নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে…

পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ পাই মাথার উপর। উড়ে যায় তারা দলবেঁধে অথবা একা। জীবনকে তখন কারাগারের জানালায় দাঁড়ানো ছায়া বলে মনে হয়? এ প্রশ্নের উত্তর ঝট করে দিয়ে ফেলা কঠিন। কিন্তু আকাশে পাখিদের ডানা মেলে ভেসে যাওয়াকে মানুষ সারা জীবন মুক্তির শ্বাশ্বত ছবি বলেই মনে করেছে। জীবনানন্দ দাস কবিতায় লিখেছেন –

আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।

তারপর চলে যায় কোথায় আকাশে?

তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে!

ছেলেবেলায় লাতিন আমেরিকার বিখ্যাত লেখক আলেকজান্দার বোলায়েভ পাখির মতো উড়তে চেয়ে নিজের বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে হাতই ভেঙে ফেলেছিলেন! আমরা বাবুইয়ের বাসা দেখে ভাবি, যদি এমন বাসা আমরাও বাঁধতে পারতাম! নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা…সুর ভেসে আসলে আজও আমরা আনমনা হয়ে যাই। রক্তের সম্পর্ক নয়, মনের সম্পর্ক আমাদের পাখির সঙ্গে।

পাখিদের এই ভেসে চলে যাওয়ার জীবন মানুষকে চিরকাল আকর্ষণ করেছে। তাই হয়তো জন্মেই পরাধীন মানুষ তার শৃংখলমুক্তির প্রতীক হিসেবে এই পাখিকেই চিহ্নিত করেছে। কিন্তু পাখিরাও কী মুক্ত? তাদের উড়ালকথার ভেতরেই কি পৃথিবীর মুক্তির স্বাদ লেগে আছে? মুক্তির উপমা হিসাবে যে প্রাণীটিকে কাছের বলে মনে হয় তার মুক্তি কোথায়?

প্রাণের বাংলার এই সংখ্যার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’।

পৃথিবীতে কিছু পাখি আছে যাদের সেই অর্থে সংসারী বলা চলে। জলাশয়ের পাখি ‘চখাচখি’ বা ‘রাডি শেল্ডাক’ বেশ লম্বা সময় ধরে সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে ধরে রাখে। প্রজননের সময় এবং শীতকালীন প্রবাসেও তাদের এই যৌথ জীবনের কাব্য ফুরায় না। সম্পর্কের ঠিক কোন রসায়ন কাজ করে তাদের ভেতরে তা আজো বুঝে উঠতে পারেননি পাখি বিশারদরা। আবার কেউ কেউ দল বেঁধে থাকে। দলের প্রয়োজনে খাবার খোঁজে, একে অন্যের পালক পরিষ্কার করে দেয় (পক্ষীবিদ্যার ভাষায় ‘অ্যালোপ্রিনিং’), অন্তত যতক্ষণ সে ওই দলে আছে। যেমন বাংলার পরিচিত পাখি ছাতারে, মুনিয়া। প্রজনন অথবা সন্তান উৎপাদন-প্রতিপালনের ক্ষেত্রে অনেক পাখি কিন্তু একটা স্তর পর্যন্ত ভালো পিতা-মাতাও হয়ে থাকে। নিশ্চয়ই তাদের মাথায় সন্তানদের বড় করা, লেখাপড়া শেখানোর চিন্তা কাজ করে না।এমন ভাবনা পাখিদের মাথায় আসার কথাই নয়। পাখিবিদ্যা বলে, কিছুটা যান্ত্রিক হলেও এসব তাদের নিজস্ব, অন্তর্গত বন্ধন। আটকে পড়া। কিন্তু পাখি বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, পাখিদের মাঝে এই অন্তর্গত বন্ধনের বিপরীত চিত্রও তো আছে।

কোনো কোনো পাখি আছে বাচ্চা উড়তে শিখলেই তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কোনো স্ত্রী-পাখি আবার ডিম পাড়ার পর ঘুরেও দেখে না বাচ্চা হলো কি হলো না। পুরুষটি ডিম ফোটায়, বাচ্চা বড় করে। বাংলার ঘাসজমির পাখি ‘বাটন্‌-কোয়েল’ তার উদাহরণ। 

পাখিরা কি তাহলে সন্ন্যাসী জীবনের কাছাকাছি কোনো মাত্রায় বেঁচে থাকে? তারাও কি সংসারে থেকেও নীলকন্ঠ?সন্তানের টান আছে, আবার নেই। লক্ষ্য করলে দেখা যায় পাখির বাসা আক্রান্ত হলে কিছুক্ষণ তারা প্রতিরোধ করে, চিৎকার করে চারদিক মাথায় তোলে। তাতেও না কুলালে বাসা এবং বাচ্চা ফেলে তারা দেয় উড়াল। আগে তো নিজের প্রাণ। পরদিন সব ভুলে সেই পাখি কন্ঠে সুর তুলে ভোরকে স্বাগত জানায়। ভেসে যাওয়া সাধের সংসার নিমেষে অতীত। বড় ঈগলদের মধ্যে দেখা যায়, খাবার দুর্লভ হলে স্বাস্থ্যবান বাচ্চাটিকে বেশি খাবার দিতে থাকে মায়েরা। কারণ তার বাঁচার সম্ভাবনা বেশি। দুর্বলটির প্রতি যত্ন কমিয়ে দেয়। প্রজাতির টিকে থাকাই একমাত্র শর্ত।

পাখির মস্তিষ্কের সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কের কোনও তুলনাই চলে না। তারা মানুষের মতো করে কখনোই চিন্তা করতে পারে না। কিন্তু এই সুন্দর পৃথিবীর কোনও মুহূর্তই কি তাদের নাড়া দেয় না?
একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, অরণ্যে সব মিলিয়ে প্রধানত পাঁচ রকমের আলোর খেলা চলে। ১. হলদে-সবুজ, ২. নীলচে-ধূসর, ৩. কমলা-লাল, ৪. বেগুনি-নীল ও ৫. সাদা। এই আলোর খেলা নির্ভর করে মূলত অরণ্যের জ্যামিতিক, আকাশে মেঘের উপস্থিতি ও সূর্যের কৌণিক অবস্থানের ওপর। সাধারণ বনাঞ্চলে নীলচে-ধূসর আলোর খেলা চলে।  জঙ্গলে কিছুটা ফাঁক থাকলে সেখানে কমলা-লাল, বিস্তর ফাঁক থাকলে ম্যাড়মেড়ে সাদা আলো, খুব ভোরবেলা বা সন্ধ্যাবেলা বেগুনি-নীল এবং ছাদ ঢাকা বনাঞ্চলে হলদে-সবুজ আলোর খেলা দেখা যায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জন এ. এন্ডলার ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তার গবেষণা পত্রে প্রকাশ করেন এই চমকপ্রদ তথ্য।

পাখির ওপর কি সেই আলোর প্রভাব আছে? এন্ডলার বলছেন আছে। অরণ্যে দিনের বিভিন্ন সময় নানা ধরণের আলোর পরিবেশ তৈরি হয়। কিছু পাখি প্রজননসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজের দেহের পালকের রং বিভিন্ন ভাবে প্রদর্শন করে। পালকের সেই রং ভিন্ন আলোয় বিচিত্র ভাবে প্রতিফলিত হয়। চারপাশের আলোর সঙ্গে মিশে সেই বর্ণচ্ছটা সঙ্গীকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। তাই ঘুরিয়ে বললে, প্রজননগত সাফল্য অনেকটা নির্ভর করে জঙ্গলের গঠন, আকাশে মেঘের উপস্থিতি ও সূর্যের অবস্থানের ওপর, বিশেষত সেই সব পাখিদের যারা প্রজননের সময় সঙ্গীকে রঙ প্রদর্শন করে আকর্ষণ করতে অভ্যস্ত। এই কথাটাই গবেষক এন্ডলার তাঁর আরেকটি গবেষণাপত্রে দেখান। তাই পাখি যতই তার রঙ-বেরঙের পালক দিয়ে সঙ্গীকে কাছে টানতে আগ্রহী  হোক না কেনো তার শরীরে সেই নাটকীয় আলো না পড়লে সব বৃথা। তা হলে এ অনুমান কি অমূলক যে জঙ্গলে আলোর খেলা পাখিদের আবেগপ্রবণ করে তোলে? অবশ্য সফল বংশবিস্তারের পর রঙের খেলা আর আকর্ষণ সব ফুরিয়ে যায়।

কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর কবিতায় একদিন পাখিদের মন পেয়ে যাওয়ার কথা লিখেছেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র কি জানতেন পাখিদের মন আছে? জানা যায় পাখিদের মন? প্রাণীকূলের মধ্যে একমাত্র মানুষই আত্মহত্যা করে। তাদের মনে আত্মহত্যার প্রবণতা আছে। কিন্তু ভারতের আসাম রাজ্যের জাতিঙ্গা গ্রামের সেই পাখিগুলোও যে বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে দলবেঁধে মরে যায়! বিষ্ময়কর ঘটনাই বটে! পাখিবিশারদরা গবেষণা করে দেখেছেন, প্রায় ৪৪ প্রজাতির কয়েক হাজার পাখি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের কোনো এক সন্ধ্যাবেলা দলবেঁধে উড়ে এসে ওই গ্রামের আকাশে পাগলের মতো উড়তে থাকে। তারা গাছের ডালপালা, বিদ্যুতের খুটি অথবা কংক্রিটের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে মারা যায়।মাংসের জন্য গ্রামের লোকেরা এসব পাখি খেয়ে ফেলে। পাখিদের এই বিষ্ময়কর গণআত্মহত্যার ঘটনাটা ঘটে আসছে প্রায় ১০০ বছর ধরে। পাখিরা কি তাহলে আত্মহত্যা করে সত্যি সত্যি? বিজ্ঞানীরা অবশ্য এমন ঘটনার একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা বলছেন বছরের ওই সময় দক্ষিণ দিক থেকে তীব্র বায়ু প্রবাহের ধাক্কায় পাখিরা এভাবে দলবদ্ধ ভাবে মারা যায়। আবার কেউ বলেছেন, ওই জায়গায় কোনো চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবও থাকতে পারে।

আসলে পাখিদের কাছে প্রজাতির টিকে থাকাই বড় একটা বিষয়। তারপর এক নির্লিপ্ত, কঠিন-শীতল জীবনযাপন। সম্পর্ক, সম্পদ, মালিকানা ভালো-মন্দ ইত্যাদি থেকে উদাসীন এক বিশ্বনাগরিক। ভালোবাসা, ক্রোধ ইত্যাদির ঊর্ধ্বে, শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে বারবার তার নিজস্ব পৃথিবীর বিনির্মাণের এক অদ্ভুত শ্রমিক এই পাখি।তাদের জীবনের রহস্য অপার।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল