নিভৃতচারী এক মানুষের গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল হোসেন

প্রাণোচ্ছ্বল কৈশোরের চঞ্চল উদ্দামতা সারাক্ষণ তাড়া করে ফেরে তাকে। বয়স মাত্র আট। যেমন পড়ায় আগ্রহ তেমনি খেলায়। পাঠ্য বই শুধু নয়, অন্য বই পেলে যেনো আরো ডুবে থাকা তার মাঝে। সমান উদ্দামতায় যতিহীন ছুটে বেড়ায় সে খেলার মাঠে। তখনো এতো রকম খেলাধুলার চল আসে নাই ঢাকার মাঠে মাঠে। ফুটবল নিয়েই চলতো ছেলেপুলেদের যতো দাপাদাপি। তুমুল কিশোরের সবই করা চাই, সবই পড়া চাই, সবই জানা চাই, খেলা চাই, সখ্য চাই।দীর্ঘ দু’শ বছরের পরাধীনতার শিকল ছিন্ন করে দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে। নতুন করে সবকিছু গড়ে তোলবার এক কর্মযজ্ঞ জোর পেতে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের গুরুত্ব মর্যাদা দুইই বাড়তে শুরু করেছে। নগর সভ্যতার এক নতুন মাত্রার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে ঢাকায়। নবজাগরণ প্রত্যাশী ঢাকা তথা গোটা দেশের মানুষ আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তির সমান্তরালে অসন্তোষের হেতুগুলো আবিষ্কার করতে শুরু করেছে। আপন ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারাকে প্রাণবান এবং গতিশীল রাখবার প্রয়োজনটা আপামর সবার কাছেই অপরিসীম হয়ে ধরা দিচ্ছে।

এমন একটা পরিবেশে কিশোরটি বেড়ে উঠছিলো সাহিত্য সংস্কৃতির আঙ্গিনায় সাগ্রহ পদচারণায় আর খেলাধুলায় মগ্ন সময় কাটিয়ে। খেলাধুলা বা অন্য সব কিছুর চাইতে সাহিত্য সংস্কৃতি ক্রমান্বয়ে তাকে টানতে থাকে অধিক। স্কুল টিমের গোলকিপিং করার চাইতে নানান বইপত্র ম্যাগাজিন পত্রিকা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা আর পড়ায় অদম্য আগ্রহ পাল্লায় ভারি হয়ে ওঠে। কোথাও নতুন কিছুর সন্ধান পেলেই ছোঁক ছোঁক করে সেখানে সে হাজির। কি লেখা, কে লিখলো, কি আঙ্গিকে তা বিন্যাসিত হলো, কেমন নান্দনিক হলো প্রকাশনাটা এগুলো যেনো তার মাথার ভিতর ঘুরপাক খেতে শুরু করে কৈশোর থেকেই।

ছেলে ও নাতি নাতনির সঙ্গে

দেশ বিভাগের পরের বছর তার সঙ্গে পরিচয় ও সখ্য গড়ে উঠলো ঢাকায় নতুন আসা আর এক কিশোরের সঙ্গে। তখন কারোই জানা ছিলোনা যে এক সময়ে এ দুই কিশোর হয়ে উঠবেন এদেশে সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের দুই বটবৃক্ষ। সখ্য ছড়াতে শুরু করলো ডালপালা, আর সেখানে জড়ো হতে শুরু করলো অনাগত দিনের তাবৎ প্রথিতযশারা। এদের সবার মধ্যেও কিশোরটি যেনো একটু বেশি অন্য রকম। নতুন কিছু পড়তে পথে-প্রান্তরে, দোকানে-বাজারে, বুকস্টলে, যে কোনো জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে পড়ে যখন তখন।

স্কুলের গণ্ডী যখন শেষ সেই সময় থেকেই তার চোখ যেনো হয়ে উঠতে থাকে জহুরী। সদ্য তারুণ্যে টগবগ করা সেই সন্ধানী চোখের রাডারে অনায়াসে ধরা পড়ে ভালো বই, ভালো লেখা ও লেখক, ভালো মানুষ। সবকিছুর মাঝে প্রকাশনার ঢঙ, বৈচিত্র, বিন্যাস তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিচার্য বিষয়। ঢাকার বইয়ে শুধু তেষ্টা মেটে না, তাই সুযোগ পেলেই কলকাতা থেকে আনাতে শুরু করলেন বই, ম্যাগাজিন। সে সময়টাতে তার প্রিয় হয়ে ওঠে ‘সচিত্র ভারত’ ম্যাগাজিনটি। মুগ্ধ হয়ে পড়েন দেখেন, পাতা ওল্টান আর কি যেনো ভাবেন। মনের মধ্যে ডালপালা মেলতে শুরু করে একটা নজর কাড়া নান্দনিক প্রকাশনার স্বপ্ন। সেই ইচ্ছে সাধের গোড়ায় পানি দিতে দিতে দিনে দিনে ক্রমশ মজবুত করে তুলতে থাকলেন অন্তর্গত ভাবনাটাকে।

খুব বেশি দিন তর সইলো না। নটর ডেম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ছেন যখন তখনই নেশাটা বাস্তবায়নের জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। মামার একখানা প্রেস ছিল, নাম ‘করিম প্রিন্টিং’। সেখানে খোঁজ-খবর চললো স্বপ্ন বাস্তবায়নের খরচ পাতি কি হবে, কেমন হবে এসবের। চিন্তা ভাবনা চললো কি কাগজে, কি ডিজাইন নকশায় ছাপা হবে সেসব নিয়েও। সন্ধানী জহুরী চোখ, আর তরুণের ভালো লাগা ‘সচিত্র ভারত’ এ দুয়ের প্রভাবেই বুঝি স্থির হলো মনকাড়া এক নাম ‘সচিত্র সন্ধানী’। নাছোড় সেই তরুণের পাশে আছে কৈশোরের বন্ধু আনিসুজ্জামান। সেই সঙ্গে একে একে জুটে গেলো উদগ্রীব আরো কয় বন্ধু। আতাউস সামাদ, হুমায়ুন খান, রহিম চৌধুরী, শরফুদ্দিন আহমেদ প্রমূখ।

সন্ধানীর পাতা থেকে

প্রকাশনার খরচ সম্পর্কে জেনে চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে পড়লো সবাই। এতো টাকার জোগান দেবে কে! তবু দমে যাবার কোনো কারণ থাকেনা তরুণের। নিজ বাসায় দুটা রুম পত্রিকা অফিস বানিয়ে শুরু হয়ে যায় কাজকর্ম। সাত আটজন বন্ধু মিলে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে মাঠে নেমে পড়া হলো পূর্ণদ্যোমে। কেউ সম্পাদনা, কেউ ব্যবস্থাপনা; তবে ঘুরে ফিরে মূল দায়-দায়িত্ব তার নিজের কাঁধেই।

অর্থ সংগ্রহ করাটাই তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুরু হলো আত্মীয় পরিজন শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ। দিন শেষে রোজই দেখা যায় ফলাফল বড় নগন্য। সারা দিনের খাটা খাটুনির তুলনায় বড়ই যৎসামান্য। সেই সময়টায় সিনেমা হল ভাড়া নিয়ে তহবিল সংগ্রহ করবার একটা চল নতুন চালু হয়েছে। সেটাই করবে মনস্থির করে নেমে পড়লেন তরুণের দল। একজন সিনেমা পরিবেশকের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হলো ‘রূপমহল’ নামের সিনেমা হলটি। ঘোড়ার গাড়ীতে করে এক এক দিন এক এক জন বের হয় প্রচারণার মাইকিং করতেন। তিল তিল করে এগিয়ে যেতে থাকে তরুণেরা স্বপ্ন সাফল্যের লক্ষ্য গন্তব্যের দিকে।

অবশেষে ১৯৫৬ সালের ২৩ জুন, প্রকাশিত হলো স্বপ্নদ্রষ্টা এক তরুণ সম্পাদকের পত্রিকার প্রথম সংখ্যা। মাত্র সতেরো বছর বয়সী, উদ্যমী একদল তরুণের নেতা এই ছেলেটিরই নাম গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ।

কাইয়ুম চৌধুরী                  শওকত ওসমান

পেপারব্যাক বইয়ের সাইজ অর্থাৎ ১/১৬ ডিডি মাপে ৩২-৪৮ পৃষ্ঠার আনকোরা নতুন ধরণের এ পত্রিকাটির প্রথম সাহসী প্রকাশনা ছিল ১০০০ কপির। রাতভর উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে ছাপা, বাঁধাই সব মন মতোন হলো কিনা দেখভাল করে প্রথম প্রকাশনার স্বপ্নটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি খুব স্বাভাবিক ভাবেই একটা চিন্তা ছিল ওটার পাঠক প্রতিক্রিয়া আর কাটতি নিয়ে। সব চিন্তা ভাবনার অবসান ঘটিয়ে পরদিন সকালে বুক স্টলে আর পত্রিকার স্ট্যাণ্ডে পৌঁছাতে যা দেরি; সকাল দশটার মধ্যে শেষ হয়ে গেলো পুরো ১০০০ কপি। স্বপ্ন সাফল্যের অগ্রযাত্রার সেই শুরু।

রম্য লেখা আর কার্টুন ধাঁচে শুরু করা ‘সচিত্র সন্ধানী’ সম্পাদক প্রকাশক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ এবং তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনা পারিষদের কল্যাণে সঙ্গত কারণেই ম্যাগাজিনটি সহসা হয়ে উঠলো বাঙালির কৃষ্টি-ঐতিহ্যের ধারক বাহক প্রতিভূ। ডিজাইন, মেক আপ, ইলাস্ট্রেশন, কনটেন্ট সব মিলিয়ে মাত করা ম্যাগাজিনটা তখন এই তরুণদের প্রাণ, দলনেতা গাজী শাহাবুদ্দিনের প্রথম প্রেম।

কাজের চাপ বাড়তে থাকলো। সেটুকু সামাল দিতে বন্ধুর বাসায় পড়বার নাম করে চলতো পত্রিকার কাজ। নটর ডেম কলেজটা আবার খুব কড়াকড়ির, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে এদিক সেদিক করবার যো নেই। পত্রিকার কাজ সামাল দেবার বাড়তি সময় জোটাতে তাই ওই কলেজ ছেড়ে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হলেন সম্পাদক। দিনে দিনে বাড়তে থাকলো পত্রিকার কাটতি, ব্যাপ্তি, যশ; বাড়তে থাকলো গাজী শাহাবুদ্দিনের পরিচিতি, সখ্য আর ভালোবাসার সংযোগ জাল।

প্রথম পর্বে ১৯৬৬ পর্যন্ত দশ বছর প্রকাশের পর বন্ধ হয়ে যায় এর প্রকাশনা। কিন্তু পত্রিকা অফিসটার সত্যিকারের কোনো ইতি ঘটেনা। ছেদ পড়েনা একে ঘিরে অদম্য উদ্দীপনার এক ঝাঁক তরুণের বন্ধুত্ব বুননে। আপাদমস্তক বন্ধু বৎসল, উদার ও পরপোকারী গাজী শাহাবুদ্দিনের বটবৃক্ষের বিস্তারে বৃদ্ধিও থামে না একটুও। একে একে দেশের সব স্বনামধন্য মানুষদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠবার পাশাপাশি তাঁর ডেরা হয়ে ওঠে বহু মানুষের নির্ভরতার ঠিকানা।

শামসুর রাহমান                 সৈয়দ শামসুল হক

নেপথ্যচারী, প্রচারবিমুখ এ মানুষটি কখনোই পাদপ্রদীপের আলোর নীচে আসতে আগ্রহী তো দূর, সম্মতই ছিলেন না। অথচ নিজে শুরু থেকেই হয়ে উঠছিলেন সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক বাতিঘর। তার সান্নিধ্যে যে সৃষ্টিশীল মানুষটি একবার এসেছে, সে ই তার বৃত্তে অনায়াস ও স্থায়ী বৃত্তাবদ্ধ হয়েছে। অগ্রজ অনুজ সমবয়সী সব বন্ধু বান্ধব স্বজনই এ রীতির ভিতর পড়েছেন। তাই এদেশের খুব কম সাহিত্য সংস্কৃতিমনা মানুষই আছেন যিনি এ বৃত্তের বাইরে অবস্থান করেন। এমন কি এর পরিধি ঢাকা বা বাংলাদেশ ছাড়িয়ে কোলকাতা পর্যন্ত ছড়িয়েছে অনায়াসে।

সাগরময় ঘোষের মতোন প্রবাদপ্রতিম মানুষ, জনপ্রিয় শক্তিমান সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সঙ্গীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীর মতোন কিংবদন্তী মানুষ কিংবা সে সময়ের তরুণ লেখক সমরেশ মজুমদার – এঁদের মতোন অনেকেরই ঢাকার বাড়িটি ছিল গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ-এর বাড়ি। মানুষটা যাকেই একবার আপন করে নিয়েছেন তাকে জীবন ভর বুক খুলে দিয়েই গেছেন তাঁর ভালবাসা ও সোনালী সখ্য।

আমাদের দেশের অগুন্তি মানুষ তাঁর এ ভালোবাসার আলিঙ্গনাবদ্ধ ও অনুরাগসিক্ত হয়েছেন আজীবন। এক সময় বাংলাদেশের প্রখর তারুণ্যের প্রতীক ত্রিদিব দস্তিদার এর এক উজ্জ্বল প্রমাণ। যাকে তিনি সারা জীবন অবারিত বুকে ভালোবাসা প্রশ্রয় আশ্রয় দিয়ে গেছেন বটবৃক্ষের মতোন। এমন কি ত্রিদিব যখন অকালে মারা গেলেন তখন শেষকৃত্যের সমস্ত আয়োজনটুকুও তিনি করেছিলেন নিজের সরাসরি তত্বাবধানে। জীবনভর করেই গেছেন অন্যের জন্য, অন্য কেউ তার জন্য কিছু করবে সে সুযোগ এক অর্থে তিনি তেমন রাখেন নি। ক্বচিৎ কদাচিৎ কাছের বন্ধু সাইয়িদ আতিকুল্লাহ বা এমন এক আধ জন কিছু সুযোগ হয়তো পেয়েছিলেন তার সচিত্র সন্ধানী সাপ্তাহিকী এবং সন্ধানী প্রকাশনীর দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কিছু অবদান বা ভূমিকা রাখবার।

সাইয়িদ আতীকুল্লাহ

এক দশক সময়কালের প্রকাশনার প্রথম পর্ব শেষে এক দশক সময় বিরতির পর ১৯৭৭ সালে আবার শুরু হয় সাপ্তাহিক ‘সচিত্র সন্ধানী’র দ্বিতীয় পর্ব। এ পর্বে এটা প্রকাশিত হয় দুই দশক। তারপর ১৯৯৬ সালে এর প্রকাশনা আবার বন্ধ হয়। এর পর আর প্রকাশিত না হলেও একটা অফিস সব সময়ই সংগ্রহশালা হিসেবে এবং সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর সম্মিলনের দরোজা হিসেবে খোলা ছিল সব সময়। এমনটা সম্ভব হয়েছিলো তাঁর ব্যতিক্রমী ভাবনা ও দর্শনের কারণেই।
দুই পর্ব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রায় সব প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিমনা মানুষের প্রকাশের সেরা মঞ্চ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছে সচিত্র সন্ধানী। এ তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এমন কাউকে খুঁজে বের করাটাই বরং কঠিন। সাহিত্য সংস্কৃতির একনিষ্ঠ ধারক বাহক হতে হলে একটা প্রকাশনার যা হওয়া উচিৎ, যেটুকু কাজ করা উচিৎ ‘সচিত্র সন্ধানী’ সে অবস্থানে ক্রিয়াশীল ছিলো সবার আগে, এক আশ্চর্য সম্পূর্ণতায়। শুধু লেখক কবি বা শিল্পীদের লেখা এবং সংবাদ প্রকাশের সংকীর্ণ গন্ডীতে তাঁর কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ ছিলনা কখনোই।

আনিসুজ্জামান, আতাউস সামাদ, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আলমগীর কবির, আনিস চৌধুরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হুমায়ুন খান, কাইয়ুম চৌধুরী, জহির রায়হান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, শওকত ওসমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, মফিদুল হক, জাহানারা ইমাম, লায়লা সামাদ, বেলাল চৌধুরী, অরুণাভ সরকার, রবিউল হুসাইন, সুশান্ত মজুমদার, শিহাব সরকার, ত্রিদিব দস্তিদার; নাম বলে শেষ করা যাবে না যাদের সৃষ্টিশীলতা প্রকাশের মঞ্চ হিসেবে কাজ করেনি সচিত্র সন্ধানী এবং গাজী শাহাবুদ্দিন-এর উদার প্রকাশ ব্যবস্থাপনা।

খালা জাহানারা ইমামকে সুহৃদ কাইয়ুম চৌধুরী সহ অনুরোধ করে করে লিখিয়ে নেন তাঁর সেই বিখ্যাত বই ‘একাত্তরের দিনগুলি’। প্রথমে ‘সচিত্র সন্ধানী’ সাপ্তাহিকীতে তা বেরোয় ধারাবাহিক ভাবে। পরে বই আকারে প্রকাশও ঘটে গাজী শাহাবুদ্দিনের হাত ধরেই। নিজ মৃত্যু শয্যায়ও শেষ দিকে একদিন তিনি যে অকস্মাৎ বলে উঠেছিলেন ‘পঞ্চাশ পঞ্চাশ’, তা কি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটির প্রক্রিয়াধীন পঞ্চাশতম প্রকাশনাকে ইঙ্গিত করেই কিনা! কে জানে!

শুধু কি এই একখানা বই-ই! এ তালিকায় আছে অসংখ্য লেখা, যা ধারাবাহিক ভাবে বেরিয়েছে সন্ধানীতে, পরে প্রকাশ পেয়েছে বই আকারে, তার হাতেই। অল্পস্বল্প নয়, অসংখ্য। সে তালিকায় আছে আবদুল মান্নান সৈয়দের বই, আবদুল গাফফার চৌধুরীর বই। আছে সৈয়দ হকের খেলারাম খেলে যা; জহির রায়হানের আরেক ফাগুন, শেষ বিকেলের মেয়ে, হাজার বছর ধরে। এমন অনেক বিখ্যাত লেখা, লেখক ও বই। বিভিন্ন ঘরানার মানুষকে তিনি হাজির করেছিলেন সচিত্র সন্ধানীর ছায়াতলে। সেখানে দীর্ঘ সময় ক্রেমোট আলী টিভি সমালোচনা লিখেছেন তাঁরই ভগ্নিপতি চিত্রালীর জনপ্রিয় ‘হাওয়া থেকে পাওয়া’ কলামের লেখক বিখ্যাত সাংবাদিক এটিএম হাই।

শুধু লেখা ছাপানো, বই প্রকাশ বা সচিত্র সন্ধানীতেই যে সীমাবদ্ধ ছিলনা তাঁর নান্দনিক প্রকাশের ব্যাপ্তি। তার প্রমাণ শুধু নয় পথিকৃত হিসেবে নানান অনুষ্ঠান, প্রণোদনা, স্মারক গ্রন্থ বা স্যুভেনির প্রকাশেও তিনি একের পর এক স্থাপন করে গেছেন মাইল ফলক। ঊনসত্তরের গণ আন্দোলনের উত্তুঙ্গ সময়ে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানকে পুরষ্কার প্রাপ্তির জন্য সম্বর্ধনার আয়োজন করেন তদানীন্তন হোটেল ইন্টারকন্টিনেটালে।  সে সময়ে এটা যে শুধু এক সম্ববর্ধনা অনুষ্ঠান, তা নয়। এটা ছিলো জাতীয়তাবোধের জাগরণের ঝাণ্ডা উঁচু করে তুলবার, সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার এক প্রয়াস। সে আয়োজনে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন ওই যুগে মোটা ম্যাট কাগজে অনিন্দ্য এক গেটআপ মেকাপ নিয়ে হাজির করা প্রকাশনাটি উপহার দিয়ে। সত্তুর দশকের মাঝামাঝি জহির রায়হানের অন্তর্ধান দিবসে আবারো তিনি আয়োজন করেছিলেন এক অনুষ্ঠান ও প্রকাশনা। ‘ওরা আমাদের মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ লেখায় সাজানো শেষ প্রচ্ছদ, লেট দেয়ার বি লাইট চলচ্চিত্রের অপ্রকাশিত দুর্লভ কিছু স্টিল ফটোগ্রাফি নিয়ে মোটা দামী কাগজের ইনার ফর্মায় এ প্রকাশনটিও সবাইকে নান্দনিকতার মুগ্ধতায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।

দর্শনীর বিনিময়ে প্রথম পদাবলীর কবিতা পাঠ অনুষ্ঠান হবে বৃটিশ কাউন্সিলে। সে অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করা কবির ছবি ও কবিতার সমন্বয়ে একখানা স্যুভেনির আর সেই সাথে ছোট আর একখানা স্যুভেনির ছাপা হবে। তাই নিয়ে তাঁর নানান চিন্তা ভাবনা। অনুষ্ঠানের আগের সারা রাতভর পঞ্চাশোর্ধ তরুণ গাজী শাহাবুদ্দিন জমিয়ে আড্ডা আলাপ চালালেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, বেলাল চৌধুরী, অরুণাভ সরকার, রবিউল হুসাইন প্রমুখ বাঘা বাঘা বন্ধু সংসর্গে।  লোকে দেখেছে সে প্রকাশনা আর চমৎকৃত হয়েছে।  নানান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে তার অবারিত আড্ডা আপ্যায়ন ছিলো আর এক অনন্য বিষয়, উদারতা ও বন্ধু বাৎসল্যের এক তুলনাহীন নজির, যা সারা জীবন তার মাঝে বিদ্যমান ছিলো।

আমরণ তারুণ্যের প্রতীক এ মানুষটার আচার আচরণ সারাটা জীবনই ছিলো এক ধাঁচের। নতুন বই পড়বার, দেখবার নেশাটা চাউর ছিলো সমান পাগলামিতে। মধ্য বয়সেও স্টেডিয়ামের লোহার গেট পেরিয়ে পানামা স্টুডিওর পাশের সিঁড়ি দিয়ে দোতালায় ছুটতেন খালেদ সাহেবের ‘ম্যারিয়েটা’য়। নিয়মিত অব্যহত ছিল তাঁর এ অভিযাত্রা। তাকে যে দেখতেই হবে নতুন কি এলো বই পত্তর আর তাতে কোথায় বসে কে কি লিখছে, নতুন কি ডিজাইন, মেকআপ, ইলাস্ট্রেশন কেমন দৃষ্টিনন্দন সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কে কোথায় হাজির করলো! তার এ নিয়মিত অভিযাত্রায় তিনি কখনো একা থাকতেন না। যেমন একা থাকতেন না তিনি জীবনে কোনো কাজেই। একা থাকার মানুষ যে তিনি নন। তাঁর সাথে ম্যারিয়েটায় যাওয়ার সঙ্গী থাকতেন নানান মানুষ। অগ্রজ, অনুজ, সমবয়সী কেউই বাদ নেই। অনুজরাই হয়তো থাকতেন বেশি। তবে শামসুর রাহমান বা অমন অনেক মধ্যবয়সী তরুণও প্রায়শই সঙ্গী হতেন তার সঙ্গে।

শুধু কি এসবই ! একুশে বই মেলায় পঁচাশি সালের আয়োজনে বাঙলা একাডেমি প্রাঙ্গনে সন্ধানী প্রকাশনীর স্টলটি অভিনবত্বে চমকে দিয়েছিলো সবাইকে। স্থাপত্যকলার এক নতুন ঘরানার প্রচলন করেন তিনি এখানেও। গতানুগতিক বইয়ের স্টলের ধারণাকে দুমড়ে দিয়ে কিভাবে খোলামেলা একটা স্টলে দর্শক অনায়াসে আসবে যাবে তার নতুন ধারণা এনে দেয় সেবছর সন্ধানীর স্টলটি।

নানা কারণে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মিলিয়ে এক দশক সচিত্র সন্ধানী প্রকাশ বন্ধ থাকলেও একাত্তরে সময়ের দাবী মিটিয়েছে তার অন্য এক সাপ্তাহিক প্রকাশনা। ‘এক্সপ্রেস’ নামে এ সাপ্তাহিকীটি গাজী শাহাবুদ্দিন প্রকাশ করেছিলেন জহির রায়হান, আলমগীর কবির, কাইয়ুম চৌধুরী, শফিক রেহমান, সৈয়দ শামসুল হক এঁদের সঙ্গে নিয়ে। যা হবার কথা তাঁর হাতের কোনো প্রকাশনার, তা ই হয়েছিলো ‘এক্সপ্রেস’-এর। ভীষণ রকম পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিলো তার স্বল্পায়ু এ সাপ্তাহকীটিও।

নব্বুই দশকের অর্ধেক পার করে সচিত্র সন্ধানী’র প্রকাশনা থেমে গেলেও সন্ধানী প্রকাশনী আর তাঁর ছাপাখানা ‘কথাকলি প্রিন্টার্স’ চালু থাকে। অনন্য সব প্রকাশনাও অব্যাহত থাকে। অব্যাহত থাকে তার উদার বন্ধুত্ব, সাহচর্য, শিল্প সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা। যার আলো থেকে বঞ্চিত হয়নি তার বৃত্তের ভেতরের কেউই। জনপ্রিয় লেখাগুলোকে আবারো পুরোনো পাঠকের পাশাপাশি নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং এক ধরণের আর্কাইভ তৈরী করবার চিন্তা থেকে তিনি প্রকাশ করেন নির্বাচিত সচিত্র সন্ধানী সংকলন। স্কয়ার গ্রুপ এ সমৃদ্ধ প্রকাশনাটির পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল।

নিভৃতচারী একটা জীবন ধরে তিনি করেই গেছেন অন্যের জন্য। তাঁর জন্যে কিছু করবার সুযোগ তিনি খুব কমই দিয়েছেন। সারাটা জীবনই এ রীতি বিদ্যমান ছিল। যেমন আমৃত্যুই বিদ্যমান ছিলো তার প্রচার বিমুখতা। পুরষ্কারের জন্য জীবন বৃত্তান্ত জমা দেবার প্রস্তাব তিনি নাকচ করে গেছেন যাবার আগে শেষের কর্কটাক্রান্ত দিনগুলোতেও।

তবু কথা থাকে। কোনো দেশের এবং সমাজের আপন সভ্যতা কৃষ্টি সাহিত্য সংস্কৃতিকে বিকশিত করবার জন্য পরিচর্যাকারীর ভূমিকায় রাষ্ট্রের মতোন মহীরুহ হয়ে দেখা দেন ক’জন মানুষ ! তাকে কি কিছু দেবার ক্ষমতা কারো সে অর্থে থাকে ! হয়তো থাকে না। না মানুষের, না রাষ্ট্রের। কিন্তু তার প্রোজ্জ্বল জীবনের বিলিয়ে যাওয়া আলোটুকুন ধরে রাখবার, প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেবার দায়টুকুন বাকীদের কাঁধে থেকেই যায়।

ছবিঃ সংগ্রহ

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]