নির্ঘুম শহরে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার কাছে শহরের অন্য নাম ছিলো ‘নির্ঘুম শহর’,স্লিপলেস সিটি। নিউইয়র্ক শহরকে নিয়ে কাব্য করেছিলেন কবি।আমেরিকায় গিয়ে লিখেছিলেন কবিতাটি। শহর কি সত্যিই ঘুমায় না? লোরকার যন্ত্রণা নিয়ে জেগে থাকে? স্ট্রিট লাইটের আলোয় জেগে থাকা শহরের চোখে ঘুম আসে না? দিনের আলোয় বাসিন্দাদের কলরোল তাকে ঘুমাতে দেয় না, তাকে ক্লান্ত করে কিন্তু বিশ্রাম দেয় না।

রাত ফুরিয়ে গেলে গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠে বাসের ইঞ্জিন, দাঁত ব্রাশ করতে করতে বের হয়ে আসে একটি মানুষ, রেস্তোরাঁর ভারি তাওয়ায় আচমকা জেগে ওঠে তেল, জাগরণের রাত্রিকে নাগপাশ ভেবে মেয়েটি হরিণীর মতো ত্রস্ত পায়ে হারিয়ে যান অন্য কোনো অন্ধকারের দিকে, তার তো আর আলোর প্রয়োজন নেই।

ভোরের মাঠ আড়মোড়া ভাঙে স্বাস্থ্যলোভী মানুষের ছুটন্ত শরীর দেখতে দেখতে, কোনো বাড়িতে হারমোনিয়ামের রীডে আঙুল ঘুরে যায় দ্রুত, রাস্তার মোড়ে এলিয়ে পড়ে থাকা পুলিশভ্যানে শেষ রাতের ঘুম তখনো ভাঙে না। শহর জেগে ওঠে।একটু পরেই পথে নামবে কর্মজীবী নারী ও পুরুষ। নিউইয়র্ক, টোকিও, কলকাতা, প্রাগ, লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন-শহর এমনি করে জেগে থাকে, জেগে ওঠে ঝিমুনি ভেঙে।

প্রতিদিন বিচিত্র গল্পের জায়গা এই শহর। শহর জুয়াড়ীর, শহর লম্পটের, শহর কবির, শহর দালালের, শহর অফিসযাত্রীর, শহর বেকারের, প্রেমিক-প্রেমিকার, গল্পলেখকের, সঙ্গীতশিল্পীর, ভিক্ষুকের। সব মিলেমিশে এক জগাখিচুড়ি গল্পের নায়ক অথবা নায়িকা এই শহর। শীত অথবা বর্ষায় শহরের গল্প সেই একটাই, অবিরাম বেঁচে থাকা।

শহর কেনো বিকশিত হয়েছিলো, দানা বেঁধেছিলো তার কোনো নির্ধারিত দলিল নেই। তবে ইতিহাসবিদদের অনেকে ধারণা করেন, মানুষের কিছু নির্দিষ্ট মৌলিক প্রয়োজন মেটাইতেই শহরের উৎপত্তি। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘নির্ঘুম শহরে’।

ধারণা করা হয়, কৃষি বিপ্লবই শহর সৃষ্টির মূল কারণ। এই বিপ্লব কৃষি ব্যবস্থার উদ্ভাবন ঘটায়। আর মানুষ খাদ্য উৎপাদনের তাড়নায় একটা নির্দিষ্ট জায়গায় স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে শুরু করে। মানুষের এই নিদৃর্ষ্ট বসতি স্থাপন থেকেই ধীরে ধীরে শহর গড়ে ওঠে। আমাদের এই ঢাকা শহরের বয়স দাঁড়িয়েছে প্রায় চারশ বছরের বেশি। কলকাতা নগরীও এমনি আরেক প্রাচীন শহর। কত ইতিহাস, বয়ে গেছে এই শহর দু‘টির বেঁচে থাকার গল্পে। তৈরি হয়েছে সংস্কৃতি, জীবনধারা, মানুষের আনন্দবেদনার কাব্য। শহর যেমন যুদ্ধ, সংকট আর বিপরযকে অতিক্রম করে বেঁচে থাকে তেমনি আবার মরেও যায়। ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে তাদের নাম। এমনি এক শহর ছিলো আটলান্টিস ইতিহাসে যার নামই হচ্ছে ‘লস্ট আটলান্টিস। সর্বপ্রথম ৩৬০ খ্রিস্টপূর্বে গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর লেখায় আটলান্টিসের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রায় দুই সহস্রাব্দ ধরে এই রহস্যময় হারিয়ে যাওয়া শহরটি বহু অভিযাত্রী, গবেষক, ইতিহাসবিদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।

বলা হয়ে থাকে এই রহস্যময় দ্বীপটি ছিলো খুবই বিস্তীর্ণ। শক্তিশালী একটি রাজ্যের রাজধানী ছিলো এই দ্বীপটি। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে উন্নত এই দ্বীপের ছিলো একটি প্রতিদ্বন্দ্বীহীন শক্তিশালী নৌবাহিনী। প্লেটোর বর্ণনানুসারে, ৯,৬০০ খ্রিস্টপূর্বে কোনো এক অজানা কারণে ‘আগুন ও ভূমিকম্পময় ভয়ানক এক রাতে’ এই গোটা দ্বীপটাই ধ্বংস হয়ে যায়। তলিয়ে যায় পানির নিচে।

ডুবে যাওয়া রহস্যময় এই শহরের খোঁজে এ পর্যন্ত অসংখ্য অভিযান চালানো হয়েছে। তবে গবেষকরা এখনো খুঁজে পাননি এই হারানো শহরটিকে। শহরের কি অভিমান থাকে? তাই সে এভাবে তলিয়ে যায় একদিন বিস্মৃতি হবে বলে?হয়তো বসিন্দাদের জগাখিচুড়ি সব গল্প-কাহিনি তার আর ভালো লাগে না, হয়তো ক্লান্তি আসে তার-ও।

একটি শহরের দিন ও রাত্রির শরীরে গাঁথা থাকে আলাদা গল্পের মাংস। শিককাবারে মাংসের মতো যতো পোড়ে ততো উপাদেয় হয়ে ওঠে। শোনা যায় একবার বার্লিন শহরের রেডিয়ো টাওয়ারের চুড়ায় দাঁড়িয়ে নিচে শহরের দিকে দেখছিলেন হিটলার আর গোয়েরিং। আনমনা ফুয়েরার হঠাৎ বললেন, গোটা শহরের মুখে হাসি ফোটবে, এমন কোন কাজ আমি করতে পারি গোয়েরিং? গোয়েরিং-এর জবাব: এখানটা থেকে ঝাঁপ দিতে পারেন, ফুয়েরার!

হিটলার যুদ্ধের দেবতা ছিলেন অথবা দানব। পৃথিবীতে ধ্বংস করেছিলেন একের পর এক শহর। তার ট্যাংক বহরের চাকার নিচে পিষ্ট হয়েছিলো বিখ্যাত সব শহর, ইতিহাস আর তার সংস্কৃতি। হিটলারের বাহিনী হাসি মুছে দিয়েছিলো প্যারিসের। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস পৃথিবীতে প্রেমের শহর বলেই খ্যাতিমান। গুগলের পাতায় ঢুকলে দেখা যাবে প্রেমে পড়ার জন্য উৎকৃষ্ট শহরগুলোর তালিকায় প্রথমেই আছে প্যারিসের নাম। প্যারিসকে ঘিরে লেখা হয়েছে অসংখ্য প্রেমের গল্প,নির্মিত হয়েছে সিনেমা।এই শহরটিকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কবরখানার নীরবতা দিয়ে সাজিয়েছিলেন। শহরটি তখন গেরিলা যুদ্ধের পটভূমি বুনে চলেছিলো। প্যারিস আর লন্ডন-এই দুই শহর নিয়ে প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্স লিখেছিলেন ‘টেল অফ টু সিটিজ’ উপন্যাস। ফরাসী বিপ্লবের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসটি কালজয়ী হয়েছে।

পশ্চিম বাংলার ককি সমর সেন তার কবিতায় শহরকে ডেকেছিলেন-শহর, হে ধূসর শহর বলে। শহরের ক্লান্ত, ম্লান ছবি কবিতার একটি লাইনেই গেঁথে ফেলে পাঠককে। আঠারো অথবা উনিশ শতকে শহরের বিকাশ মানুষকে এক দয়ামায়াহীন এক কঠিন উপলব্ধির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো। কৃষি বিপ্লবের সূত্র ধরে শহরের গোড়াপত্তনের কথা ইতিহাসবিদরা যতোই বলুন না কেন সেই শহর থেকে কৃষকরাই কিন্তু পিছু হটে গিয়েছিলো সবচাইতে আগে। শিল্প বিপ্লব আর যন্ত্রের উত্থান শহরের আত্মাকে খুন করেছিলো। এমনি সব খুন হওয়ার কাহিনি ছড়িয়ে আছে ওই সময়ের পৃথিবী বিখ্যাত সব লেখকদের লেখায়। তাই হতো শহর বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহীদের বুকের আগুন শহরের পথে বয়ে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীতে বহু শহর বিদ্রোহের জন্যও বিখ্যাত হয়েছে। ষাট এবং সত্তরের দশকে ইউরোপের শহরগুলোর রাস্তায় নেমে এসেছিলেন তরুণ বিদ্রোহীরা। রাষ্ট্র ব্যস্থার অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন শহরের রাজপথে দাঁড়িয়ে। তখন প্যারিস, লন্ডন, বার্লিন আগুনের অন্য নাম। তেমনি উত্থানের গল্প রচিত হয়েছিলো আমাদের রাজধানী শহরেও। যুবশক্তি জেগে উঠেছিলো কলকাতা শহরে, দার্জিলিং রাজ্যে, অন্ধ্রে। চে গুয়েভারা লিখেছিলেন ‘শহরে গেরিলা যুদ্ধ’ নামে বই।

শহর এতো বিদ্রোহ আর বিপ্লবের সহগামী হয়েও আবার মজার গল্পও শোনায়। উত্তর বুলগেরিয়ার ছোট্ট এক শহর। নাম তার গ্যাব্রোভো গ্যাব্রোভো প্রদেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র এ শহরটাই। কিন্তু এ শহরটি খ্যাত সম্পূর্ণ ভিন্ন আর অদ্ভুত এক কারণে, আর সেটি হলো এ শহরের অধিবাসীদের রসিকতা! তাদের কৃপণতা নিয়ে অদ্ভুত সব কৌতুক আর কাজকর্ম রয়েছে, আর সেগুলোই তাদের জন্য বয়ে এনেছে সুনাম। গ্যাব্রোভোবাসীরা গাধাদের চোখে সবুজ কাচের চশমা পরিয়ে রাখে। তাতে নাকি তাদের গাধাগুলো ঘাস মনে করে খড়ই খেয়ে ফেলে। এই শহরের মানুষ ঘড়ি যেন তাড়াতাড়ি ক্ষয়ে না যায় সেজন্য ঘুমুতে যাবার আগে রাতের বেলায় ঘড়ি বন্ধ রাখে। তারা ঘুমিয়ে পড়ে সূর্যাস্তের পরপরই।ডিমের সঙ্গে গ্যাব্রোভোবাসী নল লাগিয়ে রাখে যেন সুপ বানাবার জন্য ঠিক যতটুকু দরকার, ততটুকুই কুসুম বের করে আনা যায়। বাকিটা ব্যবহার করবে পরের বারের জন্য। আবার বিয়ার পরিবেশনের সময় তারা ডিমের খোলসে পরিবেশন করে, যেন নেশা না ধরে। নেশা ধরলে যে বিয়ার বেশি খরচ হবে!শীতের দিনে তারা ভেতরের উষ্ণতা বাঁচিয়ে রাখবার জন্য দরজা কম খোলে।

পৃথিবীর নানান শহর নিয়ে বিচিত্র সব গল্প প্রচলিত আছে। এমনি গল্পের ঝুলি নিয়ে বসে আছে এখনকার পৃথিবীতে নিয়মিত সংবাদের শিরোনাম কান শহর। চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য কান ঘিরে সিনেমা আর নায়ক-নায়িকাদের ছাড়াও আছে মজার কাহিনি। কান শহরটিকে ঘিরে আছে মারাত্মক স্বর্ণ ডাকাতির ইতিহাস। মনে করা হয়, পিংক প্যান্থার ডাকাত দলের একজন ২০১৩ সালে কার্লটন হোটেলে বিখ্যাত হীরা প্রদর্শনী থেকে ১০৩ মিলিয়ন ইউরো দামি রত্ন বাগিয়ে নিয়েছিলো। মজার বিষয় হলো, এটাই সব সময়ের জন্য বিশ্বের সেরা ডাকাতি হিসেবে ধরা হয়। একই বছরে চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ১.৬ মিলিয়ন ইউরোর নেকলেস চুরি হয়। ২০১৫ সালে উৎসবের কয়েক দিন আগে একটি দোকান থেকে ১৭.৫ মিলিয়ন ইউরোর স্বর্ণ চুরি হয়। কেউ কেউ মনে করতে পারেন, এগুলো সিনেমার সব গল্পের প্লট। কিন্তু শুনলে অবাক হবেন আলফ্রেড হিচককের ১৯৫৫ সালের ধ্রুপদি সিনেমা `টু ক্যাচ আ থিফ‘ এর কিছু অংশ তিনি করেছিলেন কার্লটন হোটেলের একজন সিঁধেল চোরকে নিয়ে।

পারস্য দেশের শহরগুলো নিয়ে একদা গল্পের বইতে বহু কাহিনি উঠে এসেছে। আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্প তো পৃথিবী বিখ্যাত। আলী বাবা নামে মানুষটির শহরে চোরের দল নাজেহাল হয়েছিলো মর্জিনা নামে সেই নারীর হাতে। শহরের গল্পে নারীরাও কিন্তু নানা কারণেই বিখ্যাত। প্যারিস শহর একদা বিখ্যাত ছিলো  লেখক সিমন দ্য বোভায়াঁরের জন্য। অভিনয় শিল্পী এলিজাবেথ টেইলারের প্রিয় শহর ছিলো কানাডার মন্ট্রিয়ল। তিনি ছুটি কাটাতে যেতেন সেখানে। ইতিহাস বলে, পতিতারাও পৃথিবরি বিভিন্ন শহরকে তাদের সুরভীতে মাতোয়ারা করে রেখেছেন। এমন শহর অ্যামস্টার্ডাম, যেখানে পতিতাবৃত্তি আর দশটা পেশার মতোই। কিন্তু বারবণীতাদের জন্য বহু আগে থেকেই বিখ্যাত স্পেনের বিভিন্ন শহরগুলো। একনায়ক মুসোলিনির সময় স্পেনে এই পেশার বিকাশ ঘটে প্রবল ধারায়। তখন মাদ্রিদ থেকে প্রকাশিত বড় বড় পত্রিকাগুলোর বিজ্ঞাপনের পাতায় জুড়ে শোভা পেতো পতিতাদের বিজ্ঞাপন।

শহর তবুও কোথায় যেন অভিমানের গল্প ধরে রাখে, ধরে রাখে একা একা বেড়ে ওঠার গল্প। মানুষের ভীড়, বঞ্চনা, যন্ত্রণা আর ভেতর থেকে একা করে দেয়ায় শহরের গল্প বিখ্যাত হয়ে থাকে মানষের শহরবাসের ইতিকথায়। শহর ঘুমায় না। প্রতিদিন জেগে থাকে,ছটফট করে কিন্তু তারপরেও বাসিন্দাদের মায়ায় জড়ায়, মাকড়সার জালের মতো এক মায়ায় আটকে রাখে।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট
ছবি : গুগল ও প্রাণের বাংলা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]