নেশার ঘোরে লেখক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শার্লক হোমসের আফিমে অসক্তি ছিলো। তবে লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের নেশার প্রতি টান ছিলো কিনা সে তথ্য জানা যায় নি। কেউ কেউ বলেন, নেশাদ্রব্য লেখাকে টেনে নিয়ে যায় এক সৃজনশীল উদ্যানে। নেশার ঘোর লেখককে যুক্ত করে তীব্র বিতর্কিত এবং গভীর অনুভূতির অধ্যায়ে। কেউ বলতে পারেন, লেখাই তো লেখকের একমাত্র নেশা। তার আর অন্য নেশায় প্রয়োজন কী? সম্ভবত এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিলো না কবি স্যামুয়েল টেইলার কোলরিজের কাছে। অফিমের ঘোরের মধ্যে বসে লিখেছিলেন ‘কুবলাই খান’ কবিতাটি। আফিম-ই তাকে খুন করেছিলো ১৮৩৪ সালে।

বাংলা সাহিত্যের দুর্দান্ত এক অশ্বারোহী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশী মদের আগুন যাকে পুড়িয়ে ফেলেছিলো একটু একটু করে। কলকাতা শহরের নেশার ঠেকগুলো অমর হয়েছে বাংলা ভাষার অন্যতম উজ্জ্বল কবি শক্তি চট্টপাধ্যায়ের কবিতা থেকে ছিটকে পড়া আলোয়।বইয়ের পৃষ্ঠায় ঠাঁই পেয়েছে সেখানকার বিভিন্ন পানশালা আর খালাসিটোলার নাম।প্যারিস শহরে বসে নেশায় আচ্ছন্ন আর এক কবি জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবো আফিমের নেশায় তছনছ হয়ে যেতে যেতে লিখেছেন এমন কবিতা, ‘‘বিষের শক্তি আমার হাত পা ভেঙ্গে দিচ্ছে/ শ্বাসরোধ হয়ে আসছে আমার/ আমি আর কাঁদতেও পারছি না’’।

বাংলাদেশেও এই আসক্তির ঢেউ এসে লেগেছিলো ষাট ও সত্তরের দশকে। রাজধানী ঢাকার সুইপার কলোনীর গুরুমূর্তি অথবা হাক্কার দোকানের দেশী মদের আড্ডা আর বাতাসে ভেসে ক্যানাবিসের নেশা কথা সাহিত্যিক বিশেষ করে কবিদের আলিঙ্গন করেছিলো ভীষণভাবে। তখন প্রয়াত কবি আবুল হাসান, রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সাবদার সিদ্দিকীর নাম উঠে এসেছে বিভিন্ন আলোচনায়।

সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক এবং কবিদের অনেকেই নেশায় আসক্ত ছিলেন। নেশা তাদের লেখক জীবনকেও এলোমেলো করেছে ব্যাপকভাবে। বদলে তাদের লেখা ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ অয়োজনে রইলো সেই সব লেখকদের নেশায় আচ্ছন্ন জীবনের কথা।

     আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন কবি জাঁ আরতুর র‌্যাঁবো। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘এ সিজন ইন হেল’ লিখেছিলেন আফিমের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে। বিভিন্ন শহরের পানশালা আর রাস্তায় মারপিট, সহগামী কবিদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করাটাই হয়ে উঠেছিলো র‌্যাঁবোর অভ্যাস। চলাফেরাও করতে শুরু করেন মাস্তান এবং অসামাজিক সব মানুষের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত আফিমের নেশা আর অসুস্থতা কবিকে ঠেলে দিয়েছিলো মৃত্যুর দুয়ারে। ‘ইল্যুমিনেন্সশান্স’-এর ‘মাতিনি দ্য ভয়েসে’ কবিতায় তিনি বলেছেন, তিনি এক আততায়ী।অন্যদিকে বোদলেয়ারের মতে অ্যাসাসিন শব্দটি এসেছে হ্যাশিশ থেকে। একাদশ শতকে মিশরে হাসান বেন সাবাহ মোমাইরি গুপ্ত ঘাতকের দলকে হ্যাশিশ খাইয়ে রাখা হতো। আর তাদেরকে বলা হতো হ্যাশিশিন। র‌্যাঁবো তাঁর রচনায় এমন এক আততায়ী, যে প্রতিদিন নিজেকে হত্যা করে।

আরেক রোমান্টিক কবি শেলীও ছিলেন তরল আফিমের নেশায় আটকে যাওয়া মানুষ। তিনি সম্ভবত অনুসরণ করতেন ফরাসী কবি বোদলেয়ারের পথ। বদলেয়ার একবার বলেছিলেন, ‘তোমাকে সব সময় নেশায় আচ্ছন্ন থাকতে হবে।এটাই একমাত্র পথ। অদ্ভুত সময়ের চাপে যখন বাঁকা হয়ে যাচ্ছে পিঠ তখন একমাত্র উজ্জ্বল উদ্ধার দিতে পারে নেশা।’

প্যারিসে ১৮৪৪ থেকে ১৮৪৯ সালের মধ্যে বোদলেয়ার স্থাপন করেছিলেন হ্যাশিশ ক্লাব। তিনি হ্যাশিশকে বলতেন সবচেয়ে কার্যকর নেশা। শুনলে চমকে উঠতে হবে বোদলেয়ারের সেই ক্লাবের নিয়মিত হাজিরা দিতেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী অলেকজান্ডার দ্যুমা।

যক্ষা রোগে আক্রান্ত ছিলেন রবার্ট লুই স্টিভেনশন। সঙ্গে ছিলো তার কোকেনের নেশা। তীব্র মাত্রায় কোকেন ব্যবহার করে তিনি মাত্র ছয় দিনে ৬০ হাজার শব্দে শেষ করেছিলেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘স্ট্রেঞ্জ কেস অফ ড. জেকিল অ্যান্ড মি. হাইড’। স্বামীর এসব কাণ্ডকারখানা দেখে তাঁর স্ত্রী ক্ষিপ্ত হয়ে পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন এই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অপরিমিত দেশী মদ পন করতেন। মদ তাকে ঠেলে দিয়েছিলো হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও আক্রান্ত পাকস্থলীকে রেহাই দেননি তিনি। হাসপাতালের ওয়ার্ডবয়দের দিয়ে গোপনে মদ আনিয়ে সেখানে বসে পান করতেন।

তাঁর অপ্রকাশিত ডায়েরিতে নিজেই লিখেছেন, ‘ভেবে চিন্তে স্থির করলাম কাজ যখন করতেই হবে, ৪টা নাগাদ `D’ (এখানে D মানে দেশী মদের সংক্ষিপ্ত রূপ) খেয়ে শুরু করি-খুব আস্তে আস্তে খাবো।’

আবার অন্য জায়গায় লিখছেন, ‘খালি পেটে বিনা জলে D খাওয়া বন্ধ।’

কলকাতা শহরে একদা খালাসিটোলা নামে শস্তার পানশালাকে রীতিমতো ধ্রুপদী মর্যাদায় নিয়ে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক কমলকুমার মজুমদার, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁরা তিনজনই প্রয়াত। কিন্তু তাদের আসক্তি এবং সুরা পানের নানান গল্পের উত্তরাধিকার আজো বয়ে বেড়াচ্ছে গোটা কলকাতা শহর।

বাংলাদেশের কবি বেলাল চৌধুরীর স্মৃতিচারণমূলক লেখায় পাওয়া যায়, কোনো এক রাতে শক্তি চট্টোপাধ্যায় মদমত্ত হয়ে এক বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছিলেন।ওই বাড়িতে শক্তিকে ঢোকানোর পর রাস্তায় হৈ চৈ শুনে গৃহকর্তা নেমে দেখেন চারজন ট্যাক্সিড্রাইভার দাঁড়িয়ে। তারা বকেয়া ভাড়া দাবি করছে কবির কাছ থেকে। পরে জানা গিয়েছিলো, মাতাল অবস্থায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় চারবার ট্যক্সি বদল করেছিলেন। চালকরা ভাড়া না পেয়ে তাকে অনুসরণ করতে করতে সেই বাড়িতে এসে হাজির। পরে অবশ্য সেই কবিবন্ধু চারজনের ভাড়াই মিটিয়ে দিয়েছিলেন।

বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন সাহিত্যিকের রচনায় এই নেশার আসক্তির কাহিনি উঠে এসেছে বিভিন্ন চরিত্রের হাত ধরে। কালীপ্রসন্ন সিংহের রচনাতে পাওয়া যায়— ‘মদ খাওয়া বড় দায় জাত রাখার কি উপায়’ রচনায় কালীপ্রসন্ন সংস্কার ও সংস্কার-মুক্তির দোলাচলের চিত্র তুলে ধরেছেন— ‘‘মদ্যপানে যে কেবল শরীর নষ্ট হয়, এমত নহে, শরীরের সঙ্গে বুদ্ধি ও ধনও যায়… বাঙালিরা মদ খাইতে আরম্ভ করিলে প্রায় মদে তাহাদের খায়’’।

ব্যক্তিজীবনে শিল্পী-সাহিত্যিকেরাও মদ্যপানে বিমুখ ছিলেন না।মাইকেল মধুসূদনের শৌখিনতা ও বিলাসের সঙ্গে মদ্যপানের আয়োজন কম ছিলো না। গিরিশচন্দ্র, অমৃতলাল থেকে শুরু করে শিশির ভাদুড়ী, প্রত্যেকেই পানে উৎসাহী ছিলেন। মধুসূদনের ‘একেই কি বলে সভ্যতা’য়় মদ্যপানের উৎশৃঙ্খল চিত্র রয়েছে। দীনবন্ধু মিত্রের  ‘সধবার একাদশী’তে নিমচাঁদের মতো চরিত্র সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মদ্যপানের অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ উভয় দিকেরই প্রতিফলন ঘটেছে। ‘সুরাপান নিবারণী সভা’য় নকুলেশ্বর নাম লেখাবে বলায় নিমচাঁদ বলেছে, ‘‘বাবা ব্রান্ডীর ভাঁটিতে না চোঁয়ালে তোমার ক্ষুধা হয় না, তুমি নাম লেখালে সাড়ে তিন হাত ভূমির মৌরসি পাট্টা নিতে হবে’’। নিমচাঁদ এ কথাও বলে, ‘‘মদ কি ছাড়বো। আমি ছাড়তে পারি বাবা, ও আমায় ছাড়ে কই? সে কালে ভূতে পেতো; এখন মদে পায়’’।

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কপালকুণ্ডলা’য় কাপালিকের কথা বাদ দিলে আমরা ‘বিষবৃক্ষ’-এ দেবেন্দ্রের মুখে যখন শুনি, ‘‘যদি স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ শুনি তাহা হইলে মদ ছাড়িবো’’, তখন আর এক বিপ্রতীপ জীবনের কথা উঠে আসে। আবার শ্রমিকজীবনে আনন্দ ও স্ফূর্তির জন্য মদ্যপানের প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসে। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকে ফাগুলাল চন্দ্রাকে বলেছে— ‘‘আমার মদ কোথায় লুকিয়েছ, চন্দ্রা?’’ শরৎচন্দ্রের রচনায় এই মদ্যপান প্রসঙ্গ যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। ব্যক্তিজীবনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মদ্যপানে আসক্ত ছিলেন। তবে, মদ্যপানের কুফলের কথাও তাঁর রচনায় খুঁজে পাওয়া যায়।

নিজেদের রচনায় মদ্যপান প্রসঙ্গ এবং ব্যক্তিজীবনে মদ্যপানের ক্ষেত্রে কোনও শতাব্দীতেই কবিরা পিছিয়ে ছিলেন না। জীবনানন্দের রচনায় আমরা পাই ‘‘রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ’’।

মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের নেশা আক্রান্ত জীবন নিয়ে আছে নানা গল্প। সমকামী এই কবি নেশার জন্য নাইট্রাস অক্সাইড এবং ম্যারিজুয়ানা সেবন করতেন। মনকে তীব্র অনুভুতিময় একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই গিন্সবার্গ ডুবে যেতেন এসব মারাত্নক নেশার আবর্তে।

আসক্তি নিয়ে সবচেয়ে মারাত্নক কথাটা উচ্চারণ করেছেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। তিনি বলেছেন,‘‘সেই পুরুষের অস্তিত্ত্বই নেই যে মাতাল নয়’’। হেমিংওয়ে শেষ জীবনে ভীষণ ভাবে মদের নেশায় আসক্ত হয়ে গিয়েছিলেন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ রাইটার রাইটার, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এডিকশন ব্লগ, আনন্দবাজার পত্রিকা।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]