পটল পাতুরি, সর্ষে বাটায় পটল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্মৃতি ভদ্র

আমাদের পাড়ায় রাস্তার এপাশ ওপাশে ছিলো বেশ অনেক তাঁতঘর। তাঁতঘরকে বলা হতো কারখানা। হাতে চালানো তাঁতের কারখানা। সকাল হতেই ঠাকুমার পুজার ঘন্টার সঙ্গে তাঁতের মাকুরের খটাশ খটাশ শব্দ মিলে চারপাশ কেমন জেগে উঠতো।

গোলেনুর দাদীর বাড়ির উঠোনে হতো সুতো রং আর ববিনে সুতো ভরার কাজ। চরকা ঘুরিয়ে ববিনে রঙ বেরঙের সুতা ভরা দেখা ছিলো আমার খুব প্রিয় একটি কাজ। আর তা হবেই বা না কেন, সুতো ভরতে গিয়ে ববিন ভেঙে গেলে বা সুতো ছিড়ে গেলেই ববিনটি আমার হয়ে যেতো যে।আর তা যদি হয় সোনালী বা রূপালী জড়ির ববিন, তাহলে তো কথাই নেই।

ও ঠাকুমা, আজ আমাকে বিদেশী পুতুল বানিয়ে দিবা। দেখো, পুতুলের চুলের জন্য জড়ির ববিন এনেছি।

বিদেশী একটাই পুতুল ছিলো আমার, সাহেব কাকুর দেওয়া। সেটাকে দাঁড় করালে চোখ খুলতো আর শুইয়ে দিলে চোখ বন্ধ করে ফেলতো। কিন্তু মনিপিসি সেই পুতুলটা হারিয়ে ফেলবো বলে বড়ঘরের উপরতলায় কাঠের বাক্সে লুকিয়ে রাখতো।

আমাদের বড়ঘর ছিলো টিনের দোতলা। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উপরের ঘরে যেতে হতো। উপরের ঘরের ছোট্ট ছোট্ট জানালা দিয়ে যতটুকু আলো আসতো তাতে সে ঘরের অন্ধকার খুব একটা কাটতো না। তাই এখানে ওখানে চাপ চাপ অন্ধকার জড়িয়ে থাকতো কাঠের পাটাতনে। কতগুলো কাঠের বাক্স, বিভিন্ন রকম আচারের বয়াম, ধান চাল আর নানারকম শস্যের ডুলি থাকতো সে আবছা অন্ধকার ঘরে।কাঠের বাক্সগুলোর কোনোটাই লেপ কাঁথা আর কোনোটাই কাঁসা পেতলের বাসন।

বড় সেসব বাক্সের ডালা আমি খুলতে পারতাম না। তাই ঠাকুমা উপরতলায় গেলেই আমি পিছু নিতাম, ও ঠাকুমা আমার বিদেশী পুতুলটা খুঁজে দাও।

সব কাজ ফেলে ঠাকুমা কাঠের বাক্সের ডালা খুলতো। লেপ কাঁথা সরিয়ে খুঁজতো আমার বিদেশী পুতুল। না নেই, কোথাও নেই আমার বিদেশী পুতুল। মনিপিসিটা আমার পুতুল কোথায় রাখলো?

আমার মন খারাপ হতে দেখেই ঠাকুমা বলে ওঠে, বিদেশী পুতুল বানানো খুব সোজা,দিদি। আমি চোখে আনন্দ নিয়ে ঠাকুমার দিকে তাকাই, ঠাকুমা তুমি বানিয়ে দেবে? ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে ঠাকুমা বলে, বানিয়ে দেবো সোনালী চুলের বিদেশী পুতুল।

আমার খুশী আরোও কয়েক গুন বেড়ে যেতো পাথরের বয়াম থেকে বরইয়ের মিষ্টি আচার হাতের তালুতে পেয়ে।

সে আচার চেটে খেতে খেতেই আমি চলে যেতাম গোলেনুর বাড়ির উঠোনে। পুতুলের সোনালী চুলের হদিশ একমাত্র সে উঠোনেই মেলে।

ভাঙা সোনালী জড়ির ববিন নিয়ে যতই বায়না ধরি না কেন, ঠাকুমার এখনকি উনুন কামাই দেবার সময় আছে? আজ যে সোমবার, বাঘকাকু ( আমার এই কাকু খুব রাগী ছিলেন, তাই তাঁকে বাঘকাকু ডাকতাম) দুপুরের খাবার খেয়ে কাপড়ের হাটে যাবে। কাপড়ের গাঁট বাঁধা ততক্ষণে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

ব্যস্ত ঠাকুমা ঝুরঝুরে আলু ভাজি তেল থেকে উঠিয়েই পটল পাতুরি রান্নার প্রস্তুত নেয়।

ছুলে রাখা আস্ত পটল হলুদ লবণ মাখিয়ে লাল করে তেলে ভেজে নেয় সবার আগে। এরপর সেই তেলেই ডুমো করে রাখা আলুও একইভাবে ভেজে নেয়। মা ততক্ষণে কাঁচামরিচ আর লবণ মিশিয়ে হলুদ সর্ষে পাটায় বেটে ফেলেছে চন্দনের মতো করে।

ঠাকুমা কড়াইয়ে আরেকটু তেল দেয়। এরপর সর্ষে বাটায় অল্প জল মিশিয়ে ঢেলে দেয় কড়াইয়ে। খোন্তা দিয়ে নাড়তে থাকে ঠাকুমা তেলের ভেতর সর্ষে বাটা। কড়াইয়ের ভেতর ধোঁয়া ঘুরপাক খেয়েই উনুনের সামনের জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়। ঠাকুমা হলুদ দিয়ে একটু নেড়েই শুকনো মরিচ বাটা দিয়ে দেয়। এরপর আরেকটু জল ছিটিয়ে কষিয়ে নেয়। সর্ষে থেকে তেল ছেড়ে এলেই ভাজা পটল আর আলু দিয়ে নেড়েচেড়ে আন্দাজমতো জল দিয়ে ঢাকনা দিয়ে দেয় ঠাকুমা। উনুনের মুখ থেকে একটি গনগনে খড়ি বের করে আঁচ ঢিমে করে।

এরপর ঠাকুমা তাড়াহুড়ো করে বাগানে যায়। ফিরে আসে কয়েকটি কুমড়ো ফুল হাতে নিয়ে।

মা’র ততক্ষণে আতপ চাল বাটা হয়ে গেছে।

বাটা আতপচালে অল্প একটু আটা, হলুদ, লবণ , কালোজিরা মিশিয়ে ব্যাটার করে নেয় ঠাকুমা।

পটল পাতুরির ঢাকনা তুলে গা মাখা সর্ষে বাটায় অল্প চিনি মিশিয়ে কড়াই নামিয়ে নেয় ঠাকুমা।

এরপর কুমড়ো ফুল দু’একটি ভাজতেই রান্নাঘরের বারান্দায় পিঁড়ি পড়ে বাঘকাকুর জন্য।

দেবদারু গাছের তলা দিয়ে ভ্যানরিক্সায় কাপড়ের সাদা গাঁট যখন চলে যায় কাপড়ের হাটে, তখনো সোনালী জড়িতে কাপড়ের পুতুলের চুল বানাতে বাইরবাড়ির বারান্দায় ঠাকুমা আর আমি হিমশিম খাচ্ছি।

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]