‘না পাঠানো চিঠি’ – নবনীতা’দি কে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

খুকু’দি,

জানি এ সম্বোধনে বকা খেতাম – এটা ‘শুধুমাত্র আমার মা-বাবার ডাকার নাম, তোদের জন্যে নয়’, অথবা ‘এতো বড়ো-সড়ো বিজ্ঞ বৃদ্ধাকে কেমন করে যে খুকু বলিস বুঝি না’। বেশ রাগ রাগ ভাব করতে খুব চেষ্টা করতে, কিন্তু ও তোমার আসতো না – তোমার সে ব্যর্থ প্রচেষ্টার মুখখানা দেখে আমি জোরে হেসে উঠতাম। আর তুমিও হেসে ফেলতে। কিন্তু তোমাকে রাগানোর এ অমোঘ পন্থাটি বারবারই ব্যবহার করেছি গো তোমার সঙ্গে।

কবে তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা, কবে তোমার সঙ্গে পরিচয়, তোমার লেখা যে আমাকে কি পরিমান মুগ্ধ করে, সে সব কথা জ্বলজ্বল করছে মনের মণিকোঠায়। জানি, প্রথম দেখা আর পরিচয় অক্সফোর্ডে, নব্বুইয়ের শেষের দিকে। তোমার উপন্যাস থেকে রম্য রচনা, কবিতা থেকে ভ্রমন কাহিনী সবই আমি গোগ্রাসে গিলি। তবে আমার পছন্দ তোমার টুকরো লেখাগুলো – এই যেমন, ‘স্বজন-সকাশে’, ‘নবনীতার নোটবই’, ‘নটী-নবনীতা’ ইত্যাদি। আর ‘ভালো-বাসার বারান্দা’ তো রয়েছেই। সে সব কথা আজ থাক। ও বলতে আজ আর ভালো লাগছে না। আজ বরং অন্য কথা বলি।

তোমার সঙ্গে যে আমার নিত্য দেখা হতো, তা’ নয় তিন-চার বছর পেরিয়ে একবার। সেও বিদেশে কারো বাড়ীতে, কোন সভায়, কখনও কখনও কোন অনুষ্ঠানে। কিন্তু যখনই দেখা হতো, মনে হতো, এই কালকেই বুঝি দেখা হয়েছিলো। কিন্তু যখনই দেখা হতে, গল্পের ঝাঁপি খুলে বসতে – কতো গল্প, কতো গল্প! তোমার মা-বাবার গল্প, তোমার বেড়ানোর গল্প, ঘর-সংসারের গল্প এবং কালে-ভদ্রে অধ্যাপক সেনের গল্পও। ওঁকে ঐ সম্বোধনেই রাখা ভালো – তোমাকে ‘দিদি’ বলেও ওঁকে তো আর ‘দাদা’ বলা যায় না। ‘দিদি’ ডাকটি তোমাকে মানায়, ওঁকে ‘দাদা’ বললে সে অন্য মাত্রা নেয়।

বাংলা সাহিত্যের দু’কবির -কবি নরেন্দ্র দেব আর কবি রাধারানী দেবের – একমাত্র সন্তান তুমি। ভাগ্য বটে তোমার। তুমি বলেছো কেমন করে বিধবা তরুনী রাধারানী দেব একবস্ত্রে কোলকাতা শহর থেকে বেরিয়ে তরুন নরেন দেবেকে মাল্যদান করেছিলেন। বাবার স্ট্যালীনীয় গোঁফ, ভুলো মন, কিন্তু ঋজু শৃঙ্খলার গল্প করতে খুব। অন্য অনেকের সঙ্গে কোন একটা অনুষ্ঠানের চাঁদা চাইতে ‘ভালো-বাসায়’ এসেছিলেন বালক অমর্ত্য সেন – ‘অপরাজিতা দেবীকে’ দেখতে। সে গল্পও তোমার মুখে শুনেছি। তোমার মা সে ছদ্মনামে লিখতেন।

অমর্ত্য সেনের সঙ্গে

খুব বলতে তোমার গুরু বুদ্ধদেব বসু আর তাঁর পরিবারের কথা। বুদ্ধদেব আর প্রতিভা বসুর তৃতীয় কন্যা ছিলে তুমি সর্ব অর্থেই। তোমার মুখে মিমি, রুমি, পাপ্পার গল্প লেগেই থাকতো। বলতে দ্বিধা নেই, এই যে আমি আগপাশ তলা বুদ্ধদেব বসুর ওপর পড়ে পড়ে হদ্দ হয়ে গেছি, তার অনেকটাই তো তোমার জন্যে। যাদবপুরের ছাত্র জীবনের কথা বলেছিলে অনেক । গর্ব ছিলো তোমার যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের প্রথম পাঁচজন ছাত্রের একজন বলে। গল্প বলেছো অনেক সুধীন দত্ত, নরেশ গুহ, অমিয় দেব এঁদের সম্পর্কে। ক্লিন্টন সিলি আর ফাদার ম্যাক্ক্যাচিয়নের কথাও বলেছি আমরা অনেক।তুমি অবাক হয়েছিলে জেনে যে ক্লিন্টন আমার শিক্ষক ছিলেন বরিশাল জিলা স্কুলে এবং ফাদার ম্যাক্কাচিয়নের পশ্চিম বঙ্গের টেরাকোটা গবেষণা সম্পর্কে আমি পড়েছি কিশোর বয়সে ষাটের দশকে। ‘ইঁচড়ে পাকা’ – বলে স্নেহার্দ্র স্বরে মৃদু ভর্ৎসনা করেছিলে তুমি।

যাদবপুরের গল্পে উঠে এসেছিলো সে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সদ্য কেম্ব্রিজ ফেরত ২৩ বছরের তরুন বিভাগীয় প্রধানের কথা। তুমি বলেছিলে, তোমরা ছাত্ররা দোতলার বারান্দায় ভীড় করেছিলে, ঝুঁকে পড়ে দেখতে চেষ্টা করেছিলে সবুজ গাড়ী থেকে নেমে আসা লাল বুটিদার টাই পড়া অমর্ত্য সেনকে। টেনে টেনে বার করেছিলাম তোমার বন্ধু এবং অধ্যাপক সেনের মাসতুতো বোন যশোধরা’দির কথা। অধ্যাপক সেনের নতুন কফি মেশিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তোমার আমন্ত্রিত হওয়ার কথা। বস্টনে রাতের খাওয়ার পরে থালা-বাসন ধোয়ার দায়িত্ব এড়াতে অধ্যাপক সেনের নানান চাতুরীর কথা। সে সব গল্পের কেন শেষ নেই – তবে সে কথা অন্যত্র।

তিনটে কথা খুব মনে পড়ে। তুমি জীবনভর চরম হাঁপানি রোগী। একবার গল্প করতে করতে তোমার ভীষন কাশির দমক উঠলো। কাশতে কাশতে তুমি আধ-শোয়া থেকে উঠে বসলে। আমার খুব খারাপ লাগছিলো। তুমি কাশির ফাঁকে বললে, ‘দ্যাখ, তোরা অসুস্থ্য হলে বসা থেকে শুয়ে পড়িস, আর আমি শোয়া থেকে বসে পড়ি। আমার অবস্থা তো তোদের চেয়ে ভালো’। তোমার মনের জোর, কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আর খুব খারাপ অবস্হার মধ্যেও ঠাট্টা করার মতো মানসিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছিলো।

আর একবার কোন একটি গল্প করার মধ্যে তুমি খুব উদাস হয়ে পড়েছিলে। জানালার বাইরের দিকে খুব গাঢ় স্বরে বলেছিলে, ‘ বিখ্যাত হোস না কখনো। বিখ্যাত ব্যক্তিদের বাইরের পৃথিবী গ্রাস করে নেয়। মনের দিক থেকে তাঁরা বড় একলা হয়ে যায়’। বুঝেছিলাম কেন তুমি এ কথা বলেছিলে। খুকু’দি, তোমার সে কথা গুলো মনে রেখেছি। মনের দিক থেকে একলা হওয়ার মতো কোন কাজ করিনি। আর আমার মতো মানুষের বিখ্যাত হওয়ার সুযোগ কোথায় গো, দিদি!

আর একদিনের কথা কখনও ভুলবো না। বেনু চলে যাওয়ার পরে তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো লন্ডনে একজনের বাড়ীতে। খুব আদর করে আমাকে পাশে বসিয়েছিলে। না, কোন ছেঁদো সান্ত্বনার কথা বলনি। কিন্তু আমার পিঠের ওপরে তোমার হাতের স্পর্শ বহু কথা বলেছিলো। এক পর্যায়ে আমি অনেকটা খেদের সঙ্গে বলেছিলাম, ‘বেনুটা চলেই গেলো।’ আমার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে খুব নরম স্বরে তুমি বলেছিলে, ‘যাবে কোথায়? আমাদের হৃদয়ে যাঁদের বাস, তাঁরা কখনোই আমাদের ছেড়ে যায় না রে’।

নবনীতা’দি (খুকু’দি বলা বাদই দিলাম), আমার হৃদয়ে তোমার বসবাস, তুমিও কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে না। সে আমি জানি। আর যাবেই বা কি করে? তোমার। কপালের ঐ বড় টিপ নিয়ে তুমি লুকোবেই বা কোথায়?

প্রনত:

সেলিম

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]