নিখোঁজ সংবাদ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘‘কবে কোথায় আকাশের কোন তারাটা খসে পড়ে কেউ কি দেখে, নাকি খবর পায়??? আমার মুখোবই থেকেও এভাবে কত মুখ খসে গেছে জানতেও পারিনি। দীর্ঘদিন কারো অনুপস্থিতি দেখে কখনও ইনবক্স করি,’ কোথায় হারিয়ে গেলে?’ কোনো উত্তর নাই।যেন বরফ শীতল চ্যাটবক্স। বুকের কোথায় নাদেখা সেই ভ্যার্চুয়াল বন্ধুটির জন্য ক্ষরণ হয়। আর দেখা হতো প্রায়ই এমন বন্ধুটির জন্যও প্রাণটা হু হু করে ওঠে।
ছোট্ট শহর হবিগঞ্জ। একই পাড়ার ছেলে। হুমায়ুন কবির।কথা হতোনা তেমন।শুধু একে অপরকে দেখা।তখন দুজন দুই শহরে। তবুও যুবক আমাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠায়। গ্রহণ করি আমিও।মাঝে মাঝে কুশলাদি জানতে চায়। মন চাইলে উত্তর দেই আবার কখনও নীরবই থাকি। কোন খবর রাখিনা। একদিন জানতে পারলাম বেশ অনেকদিন আগে হার্টঅ্যাটাক করে সে চলে গেছে বহুদূর।মন খারাপ হয়।চ্যাটবক্সে গিয়ে দেখি বিভিন্ন সময় সে আমাকে অনেক কিছু জানতে চেয়ে লিখেছিলো।আমি দেখিইনি। সেজন্য আজও কষ্ট পাওয়ায় চেয়ে নিজেকে বড়ো বেশী অপরাধী লাগে। কবি জয়দেব বসু। কলকাতার কবি। আমার মুখোবই চালনা করার শুরুর দিকের বন্ধু। দেখা হয়নি কখনও।ছোট ছোট বাক্যে দুজনের কথা বিনিময় হতো ইনবক্সে। তাও দীর্ঘদিন পরপর। একদিন দেখলাম একজন লিখেছে, ‘দাদা একবছর হলো তুমি নেই আমার মাথায় যেনো বজ্রবিদ্যুত খেলে গেলো। মানুষটা নেইইই।হৃদয়টা কে যেনো চেপে ধরলো। এভাবেও মানুষ চলে যেতে পারে??? হৃদয় ক্ষরণ থামাতে অনেক দিন লেগেছিলো।
এক সকালে ঘুম থেকে ওঠে জানতে পারি ভোরের কাগজের টিপু ভাই আর নেই। আমাদের প্রিয় টিপু ভাই। কত রসেবসে আমরা একসঙ্গে অফিসে সময় কাটিয়েছি।ভাবতে পারছিলাম না। মনের মেঘ চোখে গড়ালো।মেনে নিতে হলো। এখনও মাঝে মাঝে টিপু ভাইয়ের চ্যাটবক্সে সবুজ আলো জ্বলতে দেখি। ভাবি টিপু ভাই কি তারাদের রাজ্য থেকে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন??? জানলাম ভাবী এখন এই মুখোবইটা চালান।ভালোই হলো অন্তত টিপু ভাইয়ের প্রতি জন্মদিনে তাকে শুভেচছাটুকু জানাতে পারি।
দীলিপ চক্রবর্তী। আমাদের মঞ্চের দাদা। নাটকের দাদা। কতো কথা। কতো জোক। একসঙ্গে ঘোরা। আরও কতো প্ল্যান তাকে নিয়ে। কিন্তু কোনো কথা না রেখেই একদিন দুম করে পাড়ি জমালেন সীমার ভেতর অসীমে। বোকা হয়ে গেলাম।যেনো বোধবুদ্ধি লোপ পেলো। ঠিক শুনলাম তো? ঠিক ঠিক ঠিক। মনের মেঘ এবার আর বৃষ্টি হয়ে ঝরে না। এযে বড়ো বেদনার। তাইতো আজও ভুলতে পারিনা দাদাকে।কেনো চলে গেলে তুমি দাদা???
তাজিন চলে যাওয়ার আগের  রাত ৪টা পর্যন্ত চ্যাটবাক্সে কথা হয়েছে।লাস্ট মেসেজটা করেছিলো পরদিন সকাল ১০.৩০ এ।ওদিন বিকেলই ক্লিনিকে গিয়ে ওর নিথর শরীরটা দেখতে পেলাম। খলবল করে কথাবলা মেয়েটা আর কোনো দিন কথা বলবেনাভাবা যায়নি সেদিন। চোখে কুয়াশা জমে।হাত দিয়ে আড়াল করি।
চলে যাবে, চলে যাবে রাজেশ্বরী। হঠাৎই পৃথিবীর হাতটা ছেড়ে দেয়। জানতাম! তবুও আজও কি মেনে নিতে পেরেছি?
কলকাতা বন্ধু রাজ বসু। কতো কথা তার সঙ্গে। আমার পত্রিকায় লেখা দেবো দেবো করেও দেয় না। তার কথা, ‘ দিদি আমি তো লিখতে পারিনা আমাদের কবি বন্ধু রহিমা আক্তার মুন্নির বুকের ধন মেয়েটা সুইসাইড করলো।রাজ আমার কাছ থেকে জেনে খুব কষ্ট পায়। বলে, ‘দিদি তোমার বন্ধুকে বলো কলকাতায়ও একজন ওর জন্য কষ্ট পাচ্ছে।মাস দুইতিন রাজও মুখোবইতে অনুপস্থিত। ভাবলাম খবর নেই।চ্যাটবক্সে পাঠিয়ে দিলামকোথায় হারিয়ে গেলে? কোনো উত্তর নেই। ওর টাইমলাইনে গিয়ে দেখলাম ১০ ডিসেম্বরও স্ট্যাটাস দিয়েছে। তাহলে??? ওর এক বন্ধুর লেখা থেকে কিছুটা আঁচ করতে পারলোও বিশ্বাস করতে চাইনি। পরে সেই বন্ধুই জানালো ১০ জানুয়ারি রাতে হার্টঅ্যাটাক করে আমাদের হাতটি ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। দেখা হয়নি কখনও ওর সঙ্গে। আর দেখা হবেওনা। 
হৃদয়ে মেঘ জমে জমে বরফ হয়ে গেছে।জানিনা হয়তো যেদিন তোমাদের প্রতিবেশী হবো সেদিন শিলাবৃষ্টি হবে সেই অচিনপুরে।সেইদিন পর্যন্ত ভালো থেকো তোমরা সবাই অন্য ভূবন আলো করে।’’ আবিদা নাসরীন কলি

আমার মুখোবইতে গেলো সপ্তাহে এই স্ট্যাটাসটা দিয়ে নিজেই ভাবলাম আমার মতো সবার জীবনেই এমন অধ্যায় আছে। আর সেই ভাবনা থেকেই প্রাণের বাংলার লেখকদের কাছ থেকে তাদের জীবনের সেইসব কাহিনী জানতে চাই।ওরা জানায়।আকাশের তারা হয়ে যাওয়া সেইসব মুখোবই বন্ধুদের নিয়েই আমাদের এবারের প্রচ্ছদ আয়োজননিখোঁজ সংবাদ।

 

ইনবক্সে ভালবাসা নিয়ে বসে আছে প্রিয় বন্ধুটি

স্বরূপ সোহান (লেখক)

মানুষের নাকি এখন দুটো লাইফ। রিয়েল লাইফ তো আছেই, জুটেছে এখন ইনবক্স লাইফ। ছোট ছোট মেসেজে ভরা মায়ার অন্তজাল এই ইনবক্স। অজস্র ইনবক্স আমাদের । একেকটা ইনবক্স যেনো একেকটা গল্প। সুখ-দু্ঃখ হাসি-কান্না ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে এসব ইনবক্সে। পুরোনো চিঠির মতো কখনো এই ইনবক্স হানা দেয় মনের গভীরে। আজ যার সঙ্গে আনন্দ বেদনা ভাগ হচ্ছে, তার ইনবক্স থাকে সবার উপরে। কাল সেখানে হয়তো নতুন কেউ। গতদিনের ইনবক্সটি নেমে গেল একধাপ। পরেরদিন হয়তো আরো কয়েকধাপ। আর এভাবেই হয়তো সেদিনের ইনবক্স নামতে নামতে হারিয়ে যায়। নতুন বন্ধুর ,কাছের বন্ধুর ইনবক্স শুধু ঘুরে বেড়ায় দৃষ্টিসীমায়।

এরপর কোন একদিন। কোন একদিন মনে পড়ে যায় সেই ইনবক্সের কথা। কেমন আছে সেই প্রিয় মানুষটি। খোঁজ , খোঁজ । নাম লিখে খুঁজে পাওয়া আবার। চোখ বুলানো সেই আনন্দ বেদনার কাব্যে । মনে হয় যেনো পুরনো চিঠি। চোখের কোণ ভিজে ওঠে কখনো, কখনো বা ঠোঁটের হাসি। ইনবক্সের কোণায় চোখ চলে যায়। সবুজ বাতিটা জ্বলছে তো? কাছে আছে তো সে এতদিন পর।

সবাই কি কাছে থাকে? না, কেউ কেউ হারিয়ে যায় । পড়ে থাকে ইনবক্সে তার সঙ্গে ভাগ করে নেয়া আনন্দ বেদনা। ইনবক্সটি তখন শুধুই যেনো স্মৃতির খামে ভরা একটি পুরনো চিঠি।

এরকমই চিঠি পড়ছিলাম সেদিন দুপুরে। বাইরে তখন অবিরাম বর্ষন। বর্ষায় ভেসে যাচ্ছে প্রিয় শহর। যে শহরে আমরা বেড়ে উঠেছি, যে শহরে আমরা ছুটে বেরিয়েছি, বন্ধুত্ব, হাসি, গান যে শহরটায় আমাদের তারুন্যকে ঝলমলে করে রাঙ্গিয়ে দিয়েছে,আজ সেই শহরে বসেই আমি পড়ছি আর ভাবছি আমার এই প্রিয় মানুষের ইনবক্স যেনো বৃষ্টির আধার নয় রোদ ঝলমলে হয়ে উঠেছে।

 মেহেরুন রুনি। প্রিয় বন্ধু আমার। আমরা সাংবাদিকতা করতাম মধ্য নব্বইতে ভোরের কাগজে। সঞ্জীব চৌধুরী সম্পাদিত মেলা পাতায় নিয়মিত ছিলাম আমরা। তারুন্যে ভরপুর ওই সমযটায় কত আড্ডা, হাসি, গান। সাগর সারোয়ার তখন ওই ভোরের কাগজেই আমাদের অগ্রজ। এরপর কালের নিয়মে আমাদের কাজের পথ ভিন্ন হয়েছে। আমার কর্পোরেট ব্যস্ত জীবনে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হিসাবে এলো ফেসবুক। ইনবক্সই তখন একমাত্র ভরসা যোগাযোগের। এটিএন এর ব্যস্ত সাংবাদিক তখন সে। আর রুনির জীবনসঙ্গী সাগর ভাই তখন কর্মসূত্রে জার্মানীতে। ইনবক্সে রুনির ডাকটা ছিলো অদ্ভুত। দোস্তোওওও… বলে চীৎকার একটা। আর আমিও। যেখানেই থাকি যেভাবেই থাকি বন্ধুর এই ডাক কি উপেক্ষা করা যায়। কত যে গল্প। ক্যারিয়ার, সংসার, সন্তানের ভবিষ্যত থেকে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা।এই শহরেই বসবাস আমাদের।দেখা হতো কম। ইনবক্সই সব। এরপর তো রুনির জার্মানি যাওয়া। প্রবাসী জীবনে রুনি আরো ছটফটে। ইনবক্সে কতো প্ল্যান। ক্যারিয়ার, সাগর ভাই আর ওর সন্তান মেঘ। মেঘ বাংলা শিখছে না, জার্মান ভাষায় কথা বলে, সে কি টেনশন। আমি কেনো লেখা ছেড়ে দিলাম। বই পড়া হচ্ছে না। এতো দৌড়াচ্ছি কেন আমরা? এসবই ছিলো ইনবক্সে।এক সময় জার্মানী থেকে ফিরে এলো ওরা। রুনি যথারীতি আবার এটিএন এ। দুর্দান্ত সব রিপোর্টিং শুরু করলো। আর সাগর ভাই কাজ শুরু করলেন মাছরাঙ্গা টিভিতে । এর মাঝে একদিন দেখাও হলো কারওয়ান বাজারের দিকে। খুব তাড়াহুড়ায় ছিলো রুনি। আমারও ব্যাংকের তাড়া। শুধু চীৎকার করে বললো, ‘দোস্ত , ইনবক্সে করো, জরুরী কথা আছে।’ যথারীতি আমি ভুলে গেলাম।ভুললো না রুনি। পরেরদিনই সন্ধ্যায় ইনবক্সে আবার দোস্ত বলে ডাক। সাড়া দিলাম। ইনবক্সে তখন ওর টেনশন ঝরে পড়ছে। রুনি সাগর ভাইয়ের একমাত্র সন্তান মেঘের স্কুল নিয়ে। ‘দোস্ত, মেঘের স্কুল নিয়ে আমি একদম সন্তুষ্ট না। তুমি একটা ভাল স্কুলের খোঁজ দাও। যেখানে ক্লাসে কম বাচ্চাকে যত্ন নিয়ে পড়াবে’। আমি আমার ছেলের স্কুলের নাম বললাম। বাইরের স্কুল। কিন্ত সমস্যা হলো স্কুল তো উত্তরাতে। রুনিরা তো রাজাবাজার। অনেক দুর। কিন্তু আমার বন্ধু তো নাছোরবান্দা। মেঘের স্কুল সে বদলাবেই। বললো, উত্তরায় আমার বাসার কাছেই বাসা নিয়ে চলে আসবে। আমি যেনো বাসা খুঁজে দিই। কথা দিলাম। বাসা, মেঘের স্কুল সবই ব্যবস্থা করবো। হলো না। মাত্র সাতদিন। এই সাতদিনে আর দোস্ত বলে ইনবক্সে ডাক দেয়নি রুনি। হয়তো ব্যস্ত ছিলো কাজ, সংসার নিয়ে।আমিও ওর ইনবক্সে ঢুকিনি। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে এই সাতদিনে কথা হয়েছে। আর সেকারণেই রুনির ইনবক্সটি নেমে গিয়েছে কয়েকধাপ। সেই যে নেমে যাওয়া, প্রিয় আমার এই বন্ধুটির ইনবক্স আর উঠে আসেনি আমার দৃষ্টিসীমায়। রুনির অস্বাভাবিক মৃত্যু, নৃশংস হত্যা, সাগর-রুনীর এই অমীমাংসিত উপাখ্যান সবই কিন্তু ইনবক্সের বাইরে। রিয়েল লাইফে। ইনবক্সে সেই গল্প নেই।

 কী অদ্ভুত। রিয়েল লাইফে রুনি নেই। অথচ শত শত ইনবক্সের অতল গহ্বর থেকে খুঁজে পাওয়া রুনির ইনবক্স আজো কতো প্রানবন্ত। পড়ি আর চোখ দুটো ভিজে ওঠে। আছে তো, আমার প্রিয় বন্ধুটি ইনবক্সে ভালবাসা নিয়ে বসে আছে। ইনবক্সের বাইরে হয়তো সবুজ বাতিটি আর কোনদিন জ্বলবে না।তাতে কি? ইনবক্সের ভিতরে তার সেই ভালবাসার ডাকটি যে রয়ে গেছে, ‘দোস্তওওও আছো তো?’

বুক চিড়ে বেড়িয়ে এসেছিল  ‘ আহারে!’

শেখ রানা (গীতিকার, লেখক)

আমি গীতিকার। তবু একটু একটু করে অনেক দিন ধরে একটা অ্যালবাম শেষ করলাম। ২০১৪ এর দিকে রিলিজ ও হলো নস্টালজিকের অ্যালবামটা। ব্লগে এই নামেই লিখতাম। সেই সুত্রে অন্তর্জালে পরিচিতি ছিল আমার। কিন্তু গান বাঁধা বা গাওয়া? একেবারেই না!

 তাই অনেক উৎকণ্ঠা শেষে গানগুলো নিয়ে একজন দুইজন করে যখন ইনবক্সে জানাতে শুরু করলো অনুভূতির কথামালা- আমি আনন্দিত হতাম। জানতে চাইতাম কোন গান ভালো লাগলো, কোন লিরিক! এরকম খুব কম মানুষের একজন ছিলো খোকন। আশরাফুল খোকন।  রংপুরের দিকে থাকতো। আমাদের কথা হয়েছে খুব কম। কিন্তু নস্টালজিকের পেজ বা আমার ইনবক্সে ওর বিনয়ী অভিব্যাক্তি আমার খুবই ভালো লাগতো। সত্য স্বীকার করি, শুরুতে আমিও ভেবেছিলাম যে অনেক মানুষ আমাদের গান শুনবে। আদতে তা হয়নি। খুব কম সংখ্যক মানুষ আমাদের গান পছন্দ করেছে। কিন্তু তারা আমার লিরিকের মনোযোগী শ্রোতা হয়েছে। এ রকম শ্রোতাদের সঙ্গে আনন্দময় আলাপচারিতা শেষে আমি আত্মবিশ্বাসী হয়েছিলাম। কম গান করবো, কম মানুষ শুনুক। কিন্তু এই মানুষগুলো আমার লিরিক আর নস্টালজিকের গানের সঙ্গে থাকুক। খোকন তাদের মধ্যে বিশেষ একজন ছিলো।

 এক সপ্তাহ আগেও কথা হয়েছিলো? মনে পড়ে না। নস্টালজিকের গান নিয়েই ওর ভাবনা জানিয়েছিলো। তার

কিছুদিন পরেই জানতে পারি মোটর বাইক দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছে খোকন। আত্মায় এসে লেগেছিলো সেই দুঃখ। কোনোদিন দেখা হয়নি, অত্থচ বুক চিড়ে বেড়িয়ে এসেছিল-‘ আহারে!’

 তাজিন এর সঙ্গে আমার সামনাসামনি পরিচয় দেশ ছেড়ে বেড়িয়ে পরার ঠিক একদিন আগে। কলাবাগানে এক ফাস্ট ফুডের দোকানে ওর ফোন পেয়ে গিয়েছিলাম। পরদিন সকালেই ফ্লাইট। তাড়াহুড়ো ছিলো। তবু সেই অস্থির আলাপে আমাদের স্থির বন্ধুত্ব হয়েছিলো।

 বিলেতে চলে আসি। কিন্তু যোগাযোগ চলতে থাকে। তখন আমি ফেসবুকে খুব অনিয়মিত। ফোনে কথা হতো মাঝে মাঝে। নাটক আর গান নিয়ে বিস্তর আলোচনা। দেশে ফিরে কাজ করবো সেই ফিরিস্তি। অথচ আমি তখন আদতে কোথাও ছিলাম না। তাজিনও কি তাই? জানা হবে না কোনোদিন।

 দেশে ফিরে আমি স্থির হই। কিন্তু তাজিন যেন আর একটু অস্থির হয়ে যায়। বন্ধুত্বে অভিমান আর ভুল বুঝাবুঝি হয়। বহুদিন যোগাযোগ ছিন্ন হয়। হঠাৎ একদিন ফোন দিয়ে একাত্তর টিভির এক অনুষ্ঠানে যেতে বলে। যেন সেই আগের মতো সব ঠিকই ছিলো, ঠিকই আছে।

 ফেসবুকে শেষ দিকে ওর বাবাকে নিয়ে বুক হু হু করা স্ট্যাটাস দিতো। আমি পড়তাম। ওই টুকুই। আমি বিলেতে চলে আসি। সময়ের ব্যবধানে। আবারও বহুদিন যোগাযোগ থাকে না। হঠাৎ নাম মনে করতে না পারা একজনের টাইম লাইনে গিয়ে জানতে পারি তাজিন মারা গেছে। আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। এ কী সম্ভব! কিভাবে সম্ভব! আতিপাতি করে  সবার টাইমলাইন ঘুরে ঘুরে নিশ্চিত হই। এতো কষ্ট পেয়েছিলাম সেই দুপুরবেলায়! মনে আছে, রাজশাহী বি আই টি-তে পড়ার সময় আমার রুমে বিভিন্ন পত্রিকার প্রচ্ছদ সাঁটা ছিলো। তার একটা ছিলো আনন্দভুবন এর এক সংখ্যার প্রচ্ছদ। তাজিন ডং শিরোনামে তাজিন এর অপূর্ব সুন্দর একটা ছবি। এখনও চোখে ভাসে। আমি মনে মনে ওকে খুঁজি। সেই প্রচ্ছদের তাজিনকে। আনন্দভূবন এর এক দিনে।

মেঘমালায় মিশে যাওয়া প্রিয় মানুষগুলো

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী

জীবন মানে আর কিছু নয়, জীবন তো উৎসব- ফেইসবুকে এটাই ছিলো ওর শেষ স্ট্যাটাস। আমার বড় আপা রাজেশ্বরী প্রিয়রঞ্জিনী। আমার অভিভাবক, আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। আমার জীবন জুড়ে তার স্নেহময় সান্নিধ্য। লেখালেখি, ছবি আঁকা আর গানের মাঝে ডুবে থাকা মেয়েটি জীবনকে উৎসব ভাবতো বৈকি! হাসি আর আনন্দে ভরিয়ে রাখতে জানতো এ বিশ্বভুবন। বন্ধুবৎসল ছিলো বলেই বোধহয় ফেইসবুক ওর খুব প্রিয় ছিলো। আমি ওর পোস্টে মজা করে কিছু লিখলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে খিলখিল করে হেসে উঠতো। সামনে থাকলে বলতাম, বড় আপা, তুই কিন্তু এখন ফেইসবুকে ঢুকবিনা! প্রতিদিন দেখা হোক বা না হোক ফোনে, ইনবক্সে রোজই আমাদের কথা হতো। ভালোলাগা কোনো চিত্রকর্মের ছবি অথবা প্রিয় কোনো গান শুনলে একে অন্যকে পাঠানো হতো। হাসিঠাট্টার জন্য আমাদের কোনো স্থান কাল পাত্র উপলক্ষ দরকার হতো না। ফেইসবুক ওয়াল জুড়ে ওর আনন্দময়ী মুখ আর জীবনের উৎসব উদযাপনের আড়ালে পড়ে থাকতো জীবন আর ক্যান্সারের সঙ্গে এক অবিরাম লড়াইয়ের গল্প। কলকাতা ওর প্রাণের শহর। সেখানেই ওর চিকিৎসা চলছিলো। ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তে কলকাতা গেলো। সেবারে দিল্লী-পাঞ্জাবেও গিয়েছিলো। ওর ছবির প্রদর্শনী হবার কথা। কলকাতায় নিয়মিত চেকআপের পর কিছু সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাজ এগিয়ে নেবার কথা। এসবই ফোনে আর ইনবক্সে জানতে পারছিলাম। বাঁধ সাধলো অসুখটা। চিকিৎসক জানালেন তৃতীয় অপারেশনের জন্য তৈরি হতে। সাহসী মেয়েটা একলা এক দূরের শহরে। অপারেশনের দুইদিন দিন পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমাদের কথা হতে লাগলো ইনবক্সে। মার্চের ৩ তারিখ জানালো যে, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেতে আরো দিন দশেক লাগবে। আমি বললাম তুমি আরো কয়েকদিন থাকো। খানিক দুষ্টুমিও করলাম একে অন্যের সঙ্গে। তার মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে হাসিতে জ্বলজ্বল করা আমার বড় আপাটা আচমকা দপ করে নিভে গেলো। নিভে গেলো সবটুকু আলো। অগুনতি বন্ধুর জন্য রেখে গেলো ভুবনমোহিনী হাসিমুখের ছবি আর ক্ষুদ্র এ জীবনের উৎসবকে প্রাণভরে উদযাপনের বারতা।

শিল্পী আলী আকবর। প্রিয় বন্ধু আকবর ভাই। তরতাজা তরুণ প্রাণ আকবর ভাই। কখনো দেশে কখনো আমেরিকায় – যেখানেই থাকতো ছবি আঁকা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। ব্যক্তিজীবনের পাওয়া না পাওয়ার বেদনা কার না থাকে! মিষ্টি হাসি আর শিল্পকর্ম দিয়ে ঢাকা এমন গভীর কোনো দুঃখবোধ ওরও হয়তো ছিলো! সারাহ’র মতো অসাধারণ জীবনসঙ্গী পেয়েও, দু’জনে ভালো বন্ধু আর গগন নামের অসম্ভব মায়াভরা এক দেবশিশুর বাবা-মা হয়েও কোথায় কেন এতো অভিমান পুষে রাখা ছিলো তা কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি। বেশ কয়েক বছর ধরে দেখা না হলেও ফেইসবুকে যোগাযোগ ছিলো। দেশে বা দেশের বাইরে থেকে ওর নতুন ছবির কথা বলতে, প্রদর্শনীতে আমন্ত্রণ জানাতে কখনো ভুল হতো না। গগনের সঙ্গে ওর ছবি দেখতে ভালোবাসতাম বলে প্রায়ই আলাদা করে ওদের ছবি পাঠাতো। আমার বড় আপা রাজেশ্বরী চলে যাবার পর আকবর ভাই খুব মনে করতো ওর কথা। ১৮ জানুয়ারী , ২০১৮ শিল্পী আলী আকবর, মনখোলা এক বন্ধু আকবর ভাইয়ের নীরবে চলে যাবার খবরটা ফেইসবুকেই পাই। এখন আর পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে আকবর ভাই যখন তখন নতুন ছবি এঁকে ট্যাগ করেনা। গগনের ছবিও পাই না। কোলাহল ছেড়ে মেঘমালায় মিশে যাওয়া প্রিয় মানুষগুলো এখন কেবল এক অপার্থিব নিস্তব্ধ অনুভব।

বাবার বয়সী লোকটি প্রায়ই আমাকে বিরক্ত করতো

শামীমা জামান (লেখক)

লোকটির নাম আমি বলছিনা। যেহেতু কথা প্রসঙ্গে কিছু নেতিবাচক কথা চলে আসবে। আর তিনি মিডিয়ার মানুষের কাছে পরিচিত।হাই প্রোফাইল।বিষয় সেটিও নয়।তার পরিবারের সদস্যদের বিব্রত করার কোন দরকার দেখছিনা। তো বেশ কয়েক বছর আগে তিনি আমাকে ফেসবুকে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠান। ফেসবুকে অচেনা পুরুষের ব্যাপারে আমার নিয়ম হলো প্রথমত সে আমার কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা।হলেও মানুষ হিসেবে ইতিবাচক মনোভাবের কিনা। চেহারায় অভদ্রতা নেইতো ? জঙ্গীবাদকে লালন করে নাতো ? এরকম কয়েকটা ব্যাপার মিলে গেলে কখনো কখনো অপরিচিত মানুষকে গ্রহণ করি। লোকটি ছিলো বাবার বয়সী। চেহারা গেট আপে বঙ্গবন্ধু লুক। কলপ করা কালো কুচকুচে চুল,গোঁফ। জাতীয় পর্যায়ের চলচিত্র পুরস্কার সহ অসংখ্য কমিটির প্রতিষ্ঠাতা। নায়ক রাজ্জাকের মত মানুষদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যাই হোক মুরুব্বীকে ঝুলিয়ে রাখা অহমিকার প্রকাশ হবে ভেবে রিকুয়েস্ট কনফার্ম করলাম। (যদিও এরপর থেকে যত বড় হাই প্রোফাইল মুরুব্বী  হোন ঝুলেই থাকেন) ব্যাস।এরপর মুরুব্বী ঝপ করে ইনবক্সে আসেন’ হাই’ ।হ্যালো। প্রথম দিন একটা থাম্বসআপ দিলাম ভদ্রতার খাতিরে। এরপর দেখি আমি যখনই নিজের ছবি আপলোড করি আর মুরুব্বী ঝুপ করে ইনবক্সে এসে আমার রূপের গুণগান করেন। দশ লাইন লেখার পরও উত্তর না দিলে তিনি আমার লেখার গুণগান করেন। এই পর্যায়ে ভদ্রতার খাতিরে ধন্যবাদ শব্দটা লিখে বিদায় হই। উনি দেখি লিখতেই থাকেন। তো যাইহোক আমার তো ঘন ঘন ছবি আপলোড করা রোগ আছে। আর উনিও কমেন্টে প্রশংসা না করে ইনবক্সে ‘তুমি খুব সুন্দর’ টাইপ বাক্য লিখে যান । আমি সিন না করার ভান করি। কিন্তু উনি আসেন।উনার বানী রেখে চলে যান । কখনো বা কোনো লিংক সেন্ড করেন। একদিন কোন কারনে বেশ ফুরফুরে মুডে ছিলাম। উনি কেমন আছেন লিখলে আমি হঠাৎ কিছু না ভেবে উত্তর দেই ‘জি ভাল।আপনি ভাল আছেন?’’ এরপর দেখি উনি লেখেন ‘আমাকে তুমি করে বলবে।’ সঙ্গে সঙ্গে আমি ইনবক্স থেকে বের হয়ে নিজেকে গালি দেই, ‘কেন কথার উত্তর দিতে গেলি গাধার মত।’ আমাকে তুমি করে বলবে ।মানেকি? মুরুব্বী একটা মানুষকে কেন তুমি করে বলবো। এর তো মতলব ভালনা। পিওর আলুর দোষে দুস্ট বুড়োহাবরা। গোঁফে তিনবেলা কলপ দেয়া মানুষগুলো সব এরকমই।একে কি আনফ্রেন্ড করবো নাকি ব্লক? ব্লক হলে রিং পরাবো নাকি ওপেন হার্ট করবো ।মানে ব্লকের আগে কটা উচিৎ কথা শুনায়ে দিবো না নীরব ব্লক? সিদ্ধান্ত নিলাম কিছু কঠিন কথা শুনিয়ে তারপর ব্লক করবো। এখন থাক। এরপর দিন দেখি লিখেছে ‘তুমি কি বিরক্ত?’

‘আমরা তো বন্ধু ,তাইনা?’ আরো কিছু পুতুপুতু কথা এবং আমার রুপের প্রশংসা করে লেখা কবিতা দেখে এমন মেজাজ খারাপ হলো যে, বর কে দেখিয়ে বললাম, ‘দেখ এইরকম একটা সম্মানীয় লোক মেয়েদের ইনবক্সে এসে হানা দেয়। আমাকে কি গায়ে পড়া লুতুপুতু লেখিকাদের মত ভাবছে সে’ ? যাইহোক ইনবক্সের রাগ বরবক্সের উপর ঝাড়লাম। আর মনে মনে ভাবলাম এই লোক কে আচ্ছামত কথা শুনিয়ে ব্লক করবো । কি লিখবো গুছিয়ে ভাবতে হবে ।এখন সময় নেই। কাল লিখবোক্ষণ।

    দু’দিন পর দেখি তার আইডিতে কেউ ট্যাগ করে তার নাম উল্লেখ করে  লিখেছে ‘অমুক ভাইয়ের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে … ।থ বনে গেলাম। কি অদ্ভুত  মানব জীবন!

শুধু মরে গিয়েই কেউ হারিয়ে যায় না

নুসরাত নাহিদ
লেখক

মুখোবই থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষ- এটা শুনলেই আমার মনে পড়ে সৈয়দ আলমগীর জাফর স্যারের কথা। SAJ বলতাম আমরা ক্লাসে। বিবিএ ফার্স্ট সেমিস্টারেই ওনাকে পেয়েছিলাম। ইন্ট্রোডাকশন টু বিজনেস নিয়েছিলেন। সেই ১৯৯৯ সালে মুখোবই ছিলো না। অনেক অনেক পরে উনাকে যখন খুঁজে পেলাম, তবে যুক্ত হতে আর দেরি করিনি। যুক্ত হবার পর থেকে ২০১৪ এর অক্টোবর পর্যন্ত রোজ ওনার পোস্ট পড়ে হাসতে হাসতে চোখ চিকচিক করে ওঠেনি, এমনটা হয়নি। তখন হা হা, ভালোবাসা কিংবা কান্নার ইমো ছিলো না। এক লাইক অপশনই ছিলো। আর খুব কম মানুষ এই প্রযুক্তিতে সংযুক্ত ছিলো বলে যত্ন করে মন্তব্যও করা হতো। এরপর হঠাৎই একদিন দেখলাম উনি নেই। চলে গেছেন। মুখোবই সম্ভবত তখনো রিমেম্বারিং প্রথা চালু করেনি। লেগাসী অ্যাকাউন্ট তো এলো আরও পরে। এখন স্যারের দেয়ালে গেলেই যত্ন করে রিমেম্বারিং লেখা দেখা যায়। কেউ একজন প্রতি বছর ১৫ জুন ওনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে যান। আমি দেখি। মন কাঁদে। স্যার কী কখনো জানবেননা উনার এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ ছাত্রী উনাকে কতোটা খুঁজে বেড়ায়?

আমাদের ব্যাচেরই একজন ছিলো মাসুম। রাঁধতে এবং খেতে খুবই পছন্দ করতো। ঝিঙে কিংবা খিরা দিয়ে ইলিশ মাছ রাঁধতো দারুণ। ওর পোস্ট দেখেই জিভে জল। রান্না সংক্রান্ত নানান গ্রুপে সক্রিয় ছিলো খুব। এক রাতে দেখলাম নানা পদের রান্না চলছে, হেঁশেল থেকে ছবি পোস্ট করেছে। সেই মাসুমই পরদিন ভোরে নাই হয়ে গেলো হার্ট অ্যাটাকে। এখনো ওর আইডি ঘুরেফিরে সামনে আসে। ব্যাচেরই কেউ না কেউ বন্ধু হারাবার আর্তনাদে ভেসে যায়। কখনো কথা হয়নি, দেখাও না, তবুও মাঝে মাঝে ওর আইডিটি ভেসে এলে মনে হয় কী হতো আরও অনেক অনেক বছর এভাবেই রেঁধেবেড়ে খেয়ে গেলে?

 ইনবক্স এক বিভীষিকা- এ কথা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানে। তবু ন্যুনতম ভদ্রতার খাতিরে ইনবক্স অনিয়মিত হলেও দেখা হয়, এমন কী ঈদ, পালা পার্বণে, নববর্ষে যে গণবার্তা আসে সেগুলিও যত্ন নিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে উত্তর দেই। এমন বিশেষ দিনে কেউ মনে রেখে বার্তা পাঠিয়েছেন, এই কৃতজ্ঞতাবোধে ন্যুজ হই। এমন কী আগের এক বন্ধু (এখন ভীষণ শত্রু) যখন বলতো কেন ইনবক্সে উত্তর দিই, সমবয়সী ছেলেরা এ নিয়ে মুখরোচক গল্প ছড়ায়, তখনও উত্তর দিতাম, যতটুকুন না দিলেই নয়, ততোটুকুন। ভাবটা এই যে তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন? কাজেই ইনবক্সে যথা সময়ে বার্তার প্রত্যুত্তর না নিয়েই কেউ হারিয়ে গেছে, এমন কোন দুঃখবোধ নেই। শুরুটা করেছিলাম মুখোবই থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষ নিয়ে। আগে বন্ধু, এখন শত্রু থেকে মনে পড়লো, শুধু মরে গিয়েই কেউ হারিয়ে যায় না, দিব্যি বেঁচেবর্তে থেকেও হারিয়ে যায়, জীবন্মৃত হয়ে। কারণ তার থাকা না থাকায় আর কিছু যায় আসেনা। সে ব্লকড, চিরতরে, মুখোবই থেকে, জীবন থেকে। তখন কোন এক সময় জীবনে প্রবেশাধিকার দিয়েছিলাম বলে যেমন আফসোস হয়, তার চেয়ে বহুগুণ স্বস্তি হয় এই ভেবে যে সেই অযাচিত মানুষগুলির এই প্রাণে আর কোন স্থানই আর নেই, তারা মৃত।

জীবনটা ক্ষনিকের

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

গত বছরের এক সকালে খবর আসলো বন্ধু সঞ্জয় মারা গেছে।কিভাবে? সে আত্মহত্যা করেছে(অথবা হত্যা?)। সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সঞ্জয় আমাদের সঙ্গে স্কুলে পড়েছে। তারপর আর খুব একটা দেখা বা কথা হয়নি।যাই হোক, সারাদিন বেশ কিছু ফোন, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সঞ্জয়কে নিয়ে নানা রকম কথা বার্তা, তার মৃত্যু নিয়ে আমাদের বিচার-বিশ্লেষণ, কিছুটা মৌখিক শোক এসব দিয়েই সময় কেটে গেলো। যেহেতু খুব কাছের বন্ধু ছিলো না, তাই শোক পালন বা সামাজিকতার বাধ্যবাধকতায় শোক দেখানোর মতো প্রয়োজনীয়তাও ছিলো না। আমি বা আমরা স্বাভাবিক জীবন যাপনের রুটিনেই চলছিলাম যে যার মতো। ঝামেলা হলো তখনই, যখন আমি আবিষ্কার করলাম, ফেসবুকে বন্ধুদের গ্রুপে সঞ্জয়ের মৃত্যু নিয়ে আমার লেখা একটা পোস্টে, সঞ্জয় নিজেই ‘লাইক’ দিয়েছে। বিষয়টা শুধু অস্বস্তিকর তাই না, ভয়েরও। ওর প্রোফাইলে গেলাম। মৃত্যুর একদিন আগেও তার হাসিমাখা মুখের ছবি। মনে পড়লো আসলেই তো, যখনই দেখা হতো তখনই হাসিমুখ ছাড়া কথা বলেনি। কি মিষ্টি ব্যবহার! কেমন যেন অনুশোচনাও তৈরি হচ্ছিলো মনের মধ্যে। কেন কথা বলতাম না? কেন খোঁজ খবর নিতাম না? কেন ধরেই নিয়েছিলাম যে কোন দিন দেখা তো হবেই? এ রকম আরো কত বন্ধু আছে যাদের কোন খবর রাখিনা দিনের পর দিন? এ রকম আরো কত মানুষ আছে যারা আমাকে ভালোবাসে, বন্ধু ভাবে অথচ আমি নিয়মিত যোগাযোগ পর্যন্ত রাখিনা? নানা রকম চিন্তায় মনটা আচ্ছন্ন হয়ে থাকলো সারা রাত। যে সঞ্জয়ের জন্য কোনো শোক পালন করিনি, এখন তার চিন্তাই কুরে কুরে খেতে লাগলো। কেন আমরা ধরেই নেই যে আমি আগামীকাল বেঁচে থাকবো। কেন আমরা ধরেই নেই যে, আমাদের পরিচিতরাও আজীবন বেঁচেই থাকবে? আর যখন বেঁচে থাকে তখন আমরা খবর নেই না। কি অদ্ভুত আমাদের স্বভাব! তো বলছিলাম, সঞ্জয়ের ফেসবুক প্রোফাইলের কথা।একজন সদ্য মৃত মানুষ, তার মৃত্যুকে নিয়ে লেখায় নিজেই ‘লাইক’ দিয়েছে। মৃত্যুর পরেও একজন মানুষের প্রোফাইল কেমন হয় দেখতে? যতবার চেক করার জন্য তার প্রোফাইলে ঢুকছি, ততোবারই কেমন যেন শিরশিরে একটা অনুভূতি হচ্ছিলো। ভাবলাম ডিলিট করে দেই চিরতরে। আবার একটা অপরাধবোধ কাজ করছে, মরে গেছে বলে কি একেবারে স্মৃতি মুছে ফেলতে হবে? যাই হোক, পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি সঞ্জয়ের ছোট ভাই তার আইডি চালাতো। আমিও পরে সত্যিই ডিলিট করে দিয়েছি সঞ্জয়ের ফেসবুক আইডিটা। বাস্তব জীবনেই যখন বন্ধুর অস্তিত্ব নেই, ভার্চুয়াল জগতে রেখে কি হবে? কিন্তু, একটা সত্যি অস্বীকার করার উপায় নেই, এই ফেসবুকেই প্রতিদিন যত ভার্চুয়াল বন্ধুর সঙ্গে ভাবের আদান প্রদান হয়, বাস্তব জীবনের পরিচিত অনেক মানুষ, বন্ধু, এক সময়ের পথচলার সাথীদের আমরা সেই গুরুত্বটা দেই না। জীবনটা ক্ষণিকের, এই মহাসত্য কে পাশ কাটিয়ে আমরা সত্যিই কি খুব ভালো আছি?

কাভার ছবি:ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনীর ফেইসবুক থেকে, আর ভেতরের ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]