নৈরাশ্য ও আজকের সমাজ

ঊর্মি রহমান

(কলকাতা থেকে): সকালে খবরের কাগজ পড়লে মন ও মেজাজ, দুই’ই খারাপ হয়ে যায়। রাজনীতির কচকচানি। রাজনীতিকদের শিশুসুলভ প্রতিযাগিতা। সেসব এখন গা সওয়া হয়ে গেলেও একটা বিষয় কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না, সেটা হচ্ছে, মানুষের হার মানা। চারপাশে কত কিছু ঘটছে, কিন্তু কিছু মানুষকে এসব কিছুই স্পর্শ করে না। তারা তাদের নিজস্ব জগতে থাকে এবং তাতে এতটুকু ব্যাঘাত ঘটলে তাদের পৃথিবী ওলোট-পালোট হয়ে যায়। তারা সেটা মেনে নিতে পারে না।
এখানে একটি ঘটনার কথা বলি। আমি একদিন সকালে বারান্দায় গিয়ে দেখি নিচে অনেক মানুষ এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে আর জায়গাটা ঘিরে ফেলা হচ্ছে। প্রথমে কিছু বুঝতে পারলাম না কি ঘটছে। পরে ঝুঁকে পড়ে নিচে দেখলাম এক মহিলা সেখানে পড়ে আছেন। ঠিক আমাদেও বারান্দার নিচে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন এক বছর পঁয়ত্রিশের মহিলা। পুলিশ এলো। মৃতদেহ নিয়ে চলে গেলো। পরে জানতে পারলাম, ওই মহিলা অবসাদে ভুগছিলেন, তিনি ১৭ তলা থেকে ঝাঁপ দেন। এখানে উল্লেখ্য, আমরা বহুতল দালানে থাকি এবং এই আবাসনে এরকম ৩৬ তলার চারটি দালান আছে। আর পঞ্চমটি অত উঁচু না হলেও ১৬ তলা। এখানে এই ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার ঘটেছে। সবচেয়ে যে ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল, সেটা এক বৃদ্ধা মা ও তাঁর দুই প্রৌঢ়া কন্যার আত্মহত্যার ঘটনা। তাঁরা এখানে থাকতেনও না। আর বড় মেয়েটি ছিলেন পরিবেশবিদ, কোন একটি খেলায় চ্যাম্পিয়ন। তাঁর বেঁচে থাকার যথেষ্ট কারণ ছিলো। নবতিপর বাবা মারা যাওয়াতে তাঁরা এই পথ বেছে নেন।
আজ কাগজ খুলে দেখি শহরের এক নামী ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের এক ছাত্র পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবার জন্য আত্মহত্যা করেছে। তার পরিবার শিক্ষিত সচ্ছল। শোনা গেছে তার পরীক্ষার খারাপ ফলের জন্য তাকে কেউ বকাবকিও করেনি। তবে এর চেয়ে অনেক বেশী তুচ্ছ কারণে নিজের জীবন নিয়ে নেবার ঘটনার কথাও জেনেছি। সর্বক্ষণ স্মার্টফোন নিয়ে মেতে থাকার জন্য অভিভাবকদের বকুনিতে অভিমানে আত্মহত্যা করেছে, এরকম অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ের কথা কাগজে পড়েছি। প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে ঝগড়া বা বিচ্ছেদ এই পথ নেবার কারণ হতে পারে। আরো তুচ্ছ কারণে জীবন শেষ করে দেবার সময় কি একবারও আর কিছু বা কারো মুখ মনে পড়ে না? এর পিছনে কারণ কি জানি না। নিশ্চয়ই গূঢ় কোন কারণ, প্রবণতা বা সামাজিক সমস্যা আছে। আগে কখনা কখনো রেগে বলতাম, আত্মহত্যা যারা করে তারা কাপুরুষ। কিন্তু এক বন্ধু বললো, স্বেচ্ছায় মরে যাবার জন্য কিন্তু প্রচণ্ড সাহস দরকার হয়। তাই কি? এ এক ধরণের উন্মাদনা। উন্মত্ততা। খুব খারাপ লাগে যখন সংবাদপত্রেরর পাতায় তাদের ছবি দেখি। ফুটফুটে এসব কচি মুখ দেখে আমারই এত কষ্ট লাগে, তাদের মা-বাবা কিংবা আপনজনদের কতটা খারাপ লাগতে পারে তাই ভাবি। পশ্চিমবঙ্গে থাকি বলে শুধু এখানকার খবরই চোখে পড়ে। এ ধরনের খবর সংখ্যায় প্রচুর। মাঝে মাঝে ভাবি. অন্য রাজ্যেও কি এত বেশী সংখ্যায় অতি তুচ্ছ কারণে আত্মহননের ঘটনা ঘটে? কিন্তু কেনই এমনটা হবে। মূল্যবান জীবন শেষ করে দেবার সময় কি একবারও মনে পড়ে না, জীবনকে রিওয়াইন্ড করে ফেরানো যায় না! একবার চলে গেলে আর ফেরানো যায় না।
আমার নিজের জীবনেও ঝড়-ঝাপ্টা কম যায়নি, কিন্তু খুব দুঃসময়েও এমন কিছু করার কথা মনে হয়নি। বরং সবসময় মনে হয়েছে জীবন বড় সুন্দর। খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে যখন দেখি পূব আকাশে রঙ ছড়িয়ে সূর্য উঁকি মারছে; নদীর পাড়ে গিয়ে বসলে প্রবহমান সেই অপরূপ সৌন্দর্য্যে শুধু দু’চোখ নয়, সারা মন ভরে যায়; বৃষ্টির ফোঁটা যখন বাড়ির সামনের ঝিলের পানিতে পড়ে অথবা রোজ সকালে চড়–ই পাখিরা বারান্দায় রেখে দেওয়া বিস্কুট খেতে আসে, তখন তাদের দেখে নতুন করে মনে পড়ে জীবন বড় সুন্দর। বেঁচে থাকাটাও খুব আনন্দময়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক (বিবিসি)

ছবিঃ প্রাণের বাংলা