নিউইয়র্কের বাংলা বইয়ের মেলায়

স্মৃতি সাহা

দিনপঞ্জির হিসেব মতে চলে এসেছে গ্রীষ্মঋতু। শুধু তাই নয়, তপ্ত লু হাওয়ার শহরজুড়ে বিচরণও বুঝিয়ে দিচ্ছে এখন গ্রীষ্মকাল। কয়েকদিন আগেই শহরের স্কুলগুলোতে শুরু হয়ে গেছে গ্রীষ্মকালীন ছুটি। প্রায় আড়াইমাসের এই লম্বা ছুটি বাচ্চারা উপভোগ করে খুব আনন্দ নিয়ে। আর বাচ্চাদের ঘিরে বেশকিছু প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে থাকে নিউইয়র্ক সিটি গ্রীষ্মকালে। বিভিন্ন সামার ক্যাম্পের আয়োজন, পার্কগুলোতে সাঁতারের প্রশিক্ষণ, ব্যাডমিন্টন খেলা শেখানোর কার্যক্রমসহ আরোও বেশকিছু আয়োজন। তবে এক্ষেত্রে কমিউনিটি গুলোও পিছিয়ে থাকে না। অসংখ্য আউটডোর মেলা, পিকনিকের জমজমাট আয়োজন থাকে এই সময়কে কেন্দ্র করে। কিছুদিন আগেই নিউইয়র্ক বাংলা কমিউনিটি আয়োজন করেছিল বইমেলা আর সাহিত্যমেলার। বইকে ঘিরে আয়োজিত এ মেলাগুলোতে সমাবেশ ঘটেছিল অসংখ্য গুণীজনের। বাংলা ভাষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতির মেলবন্ধন মেলা প্রাঙ্গনকে করেছিল সমৃদ্ধ। দেশ থেকে প্রায় দুই হাজার মাইল দূরে বসেও নিজ ভাষা আর সংস্কৃতির এ উৎসব সত্যিকার অর্থেই প্রাণের উৎসব হয়ে ওঠে। দেশকে পিছনে ফেলে প্রায় দুই হাজার মাইল অতিক্রান্ত করে আমরা যখন চলে আসি আটলান্টিকের এপারে তখন আমরা পরবাসী, আমরা অভিবাসী। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন পরিবেশের পরতে পরতে তখন আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে ভিন্ন ভিন্ন রকমের লড়াই। নিজের দেশের সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশে নিজেদের শিকড় বোপন করার লড়াইটা যে খুব চ্যালেঞ্জিং বা কষ্টসাধ্য তা যেন খুব অনুমান সাপেক্ষ। নতুন ভাষা, নতুন ধরণের কাজের সঙ্গে পরিচয় হবার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের শুরু হয়ে যায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। অন্য সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা আমাদের সন্তানদের নিজেদের শিকড়ের সন্ধান দেবার যে প্রতিদিনের লড়াই শুরু হয়, তা যেন সবচেয়ে কঠিন লড়াই। ওরা চেনে না নিজের দেশের মাটির গন্ধ, ওরা ছুঁয়ে দেখেনি শ্রাবণের বৃষ্টি, দেখেনি করতোয়ার জলে রোদের খেলা। তবুও নিজের দেশ, সংস্কৃতি ওদের মন ও মননে প্রোথিত করতে আমাদের চেষ্টার অন্ত থাকে না। আমরা ওদের হাত ধরে ধরে নিয়ে যাই এসব মেলায়। দেখাতে চাই নিজের দেশের সংস্কৃতি, চেনাতে চাই চিরন্তন বাংলাকে। দেশ ছেড়ে আসা আমরা প্রবাসী। আমি বা আমরা অনেকেই হয়তো একসময় ফিরে যাবো করতোয়া পাড়ের একটি ছায়াময় বিকেলে, তপ্ত এক দুপুরে একটি তালপাখার খোঁজে। কিন্তু আমরা জানি না আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম নিজের দেশে ফিরবে কি না। তাই হয়তো এই পরবাসেই আমরা ওদের জন্য গড়ে চলি ছোট কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশ।

ছবি: লেখক