পতিসরে একদিন

দেলওয়ার এলাহী

(টরন্টোথেকে): আরও একটি দিন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যাপন করলাম তাঁর কুঠিবাড়ি পতিসরে।
রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলাটি সারা বিশ্বে গৌরব করতে পারে অন্তত দুটি কারণে : পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিশ্ব বিদ্যা মন্দির এবং বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পতিসরের কুঠিবাড়ির জন্যে। যতদিন যাবে এদের মহিমা বিশ্বভাবুক সমাজ অনুধাবন করতে পারবেন বলে আমার ধারণা।

বাড়ির অভ্যন্তরে সুন্দর বেদীর উপরে কবির ভাস্কর্য। ভাস্কর কনক কুমার পাঠক।

ঠাকুর পরিবারের চারটি কাছারি বাড়ি আছে এই বাংলায়। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের জমিদারি কত বিশাল ছিল ভাবলে অবাক হতে হয়। পতিসরের জমিদারিটি প্রিন্স ক্রয় করেছিলেন ১৮৩০ সালে। জমিদারি তদারকি করার জন্য রবীন্দ্রনাথকে ঠাকুর পরিবারের পক্ষে এখানে প্রেরণ করা হয় ১৮৯১ সালে।
পরবর্তীতে ১৯২১ সালে ভাইদের মধ্যে জমিদারি ভাগ বাটোয়ারা হলে পতিসর জমিদারি রবীন্দ্রনাথের ভাগে পড়ে। জমিদারি পাওয়ার পরেও রবীন্দ্রনাথ পতিসরে অনিয়মিত ছিলেন। কিন্তু যে টুকু সময় তিনি পতিসরে কাঠিয়েছেন রবীন্দ্র সাহিত্যের অনেক অমূল্য রচনা কবি এখানে সৃষ্টি করেছেন।
ছিন্নপত্রের ২৮ টি পত্র, অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ, কয়েকটি ছোট গল্প, ২ টি উপন্যাস ও কয়েকটি গান রচনা করেন।
‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের বেশীরভাগ অংশ পতিসরে লেখা। ‘বিদায় অভিশাপ’ ‘দুইবিঘা জমি’ বিখ্যাত কবিতাদ্বয় পতিসরেই লেখা।

কুঠিবাড়ির বারান্দার খিলান

‘বিধি ডাগর আঁখি যদি দিয়েছিল…’ এবং ‘আমি কান পেতে রই’ বিখ্যাত গান সহ আরো কিছু গান কবি পতিসরেই রচনা করেন।

পতিসরের এই কুঠিবাড়ির সিংহদ্বার, মূল বাড়ির নকশা অন্য কুঠিবাড়ি থেকে আলাদা। নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলায় এই পতিসর গ্রামটি। নওগাঁ জেলা শহর থেকে আত্রাই অভিমুখী সমতল সোজা রাস্তা থেকে দূরে দুই পাশে ছোট ছোট সবুজে ঘেরা নিভৃত গ্রাম। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। যতদূর চোখ যায় সোনালি ধানের উৎসব।
নওগাঁর বা উত্তর বঙ্গের এই এলাকায় মাটির দেয়াল দিয়ে বানানো অধিকাংশ বাড়িঘর। দুই পাশে সবুজ বৃক্ষের সারিতে স্বতঃস্ফূর্ত পতিসরের নির্ঝঞ্ঝাট ও নীরব পাকা রাস্তাটি আমাকে মুগ্ধ করেছে।

এই সেই নাগর নদী

রবীন্দ্রনাথ বজরা দিয়ে এখান থেকে শাহজাদপুর, কুষ্টিয়া অথবা শিলাইদহে যাতায়াত করতেন। কুঠিবাড়ির মূল ফটক থেকে প্রায় একশত ফুট দূরেই বজরা যাতায়াতের সেই অপূর্ব নদীটি। সত্যি বলতে কি এবার আমি অসংখ্য নদীর কাছে গিয়েছি। কোন নদীকেই আমি খুশিমনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হেসে গড়িয়ে যেতে দেখিনি। অসংখ্য নদীর নানান অভিযোগের প্রমাণ আমি নিজের চোখেই দেখেছি। কোনো কোনো নদী প্রকৃতির চিরাচরিত করাল থাবার কারণে মৃতপ্রায়। কিন্তু এতো কিছুর মাঝেও পতিসরের ‘নাগর’ নদীর নাব্যতা দেখে আমি অবাক হয়েছি, খুশি হয়েছি এমনকি চঞ্চল হয়ে উঠেছে আমার মন। পরিষ্কার টলমলায়মান সুরসৃষ্টিকারী স্রোতে যদি সাঁতার কাটতে পারতাম!

বাংলাদেশের নদীদের দুঃখ দেখে আমার ভিতরে যে ক্রোধ জমা হয়েছিল নাগর নদীর তীরে গিয়ে মুহূর্তেই তা তা বিলীন হয়ে গেছে।
আমার বাংলাদেশ। আমার সোনার বাংলাদেশ। যতদূর চোখ যায় নাগর নদীর নাব্যতার মতো চঞ্চলতা খেলা করে : ধানের ক্ষেতে, বাতাসে দোলে ওঠা পাটের সবুজ তরঙ্গে, আম, লিচু, কাঁঠালের অকৃপণ উজাড় করা নিবেদনে, চাঁদের জোছনায়। ঘাসের গালিচায় বসে নির্বাক এই রূপসী বাংলার দিকে আমি চেয়ে থাকি।

আমি জানি আমি থাকবো না। আমার এই রূপসী মায়াবী বাংলাদেশ থাকবে। আমিও লীন হয়ে থাকবো এই বাংলায়। বাংলাকে চিনেছি বলেই আমি বিশ্বকে চিনেছি। বাংলাকে ভালোবেসেছি বলেই আমি নিজেকে ভালোবাসি। রবীন্দ্রনাথ সেই ভালোবাসাকে বুঝতে পারার ভাষা সৃষ্টি করেছেন, এই বাংলার মহিমায় নিজেকে নিবেদন করে নিজেই পূর্ণতার স্বাদ পেয়েছি। এই বাংলার সুখ ও দুঃখ প্রকাশে রবীন্দ্রনাথই আমার প্রধান আশ্রয়।
পথে পথে, মাঠে মাঠে আমার চোখ আটকে যায়! এই অপরূপ শান্তির ছায়াতল ছেড়ে আমি চলে যাবো। নীরবে একটি গান আমার বুকে বেজে ওঠে- এই কথাটি মনে রেখো/ আমি যে গান গেয়েছিলেম / জীর্ণপাতা ঝরার বেলা মনে রেখো…।

ছবি : লেখক