পথের পাঁচালী’র ৬৪

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবদুল্লাহ আল মোহন

সত্যজিৎ রায়ের অসাধারণ চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী’র পর্দা উন্মোচনের ৬৪ বছর পার হলো গত ২৬ আগস্ট। ছবিটি নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে প্রথম প্রদর্শিত হয়েছিলো ১৯৫৫ সালের ৩ মে।কলকাতায় এব্ং গোটা ভারতে ছবিটি মুক্তি পেয়েছিলো তারও সাড়ে তিন মাস পর, ২৬ আগস্ট। ২০১৫ তে ছবিটি ৬০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার দিনটি স্মরণ করে ওই বছর একই দিনে একই ভেন্যুতে ছবিটি দেখানো হয়। নিউ ইয়র্কেরই ফিল্ম ফোরামে ২০১৫ তে আট সপ্তাহ চললো অপু-ট্রিলজি, টিকিট কেটে সর্বসাধারণের জন্য। অথচ এই পথের পাঁচালী ছবিটির নির্মাণকালীন বাজেট ছিলো মাত্র দেড় লক্ষ টাকা (তিন হাজার মার্কিন ডলার)।ছবির অভিনেতারা সেই অর্থে জনপ্রিয় তারকা ছিলেন না। অন্যান্য কলাকুশলীরাও যথেষ্ট অনভিজ্ঞ ছিলেন।কিন্তু তা সত্ত্বেও পথের পাঁচালী সমালোচক ও দর্শকদের প্রশংসা কুড়োতে সক্ষম হয়। ইতালিয়ান নিওরিয়ালিজমে অনুপ্রাণিত হয়ে সত্যজিৎ রায় এই ছবিতে কাব্যিক বাস্তবতাবাদের নিজস্ব এক শৈলীর বিকাশ ঘটান। পথের পাঁচালী স্বাধীন ভারতে নির্মিত আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী প্রথম চলচ্চিত্র। ১৯৫৬ কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটি “বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট” পুরস্কার লাভ করে। এর ফলে সত্যজিৎ রায়ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। আজ পথের পাঁচালী ছবিটিকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রগুলির অন্যতম মনে করা হয়।
এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সত্যজিৎ রায়ের সেই অনুপম চলচ্চিত্রের নানা কৌণিকে আলো ফেলে দেখা পুনর্বার।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর কালজয়ী উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র এবং তাঁর প্রসিদ্ধ চলচ্চিত্র-সিরিজ অপু ত্রয়ী-র প্রথম ছবি। অপর দুটি ছবি হলো অপরাজিত (১৯৫৬) ও অপুর সংসার (১৯৫৯) । তিনটি ছবি একত্রে অপু-ত্রয়ী হিসেবে পরিচিত। ছবির মুখ্য চরিত্র অপু। বিশের দশকে বাংলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে অপুর বেড়ে ওঠার গল্পই এই ছবির প্রধান বিষয়।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ বাংলা সাহিত্যের অনেকাংশে লেখকের আত্মজীবনীমূলক লেখা। ১৯২৮ সালে একটি সাময়িকপত্রে ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটি প্রকাশিত হতে শুরু করে। বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। এতে একটি দরিদ্র পরিবারের নিজের ভিটেমাটিতে টিকে থাকার লড়াই এবং সেই পরিবারের শিশুপুত্র অপুর বেড়ে ওঠাই দেখানো হয়েছে। বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র হরিহর রায় ও তার স্ত্রী সর্ব্বজয়া, দুই সন্তান দুর্গা ও অপু ওদের পিসি ইন্দির ঠাকরুন এবং কতিপয় গ্রাম্য চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে বল্লালী বালাই ও আম আঁটির ভেঁপুতে। দুর্গার মৃত্যুর পর গ্রাম ছেড়ে একসময় কাশীতে চলে যায় অপুরা। অক্রুর সংবাদে এসে যোগ হয়েছে অপর প্রধান চরিত্র, লীলা। অনেক বলেন এটি বিভূতিভূষণের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। মূলত অপু চরিত্রটিই পথের পাঁচালীর প্রধান চরিত্র। এ উপন্যাসে ফুটে উঠেছে একটি কাল ও কিছু জীবনের আন্তরিক ও মর্মভেদী চিত্রণ। উপন্যাসের শেষাংশে রয়েছে বাবা-মায়ের সঙ্গে অপুর কাশীযাত্রা ও কাশীবাসের গল্প। এই অংশটুকু সিরিজের পরবর্তী ছবি অপরাজিততে প্রদর্শিত হয়েছে। ১৯৪৩ সালে পথের পাঁচালী উপন্যাসের একটি নতুন সংস্করণের অলংকরণ করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেই সময় তিনি উপন্যাসটি প্রথমবার পড়েন। সম্ভবত ১৯৪৭-৪৮ সাল নাগাদ তিনি এই ছবির চিত্রনাট্য রচনা করেন।
সত্যজিৎ রায় কেন এই উপন্যাসটিকে বেছে নিলেন তাঁর প্রথম ছবির জন্য? তিনি বলেছেন, এই উপন্যাসের এমন কিছু গুণ ছিলো যা এটিকে একটি মহান বই করেছিলো এর মানবতাবোধ, এর কাব্যসুষমা, এবং এর সত্যবলয়।
লেখকের বিধবা পত্নী এই উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়কে ছবি করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তবে এই অনুমতি নীতিগত। এর জন্য কোনো রকম আর্থিক আদান প্রদান হয়নি।
প্রথম ছবি দিয়েই বিশ্ব চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে নিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। অনেক চিত্রসমালোচকই মনে করেন, আর একটি ছবি না-বানালেও বিশ্ব চলচ্চিত্রে অমর হয়ে থাকতেন তিনি। অল্প বাজেটে, অপেশাদার অভিনেতা, অনভিজ্ঞ কলাকুশলী নিয়ে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও শিল্প সফল ছবি ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণে করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, স্রেফ মেধার জোরেই চলচ্চিত্র বানানো সম্ভব। ১৯৫৫ সালে নয়াদিল্লীতে প্রেসিডেন্ট গোল্ড ও সিলভার মেডেল, ’৫৬ সালে এডিনবরা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেসটিভ্যালে ডিপ্লোম অব মেরিট, রোমে ভ্যাটিকান, ম্যানিলাতে গোল্ডেন কার্বো, সান ফ্রান্সিসকো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফ্যাসটিভালে সেরা ছবি ও সেরা পরিচালনার জন্য গোল্ডেন গেট, ’৫৭ সালে বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে সেরা ছবির জন্য গোল্ডেন লরেল, ৫৮ সালে কানাডার ভ্যাঙ্কুবার ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে সেরা ছবি, স্টার্টফোর্ড ফিল্ম ফেস্টিভালে সেরা সমালোচক পুরস্কার পায় এবং ১৯৫৯ সালে নিউ ইয়র্ক ফিল্ম ফেস্টিভাল ও ন্যাশনাল বোর্ড অব রিভিউ এওয়ার্ড [নিউইয়র্ক]-এ সেরা বিদেশী ছবির পুরস্কার পায়।
সাইট এণ্ড সাউণ্ড, রটেন টমেটো, ভিলেজ ভয়েজ, টাইম, নিউ ইয়র্ক টাইম, রোলিং স্টোন এবং সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকালের একাধিক জরিপে এ ছবি বিশ্বের সেরা শত ছবির মধ্যে ঠাঁই করে নিয়েছে।

আজ থেকে প্রায় ৭৪ বছর আগে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধ্রুপদী উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’কে চলচ্চিত্ররূপ দেওয়ার ভাবনা মাথায় আসে যুবক সত্যজিৎ রায়ের। ছবিটি তৈরি করতে গিয়ে সত্যজিৎ রায়কে শিকার হতে হয় বিচিত্র সব ভোগান্তির। প্রথম দিকে তিনি এর কোনো প্রযোজক পাননি। তারপর নিজ খরচে শুরু করলেও আর্থিক অনটনের কারণে মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় ছবির কাজ। শেষে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের, বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান রায়ের আনুকূল্যে শেষ হয় ছবির নির্মাণ প্রক্রিয়া। পথের পাঁচালীর শুটিং শুরু হয় ২৭ অক্টোবর, ১৯৫২ সালে। প্রায় পৌনে তিন বছর পর ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট মুক্তিলাভ করে ‘পথের পাঁচালী’। ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট ছবিটি কলকাতায় মুক্তির আগে ১৯ আগস্ট প্রচারপত্রে লেখা হয়েছিল ‘অসামান্য গ্রন্থের অভাবনীয় চিত্ররূপ; পরিচালক : সত্যজিৎ রায়, সঙ্গীত : রবিশঙ্কর। মুক্তি দিবস : ২৬ আগস্ট।’

সত্যজিত রায়ের এই ছবি দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন সমকালীন রাশিয়ান চলচ্চিত্রবোদ্ধা সের্গেই আইজেনস্টাইন ও জাপানি চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়ার মতো বিখ্যাতরাও। পৃথিবীজুড়ে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আজও এটি অনবদ্য সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়।
উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে ছবির নেগেটিভ রিলগুলো একসময় খারাপ অবস্থায় পৌঁছে যায়| তবে সুসংবাদ হলো, আমেরিকায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে ‘রেস্টোর’ হয়েছে পথের পাঁচালী, অপরাজিত এবং অপুর সংসার। ক্রাইটেরিয়ন কালেকশন হিসেবে ২০১৫ সালে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে চলছে এই অপু ট্রিলজি। নবকলেবরে এই ট্রিলজি দেখার পর মার্কিন চিত্রসমালোচক জন পাওয়ার্স জানিয়েছেন, ‘ইটস টাইমলেসলি অ্যালাইভ!’ আমেরিকার বিখ্যাত ফিল্ম রেস্টোরার ডেভিড শেপার্ড পত্রিকান্তরে জানিয়েছেন, ১৯৯২ সালে সত্যজিত্ রায় অস্কার পাওয়ার পর, তাঁর ছবির নেগেটিভের হাল খতিয়ে দেখা এবং সেগুলোকে রেস্টোর করার জন্য অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস তাকে স্বেচ্ছাসেবক করে কলকাতায় পাঠায়। এরপর বহু বছর ধরে এই কাজ চলে। অতঃপর ২০১৫-তে এসে অপু ট্রিলজির পাশাপাশি দু-ডজনেরও বেশি ছবি নতুন করে ডিভিডি বা ব্লু-রে ভার্সন প্রকাশিত হচ্ছে।২০১৫ সালে হীরক জয়ন্তীতে নতুন করে উদ্ভাসিত হয়েছিলো পথের পাঁচালী।

কিংবদন্তি একটি চলচ্চিত্রের নাম পথের পাঁচালী। গল্পের গাঁথুনি, নির্মাণশৈলী আর চমৎকার অভিনয়ে পথের পাঁচালী হয়ে উঠেছিল বিশ্ব দরবারে প্রথম স্বীকৃত বাংলা চলচ্চিত্র। অথচ এই সিনেমা নির্মাণের আগে সত্যজিৎ রায় প্রথম জীবনে কখনো পথের পাঁচালী পড়েননি। ‘আম আঁটির ভেঁপু’র ইলাস্ট্রেশন করার সময়ের ওইটুকু ভাগ পড়েই গল্পটি নিয়ে ছবি করার কথা ভাবেন তিনি। এটা আবার সত্যজিৎ রায়ের প্রথম সিনেমা। কেন ছবি নির্মাণের জন্য পথের পাঁচালীকে বেছে নেয়া হয়েছিলো এই প্রশ্নের জবাবে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘সিনেমায় ফুটিয়ে তোলার যোগ্যতম উপন্যাসগুলোর মধ্যে বাংলা সাহিত্যে ‘পথের পাঁচালী’ অগ্রগণ্য। এই ছবির স্টাইলের আধার বিভূতিভূষণের লেখাটিই, কোনো বিশেষ আঙ্গিকের ছবি নয়।’

অপেশাদার অভিনেতা, স্টুডিও ফ্লোরের বাইরে বাস্তবের গ্রামে ক্যামেরা নিয়ে গিয়ে সেখানে সেট বানিয়ে, তাকে জীর্ণ চেহারা দিয়ে, অভিনেতাদের মলিন জামাকাপড় পরিয়ে অভিনয় করানো, এমনকি আসল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শুটিং করা তখন টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ায় রীতিমতো অভাবনীয় ব্যাপার ছিলো।’ তিনি বলেন, ছবিটি নির্মাণের সময় সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে সমালোচনা হয়েছিলো; ‘একটা লোক কয়েকজন বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে কী এক পাগলামো শুরু করেছে এবং অচিরেই যে তাদের সব চেষ্টা বিফল হবে, এমন ধারণা স্টুডিও পাড়ায় চাউর হয়ে গিয়েছিলো।’

ছবিটির দুর্গা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উমা সেন। একটি পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমি বেলতলা গার্লস স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ার সময় ছবির সহকারী পরিচালক আশিষ বর্মণ আমার নাম-ঠিকানা লিখে নিয়ে যান। পরে বাবার কাছে অভিনয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়। প্রথম দিন আমার শট ছিল শক্তিগড়ের কাছে। সেই বিখ্যাত দৃশ্য যেখানে কাশবনের মধ্যে দিয়ে অপু-দুর্গা ছুটছে ট্রেন দেখার জন্য।’ উমা বলেন, ‘আরেকটা দৃশ্যের কথা সব সময়ই মনে পড়ে, টুনির পুঁতির মালা চুরি করার দায়ে যখন সবর্জয়া দুর্গাকে চুলের মুঠি ধরে মারে, মনে আছে দৃশ্যটা? উফ… সে কী যে মেরেছিল করুণাদি! আমার ঘাড়ের শিরাগুলো ফুলে উঠেছিল। দৃশটা ক্যামেরায়ও ধরা পড়েছে।’ আর অপু চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘অপু আমার শিরায়-শিরায় বয়ে চলেছে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে কাকাবাবু (সত্যজিৎ রায়) বলতে থাকতেন, সামনে তাকাও, এবার একটু এগিয়ে যাও, ক্যামেরার দিকে তাকিও না, আচ্ছা এবার একটু দাঁড়িয়ে ডান পা-টা চুলকে নাও,… এবার এগোও। এর ফলে সহজে হয়ে যেত সব কিছু।’
১৯৫৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে পথের পাঁচালী শ্রেষ্ঠ মানবিক দলিল হিসেবে পুরস্কৃত হয়। সারা বিশ্বে ছবিটি নিয়ে হইচই পড়ে যায়। তারপর থেকে আজ অবধি সিনেমার অন্যতম আইকন হিসেবে রয়েছে ‘পথের পাঁচালী’।

তৎকালীন সাময়িক পত্র মাসিক ‘বিচিত্রা’য় ১৩৩৫ সালের আষাঢ় সংখ্যা থেকে ‘পথের পাঁচালী’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। পরবর্তীতে সজনীকান্ত দাসের রঞ্জন প্রকাশনালয় থেকে ১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে পথের পাঁচালী পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়। উৎসর্গ করা হয়েছিল, ‘পিতৃদেব’ কে। উপন্যাসটি তিনটি পর্বে বিভক্ত: বল্লালী বালাই, আম- আঁটির ভেঁপু, অক্রুর সংবাদ। বিভূতিভূষনের আত্মজীবনী তৃণাঙ্কুর থেকে আমরা জানতে পারি, উপন্যাসটি লেখার আগে তিনি অন্তত পাঁচ বছর ভেবেছেন। ‘পথের পাচাঁলী’ প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালীন ভিন্নধারার একটি উপন্যাস।

সত্যজিৎ রায় অবশ্য মূল উপন্যাসের আক্ষরিক অনুকরণ করেননি, বরং অনেক কিছুই বদলেছেন। মূল উপন্যাসে ইন্দির ঠাকুরের মৃত্যু অনেক আগেই হয়, গ্রামের পূজা মণ্ডপে অন্যান্য বৃদ্ধদের সামনে তার মৃত্যু হয়, কিন্তু ছবিতে ইন্দির ঠাকুর মারা যায় অপু, দূর্গার সামনেই। অপু দূর্গার দৌঁড়ে ট্রেন দেখতে যাওয়া এ ছবির উল্লেখযোগ্য একটি দৃশ্য, মূল উপন্যাসে তারা কোন ট্রেনই দেখেনি। ছবির শেষে অপুর পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। এই সমাপ্তিও মূল উপন্যাস থেকে ভিন্ন।
জ্যাঁ রেঁনোয়া ১৯৪৯ সালে কলকাতায় রিভার ছবির শুটিং-এ এলে সত্যজিৎ রায় তাকে লোকেশন খুঁজতে সাহায্য করেন। সে সময়ই তিনি রেঁনোয়াকে ‘পথের পাঁচালী’র কথা বলেন। রেঁনোয়া তাকে উৎসাহ দেন। ১৯৫০ সালে ডি জে কিমারের হেডকোয়ার্টার লন্ডনে যান সত্যজিৎ রায়। লন্ডনে ছয় মাসে তিনি ৯৯টি ছবি দেখেন। এর মধ্যে ডি সেকার বাইসাইকেল থিভস তাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করে। হল থেকে বেরিয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেন ছবি পরিচালনা করবেন। রেঁনোয়া, ডি সিকার বাইসাইকেল থিভসের পাশাপাশি কুরোশাওয়ার রসোমন এবং বিমল রায়ের দো বিঘা জমির আন্তর্জাতিক সাফল্য তাকে দ্রুত অনুপ্রাণিত করে।
অপুর চরিত্রের অভিনেতার জন্য সত্যজিৎ পত্রিকায় বিজ্ঞাপণ দেন। ৫ থেকে ৭ বছরের বহু শিশুর সাক্ষাৎকার নেন তিনি, কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারেন না। অবশেষ তার স্ত্রী বিজয়া রায় পাশের বাড়িতে সুবীর ব্যানার্জিকে আবিষ্কার করেন। সুবীর ব্যানার্জি ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন অপুর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। এক সময়ের মঞ্চ অভিনেত্রী চুনিবালাকে পতিতাপল্লী থেকে নিয়ে আসা হয় ইন্দির ঠাকুর চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে। কলকাতারা নিকটবর্তী বড়াল গ্রামের [শুটিং লোকেশন] বহু লোক এ ছবিতে অভিনয় করেছেন।
এ ছবির চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্র জীবনে কখনো মুভি ক্যামেরা চালাননি। ২১ বছরের এই তরুণ রেঁনোয়ার রিভার ছবিতে স্টিল ফটোগ্রাফি করতেন। সেই সময় থেকে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। সত্যাজিৎ রায়ই তাকে পথের পাঁচালী’র চিত্রগ্রাহকের দায়িত্ব দেন। পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায়ের বহু ছবির চিত্রগ্রাহক হিসাবে সুব্রত প্রচুর সম্মান ও পুরষ্কার অর্জন করেন। সুব্রত মিত্র এ ছবির আবহ সঙ্গীতে সেতারও বাজিয়েছেন।
ছবির অর্থ জোগান দিতে সত্যজিৎ রায় গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ করেন, নিজের জীবন বীমার স্কিম বিক্রি করেন, প্রিয় এলপি রেকর্ডগুলো বিক্রি করেন, তার স্ত্রী বিজয়া রায় সব গয়না বন্ধক রাখেন। তবু অর্থভাবে প্রায় এক বছর শুটিং বন্ধ থাকে। সত্যজিৎ রায় পরে বলেছিলেন, এ দেরী তাকে দুঃশ্চিন্তায় ফেলেছিলো এবং তিনটি অলৌকিক বিষয় তাকে রক্ষা করেছে :‘প্রথমত অপুর কণ্ঠ ভেঙে যায়নি, দূর্গার বয়স বাড়েনি এবং ইন্দির ঠাকুর মারা যাননি।’ ছবি শেষ হতে তিন বছর লেগেছিলো।
১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট পথের পাঁচালী কলকাতার সিনেমা হলে মুক্তি পায়। শুরুতে এ ছবি কলকাতার দর্শককে খুশি করতে পারেনি। সপ্তাহ দুয়েক পর কিছু দর্শক হলে আসতে থাকে। পরবর্তীতে আরেকটি হলে টানা সাত সপ্তাহ ছবিটি চলে। বিধান চন্দ্র রায় ভারতের প্রধান মন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে দেখানোর জন্য কলকাতার একটি হলে এর আলাদা শো’র ব্যবস্থা করেন। তিনি ছবিটি পছন্দ করেন এবং তার কারণেই ছবিটি শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালের কান ফিল্ম ফ্যাস্টিভালে অংশ গ্রহণ করতে পারে। এর আগে অনেকেই অভিযোগ করেন এ ছবি ভারতে দারিদ্র্যকে তুলে ধরছে, এতে করে ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। এমনকি এ ছবির সাফল্য যখন প্রমাণিত তখন ১৯৮০ সালে ভারতের বিখ্যাত অভিনেত্রী ও সংসদ সদস্য নার্গিস দত্ত সংসদে বলেছিলেন, এ ছবির ভারতের দারিদ্র্যকে পূঁজি করছে। ফ্রান্সের চলচ্চিত্র পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ত্র“ফো বলেছিলেন, ‘চাষারা তাদের হাত দিয়ে ভাত খাচ্ছে এমন ছবি আমি দেখতে চাই না।’ অন্যদিকে জাপানের পরিচালক কুরোশাওয়া বলেছিলেন, ‘এ ছবির দেখার পর আমার মনে যে রোমাঞ্চ হয়েছিলো তা আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না। এরপর আমি বহুবার এ ছবি দেখার সুযোগ পেয়েছি এবং প্রতিবারই আপ্লুত হয়েছি।
এ ছবির পথ ধরেই ১৯৫৬ সালে অপরাজিত এবং ১৯৫৯ সালে অপুর সংসার নির্মিত হয়। এই তিনটি ছবি সারা বিশ্বে অপু ট্রিলজি বলে খ্যাত।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, দেশ, আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দলোক, সানন্দা, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]