নিন্দুকেরে বাসিলাম আমি ভালো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

আগেও বলেছি এখনো বলি এবং এই বলাতে আমার কোন দ্বিধা নাই যে আমার গানের জগতে আমি সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখেছি নিজের গা বাঁচিয়ে কিন্তু কারো আগেপিছে আমি কখনোই ছিলাম না।এতে আপাতদৃষ্টিতে আমাকে স্বার্থপর মনে হলেও এটাই মনে হয় নিরপেক্ষ অবস্থান। যাদের সঙ্গে সারাক্ষণ কাজ করেছি,প্রতিদিনই দেখা হয়েছে, তাদের বিপদে পাশে ঠিকই থেকেছি কিন্তু কারো সঙ্গেই আমার গলায় গলায় ভাব কখনওই ছিলো না কারণ এই জগতের মানুষদের পোশাক আশাক, জেশ্চার পশ্চার, আড্ডাবাজি, বাড়ি ফেরার সময় কিছুই আমার সঙ্গে যেতো না। অনেকেই অথবা সবাই আমার পিছনে আমার পোশাক নিয়ে কথা বলতো।আমার হাজব্যান্ড সারাটা ক্ষন আমার সঙ্গে থাকতেন তাই বিশেষ করে কিছু সাংবাদিক বলতেন এই শিল্পী অনেক দূর যেতো কিন্তু এই লোকের সারাক্ষণ পিছু লেগে থাকার জন্য অনেক কিছুই হচ্ছেনা, হবেও না।

আমি ভাবতাম গান তো হচ্ছে! নব্বই দশক বা দুইহাজার দশ বিশ পর্যন্ত আমার মতো একচেটিয়া এতো গান কেউ কি আর গেয়েছে।প্লেব্যাক, (কম হলেও) অডিও জগত,মঞ্চানুষ্ঠান,বিদেশ বিভুইয়ে আমি এতো নিয়মিত ছিলাম যে এরচেয়ে আর বেশি কিছু হয়না। সেই সময়ে গানের জন্য, চলচ্চিত্রের গানের জন্য প্রতিটি উল্লেখযোগ্য শাখায় আমি নিয়মিত পুরস্কার পেয়ে চলেছি। তারপর ও নিন্দা গাওয়া যাদের অভ্যাস তা তারা করবেই। একদিন আমাদের একজন সহশিল্পীর স্ত্রী আমাকে বললো আরেকদিন বুলবুল ভাইয়ের বাসায় আপনাকে নিয়ে অনেক কথা হচ্ছিলো। আমি কান দেইনা! সে বলেই চলেছে যে তারা শুধু কথা বলছিলো না তারা হাসাহাসি ও করছিলো।এবার আমার রাগ হলো। জিজ্ঞেস করলাম আমি কি জোকার, আমাকে নিয়ে হাসির কি হলো? এবার সে উৎসাহ পেয়ে বললো তারা বলছিলো আপনি নাকি খুব ব্যাকডেইটেড!

আপনার ব্লাউজ এর কাটিং, আপনার শাড়ি নির্বাচন, আমার চুলের স্টাইল, চুলের রঙ সবই খুব হাস্যকর। আপনি তো অনেক টাকা ইনকাম করেন কিন্তু আপনি না চুলে রঙ করেন না একটা ভালো শাড়ি পরেন না আপনার হাতের ব্যাগ ফ্যাশনেবল। আমি দম নিলাম। যে বলছিলো তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম তুমি সত্যি কথা বলছো তো? সে বললো জী আপা।সেখানে কে কে ছিলো? সে বললো বড় বড় তিনজন শিল্পী ছাড়াও আরও কয়েকজন উঠতি শিল্পীও ছিলো। এবার আমি উত্তর দিলাম। বললাম তাদের যেয়ে বলবে বাংলাদেশের উঁচু সারির শিল্পী হয়েও যারা গান ছাড়া আরও অন্য রকম প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে ভাবে,নিজে শিল্পী হয়ে অন্য শিল্পীর পোশাক নিয়ে হাসি-তামাশা করে, সামান্য ফ্যাশন স্টেটমেন্ট নিয়ে পড়ে থাকে তাদের আমি অবলীলায় করুনা করি।এই ধরনের পিছুকথা তারাই বলে যাদের কোন কাজ নেই।

স্বামীর পয়সায় খেয়ে, শুয়ে, বসে অলস সময় কাটিয়ে স্টার জলসা দেখে সময় কাটায় যারা, তারা এগুলো গসিপ করলে মানায়।কিন্তু দেশের একটা ইম্পর্টেন্ট স্থানে অধিষ্ঠিত হয়ে যারা সামান্য জামাকাপড় এর গল্প, মানুষের নিন্দা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না তারা তো আসলে নিজের সম্মানিত স্থানকে কুলষিত করছে। যারা এ কথা গুলো বলছে তাদেরকে আমার কথা গুলো বলবে।সে এবার লজ্জিত হয়ে বলে আমি কেন এগুলো বলবো! আমি বললাম তুমি না হয় শুনেছো আমার বদনাম, কিন্তু আমাকে বলার দায়িত্ব তোমাকে কে দিলো!আর যখন বলেই ফেলেছো এখন তোমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে আমার কথা বয়ে নিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া তাইনা! সে বলে আপা,এখন আমি বুঝতে পারলাম সত্যিই আপনাকে এ কথাগুলো বলা উচিত হয়নি। সত্যিই আমি এই সমালোচকদের ধন্যবাদ জানাই যে তারা এমন কথা বলে আমাকে আরও আমার মতো করে থাকতে সাহায্য করেছে।

একটা মানুষ বিশেষ করে মহিলা মানুষ যারা এই জামাকাপড়, চুল, আইল্যশ,রঙ্গিন লেন্স,আঁকানো ভ্রু, জুতা ব্যাগের বাইরে নিজেদের নিতেই পারেনা তাদের জন্য আমি অবলীলায় করুণা বোধ করি। খুব মায়া হয় তাদের ভাবনার অগভীরতা দেখে।সারাক্ষণ পার্লার, দামী শাড়ি দামী গহনার জন্য তাদের কতই না ভাবতে হয়,খাটুনি করতে হয়,পয়সা খরচ করতে হয়। শুধু কি তাই! কে কি পরলো,কয়বার পরলো,সেগুলো কোথা থেকে কিনেছে, তারচেয়ে ভালো কিছু আবিস্কার করে কেনাকাটা করে নিজেকে মানিয়ে নেয়া কি চাট্টিখানি কথা! অথচ আমার কতো আরাম! আল্লাহর দেয়া চুল চোখ হাতপা নিয়ে আমাকে কখনো ভাবতেই হয়নি।আমি খুব নিশ্চিন্তে গান নিয়ে ভাবার বাড়তি সময় পেয়েছি। আমার আত্মাকে নিয়ে, আমার সংসার নিয়ে ভাবার অনাবিল সময় পেয়েছি। আমি খুব বিরল সৌভাগ্যবানদের একজন যে কিনা সমানতালে তার ঘর এবং গান সামাল দেয়ার সময় ও শক্তি পেয়েছে। সেটা আমার জন্য কতই না ভালো হয়েছে।

প্রথম থেকেই আমার ভাবনা ছিলো যে, যতই পেশা নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যাস্ত থাকি ব্যাস্ততা শেষ হলে এই সংসারেই আমাকে থিতু হতে হবে।সারাজীবন ক্যারিয়ারে সময় দিয়ে যখন সেই জগতে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে তখন সংসার, স্বামী সন্তান যদি আমাকে ফেরত না নেয়? তখন কোথায় যাবো! আমার এই নিগুঢ় ভাবনা আজ আমায় পারিবারিক, সামাজিক ভাবে কি সম্মানিত জীবন এনে দিয়েছে তা আজ সারা পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী মানুষ জানে।কনকচাঁপার গান যদিও কারো ভালো না লাগে কিন্তু তারা ঠিকই কনকচাঁপার জীবনযাপন, জীবনযাত্রার ধরন কে পছন্দ করেন, সমীহ করেন। আমার এই গোছানো জীবনের জন্য এইসব সমালোচকদের উপর আমি কৃতজ্ঞ।তারা আমাকে উল্টো পথে হলেও সাহায্য করেছেন। আজ আমি সুন্দর সাজানো গোছানো জীবন যাপন করছি যা কিনা এই মিডিয়া জগতে অনেকের জন্য কল্পনা মাত্র। ভালোবাসি আমার জীবনে নানাভাবে জড়িয়ে থাকা সবাইকে।আর সব কিছুর জন্য স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতা। আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box