নীড়ে ফেরা পাখী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

আমাদের দ্বীপের মধ্যেই হাঁটছিলাম আজকে শনিবারের উজ্জ্বল সকালে। কত মানুষ বেরিয়েছে এ রৌদ্রস্নাত প্রভাতে। পূর্বী নদীর পাড় ধরে চলেছে কত তরুন যুগল হাত ধরাধরি করে, শিশুঠেলুনীতে শিশুদের নিয়ে বেরিয়েছেন মা-বাবারা গল্প করতে করতে, বয়স্ক মানুষেরা হাঁটছেন মৃদু গতিতে। স্বাস্হ্য-সচেতন মানুষদেরও কমতি নেই সেখানে – দৌঁড়ুচ্ছেন কেউ কেউ – একা কিংবা যুগলে। দ্রুত হাঁটছেন অনেকেই – আবারও একা ও যুগলে। আমি অবশ্য হাঁটছি আমাদের এক এবং অদ্বিতীয় প্রধান রাস্তা দিয়ে। বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি প্রতি শনিবারের মতো আজও সাপ্তাহিক কৃষি বাজার বসেছে। নানান ফলমূল আর শাক-সব্জীর পণ্য সাজিয়ে বসেছেন নানান কৃষক দম্পতি। জানি এদের কেউ কেউ সুদূর ফিলাডেলফিয়া থেকে এসেছেন। তাঁদের পণ্যের নানান রঙে হৃদয় জুড়িয়ে যায়, চোখে নেশা ধরে, দাঁড়িয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।

ঠিক তখনই চোখে পড়ে সামনের দিকে। যে তরুনীটি একটি শিশুর হাত ধরে শূন্য শিশুঠেলুনীটি ঠেলছেন, তাঁকে আমি চিনি। বিশ বছর আগে যখন আজকের তরুনী মা’টিকে তাঁর মা ঠিক এমনি করেই নিয়ে যেতেন, তখন থেকেই চিনি। ১৯৯৭/৯৮ এর দিকে প্রায়শই দেখতাম তিনটে বাচ্চাকে নিয়ে তরুন মা-বাবা চলেছেন। বড় মেয়েটি বছর সাতেকের, পরের ছেলেটি বছর পাঁচেকের, আর সবচেয়ে ছোট মেয়েটির বয়স তিন বছর হয় কি না হয়। আজকের তরুনী মা’টিই সেদিনের সেই তিন বছরের শিশুটি। তাকেই তার মা শিশুঠেলুনীতে ঠেলতেন, আজ সে যেমন ঠেলছে তার সন্তানটিকে। ভারী সুদর্শন ছিলেন তার মা-বাবা আর তাঁদের সবটুকু রূপ চুরি করে নিয়ে যেন এ ধরাধামে এসেছিলো ঐ শিশু তিনটি। হাঁটতে হাঁটতে মা-বাবা মৃদুস্বরে গল্প করতেন, তিনটে শিশু তাঁদের ঘিরে থাকতো, ভারী ভালো লাগতো আমাদের। আমাদের কন্যারা তখন বড় হয়ে গেছে, তবু আমাদের সেই দিনগুলোর কথা মনে হতো যখন তারা এ বয়সেরই ছিলো।

এর কিছুদিন পরেই ঘটলো ৯/১১। আমাদের দ্বীপের বেশ কিছু বাসিন্দা ঐ অঞ্চলে কাজ করতেন – মূলত: আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। শোনা গেলো আমাদের দ্বীপ পাঁচজনকে হারিয়েছে। জনান্তিকে জানলাম যে ঐ পাঁচজনের মধ্যে ঐ তিনটে দেবশিশু তুল্য বাচ্চাদের পিতাটিও আছেন। মনটা ভীষন ভারী হয়ে গেলো। আলাপ নেই – শুধুমাত্র চোখের পরিচয়, তবু ঐ শিশু তিনটি আর তাদের তরুনী মার কথা ভেবে ভেবে হৃদয়টাই যেন ভেঙ্গে গেলো। কি করবে তরুনী মাতাটি তাঁর তিনটি সন্তান নিয়ে – সারাটা জীবন তাঁর সামনে পড়ে আছে? পিতৃহীন হয়ে কেমন করে বেড়ে উঠবে ঐ শিশুত্রয়? যতই ভাবি, ততোই যেন ঐ পরিবারটির জন্য এক অনামা মমত্ব বোধ করি। ঐ ঘটনার কিছুদিন পরে দ্বীপের লাল বাসের ধরার জন্য বেনু আর আমি একদিন বাস ছাউনীতে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি একটু দূরে তিনটে সন্তান নিয়ে তরুনী মাতাটি দাঁড়িয়ে আছেন। ওদের দিকে তাকিয়ে বুকটা কেমন হু হু করে উঠলো। আমার মনে হলো আলাপ থাকুক বা না থাকুক, এ অবস্হায় আমরা ওদের কাছে না গিয়ে এখান থেকে যেতে পারবো না। ওটা অসম্ভব।

বেনুর দিকে তাকিয়ে দেখি আমার মতো সেও ওদের দিকে তাকিয়ে আছে – ওর বড় বড় চোখ জলে ভরে এসেছে। আমরা পরস্পরের দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকালাম। তারপর এগিয়ে গেলাম ওদের দিকে। নি:শব্দে বেনু তরুনী মা’টিকে জড়িয়ে ধরলো বুকে। আমি হাঁটু গেড়ে বসে শিশু তিনটিকে আমার দিকে টেনে আনলাম। অশ্রুর ভাষা ভিন্ন আমাদের আর অন্য কোন ভাষা ছিলো না। নিস্তবদ্ধতাও কতটা বাঙময় হতে পারে, সেদিন তা বুঝেছিলাম। তারপরের দিন, মাস, বছরগুলোতে দেখেছি মা শিশু তিনটিকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে, বড় বোনটি ছোট ভাই-বোন দুটিকে আগলে নিয়ে খেলতে যাচ্ছে, সবাই মিলে চলছে তাদের সন্মুখের জীবন পথে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেদিনের শিশুত্রয় কিশোর কিশোরীতে পরিনত হয়েছে। বড় মেয়েটির ছেলে বন্ধু হয়েছে, ভাইটি লম্বায় বোনদের বা মাকে ছাড়িয়ে গেছে, মায়ের চুলে রুপোলী ঝিলিক সুস্পষ্ট। ততদিনে পরিবারটির সঙ্গে একটু আধটু কথা-বার্তা শুরু করেছি – তেমন কিছু নয়, এই দেখা হলে স্বাভাবিক সম্ভাষন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার কথা, দ্বীপের টুকটাক ঘটনার কথা – ভীড় বাড়ছে, যানজট ঘটছে, দোকানে জিনিসপত্রের দাম খুব ইত্যাদি।

এরই মধ্যে সময়ের সুতোর গোলা সুতো সুতো ছাড়তে ছাড়তে আরও কিছুটা গড়িয়ে গেছে। ছেলে মেয়েগুলো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছে, ছেলে ও মেয়ে বন্ধু হয়েছে তাঁদের। রাস্তায় বা বাসে দেখা হলে তাদের মা জানিয়েছে গত মাসে বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলো, তার মাস ছয়েক পরে জানলাম ছেলেটি চাকুরী নিয়ে ইউরোপ চলে গেছে, কারন তার বান্ধবী ফরাসী। ছোট মেয়েটি ক্যালিফোর্নিয়াতে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করছে। আমাদের দেখলেই একদিনের সেই তরুনী মা’টি, আজ যিনি যৌবনোত্তর বয়সের দিকে পা বাড়াচছেন, দাঁড়াতেন। এটা ওটা গল্প করতাম। তাঁর মুখে একটা ক্লান্তির ছাপ, একটা নৈরাশ্যের বেদনা, একটা ধূসর কান্না দেখতে পেতাম।

একদিন ভারী বিষাদময় সুরে বলেছিলেন, ‘দেখুন, পাখীর নীড় বাঁধা আর মানুষের সংসার করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। পাখী কতো যত্ন করে নীড় বাঁধে, ডিম পাড়ে, বাচ্চা হয়। তারপর একদিন পাখীর ছানা উড়তে শিখলে নীড়ের কাজ শেষ – নীড় ভেঙ্গে যায়। মানুষ কত ভালোবেসে সংসার তৈরী করে, ছেলেমেয়ে মানুষ করে, তারপর একদিন ছেলেমেয়ে চলে যায়। মানুষ সংসারে একা হয়ে যায়। কিন্তু মানুষতো আর পাখীর নীড় ভাঙ্গার মতো সংসার ভেঙ্গে দিতে পারে না। সে একা সংসার আগলেই থাকে আমৃত্যু’, কেমন যেন আনমনা বিষাদমাখা নীচু স্বরে কথাগুলো শেষ করলেন তিনি। কি একটা ছিলো তার কথায় – কেমন যেন ঘা দিয়ে গেলো হৃদয়তন্ত্রীতে।

এই সব ভাবতে ভাবতে টের পেলাম, হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন সামনের মেয়েটির পাশাপাশি চলে এসেছি। আমাকে দেখে থামলো সে, থামালো তার শিশুঠেলুনী। স্মিত হাসলো সে। আমিও দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে নীল চোখের, সোনালী চুলের শিশুটি উৎসুক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তার গালে একটু আদর করে বললাম, ‘একদম তোমার মতো হয়েছে। জানো, তোমাকে আমি প্রথম ওর বয়সেই দেখেছি’। ‘জানি’, ভারী লাজুক হেসে মেয়েটি বললো, ‘মা বলেছিলেন’। ‘তা, মা কেমন আছেন?’, জিজ্ঞেস করি মেয়েটিকে। একটি কান্নার মতো কষ্টের হাসি হেসে মেয়েটি বললো,’ মা? মা’তো নেই। মাস ছয়েক হয় আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন’।

আমি স্তব্দ হয়ে গেলাম। কোন মতে ফিসফিসিয়ে বললাম, ‘তোমার ভাইবোনেরা’? ‘আমরা তিন ভাইবোন আবার এ দ্বীপে মায়ের বাড়ীতেই ফিরে এসেছি’, উদ্ভাসিত মুখে মেয়েটি বললো। ‘বাবা চলে যাওয়ার পরে মা’ ইতো তার জীবনটাই বিলিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের জন্য’, মেয়েটি বলে চলে, ‘কিছুই করতে পারিনি মায়ের জন্য। তার ওপর মা’কে একা রেখে দূরে চলে গিয়ে ছিলাম সবাই’। দেখতে পাই মেয়েটির নীল চোখ জলে টলটল করছে। ‘মাকে তো আর ফিরে পাবো না, কিন্তু এখানে আমরা থাকলে অন্তত: মায়ের স্মৃতির কাছাকাছি থাকতে পারবো’। হাতের রুমালে চোখের জল মোছে সে। আমি আকাশের দিকে তাকালাম। তারপর মনে মনে বললাম, ‘আপনার সংসার কিন্তু শূন্য হয়ে যায় নি, বরং পূর্ণ হয়েছে’। কার উদ্দেশ্যে আমার এ উক্তি, সে তো আমি জানি।

লেখক: ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: লেখক

 

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box