পথের পাঁচালী রইলো…

চোখের পলকেই যেন ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাস ৯২ বছরে পা রাখলো। অপু নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে গিয়েছিলো উপন্যাসের কাহিনিতে। কিন্তু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপন্যাস বাঙালী পাঠককে ছাড়েনি আজও। অপুর পরিক্রমা বাঙালীর প্রাণের সঙ্গী হয়েই থাকলো এতটা সময় ধরে।

তখন তিনি বিএ পাশ করে প্রথম চাকরি পেয়েছেন একটি স্কুলে। ক্লাসের ফাঁকে একদিন বসে আছেন শিক্ষকদের ঘরে। হঠাৎ অল্প বয়সী একটি ছেলে এসে তাকে অদ্ভুত এক প্রস্তাব দিয়ে বসলো। ছেলেটি তাঁর সঙ্গে যৌথ উদ্যাগে বই লিখতে চায়। শুনে বিভূতিভূষণ তো বিষ্মিত। সে সময় তিনি গল্প উপন্যাস তো দূরের কথা, প্রবন্ধ লেখার কথাও ভাবেননি।তাই ছেলেটির কথার কোনো গুরুত্বই দেননি তিনি সেদিন।   কিন্তু, পরের দিন স্কুলে গিয়ে দেখেন আরও অদ্ভূত এক কাণ্ড ঘটিয়েছে ছেলেটি। দেয়ালে পোস্টার লোগিয়ে গেছে যেখানে লেখা ছিলো, শীঘ্রই তাঁর উপন্যাস বের হবে। বিভূতিভূষণের সহকর্মীরা তাঁর এই গুণের কথা জেনে অভিনন্দন জানাতে শুরু করে দিলেন। সবার একটাই প্রশ্ন, লেখা কবে প্রকাশিত হবে? বিপদেই পড়ে গেলেন তিনি। সহকর্মীদের বলে উঠতে পারলেন না, তিনি আদৌ লেখক নন। খুব রাগ হলো ওই ছেলেটির উপর।আর রাগের চোটে কাগজ-কলম নিয়ে বসে পড়লেন লিখতে। একটি ছোট গল্প লিখে পাঠিয়ে দিলেন কলকাতার একটি মাসিক পত্রিকায়। আশঙ্কা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন অমনোনীত গল্প কবে ফেরত পাঠায় পত্রিকার সম্পাদক।  সপ্তাহ তিনেক পরে সম্পাদকের চিঠি এলো বাড়িতে। জানতে পারলেন, লেখা মনোনীত হয়েছে এবং শীঘ্রই তা প্রকাশিত হবে। অবশেষে বাংলা ১৩২৮ এর মাঘ মাসের ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘উপেক্ষিতা’। পরে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যতীন্দ্রমোহন রায় নামে সেই ছেলেটিকে ঈশ্বরের দূত মনে হয়েছিলো।

১৯২৫ সালের এপ্রিল মাসে ভাগলপুরে কাজ নিয়ে আসেন বিভূতিভূষণ। সেখানকার জঙ্গলমহালের সহকারী ম্যানেজার। সেখানে বসেই লিখতে শুরু করেন পথের পাঁচালী উপন্যাস- ‘নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের একেবারে উত্তর প্রান্তে হরিহর রায়ের ক্ষুদ্র কোঠাবাড়ি’। ডায়েরি লিখতেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। উপন্যাস শুরু করার অভিজ্ঞতার বিবরণ লিখে রাখেন সেখানে এভাবে-‘জগতের অসংখ্য আনন্দের ভাণ্ডার উন্মুক্ত আছে। গাছপালা, ফুল, পাখি উদার মাঠঘাট…আস্তসূর্যের আলোয় রাঙা নদীতীর, অন্ধকার নক্ষত্রময়ী উদার শূন্য…জগতের শতকরা ৯৯ জন লোক এ আনন্দের অস্তিত্ব সস্বন্ধে মৃত্যুদিন পর্যন্ত অনভিজ্ঞই থেকে যায়’। পথের পাঁচালী উপন্যাসে বিভূতিভূষণ তাঁর নিজের পরিবারের চরিত্রগুলোকেই তুলে আনলেন। আর স্বয়ং নিজে উপস্থিত হলেন অপু নাম ধারণ করে।

উপন্যাস লেখা প্রায় শেষ হয়েই গিয়েছিলো। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে আগমন ঘটলো দূর্গা চরিত্রের। আবার ডায়েরিতে লিখলেন, ‘ একদিন হঠাৎ ভাগলপুরের রঘুনন্দন হলে একটি মেয়েকে দেখি। চুলগুলো তার হাওয়ায় উড়ছে। সে আমার দৃষ্টি ও মন দুই-ই আকর্ষণ করল-তার ছাপ মনের মধ্যে আঁকা হয়ে গেল, মনে হলো, উপন্যাসে এই মেয়েওকে না আনলে চলবে না। পথের পাঁচালী আবার নতুন করে লিখতে হল, এবং রিকাস্ট করায় একটি বছর লাগল’।

১৯২৮ সালে সাময়িকপত্র বিচিত্রা’তে উপন্যাসটি ছাপা হতে শুরু করে। বই হয়ে ছেপে বের হতে ১৯২৮ সাল। আর ততোদিনে পথের পাঁচালী বাংলা সাহিত্যে অনন্য অবস্থান দখল করে নিয়েছে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ পথের কবি, কিশলয় ঠাকুর, এই সময়, কলকাতা
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box