পঁচাত্তরে পা রাখলো গণনাট্য সংঘ

ঊর্মি রহমান

একটি ব্যক্তিগত কথা দিয়েই আজকের লেখা শুরু করছি। ডিসেম্বরের ২০ তারিখ আমার বাবার ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর কাছেই আমার মূল `xক্ষা পাওয়া। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, প্রগতিশীল ভাবনা সমস্তই তিনি আমাদের তিন বোনকে দিয়ে গেছেন। তিনি কোন ক্লাস নেননি, বসে লেকচারও দেননি। কিন্তু গল্প বলেছেন প্রচুর। সেসব গল্প থেকেই আমরা আমাদের জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করে নিয়েছি। তাঁর কাছেই প্রথম শুনেছি নবান্ন নাটকের কথা ও তার পটভূমি। ফসল কাটাকে কেন্দ্র করে বাংলার লোক-সংস্কৃতি উৎসব নিয়ে বিজন ভট্টচার্য্য রচিত এই নাটক আসলে ১৯৪৩ সালের বাঙলার দূর্ভিক্ষের কথাই বলেছিলো।মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা বলেছিলো। বড় হয়ে নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধে, আলাপ-আলোচনায় এই নাটকের কথা পড়েছি ও শুনেছি। এক সময় মনে হত কেন সেই সময় জন্মালাম না?
ভেবেছিলাম গণনাট্য সংঘের কোন অস্তিত্ব হয়তো আর নেই। কলকাতা এসে বসবাস শুরু করার পর জানলাম আমার ধারণা ভুল। শুধু যে আছে, তাই নয়, এ বছর ভারতীয় গণনাট্য সংঘের ৭৫তম বার্ষিকী উদযাপন করা হচ্ছে। এই উপলক্ষ্যে কলকাতা শহরে নানা অনুষ্ঠান চলছে। পাঠকদের অনেকেরই জানা, এই সংগঠনের পথ চলা শুরু হয় ১৯৪২ সালের ২৫শে মে। এর পটভূমি ছিলো ঔপনিবেশিক দমন নীতি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং এটি প্রতিষ্ঠিত হবার পর পরই বাংলায় দূর্ভিক্ষ দেখা দেয়। অনাহারে মানুষ মারা যেতে থাকে। সেই সময়ই শুরু হয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন। একদিকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর অন্যদিকে ব্রিটিশ সাম্রজ্যিবাদের বিরুদ্ধাচরণ। আর এসব প্রতিবাদ ছিলো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। গণনাট্য সংঘের ইংরেজি নাম Indian People’s Theatre Association বা IPTA. প্রথম দিকে এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন পৃথ্বীরাজ কাপুর, বিজন ভট্টাচার্য, ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত, খাজা আহমেদ আব্বাস, সলিল চৌধুরী, পণ্ডিত রবি শংকর, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, শম্ভু মিত্র, অহিন্দ্র চৌধুরী, শেখর চট্টোপাধ্যায়, নিরঞ্জন সিং মান, এস. টেরা সিং চান, জগদীশ ফরিয়াদি, খলিল ফরিয়াদি, রাজেন্দ্র রঘুবংশী, সফদার মীর, অমিয় বসু প্রমুখ।  
চল্লিশের দশকে এই সংগঠন যখন শুরু হয়, তখন এটি ছিলো ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা। এখন এটি সিপিআই ও সিপিএম-এর সাংস্কৃতিক শাখা। ভারতের স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর গণনাট্য সংঘ শিল্প-সংস্কৃতির অন্যান্য বিভাগে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর সদস্যরা সংগঠনের আদর্শ বহন করে চলেছেন। সেই সময় শম্ভু মিত্র-তৃপ্তি মিত্র গঠন করেন বহুরূপী নাট্যদল। দিল্লিতে পথ নাটক করে যারা পরিচিতি পেয়েছে, সেই জন নাট্য মঞ্চ তৈরী হয়েছে গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ থেকে। ঋত্বিক ঘটক গণণাট্য সংঘের নাটকের দলবলকে কেন্দ্র করেই নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র কোমল গান্ধার। তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্র প্রদেশে আছে জন নাট্য মণ্ডল। কর্ণাটকে সমুদয়া। পশ্চিম বঙ্গের ২৩টি জেলায় ২৩৮টি শাখা রয়েছে। যেমন পরিচয়, হাওড়া; নান্দনিক, হুগলী; সাম্প্রতিক, উত্তর ২৪ পরগণা; স্পন্দন, কলকাতা; বেদূইন, হাওড়া; কৃষ্টি সংসদ শাখা, পশ্চিম মেদিনীপুর; উত্তরসূরী, হাওড়া; ইস্পাত, দূর্গাপুর; গণকণ্ঠ, বীরভূম; সূর্যসেনা, পূর্ব মেদিনীপুর, সুষ্টি শাখা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, ইত্যাদি। এই শেষোক্ত শাখাটিতে আছে আমার ঘনিষ্ঠ, অনুজপ্রতিম বন্ধু সোমা চন্দ।
গণনাট্য সংঘের ৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বিভিন্ন শাখা। দমদমে হয়ে গেল তিনদিনব্যাপী অঙ্গন নাটক উৎসব। এছাড়া সেমিনার, সঙ্গীতানুষ্ঠান ইত্যাদিসহ বছরভর অনুষ্ঠান চলছে। কলকাতা জেলা কমিটি ছ‘দিন ব্যাপী উৎসবের আয়োজন করেছে। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিনয় রায়, সলিল চৌধুরীর গণনাট্যের গান ছাড়াও অভিনীত হবে ব্রেখটের ফিয়ার অ্যান্ড মিজারি অব থার্ড রাইখ নাটকটি।
সৃষ্টি শাখার সোমা চন্দ আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা, কলকাতা গ্রুপের সদস্য। আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ। ওর কারণেই ওদের শাখার বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে যাবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। গান শোনার আনন্দের পাশাপাশি মন ভরে গেছে সংগঠনের সকলের নিষ্ঠা ও টীমওয়ার্ক দেখে । আমি নিশ্চিত গণনাট্য সংঘের প্রতিটি শাখার কর্মীদের মধ্যেও অনেক বছর আগের সেই আদর্শ ও দেশপ্রেম সেরকমই রয়েছে।

ছবিঃ গুগল।