পতিতাপল্লী থেকে পথের পাঁচালীতে চুনীবালা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কলকাতার বিখ্যাত ‘রেডলাইট এরিয়ার একটা ঘরের দরজা। সামনে দাাঁড়ানো কয়েকজন মানুষ। তারা টোকা দিচ্ছেন দরজায়। শীর্ণ দুটো হাত দরজা খুলে দেয়।  দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে ‘বাবুরা’। ‘কীরকম মেয়ে পছন্দ বলুন ? থিয়েটারে অভিনয় করাবেন ? নাকি …..।’

দরজায় দাঁড়ানো একজন দীর্ঘদেহী মানুষ উত্তর দিলেন, ‘কাউকে নয়, আমাদের দরকার আপনার সঙ্গে।’

 বিস্মিত হয়ে গেলেন সেই বৃদ্ধা। বয়স চার কুড়ি প্রায়। ফোকলা মুখ। এই বাবুরা তাঁর কাছে এসেছেন কেন! আর তখন সেই দীর্ঘদেহী মানুষটি ভাবছেন,  তিনি পেয়ে গেছেন যাকে খুঁজছেন এতদিন ধরে। সেই মানুষটির নাম ছিলো সত্যজিৎ রায় আর সেই বৃদ্ধা হলেন চুনীবালা দেবী।

সেই পতিতালয়ের বাসিন্দা চুনীবালাকে বলা হল অভিনয় করতে হবে, ‘পথের পাঁচালী’ ছবিতে ইন্দিরা ঠাকুরণের চরিত্রে। কথা শুনে হতবাক তিনি। অ-ভি-ন-য় !! সে তো গতজন্মের কথা। যদিও তিনি বহুযুগ আগে থিয়েটার করতেন। ফিল্মেও সুযোগ এসেছিলো ১৯৩০ সালে। তখন বয়েস পঞ্চান্ন বছর। অভিনয় করছিলেন ‘বিগ্রহ’, ‘রিক্ত’ প্রভৃতি ছবিতে। তাঁকে নিয়েই তৈরি হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচালনায় ‘নটীর পুজা’।

থিয়েটারের চুনীবালা দেবী ছবিতে এসে পার্শ্বচরিত্র হয়েই থেকে গিয়েছিলেন। অবহেলায় ভাসছিলেন কলকাতার পতিতালয়ে। হয়তো অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার জন্যই জীবিত ছিলেন তিনি। এরপর এলো পথের পাঁচালীতে কাজ করার সুযোগ।  তারপর বাকিটা ইতিহাস।

পথের পাঁচালী ছবিতে চুনীবালার পারিশ্রমিক ছিলো রোজ কুড়ি টাকা। এর বেশি দেয়া আর সম্ভব হয়নি নতুন পরিচালক সত্যজিৎ রায়-এর পক্ষে। ইউনিট ভুগছিলো  অর্থসঙ্কটে। তাঁর নিজের বীমার কাগজ পত্র‚ স্ত্রীর গয়না সব আটকানো বন্ধক হিসাবে। তবুও প্রিয় উপন্যাসটি সেলুলয়েড-বন্দি করতে চান তিনি।

অশীতিপর ইন্দিরা ঠাকুরণ চরিত্রের জন্য খুঁজছিলেন এমন কাউকে‚ যিনি বৃদ্ধা। কিন্তু অভিনয়টা জানেন। আউটডোর শ্যুটিং-এর ধকল নিতে পারবেন। মনে রাখতে পারবেন চিত্রনাট্য। নবীন কাউকে মেক আপ দিয়ে প্রবীণ সাজাতে চাননি তিনি।

অনেক খুঁজেও মনমতো কাউকে পাচ্ছিলেন না সত্যজিৎ রায়। ভাবছিলেন এমন একজন অভিনেত্রী প্রয়োজন  যাঁকে দিয়ে ম্যানারিজম-বর্জিত অভিনয় করাতে পারবেন। কিন্তু কোথায় পাবেন তারে? শেষে অভিনেত্রী রেবা দেবী তাঁকে জানালেন, পুরনো দিনের অভিনেত্রী চুনীবালা দেবীর কথা। রেবা তাঁর সঙ্গে একটি ছবিতে অভিনয় করছিলেন।

সেই ঠিকানা ধরেই সত্যজিৎ রায় হাজির হন সেই পতীতাপল্লীতে। সঙ্গে প্রোডাকশন ম্যানেজার অনিল চৌধুরী। চুনীবালা দেবীকে দেখেই তাঁর মন বলেছিলো, বিভূতিভূষণের ইন্দির ঠাকরুণ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

পতিতালয় থেকে আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন চুনীবালা। পরনে শতচ্ছিন্ন সাদা থান। পরিচালক ও ইউনিটের আশা ছাপিয়ে অভিনয় করলেন তিনি।  একদিন গাড়ি থেকে নামার পরে তাঁকে বলা হলো‚ সেদিন মৃত্যুর দৃশ্যে অভিনয় করতে হবে। ইউনিটের সবাই ভেবেছিলেন উনি হয়তো ক্ষুণ্ণ হবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইন্দির ঠাকরুন ওরফে চুনীবালা দেবী বললেন‚ ‘আরে! এ তো অভিনয়! কিছু মনে করবো কেন ?’

নিশ্চিন্দিপুরের অথবা বোড়াল গ্রামের বাঁশঝাড়ের পাশে ঢলে পড়লেন ইন্দির ঠাকরুন। শোনা যায়‚ তাঁর মাথা মাটিতে পড়ার মুহূর্তে নিজের কোলে নিয়ে নিয়েছিলেন পরিচালক। এত স্বাভাবিক অভিনয়টা করার জন্যই বোধহয় জীবনভর অপেক্ষায় ছিলেন অবহেলিত সেই  অভিনেত্রী।

সাবলীল অভিনয় করেছিলেন শেষযাত্রার দৃশ্যে। তাঁর দেহ বাঁশের খাটিয়ায় বেঁধে নিয়ে যাওয়া হলো। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে লেখা হলো নতুন ইতিহাস। কিন্তু সেদিন শ্যুটিং শেষ হবার পর সবার কপালেই দেখা গিয়েছিলো  ঘাম।  কারণ ইন্দির ঠাকরুন শট ওকে করেও চোখ খুলছেন না।

বেশ কিছুক্ষণ কসরতের পরে পিটপিট করে চোখ খুলে ফোকলা হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন‚ ‘আরে‚বলবে তো শট হয়ে গেছে। আমি কতক্ষণ মড়া সেজে পড়ে রয়েছি।’

তিন বছর ধরে শ্যুটিং চলেছিলো ফিল্মের। টাকাই যোগাড় হয় না। সেই দীর্ঘ সময়ে বেশি বড় হয়ে যায়নি ইন্দির ঠাকরুনের ভাইপো ভাইঝি। দুর্গা ছিলো ছবির শুরুর চেহারাতেই। অপুরও গলা ভাঙেনি। আর চুনিবালা দেবী বা ইন্দিরা ঠাকরুন নিজেও জীবিত ছিলেন। নইলে পথের এই অপূর্ব পাঁচালী অনুপস্থিত রয়ে যেত পর্দায়।

মুক্তির জন্য অপেক্ষা না করে পরিচালক সত্যজিৎ রায়, চুনীবালা দেবীর বাড়ি গিয়ে ছবির প্রোজেকশন দেখালেন। বুঝতে পেরেছিলেন তাঁকে আর বেশিদিন সময় দেবেন না চুনীবালা। ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট যখন মুক্তি পেলো ‘পথের পাঁচালী’‚ তার কয়েকমাস আগেই চলে গেছেন চুনীবালা দেবী। গল্পের দুর্গার মতো তাঁরও বাস্তবে ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছিলো।

নিজেও যুক্ত হয়েছিলেন ইতিহাসের সঙ্গে। জানা হয়নি সে খবরটাও। জানা হয়নি তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি সম্মানিত হয়েছেন বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসবে। ম্যানিলা চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে ইন্দির ঠাকরুন চলে গিয়েছেন অনেক দূরে। আর পরিচালক সত্যজিৎ রায় প্রথম ফিল্মেই নিজের জায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র: দ্য নিউজ

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]