যা। বাইরে ফরাসী বিপ্লবের আগুনে পুড়ছে গোটা ফ্রান্স আর আদালতের ভিতরে একজন রমণী তীব্র শ্রেণী হিংসার আগুন বুকে নিয়ে গুনে যাচ্ছে মৃত্যুর উৎসবের ইতিবৃত্ত। এমনই এক চরিত্র নির্মান করেছিলেন চার্লস ডিকেন্স তাঁর অমর উপন্যাসে। উইলিয়াম শেক্সপীয়র তাঁর ‘হ্যামলেট’ নাটকে হ্যামলেটের মা-কে খল চরিত্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ‘ট্র্যাজেডি অফ ম্যাকবেথ’ নাটকে ম্যাকবেথের স্ত্রী বোধ হয় এখন পর্যন্ত সাহিত্যে সবচাইতে বেশি আলোচিত নেতিবাচক নারী চরিত্র। বাংলা সাহিত্যের দিকে দৃষ্টি ফেরালেও এমন জটিল এবং মানসিক প্রতিশোধ স্পৃহায় ধারালো হয়ে ওঠা নারী চরিত্র হিসেবে আমরা দেখতে পাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের কুসুমকে। শশী ডাক্তারের কাছে ভালোবাসা চেয়েও একদা উপেক্ষিত কুসুম পরে শশীর ভালোবাসার আর্তিকে মানসিক অবহেলা দিয়ে পিষ্ট করেছিলো। 

সাহিত্যে এই নেতিবাচক নারী চরিত্ররা কেন সৃষ্টি হয়? এ প্রশ্নের সামাজিক ব্যাখ্যাই বা কী? এ দেশীয় বা পশ্চিমা রূপকথার গল্পেও দেখা যায় রাক্ষস বা ডাইনির চরিত্রটাও নির্দিষ্ট হয়ে থাকে নারী হিসেবেই। বড় চুল আর মূলার মতো দাঁত নিয়ে আকাশ পথে উড়ে উড়ে আসে রাক্ষস, ঝাড়ুতে চড়ে আসে ডাইনিরা। এরা সবাই নারী। কোনো রাজপুত্র বা রাজার অনিষ্ট সাধনই এদের প্রধান কাজ।সোজা বাংলায় বললে, ভিলেইন বা খল চরিত্রে নারী। পুরুষের প্রভাব বলয়ে থাকা সাহিত্যে নারী চরিত্রকে নেতিবাচক হিসেবে কেন দেখানো হয়? সেখানে শুধুই কি পুরুষের ইচ্ছার নির্মাণ নারী? নাকি নারী চরিত্রকে আলাদা একটি শক্তিশালী অবয়ব দিতেই এই চরিত্রগুলো সৃষ্টি হয়েছে? উত্তরটা অস্পষ্ট এখনও। হয়তো ভবিষ্যত আলোচনা আর বিশ্লেষণে স্পষ্ট হবে।

প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ আয়োজনে এসব দিক নিয়ে রইলো ‘নারী ভয়ংকর’।

সাহিত্যে নেতিবাচক নারী চরিত্রগুলো সত্যিই পুরোটাই অর্থহীন, একরৈখিক  নেতিবাচকতায় পরিপূর্ণ ছিলো? পুতুল নাচের ইতিকথায় শশী ডাক্তারকে যতোই অবহেলায় মুড়িয়ে দূরে সরিয়ে দিতে চাক না কুসুম তার ভিতরে শশীর প্রতি ভালোবাসার হাহাকারটুকু সংলাপের অন্তরাল থেকে ফুটে বের হয়েছে। লেডী ম্যাকবেথ চেয়েছিলেন ক্ষমতা। পুরোটাই কী নিজের জন্য? না। ম্যাকবেথের উত্থান দেখাটাই ছিলো তার স্বপ্ন। পাশাপাশি নিজেকে ক্ষমতার বলয়ে যুক্ত করাটাও ছিলো দ্বিতীয় উদ্দেশ্য। ম্যাকবেথের স্ত্রী স্বামীকেই ভালোবাসতো। আর তাই নাটকে ম্যাকবেথ তাকে, ‘মহানুভবতার সহগামী’ বলে চিহ্নিত করেছে। এই সংলাপ এই বয়ষ্ক দম্পতির ভেতরে বয়ে যাওয়া ভালোবাসাকেই প্রকাশ করে। এখন বিশ্লেষকরা মনে করছেন লেডী ম্যাকবেথের অপাত: ক্ষমতা লিপ্সা, উন্মাদনা আর ষড়যন্ত্রের ভিতরেও হাত ধরে ছিলো ভালোবাসা যা এই চরিত্রটিকে পুরোপুরি নেতিবাচকতায় পর্যবসিত হতে দেয়নি।

মাদাম দাফার্জের ভেতরে ছিলো শ্রেণী হিংসা। সেই হিংসার ভেতরে লেডী ম্যাকবেথ বা কুসুমের মতো ভালোবাসায় সমর্পনের মৃদু সুগন্ধের ছিটেফোঁটাও ছিলো না। কিন্তু যৌক্তিকতা কী ছিলো না? রাজতন্ত্র আর সামন্ততন্ত্রের জটাজাল ভেঙে ফরাসী বিপ্লবের যে আগুন জ্বলে উঠেছিলো মাদাম দাফার্জ ছিলেন সেই আগুন থেকেই উদ্ভুত। ফলে বিপ্লবের মাঠে এই নারী চরিত্রের মাঝে নিষ্ঠুরতার ভিতর দিয়ে চার্লস ডিকেন্স যে নারীর শক্তির উদ্ভোধনকে দেখাতে চেয়েছেন সে সম্ভাবনা একবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

নারী ভয়ংকরের আবরণে সাহিত্যে নারীর শত্তিশালী প্রতিচ্ছবি তৈরি করতে চেয়েছেন সাহিত্যিকরা।নারী চরিত্র রাক্ষুসী, তারা ডাইনি, তারা ষড়যন্ত্রী, তারা ক্ষমতার লড়াইয়ে একজন অংশীদার। কিন্তু এই মূর্তির পাশাপাশি তাদের শক্তিমত্তার দিকটাও কী প্রকাশিত নয়?কিন্তু তাহলে রূপকথার গল্প? সেখানে তো রাজার কোনো অপরাধ থাকে না। সব দোষে দুষ্ট নারী চরিত্রটি-ই। আসলে নারীই জীবন, আবার সে মৃত্যু, তাকে জয় করার মধ্যে বীরনায়ক জীবনকে অধিগত করে বিজয়নিশান ওড়ায়। কিন্তু এই ভাবনার মধ্যেই সংগুপ্ত আছে নারীকে ভয়ংকরী রূপে কল্পনা করার বীজ। রক্তমাংসের ক্রন্দন, বাসনার উদ্দামতা, জৈবকোষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, আগ্রাসনস্পৃহা — এই সব কিছুর উগ্র প্রকাশের প্রতি এক ধরনের ঘৃণা থাকে মানুষের। অস্তিত্বের এই সব প্রমত্ত শক্তিকে সে কোমল সুরভিত প্রসাধিত মৃদুতায় ভূষিত করতে চায়। তাই যখন কোনো বিচ্যুতি ঘটে, আরেকজন কাউকে মানুষ চায় — যার ওপর এই স্খলনের দোষ চাপানো যাবে। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারী হয়ে ওঠে এই দোষের আধার। নারীই যেন মূর্তিমতী পাপ। এই প্রবণতার হাত ধরেই সাহিত্যে নানান চরিত্রে নারী ঘুরেফিরে হয়ে থেকেছে ভয়ংকরী।কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে সাহিত্যে নারী চরিত্রগুলো আবারও পুনর্মূল্যায়িত হতে শুরু করেছে। ফিরে তাকাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। হয়তো আগামীতে সাহিত্যে ভয়ংকর হিসেবে উপস্থাপিত নারী চরিত্রদের অবয়ব পাল্টে যেতে পারে পুরোপুরি।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ বিবিসি কালচার
ছবিঃ বিবিসি, গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box