নায়িকা না খল নায়িকা

অ্যাডলফ হিটলার, ড. জোসেফ গোয়েবলসের মতো পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম দানবদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। যুদ্ধের একেবারে অন্তিম প্রহরেও এই ভয়ঙ্কর মানুষগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কাজ

জোসেফ গোয়েবলস-

জোসেফ গোয়েবলস

করেছেন নাৎসিবাদ প্রচারণা এবং বিশ্বজুড়ে মানুষ হত্যার অন্যতম নায়ক জোসেফ গোয়েবলসের একান্ত সচিব হিসেবে। কে এই মানুষটি? তার বয়স এখন পৌঁছে গেছে ১০৫-এর ঘরে। তিনি ব্রুনহিল্ড পোমসেল নামে একজন নারী।
এই মহিলার জীবন নিয়ে একদল চিত্র পরিচালক একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। ছবির নাম ‘এ জার্মান লাইফ’। ২০১২ সালে এই ছবি তৈরীর কাজ শেষ হয়। এই তথ্যচিত্রকে কেন্দ্র করে ব্রুনহিল্ড পোমসেলের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায়।

অনেক কথাই বলেছেন ইতিহাসের সাক্ষী এই নারী। জন্মেছিলেন ১৯১১ সালে জার্মানীর বার্লিনে।
প্রথম জীবনে বার্লিনে এক ইহুদী আইনজীবীর সেক্রেটারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি কাজ করতেন একজন ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ভদ্রলোকের টাইপিস্ট হিসেবে। কিন্তু ১৯৩৩ সালে ব্রুনহিল্ড পোমসেলের জীবনের ধারাটাই পাল্টে গেল। তখনকার নাৎসি পার্টির এক সদস্য তাকে কাজ জুটিয়ে দিল হিটলারের থার্ড রাইখের সংবাদ বিভাগে। কিন্তু সেখানেই আটকে থাকলেন না ব্রুনহিল্ড। ১৯৪২ সালে যুদ্ধের সময় তিনি বদলি হন জার্মানীর প্রচারণা মন্ত্রণালয়ে। আর সেখানেই তিনি কাজ শুরু করেন কুখ্যাত জোশেফ গোয়েবলসের একান্ত সচিব হিসেবে। যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি সেই পদেই বহাল ছিলেন এবং জার্মানীরর পতনের পর তার ঠাঁই হয় রুশ কারাগারে।

অ্যাডলফ হিটলার

অ্যাডলফ হিটলার

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে কখনোই আগ্রহী ছিলেন না ব্রুনহিল্ড। হয়তো এক ধরণের ভয় থেকেই এড়িয়ে চলতেন সাংবাদিকদের। শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র পরিচালকদের কল্যাণে ইতিহাসের এক নতুন সাক্ষী বের হয়ে এলো পর্দার আড়াল থেকে। ব্রুনহিল্ড ১৯৪২ সালে যোগ দিয়েছিলেন হিটলারের নাজি পার্টিতে। তার নিজের জবানীতে, ‘আমি যোগ না দেয়ার কোনি কারণ খুঁজে পাইনি। তখন সবাই তাই করছিল।’ গোয়েবলসকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন তিনি। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ব্রুনহিল্ড পোমসেল বলেন, ‘হিটলারের খুব বিশ্বাসভাজন মানুষ ছিলো গোয়েবলস। দেখতেও ছিলো সুদর্শন। চমৎকার রুচিশীর পোশাক পরতো ইতিহাসের এই ঘৃণ্য মানুষটি। তার পুরো কর্মকান্ডই ছিল অসাধারণ এক অভিনেতার মতো।’
ব্রুনহিল্ডের সঙ্গে আরও ৪ জন মহিলা গোয়েবলসের অফিসে সচিবের কাজ করতো। তবে
গোয়েবলসের চিঠিপত্র আর বিবৃতি টাইপ করার দায়িত্ব বেশীরভাগ সময়ে পড়তো তার ওপর।
যুদ্ধের সময় একবার গোয়েবলসের প্রাসাদে একবার নৈশভোজের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ব্রুনহিল্ড।

ব্রুনহিল্ড পোমসেল

ব্রুনহিল্ড পোমসেল, ১৯৫০ সালে

এই ভয়ঙ্কর মানুষটির স্ত্রী আর সন্তানদের সঙ্গেও তার পরিচয় ছিল। হিটলার যখন তার বাংকারে
আত্নহত্যা করে তখন এই গোয়েবলস ও তার স্ত্রী সহমরণে যায়। তার আগে তারা খুন করে
৬ সন্তানকে।
এতোসব ঘটনা এতো কাছে থেকে দেখার পর ব্রুন হিল্ড কিছুই বুঝতে পারেন নি? বিষ্মিত হবার মতোই ব্যাপার। এতো বড় হত্যাযজ্ঞ অনষ্ঠান চলছে পৃথিবী জুড়ে অথচ তিনি কিছুই টের পাচ্ছেন না! একটু খটকা লাগে বৈকি। ব্রুনহিল্ড অবশ্য গোটা বিষয়টাকে নিজের স্বভাবদোষ বলে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তার কথা হচ্ছে, এসব বিষয়ে তার কোন আগ্রহ ছিল

ব্রুনহিল্ড পোমসেল

ব্রুনহিল্ড পোমসেল

না। তাই গোয়েবলস কী লিখছে আর কোথায় কী প্রচার হচ্ছে খেয়াল করেনি নি তিনি। এখন বুঝতে পারেন পুরো ব্ষিয়টাই ছিল তার নিজের খামখেয়ালিপূর্ণ আচরণ।

রুশ সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পড় ১৯৫০ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন ব্রুনহিল্ড। ছাড়া পেয়ে আবার ফিরে আসেন জার্মানীতে। সেখানেই আবার চাকরি নেন রেডিওতে। ১৯৭১ সালে কাজ থেকে অবসর। নিউইর্য়ক টাইমসের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎকারে ব্রুনহিল্ড বলেন, নাজিদের হত্যাযজ্ঞ, গ্যাস চেম্বারে হাজার হাজার ইহুদীকে ঠান্ডা মাথায় মেরে ফেলার ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। জেল থেকে বের হওয়ার পর সব ঘটনা জানতে পেরেছেন। তখন তার কাছে জার্মানদের ভয়ঙ্কর নির্যাতন ক্যাম্প ‘বুশেনওয়াল্ড’ নামটা পরিচিত ছিল সংশোধন কেন্দ্র হিসেবে। তার ভাষায় ‘আমরা জানতাম ওটা একটা ক্যাম্প। সেখানে ইহুদীরা যেত।’ এই কথাগুলো সেই তথ্যচিত্রেও লিপিবদ্ধ হয়েছে।

‘এ জার্মান লাইফ’ তথ্যচিত্রে ইতিহাসের অনেক অনুল্লিখিত অধ্যায়ের কথা জানিয়েছেন এই মহিলা। তবে পাশাপাশি নিজেকে জার্মানদের দোসর হিসেবে স্বীকার করেন নি। তার কথা হচ্ছে, দু একজন মানুষকে দিয়ে গোটা জার্মান জাতটাকে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। সেই সময়ে জার্মানীর মানুষও একটি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বসবাস করছিল।
তথ্যচিত্রের পরিচালকরা অবশ্য ব্রুনহিল্ড পোমসেলকে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত করেনি নি। তারা বলছেন ব্রুনহিল্ড নারকীয় এই যুদ্ধের সময় জার্মানদের চাকরি করেছেন। কিন্তু তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

ফয়সাল আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল, নিউইয়র্ক টাইমস