পথের কুকুর

ইরাজ আহমেদ

পথ থেকে কুকুরছানা ধরে বাড়িতে নিয়ে আসা একটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো আমাদের বাড়িতে। প্রায় বছর তিরিশ আগের কথা বলছি। সেই ঢাকা শহরে তখন ফ্ল্যাট বাড়ির সংস্কৃতি এতোটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। বেশীরভাগ বাড়ি লাগোয়া চিলতে বারান্দা অথবা উঠান ছিলো। সেই উঠান অথবা বারান্দায় আশ্রয় পেয়ে যেতো তুলতুলে শরীরের কুকুরছানাগুলো।

এই পথের কুকুরছানাদের বেশী পাওয়া যেতো শীতকালে। পথের পাশে বালির স্তুপ অথবা কোনো পরিত্যক্ত বাড়ি হতো এদের জন্মস্থান। স্বাধীনতার যুদ্ধ তখনো শুরু হয়নি। থাকি এখনকার জোনাকি সিনেমা হলের পেছনের গলিতে।একদিন চোখে পড়লো আমাদের সেই একতলা টিনের চালওয়ালা বাড়ির কাছেই অনেকগুলো কুকুরছানা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্যাস, দেখেশুনে কালো রঙের একজনকে বগলদাবা করে সোজা বাসায়।তখন এই উটকো অতিথি নিয়ে বাড়িতে হাজির হলে বকাঝকা শুনতে হতো। কিন্তু চোখকান বুজে সহ্য করতাম। একটা সময়ে সেই অতিথি হয়ে উঠতো পরিবারের একজন সদস্য। কত ধরণের নাম রাখা হতো তাদের। ভুলো, টমি, লালু। সেবার সেই অতিথি বেশ কিছুদিন বাস করলো আমাদের বাড়িতে। তারপর একদিন দেখা গেলো তার শরীরে এক ধরণের পোকার আক্রমণ ঘটেছে। সেই পোকার দল আমাদের ভুলোর শরীর ছেড়ে জায়গা করে নিচ্ছে বাড়ির ভেতরেও। ভুলোকে হারাতে চাইনি আমি। কিন্তু এক ভোরবেলা কাকা সম্পর্কীয় একজন বস্তায় ভোরে ভুলোকে রেখে এলেন সেই সদরঘাটে। আমাদের সেই ছোট্ট বাড়িটার শুন্য বারান্দায় বহুদিন ভুলোর জন্য শোক একা একা ঘুরে বেড়ালো।তারপর একদিন ভুলোর স্মৃতি ফিকে হয়ে এলো। কিন্তু সত্যি কি ভুলো তার স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসতে দিলো? তিনমাস পর এক ভোরবেলা বাসার দরজার বাইরে মৃদুকন্ঠে সারমেয়র ডাক শুনে আমরা সবাই উঠে দেখি আমাদের ভুলো কুকুর হাজির। তিনমাস পরে পথ চিনে ভুলো কী ভাবে বাড়ি ফিরেছিলো তা আজো আমার কাছে এক রহস্য।এর পরের গল্প সংক্ষিপ্ত।যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে আমরা পালিয়ে গ্রামে চলে যাই। ফিরে এসে ভুলোকে আর পাইনি।তবু আজো ভুলোর জন্য বড় মায়া পড়ে আছে মনে।

সেই শহরে পথের কুকুর রাস্তা থেকে ধরে এনে পুষতাম যেমন তেমনি তারাও এসে হাজির হতো বাড়িতে। কোনোদিন ঘুম থেকে উঠে দেখতাম দরজার সামনে আসন পেতেছে এক অচেনা অতিথি। দাদু ছিলেন আমার সব আবদারের জায়গা। তাকে ধরেবেঁধে ব্যবস্থা করতাম কুকুরের খাবার। তারপর তার শোবার জন্য জোগাড় করতে হতো চটের ছেঁড়া বস্তা। শোবার জায়গার ব্যবস্থা হয়ে গেলেই সেই পথের কুকুর ঢুকে পড়তো সংসারে।

থাকতাম সিদ্ধেশ্বরীতে। বাড়িওয়ালার পোষা কুকুর টমি। বাড়িওয়ালার পরিবার পাড়া ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলে টমি হয়ে উঠলো আমাদের বাড়ির সদস্য। অসাধারণ বুদ্ধিমান আর সাহসী কুকুরটি কিছুদিনেই গোটা পাড়ার কুকুর হয়ে উঠেছিলো। সবার বাড়িতে তার জন্য ছিলো অবারিত দ্বার। বিভিন্ন বাড়িতে খেয়ে আর আমাদের পুরো গলিটা রাতে পাহারা দিয়ে দিন কাটতো টমির। রাতে টমি ঘুমাতো আমার বিছানার পাশে মেঝেতে। ভোরবেলা আমাকে ঘুম থেকে ঠেলে তোলা ছিলো টমির প্রিয় কাজের একটি। বাবা পেশাগত কারণে অনেক রাতে বাড়ি ফিরতেন। সেই কুকুরটি অত রাতেও গলির মোড়ে বসে থাকতো। বাবা ফিরলে তার পেছন পেছন ঘরে ফিরতো প্রভুভক্ত প্রাণীটি। পরে টমি মারা যায় চোরদের বিষপ্রয়োগে।

কুকুরছানার দখল নিয়ে ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়াও হতো। একজনের পছন্দ করা ছানা অন্য কেউ নিয়ে নিলে বেধে যেতো ঝগড়া।কথাও বন্ধ থাকতো অনেকদিন। পথেঘাটে কুকুরছানা পাকড়াও করে বাড়ি নিয়ে আসার স্বভাবটা পেয়েছিলো আমার অনুজ। তাকেও প্রায়শই দেখতাম এরকম কুকুরছানার গলায় দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে আসছে বাড়িতে।এই অনাহুত অতিথিদের প্রথমে বাড়িতে এনে ভালো করে গোসল করানো হতো। তারপর যাতে তারা পালিয়ে না যায় সেজন্য বেঁধে রাখা হতো কিছুদিন। বহুবার দড়ির দূর্বল বাঁধন কেটে এরা ফিরে গেছে আপন জননীর কাছে।

পথের কুকুরদের পাশাপাশি পাড়ায় বসবাস করতো দু‘একজন বিদেশী অতিথিও।তাদের গুরুগম্ভীর ডাক আর রাজসিক চলাফেরা আমাদের জন্যও ছিলো ভয়ের ব্যাপার। আমাদের পাড়ায় দেয়ালঘেরা বিশাল এক বাড়িতে এমনি এক অ্যালসেশিয়ান কুকুর ছিলো।তার ভয়ে সেই বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষতাম না আমরা। আমাদের পথের কুকুরের দলও সেদিকে খুব একটা যেতো না।

পথের কুকুরের গল্প অসংখ্য।সেই শহরে তারা বন্ধুর মতোই জড়িয়ে থাকতো আমাদের সংসারে। পথের কুকুর পোষার গল্প আজকাল আর শুনতে পাই না তেমন। ফ্ল্যাট বাড়ির পরিসর আর ভুলো, টমি অথবা লালুদের অস্তিত্বকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। পথে পথে ঘুরতে দেখি এই সারমেয়দের। তাদের ছোনারাও হয়তো এই শহরে বেড়ে ওঠে মানুষের ভালোবাসা ছাড়াই। নতুন সংস্কৃতিতে পথের কুকুরের আর ঠাঁই নেই।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা