পথে যেতে যেতে আমি ফিরে ফিরে চাই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

ইমতিয়াজ বুলবুল

ছবিতে গাইতে গাইতে এমন অবস্থা হলো যে আমি এবং আমার জীবনসঙ্গী বলা যায় স্টুডিওতেই থাকি।আমাদের বাসা তখন বাসাবোর ছায়াবীথি হাউজিং এ। কিন্তু সেখানে বাসাবোর প্রধান রাস্তাটি যেটা বাসাবো রেলগেইটের পাশে দিয়ে বাসাবো, মাদারটেক, হয়ে ডেমরা দিয়ে নরসিংদী চলে গেছে ওই রাস্তাটি এমন কাটা কাটলো যে তার খানাখন্দে নৌকা চলবে। কৈশোরের বেশীরভাগ সময় মাদারটেক এর কাদার সঙ্গে কেটেছে। এখন এই ব্যাস্ত সময় ব্যাস্ত জীবনে অতি মূল্যবান সময় রাস্তার পিছনে নষ্ট করলে চলবে কি করে!

আমরা বাসা পাল্টিয়ে রামপুরার মহানগর প্রজেক্টে চলে গেলাম। আমাদের গানের জগতের অতি পরিচিত প্রিয়মানুষ গায়ক আবু সাঈদ জাহাঙ্গীর ভাই আমাদের ওই এরিয়াতে নিয়ে গেলেন।সুন্দর বাসা, এলাকাটাও সুন্দর। কিন্তু ওখানে খুব একলা হয়ে গেলাম। বাবা-মায়ের কাছে থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। আর পাড়ার মানুষদের কাউকে চিনিনা।যাই হোক তারপর ও জীবন কেটেই যায়।মাশুক কে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে ভর্তি করালাম আর ফারিয়াকে ভিকারুননিসা স্কুলে ভর্তি করালাম। সেই স্কুল গুলোও ভালোই দূরে। ওদের স্কুলের জন্যই নতুন মানুষ রাখলাম কিন্তু আমি থাকি সারাদিন থাকি স্টুডিওতে। সংসার খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। গানের সঙ্গে সঙ্গে আমার রান্নার গল্পও ছড়িয়ে পড়লো। প্রায়শই আলাউদ্দিন ভাই ,বুলবুল ভাইয়ের আবদার হতে লাগলো যে আমি যেন স্টুডিওতে রান্না করে নেই।এ আরেক মুশকিল হলো। আমি রান্না করবো কখন রেকর্ডিং এ যাবো কখন , বাচ্চাদের পড়াশোনা, তাদের স্কুলে যাওয়া সব কিছুই খুব কষ্টকর হলেও আমরা যোদ্ধার মতো সব সামলে নিচ্ছিলাম।কিন্তু মুশকিল এ পড়লাম বাসা নেয়ার একবছরের মাথায় সারা ঢাকায় ভীষণ বন্যা হলো এবং আমাদের বাসার সামনে পানি উঠলো। কোনমতে আমাদের গাড়ি সেই পানি সাঁতরে এদিকে কোন গ্যারেজে রাখা হলো। আমরা নৌকা দিয়ে মহানগর প্রজেক্ট পাড়ি দিয়ে সেই গ্যারেজে আসি তারপর মগবাজারের বেকারির গলি দিয়ে শ্রুতি স্টুডিওতে যাই।গান গেয়ে বাসায় ফিরতে না ফিরতে ফোন আসে যে আবার স্টুডিওতে যেতে হবে।আবার নৌকায় চড়ে গাড়ি পর্যন্ত গিয়ে তারপর স্টুডিও। এই যে এতো কঠিন পথ পরিক্রমা, সেসব না বুঝেছেন আত্মীয় স্বজন না বুঝেছেন মিউজিক ডিরেক্টর না বুঝেছেন আশেপাশের মানুষ। আর শ্রোতারা তো কখনই বুঝবেন না যে কি ভয়ানক কষ্ট আমরা করি।

বন্যা তো বর্ষাকালেই হয়।সেই নৌকায় করে যে মহানগর প্রজেক্ট পার হতাম তখন শুধু নীচেই পানি থাকতো না।মাথার উপর বৃষ্টি ও থাকতো। আমাদের ওই প্রজেক্ট এ আমাদের সোনালী কন্ঠের খালিদ হাসান মিলু ভাই ও থাকতেন। আমরা অনেক সময় এক নৌকাতেই যাতায়াত করেছি।এক ছাতার নীচে টুলে বসে নদীর মত জায়গা পাড়ি দিয়ে আধাভেজা হয়ে স্টুডিওতে গিয়ে মাথা মুছে গান গাইতে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে গায়ে চড়চড় করে বেড়ে যাওয়া জ্বর নিয়ে অবলীলায় গেয়েছি ” যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে অমর হয়ে রয়, সেই প্রেম আমাকে দিও, জেনে নিও, তুমি আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় তুমি আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় “

 এই গান যেদিন আমি এবং মিলু ভাই গেয়েছি সেই দিন একটি দিন ছিলো বটে।বুলবুল ভাই বলেছেন গরুর গোস্তো ভুনা, সব্জী,করলা ভাজি, কাচকি মাছের চচ্চড়ি খাবেন। একে গায়ে জ্বর তায় প্রায় বিশজন মানুষের রান্না, ঘরে কোন কাজের লোক নাই , আমার গানটান সব মাথায় উঠলো। গায়ের শক্তি মনের জোর গানের গলা সব রান্নার পাতিলে ঘনীভূত হলো। কিন্তু মহরতে অনেক লোক দেখে মিইয়ে যাওয়া আমি মানসিক শক্তির বলে দাঁড়িয়ে গেলাম।চোখ বুঁজে ভাবলাম তোমাকে পারতেই হবে পারতেই হবে পারতেই হবে। গান যখন গাইছিলাম তখন আমার আর না হয় একশো চার জ্বর! আধাচেতন অবস্থায় গাইছিলাম। আমি শুধু মিলু ভাইকে দেখছিলাম। এতো উউঁচু একজন মানুষ, উনার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিলো আকাশ থেকে কন্ঠ তো নয় গলিত সোনার নহর বইছে।গান শেষ করে বাহবা কুড়িয়ে আবার নৌকা করে বাড়ি গিয়ে খুব অসুস্থ হয়ে গেলাম এবং বলাই বাহুল্য এক সপ্তাহে আর না হয় ছয়টি গান মিস করে ফেললাম। এবং শিক্ষা নিলাম যে জ্বর হলে আমার শক্তি আরও বাড়িয়ে নিয়ে ঠিকঠাক গান গাইতে হবে।এ থেকে আমার মাফ নেই। পথে যেতে যেতে আমি ফিরে চাই যখন তখন মনে হয় “আহা! কি ভয়ংকর সুন্দর দিন না আমি গান গেয়েই পার করেছি” আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]