নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই ও বাংলার অসংখ্য মালালারা

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ

দিন যায় ,দিন আসে ।সপ্তাহ যায় ,সপ্তাহ আসে ।যদি প্রশ্ন আসে, কড়া নেড়ে চলে যাওয়া গত সপ্তাহের সবচেয়ে বড় খবর কি ছিল ? জানি পইপই করে আমরা বলে বসবো, আন্ডারডগ ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপে ফাইনালিষ্ট হওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় খবর ।আর কি কোন বিশেষ খবর ছিল ? ছিল কি আমাদের মনন এবং চৈতন্যের দ্বার কাঁপিয়ে দেয়া বিশেষ কোন দিবস ? হ্যা, ছিল । ১২ জুলাই ।মালালা ইউসুফজাইয়ের জন্মবার্ষিকী ।এই দিনটি মালালা দিবস হিসেবে বিশ্বের অনেক দেশেই পালন করা হয় ।আমাদের ম্যাড়মেড়ে জীবনে বিশ্বকাপ ফুটবল আনন্দের বন্যা বইয়ে দিয়েছে ।ফলে চাপা পরে গেছে অনেক গুরুত্ববহ দিবস ।তেমনই চাপা পরেছিল বিশ্ব মালালা দিবস । অথচ বিশ্বের সবচেয়ে সন্মানজনক পুরস্কার হিসেবে পরিচিত নোবেল পুরষ্কার তাঁকে দেয়া হয়েছে । বিশ্বশান্তিতে তাঁর অবদানের জন্য তিনি পুরস্কৃত হন ।তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির খবরটি বেশ পুরোনো । আফগান এই কিশোরী রক্ষণশীলতার কঠোর পর্দাকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চশিক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যান ।ধর্মান্ধ তালেবানরা এটা মানতে পারে নি ।তাকে গুলি করা হয় ।সৌভাগ্য ক্রমে প্রাণে বেঁচে যান।তারপরেও তিনি শিক্ষাগ্রহণ বন্ধ করেন নি ।বিষয়টি সত্যি মহৎ ।তাই জঙ্গীবাদ- ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধ বাতাসে দাঁড়িয়ে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাঁর কাজটির ক্যানভাস অনেক বিশাল ।তাই ,সবার মত আমরাও মালালার নোবেল প্রাপ্তিতে খুশীই হয়েছি ।

মাত্র সত্তর বছর আগেই বাংলা নামের জনপদটি ছিল ব্রিটিশ শাসিত ।ধূর্ত ইউরোপীয়রা তাদের শাসন নিশ্চিত করতে দুই প্রধান জনগোষ্ঠী হিন্দু –মুসলমানের মাঝে অবিশ্বাস ও বিভেদ লাগিয়ে দেয় । মুসলিম জনগোষ্ঠী শিক্ষা –দীক্ষা –শিল্প –সংস্কৃতি –বিজ্ঞান মুক্তচিন্তা চর্চায় পিছিয়ে পরে ।ব্রিটিশের জগদ্দল পাথর সরাতে না সরাতেই পূর্ব বাংলার বাঙালিদের পাকিস্থান সৃষ্টির খোয়াব খান খান করে ভেঙ্গে পরলো।ধর্মীয় রক্ষণশীলতার নামে প্রগতির চাকাকে আরও পিছিয়ে নেয়া হল ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের উপর দাঁড়িয়ে সারাবিশ্বে নারীপুরুষ নির্বিশেষে নতুন কল্যাণকামী বিশ্ব বিনির্মাণের বিপুল কর্মযজ্ঞ শুরু করে ,সেই চলমান ধারার সঙ্গে একই লয়ে চলতে কোটি কোটি বঙ্গকন্যাকে বাঁধা দেয়া হয় ।ফলে রন্ধনশালাই হয়ে উঠে তাঁদের একমাত্র কর্মক্ষেত্র ।যদি কেউ শিক্ষার আলোর জন্য দুয়ার উন্মুক্ত করতে চাইতো তৎক্ষণাৎ তা বন্ধ করবার জন্য অসংখ্য কালো হাত সেটি রুদ্ধ করে দিত । ফলে মুসলিম নারীরা অন্তঃপুর বাসিন্দা হওয়ায় দেশ গঠনের মূলধারার থেকে ছিটকে পড়েন ।এগিয়ে এলেন বেগম সাখাওয়াত । এই বাংলায় নারী জাগরণে তাঁকেই অগ্রদূত ধরা হয় ।শিক্ষার আলো বঞ্চিত নারীদেরকে জাগানোর বিষয়টি সহজসাধ্য ছিল না ।দীর্ঘদিন গভীরে প্রোথিত জগদ্দল পাথর যে অচলায়তন সৃষ্টি করেছিল সেটিকে সরিয়ে মুক্তধারা বইয়ে দিতে বেগম রোকেয়াকে কণ্টক বিছানো দীর্ঘপথে হাঁটতে হয়েছিলো ।তাঁর পা হয়েছিল রক্তাক্ত ,ক্ষতবিক্ষত ।একজন নারীকে যতটুকু অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করা যায় সবই তখনকার সমাজপতিরা তাঁকে করেছিল ।কিন্তু ,তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে রক্তচক্ষু অবদমিত হয়েছিল ।তিনি বাঙালি মুসলিমের প্রধান সমস্যাটি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন ।আর সেটি ছিল শিক্ষার আলোর অভাব ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী ছাত্রী হবার সৌভাগ্য ছিল লীলা নাগের ।প্রথম নারী শিক্ষিকা ছিলেন করুণা কণা মিত্র ।তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব ছিল ইলা মিত্রের হাতে । মাষ্টারদা’ সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে ইংরেজদের ক্লাবে হামলা এবং ধরা পরবার পর সায়ানাইড খেয়ে আত্মহননের এর গৌরব গাঁথা রচনা করেন প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদার ।এইসব সাহসী কাজে মুসলিম নারীদের প্রতিনিধিত্ব সামান্যই ছিল ।

কিন্তু , রক্ষণশীলতার প্রশ্নে পর্দাপ্রথার দোহাই দিয়ে সমাজপতিদের স্পর্শকাতরতা আর একগুঁয়েমির মাসুল দিতে যেয়ে মুসলিম নারীরা উল্লেখ করবার মত অগ্রসর হতে পারলো না ।শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির উজ্জ্বল্যের প্রশ্ন আসে ।সংগীত জগত এবং চলচ্চিত্র জগত বিকাশে নারী চরিত্রের দারুণ আকাল দেখা গেল। পুরুষরা নারী সেজে অভিনয় করত।অগত্যা নিষিদ্ধ পল্লী থেকে গায়িকা এবং নায়কাদের ‘আমদানী’ করতে হয়েছিলো ।এরপরেও যারা এক’পা দু’পা করে শিল্প –সংস্কৃতির পাড়ায় আসেন তাদের মধ্যে মুসলিম নারীর সংখ্যা ধর্তব্যের মধ্যে পরে না ।বিরুদ্ধ বাতাসে দু’একজন এলেও তারা বৈরী পরিবেশের ঝঞ্ঝায় আবার অন্তঃপুরে ফিরে যেতে বাধ্য হলেন ।

আমাদের নারী ক্রিকেট দল

পরের গল্প আমাদের সবারই কম-বেশী জানা ।বেগম রোকেয়ার হাতে শিক্ষার অন্ধত্বের অচলায়তন ভাঙ্গলো । কিন্তু, নারীর শিক্ষাগ্রহনের তৃষ্ণা থামেনি ।এলেন আরেক মহীয়সী নারী ‘বেগম সুফিয়া কামাল ।‘ তখন নারীদের জন্য পত্রিকার বিশেষ দরকার হয়ে পড়লো ।‘বেগম’ পত্রিকাটি নূরজাহানের হাতে আলোর মুখ দেখলো ।এই পত্রিকা মূলত শিক্ষিত মুসলিম নারীদের সাহিত্য চর্চার একমাত্র চারণ ক্ষেত্র হয়ে উঠলো ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণের ইতিহাস লিখতে গেলে জাহানারা ইমামের নাম অনিবার্য ভাবে আসবে ।যুদ্ধের ধর্মই কাউকে মারো বা না হয় নিজে মরো ।তাই নিজ সন্তানদেরকে নিজহাতে রণসাজে সজ্জিত করে যুদ্ধে পাঠানো বিশাল আত্মপ্রেষনার বিষয় ।সেই কাজটি করে তিনি প্রকৃত উচ্চশিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত মায়ের গৌরবময় কাজটিই করেছেন ।মহান এই কাজটির বেদীমূলে আরো লুকানো ছিল পরবর্তী প্রজন্মের হাতে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়া ।দেশের মোট নারী জনসংখ্যার অধিকাংশই পল্লীবাসী । বঙ্গনারীদের শিক্ষাগ্রহণ মূলত নগরকেন্দ্রিক বনেদী মুসলিম পাড়ার চৌহদ্দিতে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগুতে শুরু করলেও সেখান থেকে মুক্তধারা বাংলার গ্রামে-গঞ্জে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া একান্ত দরকার হয়ে উঠলো । নজরুল বলেছিলেন’ আমপারা পড়া হামবড়া মোরা’ ।শুরু হল ফতোয়া দেয়া ।যে দেশের সংবিধান দুইলক্ষ নারীর সম্ভ্রমের বেদনার উপর রচিত সেখানেও দেশের আইন –আদালতকে উপেক্ষা করে ‘ফতোয়াবাজি’ চললো । অপরিণত বয়েসে বিয়ে দিয়ে শুধু শিক্ষার দ্বারই রুদ্ধ করবার চেষ্টা চলেনি বরং নারীর মনোদৈহিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক ঝুঁকিও ডেকে আনা হলো । আশির দশকে ‘নূরজাহান’ এর ঘটনা আমাদের বিবেককে শিউরে দিয়েছিল ।এই ঘটনার ছায়া নিয়ে কথা সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন রচনা করেন ‘নূরজাহান’ ।কিন্তু ,শিক্ষার ‘নূর ‘প্রত্যাশা অনুযায়ী বিস্তার করা পুরোপুরি সহজ করা যায় নাই ।

‘রংবাজ’ জাতীয় ছায়াছবি অনেক উঠতি বয়সের কিশোর –তরুণদের আইকন হয়ে উঠলো ।এরা স্কুল ,কলেজের কাছে সিটি বাজায় ,মেয়েদের পথ আগলে দাঁড়ায়, অশ্লীল দেহভঙ্গিমা করে ।ক্ষমতাধরদের পুত্ররা আরও দুর্বিনীত হয়ে উঠলো ।শুরু হল এসিড সন্ত্রাস ।নিম্নবিত্ত ,মধ্যবিত্ত,উচ্চবিত্ত সব স্তরের নারীরাই প্রেমপ্রার্থী ‘রোমিওদের ‘ এসিড সন্ত্রাসের শিকার হলো ।বাড়িতে বাড়িতে এসিড ছুড়বার হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানো হলো ।ভয়ে অনেক অভিভাবক তাদের কিশোরী এবং তরুণী কন্যাদের স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন ।আবার শ্লথ হল রাঙ্গা আলোর হাতছানিতে পথচলা ।

অন্ধকারের শক্তি পথ যেন ছাড়েই না ।‘ধর্ষণ ‘এর ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা ইলেকট্রনিক ,প্রিন্ট মিডিয়া আর সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ছেয়ে গেল ।শুধু ঘরবাড়িতেই নয় ,এমন কি চলন্ত বাসে এমন ঘৃণ্য ঘটনা ঘটলো ।আমরা গভীর হতাশা নিয়ে দেখলাম ,এই ঘটনার সঙ্গে শুধু অপরিচিত/অল্প পরিচিতজনেরাই নয় মামা-চাচা গোত্রের নিকটাত্মীয় এমন কি বাবার দ্বারা নিজ কন্যা ধর্ষণের কুৎসিততম ঘটনাও শোনা গেল ।

সময় কালে কুৎসিত হলো মেয়ে শিশুদের উপর নির্যাতন ।এ যেন আইয়ামে জাহিলিয়াতের চিত্রকল্প ।নির্যাতিত অনেক শিশু রক্ষক্ষরণসহ নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুও বরণ করলো ।

এত ভয়ংকর ভয়ংকর সব বাঁধা পেরিয়েই বাংলার মেয়েরা এতদূর এসেছে ।রাজনীতির মত কঠিন অঙ্গনের শীর্ষ স্থানেও নারীর ক্ষমতায়ন আমাদের আনন্দিত করে ।সামরিক বাহিনীতে অফিসার এবং সৈনিক পদেও নারীরা নিজ যোগ্যতায় স্থান করে নিয়েছেন । জনপ্রশাসন ,বিচার বিভাগ ,বিভিন্ন ক্যডার ,কর্পোরেট জগতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ আমাদের আশান্বিত করলো ।শিক্ষকতা আর চিকিৎসা বিজ্ঞানে যেন নারীদেরই একচ্ছত্র অধিকার দেখা গেল ।আমাদের রাষ্ট্রের অর্থনীতির অন্যতম বুনিয়াদ গার্মেন্টস সেক্টর ।‘সেলাই দিদিমণিরা’ এই সেক্টরের পিদিম প্রায় একাই জ্বালিয়ে রেখেছে ।পর্বত জয়ের মত দুর্গম কাজে সাফল্য দেখালো বঙ্গনারীরা । ক্রিকেট ও ফুটবলের মত বহিরাঙ্গন খেলায় আশাতীত সাফল্য আনলো প্রমীলা খেলোয়াড়েরা ।

মালালাকে যেমন রক্ষণশীলতাকে চ্যলেঞ্জ করে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়েছে ,বাংলার উচ্চবিত্ত,মধ্যবিত্ত ,নিম্নবিত্ত সকল পর্যায়ের নারীদেরকেও তেমনই অপশক্তির বিরুদ্ধে শৈশব থেকে উচ্চতর পর্যায়েও শিক্ষা গ্রহণের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন লড়াই করেই নিজ অবস্থানে আসতে হয়েছে ।তাই শিক্ষার আলোর পথযাত্রী কোটি কোটি লড়াকু বঙ্গকন্যারা এক এক জন মালালা ।ফুটবলের ডামাডোলে চাপা পড়া মালালা ইউসুফজাই দিবসে বিলম্বে হলেও তাঁকে এবং বাংলার সকল মালালাকে টুপি খোলা অভিনন্দন জানাই ।

ছবি: গুগল

লেখক: (উপ অধিনায়ক ,আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরটরী)