পথ…

পথ…। চেনা এবং অচেনা ঠিকানাকে যুক্ত করা একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব। ঘর থেকে নামলেই একটা পথ চিরকালের ধূলিকণার রেখায় আঁকা। পথ তৈরি করেছে মানুষ তার নিজেরই প্রয়োজনেই।  সে-পথ ধরে পৌঁছানো যায় কোনো গন্তব্যে। কতরকম পথ তৈরি করেছে মানুষ। চলে যাওয়ার পথ, ফিরে আসার পথ। নাম দিয়ে, সংখ্যা দিয়ে সেসব পথকে চিহ্নিত করেছে। পথ আমাদের নিয়ে যায় অজানায়। আবার ফিরিয়ে আনে চেনার মাঝে। এই চলাচলের মাঝখানে ঘাসের মতোই গজিয়ে ওঠে অনেক গল্প।পথিককে কোথায় নিয়ে যায় এই পথ? কোথায়ই বা ফিরিয়ে আনে! রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,‘ আমি কাহারো লক্ষ্য নহি, সকলের উপায়মাত্র। আমি কাহারো গৃহ নহি, আমি সকলকে গৃহে লইয়া যাই’।

কেউ পথ খোঁজে, কেউ পথ পায় না। খোঁজার আগেই কারো কাছে পথ এসে ধরা দেয়, কারো পায়ে লেগে থাকে পথের ধূলোমাটি। দুটি দূরত্বকে কাছে আনে পথ। কবি নবারুণ ভট্টাচার্য এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি একটা পুরনো রোড রোলারের কাছে বসে পথ বানানোর গল্প শুনি।’ এই পথ বানানোর গল্পটা কঠিন। এই যে হাজার হাজার শ্রমিক মিলে নগরে, বন্দরে, পাহাড়ে, সমুদ্রের বুকে পাথর কেটে, ইট গুড়ো করে, পীচ ঢেলে পথ তৈরি করেছে, তৈরি করেছে সভ্যতা আর সংযোগের সংস্কৃতি তার ইতিহাস কে কবে কোথায় লিখেছে? সে পথের উপর দিয়ে বয়ে গেছে জনস্রোত, রাজরাজাদের রথ, একলা পথিকের ঘরে ফেরার গল্প। মানুষ পথ বানিয়েছে চাঁদে যাওয়ার, সমুদ্রের তলদেশ খুঁড়ে রাস্তা বেঁধেছে, ভাগ্য বদলানোর পথ নির্মাণ করেছে আবার পথে নেমে আর কখনো ফিরেও আসেনি। 

পথ বড় অদ্ভুত বিষয়।মানুষের মনের মধ্যেও একটা পথ আছে। সেই পথের সঙ্গে বাস্তবের পথের বিস্তর ফারাক। আদর্শের পথ তো আরো কঠিন পরীক্ষায় আচ্ছন্ন। যাবার প্রয়োজনে মানুষ পথ বানায় আবার সেই পথ মানুষকে ডেকে ঘরছাড়া করে। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেই ‘পথ’ নিয়ে নানা কথা।

খৃষ্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ২২০০ সালের মধ্যে পৃথিবীর প্রথম রাস্তা তৈরি হয়েছিলো মিশরে এমনই সাক্ষ্য দেয় ইতিহাস।তার আগে? তার আগেও এই পৃথিবীতে পথ ছিলো। পশুরা তৈরি করেছিলো সেই পথ। মানুষের ইতিহাস আরো জানায়, খৃষ্টের জন্মের বহু আগে প্রাচীন ইংল্যান্ডে মানুষ তৈরি করেছিলো কাঠের রাস্তা। এরপর যুগ যুগ ধরে মানুষের সভ্যতার ইতিহাস এগিয়েছে পথের কাঁধে ভর করে। বাংলা সিনেমার মহা রোমান্টিক জুটি উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন অভিনীত সেই বিখ্যাত গানের দৃশ্যটির কথা আজো মনে পড়ে। মোটর সাইকেলে বসে পর্দায় সেই বিখ্যাত গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলানো-‘এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলতো?’ তাদের সেই অনন্ত পথের ধারণা তো ছিলো ভালোবাসার পথ। ভালোবাসার পথ ফুরিয়ে যাক এমনটা কে কবে চেয়েছে? এই গান চিরকালের হয়ে আছে বাঙালীর মনে। সত্যিই তো ভালোবাসার পথ তো ফুরাতে চায় না। তাহলে কোন পথ ফুরিয়ে যায়? জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন তাঁর কবিতায় ফুরনো পথের কথা।

আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন- কতদিন আমিও তোমাকে

খুঁজি নাকো;- এক নক্ষত্রের নিচে তবু- একই আলো পৃথিবীর পারে

আমারা দু’জনে আছি; পৃথিবীর পুরোনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,

প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়।

জীবনানন্দের কবিতায় মানুষের মানসিক সংযোগের মৃত্যুর ইশারা। কবির কাছে প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়। আর সেই মৃত্যুর ধারণা মানুষের মানসিক মৃত্যুকে কাছে ডাকে। মানুষের জীবনের পথ একদিন শেষ হয়ে আসে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের হারু চরিত্রটি জঙ্গলের অচেনা পথে বজ্রপাতে মারা যায়। হারু জঙ্গলে ঢুকেছিলো পথ সংক্ষেপ করতে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন উপন্যাসে, ‘পথ তাহার সংক্ষিপ্তই হইয়া গেলো। পাড়িও জমিলো ভালো’। এমনি ভাবে মানুষের জীবনের পথ সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়।জীবনের অদৃশ্য পথ ধরে চলতে চলতে হঠাৎ একদিন পথ ফুরিয়ে যায়। জীবনের পথের উপর নামে শেষদৃশ্যের পর্দা।

রোমান সম্রাটদের পথ কিন্তু সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়নি। পৃথিবীকে পদানত করতে তারা তৈরি করেছিলেন পাথরের মজবুত পথ। সেসব পথ দিয়ে পার হয়েছে রোমান সেনাদল, সমরাস্ত্র। তারা দেশের পর দেশ দখল করেছে, লড়াই করেছে। ইতিহাসের পাতায় রোমান সাম্রাজ্যের নাম আজো উজ্জ্বলভাবে গাঁথা। কিন্তু তাদের তলোয়ারের আঘাতে, চাবুকের নির্মমতায় দাসদের জীবনের পথ কিন্তু মুছে গেছে ইতিহাসের অন্ধকারে। তবে সেই অন্ধকারে বিদ্রোহ করেছিলেন স্পার্টাকাস। সূচনা করেছিলেন বিদ্রোহের পথের নিশানা।

বিদ্রোহেরও পথ থাকে। বাংলা গানের একজন অসাধারণ সুরকার ও গীতিকার সলিল চৌধুরী গান লিখেলেন, ‘পথে এবার নামো সাথী পথেই হবে পথ চেনা’। এ কোন পথ? যুদ্ধের পথ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যয়সঙ্গত বিদ্রোহের পথ?শোষণ আর বঞ্চনা থেকে মানুষের মুক্তিকে অবারিত করতে পৃথিবীতে বৈপ্লবিক মানুষেরা পথের সন্ধান করেছেন। তারা বিদ্রোহের, বিপ্লবের আগুন জ্বেলে মানুষকে সেই পথের ঠিকানা চিনিয়ে দিতে চেয়েছেন।

চীনে বিপ্লব সংগঠিত করতে মাও সে তুং-এর লং মার্চ আজো দৃষ্টান্ত হয়ে আছে ইতিহাসে। ৯৩৭৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন মাও তার রেড আর্মি নিয়ে। পৃথিবীর দেশে দেশে চে গুয়েভারা বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে দেয়ার পথ খুঁজেছিলেন। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন সর্বহারা মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের সূচনা করেছিলো রাশিয়ায়। এ সবই তো পথ খোঁজা, যেনো ঝড়কে খুঁজতে পথে নামা।

পথ থাকলে পথ হারানোর গল্পও থাকে। রূপকথার গল্পে রাজার ছেলেদের পথ হারিয়ে রাক্ষসদের কবলে পড়ার গল্প তো আমাদের শৈশবকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। পথ হারানো রাজকুমারদের জন্য তখন আমাদের মনে উদ্বেগের অন্ত ছিলো না। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে পথের জাল।পানির উপর অথবা আকাশের অসীমেও মানুষ তৈরি করেছে চলার পথ। ঠায়-ঠিকানা, নম্বর আর বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে সেসব পথের সীমানা গোছানো। নেই হারাবার শংকা। কিন্তু তারপরেও মানুষ হারায় পথের দিশা। সেই হারিয়ে যাওয়াকে বেঁধে রাখতে পারে না কোনো কম্পাস। ছেলেবেলায় শোনা যেতো অচেনা রাস্তায় গেলে ছেলেধরা এসে পথ ভুলিয়ে নিয়ে যাবে। সেই পথ ভোলানোর মন্ত্রটা আসলে কী? কোন মন্ত্র পড়ে মানুষ খুঁজে পায় হারিয়ে যাবার ঠিকানা? আসলে মানুষের মন-ই জেনেছে সেই ভুল পথের ঠিকানা। তার চেতনার মধ্যেই খেলা করে পথ ভুল করার আকাঙ্ক্ষা। রবীন্দ্রনাথ তো তাঁর গানেই লিখে গেছেন, ‘আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি’। এই পথভোলা পথিকদের কাছে বহুদূর থেকে অজানা পথ যেনো গোপন বার্তা পাঠায়। এ যেনো নিশির ডাক। সে ডাকে ঘর ছেড়ে কেউ কেউ সংসার বিরাগী হয়, কারো মনের মধ্যে বসবাস করে আজীবনের এক উদ্বাস্তু মানুষ।

আর্কিমিডিস গণিতের সূত্রের সমাধান করতে পেরে আনন্দে উলঙ্গ হয়ে রাস্তায় চলে গিয়েছিলেন। পোশাক পড়ার কথা তার মনেও ছিলো না। এই বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানীরাও পৃথিবীর নানান জটিল ধাঁধার সমাধান করেও তৈরি করেছেন নতুন পথ। সে পথ চিন্তার, সে পথ মানুষের কল্যাণের। চিন্তা আর নতুন আবিষ্কারের পথও মানুষ প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে গেছে বহুদূর। এই মানুষ এখন মঙ্গল গ্রহেও বাঁধতে চাইছে ঘর।

গ্রামের ধূলিধূসরিত পথ অথবা শহরের কোনো কানাগলি। সেই পথ বদলে গিয়ে পৃথিবীর কত জনপদ, কত প্রান্তর পেরিয়ে ছড়িয়ে যায় আরো কতদূরে। সেই পথ তো আমার নিজস্ব পথ। কিন্তু সে পথে একবারই হেঁটে যাবার সুযোগ আছে। আর কখনোই ফিরে গিয়ে নতুন করে সে পথে চলার সুযোগ নেই। আবারও ফিরি রবিঠাকুরের লেখায়। ‘পায়ে চলার পথ’ লিপিকায় তিনি লিখেছেন, ‘নেবুতলা উজিয়ে সেই পুকুরপাড়, দ্বাদশ দেউলের ঘাট, নদীর চর, গোয়াল-বড়ি, ধানের গোলা পেরিয়ে সেই চেনা চাউনি, চেনা পথ, চেনা মুখের মহলে আর একটিবারও ফিরে গিয়ে বলা হবে না ‘এই যে’। আসলে পথেই আমরা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলি। হারাই সম্পর্ক, হারাই সঙ্গী, হারাই স্বপ্ন। তবুও পথ-ই আমাদের নিয়তি। পৃথিবীর বুকে যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠেছে মাইলের পর মাইল পথ। সে-পথ মানুষকে মানুষের কাছে এনেছে আবার দূরেও ঠেলে দিয়েছে। পথ আমাদের অচেনা করেছে, বিবাগী করেছে, ফিরে তৈরি করেছে স্বপ্ন দেখার বাসনাও।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল ও লেখক ।