নিখোঁজ হয়েছিলেন আগাথা ক্রিস্টিও

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা গল্প লেখক আগাথা ক্রিস্টি ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর, শুক্রবার রাত সাড়ে ন’টায় তার প্রিয় আর্মচেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, সিঁড়ি বেয়ে মেয়ে রোজালিণ্ডের ঘরে গেলেন। মেয়ের কপালে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে, ‘শুভরাত্রি’ বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন নিজের প্রিয় গাড়ি মরিস কাউলিতে চড়ে। তার পরের দু’দিন আর বাড়ি ফিরলেন না তিনি। শুরু হলো রহস্য গল্পের স্রষ্টার অন্তর্ধান রহস্য।

ভদ্রমহিলা তখন থাকেন ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারে। তাঁর সেই আকস্মিক অন্তর্ধানে নড়েচড়ে বসলো সাহিত্যমহল, পুলিশ, পাঠক। কোথায় গেলেন ক্রিস্টি?

গোয়েন্দা গল্পের পাঠকের কাছে আগাথা ক্রিস্টি এক অনন্য নাম। তাঁর গোয়েন্দা চরিত্র এরকুল পয়রো পৃথিবীর গোয়েন্দা গল্পের ইতিহাসে শার্লক হোমসের সমানে সমান হয়ে লড়াই করছে এখনো। কিন্তু সেই আগাথা ক্রিস্টি নিজেই যখন বাস্তব জীবনে রহস্যের কেন্দ্র হয়ে উঠলেন তখন সে রহস্য সমাধানে ডাক পড়েছিলো গোয়েন্দা সাহিত্যের আরেক অমর চরিত্র শার্লক হোমসের স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের।

সেই রহস্যময় ঘটনাটি নিয়ে এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘নিখোঁজ হয়েছিলেন আগাথা ক্রিস্টিও।’   

কেউ কেউ বলল গোটা ঘটনাটি নিছকই একটি পাবলিসিটি স্টান্ট। আগাথা ক্রিস্টি ইচ্ছাকৃতভাবে গা ঢাকা দিয়েছেন, যাতে করে তার পরের বই সব রেকর্ড ভাঙতে পারে। শুধু তাই নয় বাজারে গুজব ছড়ালো, স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন আগাথা ক্রিস্টি। আগাথার সঙ্গে স্বামীর সম্পর্ক তখন ভালো যাচ্ছিল না। তাঁর স্বামী তখন নিয়মিত এক রক্ষিতার কাছে যাতায়েত করছেন। এই খোঁজাখুঁজি এক নাটকীয় মোড়ে এসে দাঁড়ালো যখন পুলিশ গিল্ডফোর্ডের নিউল্যান্ডস কর্নারের কাছে একটি জায়গায় পরিত্যক্ত অবস্থায় খুঁজে পেলো আগাথা ক্রিস্টির মরিস কাউলি গাড়িটি। সেখানেই ছিলো সাইলেন্ট পুল নামে একটি ঝর্ণা। সবাই ‘দুয়ে দুয়ে চার’ মিলিয়ে নিলেন। সাংবাদিকরা উৎসাহী হয়ে পত্রিকায় লিখলেন- ‘ঝর্ণায় আত্মহত্যার সম্ভাবনা রহস্য লেখক আগাথা ক্রিস্টির।’ নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় খবরটি প্রকাশিত হলো।বৃটেনের প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা আঁতকে উঠলেন খবর পড়ে। হাজারখানেক পুলিশ নিয়োজিত হলো আগাথাকে খুঁজে বের করার জন্য। অজস্র ভক্ত-অনুরাগীরাও ঘর ছেড়ে রাস্তায় নামল প্রিয় লেখিকার খোঁজ করতে। ইতিহাসে প্রথমবার কোনো লেখিকাকে খুঁজতে উড়োজাহাজ অবধি ব্যবহৃত হল। ব্রিটেনের তৎকালীন হোম সেক্রেটারি উইলিয়াম জনসন হিকস পুলিশবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন- লেখিকাকে যেভাবে হোক খুঁজে বের করতে হবে। কেউ কেউ বললেন, জাদুকর হ্যারি হুডিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চয় খুঁজে দিতেন আগাথাকে কিন্তু সেবছরই অক্টোবরে মারা গেছেন হুডিনি। অতএব সে আশাও আর নেই। শেষে ডেকে আনা হলো স্যার আর্থার কোনান ডয়েলকে। শার্লক হোমস তখন সারা ব্রিটেন জুড়ে এক নম্বর গোয়েন্দা। গল্পের চরিত্র হলেও সবাই মনে করতো হোমসের হাতেই আছে সব রহস্য সমাধানের চাবি। হোম সেক্রেটারির আশা স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের অপরাধ বিষয়ে অগাধ জ্ঞান রয়েছে। তাঁর বই পড়ানো হচ্ছে স্কটল্যাণ্ড ইয়র্ডের পুলিশ-গোয়েন্দা বিভাগে। হোমস স্রষ্টা তাঁর অগাধ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে খুঁজে দেবেন আগাথা ক্রিস্টিকে। শুধু তাই নয় আর্থারকে সাহায্য করার জন্য ডাক পড়লো লর্ড পিটার উইমসি সিরিজের রচয়িতা ডরোথি সেয়ার্সেরও।

আগাথার গাড়ি শেষবারের মতো যেখানে পাওয়া গিয়েছিলো ডরোথি সেখান থেকে তদন্ত শুরু করলেন কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলেন না। এদিকে স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের গুপ্তবিদ্যার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। তাঁর স্ত্রী প্ল্যানচেট ,গুপ্তবিদ্যা, যাদু এসব করতেন। আর্থার কোনান ডয়েল রহস্য সমাধানের জন্য অতিপ্রাকৃত শক্তির সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করলেন। আগাথা ক্রিস্টির ব্যবহৃত একজোড়া পুরনো গ্লাভস নিয়ে তিনি হাজির হলেন স্বনামধন্য এক গুপ্তবিদ্যা বিশারদের কাছে।

তিনি আশা করেছিলেন, ওই তান্ত্রিক লেখিকার সন্ধান বাতলে দেবেন অবশ্যই। কিন্তু তিনিও ব্যর্থ হলেন। হোমসের স্রষ্টার এটাই ছিলো একমাত্র কেস যেখানে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। অবশেষে নিখোঁজের ১১ দিন পর ১৪ ডিসেম্বর খোঁজ মিলল আগাথা ক্রিস্টির। তাকে নিরাপদে, সুস্থ শরীরেই পাওয়া গেল হ্যারোগেটের একটি হোটেল থেকে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় সেই হোটেলে আগাথা ‘থেরেসা নিল’ নামটি ব্যবহার করে থাকছিলেন। আর এই ‘থেরেসা নিল’ ছিলেন আগাথার স্বামীর রক্ষিতার নাম!

আগাথা বাড়ি ফিরলেন। মনোনিবেশ করলেন লেখালেখিতে কিন্তু এই ১১ দিন ঠিক কী হয়েছিল আগাথার, আর কেনই বা তিনি রাতের অন্ধকারে সেদিন বেরিয়েছিলেন সে ব্যাপারে মুখ খুললেন না আর। তাঁর একটাই কথা ছিল- “এই এগারো দিন আমি কি করেছি কোথায় থেকেছি আমি কিছুই মনে করতে পারছি না।”

আগাথা ক্রিস্টির জীবনী লেখক অ্যান্ড্রু নরম্যান লিখছেন-“ ওই এগারো দিন আগাথা মানসিক সম্মোহনে ভুগছিলেন। বড় ধরনের কোনো মানসিক আঘাত বা বিষণ্নতার কারণে তাঁর ওই কদিনের স্মৃতিবিলোপ হয় অথবা কেউ তাঁকে বশীকরণ করেছিলেন নাহলে তাঁর স্মৃতি ফেরা কার্যত অসম্ভব ছিল।” ওই হোটেলের মালিক জানান, “আগাথা ক্রিস্টি ওই এগারো দিন এমন কিছুই করেননি, যাতে করে তাকে সেখানে বেমানান মনে হয়। তিনি নিয়মিতই বল ডান্স এবং পাম কোর্টে অংশ নিচ্ছিলেন। কেউই তাকে দেখে চিনতে পারছিলো না যে তিনিই সেই হারিয়ে যাওয়া বিখ্যাত লেখিকা। শেষে হোটেলের এক ব্যাঞ্জো বাদক বব ট্যাপিন, আগাথাকে চিনে ফেলেন ও পুলিশে খবর দেন। পুলিশ খবরটা জানায় আগাথার স্বামী কলোনেল ক্রিস্টিকে। কলোনেল ফিরিয়ে নিয়ে যান আগাথাকে। ” অন্যদিকে আগাথা ফেরার পর পুলিশ অনেক কিছু বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।যাতে লেখা হয়- “নিজ বাড়ি ছেড়ে লণ্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন আগাথা ক্রিস্টি। মাঝপথে তার গাড়ি দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয় এবং খাদে পড়ে যায়। তখন তিনি একটি ট্রেন ধরে হ্যারোগেটে চলে যান। সেখানে গিয়ে ওঠেন সোয়ান হাইড্রো নামের হোটেলে। হোটেলের এক কর্মীর সহায়তায় পুলিশ খুঁজে পায় আগাথাকে।”

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]