নেই সেই বিয়ে বাড়ি

ইরাজ আহমেদ

সেই শহরে বিয়ে বাড়ির মজাই ছিলো আলাদা। এখনকার মতো এতো আলো ঝলমল ছিলো না বিয়ের আয়োজন। ছিলো না উৎকট হিন্দী গানের চড়া সুর, সারবেঁধে বসে কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়ার উৎসব।বছর তিরিশ আগেও বিয়ের উৎসব ছিলো ঘটনাবহুল। তখন বিশীরভাগ বিয়ে হতো দুপুরবেলা। সেই শহরে কনভেনশন হল আর কমিউনিটি সেন্টারের ছড়াছড়িও ছিলো না।এতো আলো আর বাজি পোড়ানোর ঝলকও ছিলো না। কোনো পাড়ায় বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই গলির মোড়ে অথবা বাসার সামনে লাল হলুদ আর সবুজ কাপড় দিয়ে মোড়া বাঁশের গেট দাঁড়িয়ে যেতো। উঠান অথবা বাসার ছাদে বসতো ইঁট দিয়ে তৈরী রান্নার চুলা। সকাল থেকে কয়লা পোড়া গন্ধ আর ঘিয়ের সুঘ্রাণে মঁ মঁ করতো বাতাস।যেখানে থাকি সে এলাকায় কারো বাড়ির বিয়ে হলে ছুটি মিলে যেতো আমারও। আস্তে ঢুকে পড়তাম প্রতিবেশীর বিয়ের আয়োজনে। গেট ধরা, বরের জুতা চুরির পরিকল্পনা, অতিথি সামলানো, তাদের খাবার পরিবেশন-অনেক কাজ।
আজকাল শহুরে বিয়েতে বিয়ে পড়ানোর পর্বটাও অনুপস্থিত। কাজী সাহেব আগের দিনই বইখাতা নিয়ে উভয় পক্ষের বাড়িতে ছোটাছুটি করে কাজটা সেরে রাখেন। কিন্তু তখন বিয়ের আসরে বিয়ে পড়ানো হতো। কন্যার অনুমতি নিতে হতো বিয়ের আসরেই। কত বিয়েতে কোনো কোনো কনে ‘কবুল’ শব্দটা বলতে গিয়ে অজ্ঞানও হয়ে যেতো। পাড়ায় কন্যাপক্ষের বসবাস হলে সেখানে সকাল থেকে ম্লান মুখে ঘুরে বেড়ানো একজন যুবকের চরিত্র ছিলো বাঁধা। বিয়ে হতে চলা মেয়েটির সদ্য সাবেক হওয়া প্রেমিক সেই যুবক।অনেক সময় ব্যর্থ ভালোবাসার মৃতদেহের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার ঘটনাও ঘটতো। একবার পাশের বাড়িতে বড় এক আপার বিয়েতে পচা ডিম নিক্ষেপ করেছিলাম এক বড় ভাইয়ের নির্দেশে।সে নিয়ে ঘটেছিলো তুলকালাম কাণ্ড। পচা ডিমের উৎকট গন্ধ বিয়ে বাড়ির উৎসবকে খানিকটা হলেও ম্লান করে দিয়েছিলো সেদিন।
বরের গেট আটকানোর ব্যাপারটা এখনকার বিয়ে বাড়িতে পূর্ব নির্ধারিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সেই শহরে এটাই ছিলো বিয়ে বাড়ির অন্যতম আনন্দের উৎস। ঢাকা শহরের বিয়েতে বর আসতো প্রথামাফিক ভাড়া করা অথবা কেনা সাদা রঙের পাগড়ি পড়ে। তার পোশাক নিশ্চিত ভাবে আঁটোসাঁটো শেরোয়ানি আর চোস্ত পাজামা। পায়ে সাদা মোজা আর নাগড়া জুতা। জরি চুমকির কাজ করা জুতোজোড়াই ঘটাতো অনেক অনর্থ। একবার এক বিয়ের আসরে জুতা চুরি করার পর বরপক্ষের সঙ্গে রীতিমত হাতাহাতি বেধে যায়। বিয়ে পণ্ড হবার জোগার। মনে পড়ে, বরের জুতা ছিঁড়ে গিয়েছিলো টানাটানিতে। তবে সেদিন সেই বিয়ের গেট আটকানোর টাকা দিয়ে আমরা সিনেমা দেখেছিলাম।
তখনকার বিয়ে বাড়িতে বাধ্যতামূলক ভাবে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা বসতে হতো। কোনো কমিউনিটি সেন্টার অথবা হোটেলে বিয়ে হলেও এই ব্যবস্থা বহাল থাকতো। বেশীরভাগ সময় ডেকোরেটার্সের লোকেরা একটা বাহারী কাপর টানিয়ে এই বিভাজন রেখা তৈরী করে দিতো। কিন্তু তারপরেও তখনকার বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানে প্রেম আসতো ভীরু চরণে। বরপক্ষের সঙ্গে আসা কোনো কিশোরীর চকিত চাহনি অথবা বরপক্ষ হয়ে গিয়ে গেট ধরায় ব্যস্ত মুখরা বালিকার উচ্চকিত ঝগড়া উস্কানী দিতো প্রেমে পড়ার জন্য।পাত্র বা পাত্রী পাশাপাশি পাড়ার কেউ হলে প্রেমটা কয়েক বছর বেঁচেও থাকতো।
বিয়ের আসরের অন্তিমে বর আর বউকে একসঙ্গে বসিয়ে হতো রুসমৎ অথবা শাহ-নজর। সেখানে আয়নায়, বাটিতে রাখা পানিতে বর কনের মুখ দেখতো। শ্যালিকাদের রসিকতা ছিলো তখনকার বিয়ে বাড়ির প্রধান উৎসব। এরকম এক অনুষ্ঠানে আমার এক দাদাকে দেখেছিলাম অতিউৎসাহী এক শ্যালিকাকে মাথার কিস্তি টুপি খুলে প্রহার করতে। শ্যালিকাটি তার গায়ে আলপির ফুটিয়ে দিয়েছিলো।
সেই শহরে হাতেগোনা কয়েকটা কমিউনিটি সেন্টার ছিলো। তার মধ্যে অন্যতম ছিলো আজিমপুর কমিউনিটি সেন্টার।পুরান ঢাকায় লালবাগ কমিউনিটি সেন্টার, নারিন্দায় লালকুঠিও ছিলো বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য বিখ্যাত। তখন উচ্চবিত্তদের বিয়ের অনুষ্ঠান হতো নিজেদের বাড়িতে অথবা কোনো হোটেলে। মতিঝিলে ‘হোটেল পূর্বরাগ’ ছিলো তেমনি একটি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পূর্বরাগের নাম ছিলো ‘হোটেল প্যারাগন’। চীনা খাবারের দোকানে বিয়ের প্রচলন শুরু হয় সত্তরে দশক পার হয়ে।
পাড়া অথবা কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠান হলেই কাছাকাছি পানের দোকান আর ঠাণ্ডা সেভেন আপ-এর কদর বাড়তো। তখন বিয়ে বাড়িতেও কেউ কেউ বের হওয়ার দরজার পাশে পানের আয়োজন রাখতেন। তবে বিয়ে বাড়িতে কাচ্চি বিরিয়ানির ছড়াছড়ি ছিলো না তখন। পোলাও, আর মাংসের রেজালা আলাদা রান্না হতো। সঙ্গে ছিলো মুরগির রোস্ট। টিকিয়াও ছিলো তখনকার বিয়ে বাড়ির কমন মেন্যু।
বিয়ের খাবার গলা অবধি খেয়ে লোকজন বের হতো সেভেন-আপ অথবা পানের খোঁজে। কেউ আয়েশ করে বিয়ে বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে টান দিতো সিগারেটে। তারপর গল্প করতে করতে তাদের বাড়ি ফেরা। সে গল্পে থাকতো বিয়ে বাড়ির আয়োজনের সমালোচনা।

ছবি: গুগল