নেশা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

শাহ্ রিয়ার খালেদ

۔
আবেদ সাহেব কাজ পাগল মানুষ। তিনি অফিসে যান সবার আগে আর বের হন সবার পরে। প্রথম প্রথম সহকর্মীরা জিজ্ঞেস করতো ফিরতে দেরী হবে কিনা। আজকাল আর কেউ জিজ্ঞেস করে না। আবেদ সাহেব এক কাঠি সরেস। তিনি বাড়িতে যাবার আগে দুটো ফাইল বগলদাবা করে নিয়ে যান।

বিয়ের পর বৌ ভেবেছিলো কাজ মনে হয় সত্যি বেশী। আবেদ সাহেব রাতের খাওয়া সেরে একটা পান মুখে দিয়ে ফাইল খুলে বসেন। বৌ অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে যায়। একদিন বৌ অনুযোগ করে। তারপর, একদিন অশ্রু ঝরায় দু’চোখে। আবেদ সাহেব যেন মজা পান এইসবে। একটা ডাবল পান মুখে দিয়ে তিনি ফাইল খুলে বসেন। তার মুখে প্রবল তৃপ্তির ছোঁয়া। কিন্তু এই সুখ বেশী দিন সইলোনা। সেদিন চোখের সামনে ফাইলটা তিনি উড়ে যেতে দেখলেন। তারপর পাতা গুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। বৌয়ের রণরঙ্গিনী মূর্তি দেখে তিনি ভয় পেলেন। সেদিন থেকে তার বাসায় ফাইল আনা বন্ধ

۔
ডিসেম্বরের স্কুল ছুটি চলছে। বাৎসরিক পরীক্ষা শেষে আবেদ সাহেবের বৌ ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি গিয়েছে। সারা বাড়ি খালি। তার বউ আগেই খাবার রান্না করে ছোট ছোট বাক্সে করে রেখে গেছে ফ্রিজে। আবেদ সাহেব শুধু গরম করেন আর খান। পুরনো অভ্যাসটা তাঁর ফিরে এসেছে। আবার বগলে দু’টো ফাইল নিয়ে তিনি বাড়ি আসেন। এমন সুখ তিনি অনেকদিন পান নি।

বাড়ি এসে খেয়েই তিনি একটা ডাবল পান মুখে চালান করে দিয়ে ফাইল খুলে বসেন। তার চা খাবার তেষ্টা পায়। তার স্ত্রীর নাম শিউলি। তিনি বলেন, শিউলি এক কাপ চা দিওতো। রান্না ঘরে আওয়াজ পাওয়া যায়। এক কাপ চা তাঁর বিছানার পাশ টেবিলে রাখা হয়। তিনি চায়ে চুমুক দেন। প্রতিটা চুমুকের সঙ্গে তাঁর মাথার জট খুলে যায়। হিসেবের ভুলটা তার চোখে পড়ে। তিনি আরো নিবিষ্ট হয়ে যান ফাইলে মুখ গুঁজে।

কিছুক্ষন পর আরেক কাপ চায়ের ফরমাশ করেন তিনি। আবার রান্না ঘরে চা বানাবার আওয়াজ পাওয়া যায়। আরও এক কাপ ধূমায়িত চা তার সামনে রাখা হয়। চায়ে চুমুক দিতে দিতে তিনি কাজে ডুবে যান।

۔
সকালে ঘুম ভাঙে আবেদ সাহেবের। বিছানার পাশে চায়ের কাপ দু’টো দেখে তিনি ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকেন। চা খাবার কথা তার স্পষ্ট মনে পড়ে। মনে পড়ে শিউলিকে চা বানাতে বলেছিলেন। কিন্তু শিউলি তো নেই। নিজেও চা বানাননি, তাহলে কোত্থেকে এলো। শিউলি নেই জেনেও তিনি এক চক্কর ঘুরে দেখলেন ঘরে। এমনকী রান্নাঘরে চা বানাবার আলামত পর্যন্ত নেই। অফিসের দেরী হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যান। কিন্তু কিছুক্ষন পরপরই চায়ের কথাটা মনে হতে থাকে তাঁর।

۔
আবেদ সাহেব যথারীতি আজও দু’টো ফাইল বগলদাবা করে বাসায় এসেছেন। বিছানার পাশে চায়ের কাপদু’টো তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে। তিনি অস্বস্থি বোধ করেন। মনকে অন্যদিকে সরাতে তিনি একটা পুরান দিনের গান ধরে গোসলে ঢোকেন। বের হয়ে যথারীতি খাবার গরম করে খেতে বসেন। গত দিনের থালাবাটি ধুয়ে একটা ডাবল পান মুখে দিয়ে বিছানায় ফাইল খুলে বসেন।

তার মন ডুবে যায় কাজে। শিউলি একটু চা দিওতো, নিজের অজান্তেই বলে ফেলেন তিনি। রান্না ঘরে চা বানাবার আওয়াজ পাওয়া যায়। একটু পর এক কাপ গরম চা তাঁর বিছানার পাশ টেবিলে ধোঁয়া ছড়ায়। চশমাটাকে নাকের উপর টেনে তিনি চায়ের কাপে চুমুক দেন। আহা চা তো না, যেন অমৃত। শেষ চুমুক দেবার আগে তাঁর মনে হয় শিউলি বাসায় নেই। ঝট করে তিনি চায়ের কাপ নামিয়ে রাখেন। দরজা থেকে কেউ কি সরে গেলো, না মনের ভুল।

তিনি বিছানা থেকে নেমে খাবার রুমে যাবার করিডোরে গেলেন। বসার ঘরের বাতি জ্বালালেন। রান্না ঘর, স্টোর রুম, গোসল খানা কোথাও বাদ রাখলেন না। সবগুলো ঘরে বাতি জ্বলতে লাগলো। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি মধ্যরাত পার হওয়া শান্ত নীরব বাসায় জোরে পাখা চালিয়ে দিয়ে আবেদ সাহেব রীতিমতো ঘামতে লাগলেন।

আবেদ সাহেব চা বানাতে জানেন না। কাপ পিরিচ কোথায় থাকে তাও তার সঠিক জানা নেই। রান্নাঘরের ভূগোলে তিনি বিশেষজ্ঞ নন বিশেষ অজ্ঞ। শিরদাঁড়া সোজা করে বিছানায় ঠায় বসে থাকেন তিনি। তার চোখ পড়ে থাকে ঘরের দরজার দিকে।

۔
পরদিন ঘুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে উনি ছুটলেন কাওরান বাজারে। সেখান থেকে বড় দুটি ইলিশ কিনে সরাসরি চললেন আরামবাগের শশুর বাড়ি।

কড়া নাড়তেই তাঁর শশুর নিজেই দরজা খুললেন। এতো সকালে তুমি, বলে একটু অবাক হয়েই ভিতরে আসতে বললেন। সালাম দিয়ে ভেতরের বসার ঘরে আসতেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো তাঁর শ্যালিকার। তাকে দেখেই কপালে চোখ তুলে মুখে ওড়না চেপে হাসি চেপে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করলো। ইতোমধ্যে তাঁর শাশুড়ী এসে দাঁড়িয়েছেন। মা দ্যাখো, আপুকে ছাড়া দু’দিনও থাকতে পারলোনা। শাশুড়িও হাসলেন মুখ টিপে।

নাস্তা খাবার পর্ব শেষ হলে স্ত্রীর হাত ধরে বসে রইলেন তিনি। স্ত্রী মনে মনে খুশী হলেও কপট রাগ দেখিয়ে গম্ভীর হয়ে রইলেন। শেষপর্যন্ত ঠিক হলো ছেলেকে নানা নানুর কাছে রেখেই তাঁরা বাসায় যাবেন।

۔
বাসায় এসে আবেদ সাহেব সব ভুলে গেলেন। খালি বাসায় শুধু তাঁরা দুইজন। ঠিক বিয়ের পর পর নতুন দম্পতির মতো। তাঁর স্ত্রীর মাঝেও একই অনুভূতি কাজ করলো। রান্না ঘর ঘুরে আসতে আসতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, চা খাবে? তারপর শোবার ঘরে পা দিতেই নজর পড়লো চায়ের কাপের দিকে। বাহ্! বেশ চা বানাতে শিখে গ্যাছো, এখন থেকে আমাকেও মাঝে মাঝে বানিয়ে খাওয়াবে, কেমন? আবেদ সাহেব সত্য কথাটা বলতে পারলেন না। আবার চা বানানো অস্বীকার করতেও তাঁর কোথায় বাঁধলো। হ্যাঁ, এই আর কি, বলে মাঝামাঝি একটা উত্তর দিলেন। পর্দাটা একটু দুলে উঠলো। তাঁর মনে হলো দরজার ওপাশে সরে গেলো কেউ। একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো তার শিরদাঁড়া বেয়ে।

চায়ের কাপটা নিয়ে আসোতো, রান্না ঘর থেকে তাঁর স্ত্রীর গলা শোনা গেলো। হ্যাঁ আনছি, বলে আবেদ সাহেব কাপটা পিরিচ সহ তুলে নিলেন। হঠাৎ করেই কাপটা যেন একটু দুলে উঠলো তারপর ভেসে উঠলো পিরিচ থেকে শূন্যে। গতরাতের না খাওয়া অবশিষ্ট চা যেন কেউ উপুড় করে দিলো তাঁর মাথায়। তারপর ঠক করে চায়ের কাপটা নেমে এলো পিরিচে।

দরজার পর্দা কি আবার একটু দুলে উঠলো? আবেদ সাহেব দাঁড়িয়ে থাকলেন স্তম্ভিত হয়ে।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]