পরকীয়া, পরকীয়া…

পরকীয়া-আলোচনার ফুলঝুড়ি, না চায়ের কাপে ঝড়? একসঙ্গে দুটোই হতে পারে। তবে এ কথা ঠিক বিষয়টি নিয়ে গত কিছুদিন ধরে আলোচনার ঝড় উঠেছে চায়ের কাপে নয় আমাদের দুঃখ-সুখের বারান্দা বলে খ্যাত ফেইসবুকে। আলোচনা চলছে নানা পোর্টালেও। হঠাৎ করে নারী ও পুরুষের এই বিশেষ ধরণের প্রেমাচারণ আলোচনায় কেন? সূচনার সূত্র অথবা কারণ কোনটাই খুঁজে না পাওয়া গেলেও আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে এবং তা নিয়ে চর্চাও ভালোই হচ্ছে। যে কোন বিষয় নিয়ে মুক্ত আলোচনা সবসময়ই স্বাস্থ্যকর। আলোচনার ঝড়ে কখনো সঠিক পথ বের হয়ে আসে আবার কখনো মূল প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যায়।

প্রাণের বাংলাও এ আলোচনায় অংশ নিতে চায়। তাই এবারের প্রচ্ছদ আয়োজন পরকীয়া নিয়েই। লেখকদের কাছে আমরা তাদের মতামত চেয়ে লেখা আহ্বান করেছিলাম। তারা জানিয়েছেন তাদের ভাবনার কথা।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি

পরকীয়ার সামাজিক অনুসন্ধান

“To be wronged is nothing unless you continue to remember it”.

  • Confucius

পরকীয়া নিয়ে পড়তে গিয়ে কনফুসিয়াসের এই কথাটি মাথায় এলো। না, আমি পরকীয়া ভুল বা ঠিক, নৈতিক বা অনৈতিক কিনা সেই বিচারে যাচ্ছিনা। কিন্তু মানুষ কেন বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কে জড়ায় সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক লেখায় উপ-মহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে ১২টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- অল্প বয়সে বিয়ে, ভুল কারণে বিয়ে করা, পরিবর্তনকে মানতে না পারা, অভিভাবকত্ব, যৌন অতৃপ্তি, Emotional disconnect বা মনের অমিল, সামাজিক মূল্যবোধের মৌলিক জায়গায় দু’জনের বিপরীত অবস্থান, জীবনের চাহিদা বলে যাওয়া, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, একঘেয়েমি, আর্থিক অস্বচ্ছলতা বা একজনের আকস্মিক অর্থ প্রতিপত্তি বেড়ে যাওয়া (বিশেষ করে পুরুষের) এবং নাগরিক জীবনের মানুষের অধিক পরিমাণে ক্যারিয়ার সচেতন হওয়া।

পরকীয়ায় যারা জড়িয়ে যায় তারা প্রথমে এটাকে একটা হাল্কা বিষয় হিসেবেই দেখে। ভাবে এটাও জীবনের চটুল কোন দিক। ভাবতে থাকে, বিবাহিত জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেও কোন একজনের আবেগ আর অনুভূতি ভাগ করে চলা সম্ভব হবে বাকি সময়টা। ভাবতে থাকে মুখস্ত জীবনে এই সম্পর্ক নতুন পথের দিশারী, জীবন আরো একবার প্রাণোচ্ছল হলো। হয়তো কেউ কেউ সারাজীবন এভাবে নিজেদের এগিয়ে নিতে পারে। কেউ কেউ মাঝ পথে হাল ছেড়ে দেয় আর কারো কারো জীবনে এ বিষয়টি পুরোই জটিলতা, কারণ কোন কূলই আর শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়না।

অ্যাফেয়ার বা সম্পর্ক আসলে তিনটি মৌলিক জায়গায় দু’জন নর-নারীকে একত্রিত করে। একটি গোপন সম্পর্ক, একটি আবেগ তাড়িত যোগাযোগ এবং শারীরিক চাহিদা। আবেগ আসল ভূমিকা রাখে এবং এখানে আবেগের গতি প্রায় ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে প্রাথমিক লক্ষ্য যা-ই থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত এই সম্পর্কে যৌনতাই নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়।

দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই ধরণের বেশিরভাগ সম্পর্ক লম্বা সময় টিকে থাকেনা। ভারতীয় মনোবিজ্ঞানী ড. রাশি আহুজা বলেন, “সব সম্পর্কের একটি হানিমুন পিরিয়ড আছে। এ সময়টাতে নিজেকে অনেক জীবন্ত মনে হয়, ভালবাসায় পূর্ণ মনে হয় এবং উজ্জীবিত মনে হয়। এবং দাম্পত্য জীবনের মতো পরকীয়াও একটা সময় বোরিং মনে হয়, আবেগ হারিয়ে দ্বন্দ্বই প্রধান হয়ে উঠে”। দাম্পত্য দ্বন্দ্ব তবুও মেটানোর উপকরণ আছে যেমন সন্তান, পরিবার, পরিজন এবং বন্ধুদের পরামর্শ। পরকীয়ায় যে সংঘাত হয়, সেখানে খুবই কম এমন উপকরণ মেলে।

অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। দাম্পত্য জীবন এর বাইরে নয়। এই তুলনা অতৃপ্ত করে তোলে আত্মাকে, চাহিদা এমন জায়গায় নিয়ে যায় যে, যার কোন দিক নির্দেশনা থাকেনা। আর সেখান থেকেই নতুন পথে পা বাড়ায় মানুষ। বিয়ের আগে বা বিয়ের সময় অনেকেই নিজেদের জীবনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেননা। এক সঙ্গে গোটা জীবন কাটাতে হলে একে অপরের গুরুত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ভাবে জানা ও সম্মান করা জরুরী। অধিকাংশ সময়ই দেখা যায় দু’জনের জীবনের গুরুত্বের জায়গাগুলো আলাদা। সেখান থেকেই শুরু হয় সমস্যা। সব দিক দেখে শুনে, অথবা এক সময়ে একে অপরের প্রতি তীব্র ভাললাগাই দু’জনকে এক করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাল লাগা-খারাপ লাগা সামনে আসতে শুরু করে। তখন বোঝা যায় দু’জন মানুষ আসলে কতটা আলাদা। এখান থেকে দূরত্ব বাড়তে থাকে।

আবার অনেকেরই পরিবারের জোয়াল টানতে টানতে অনেক সময় নিজের দিকে নজর দেওয়া হয়ে ওঠে না। নিজের পছন্দ, স্বাদ-আহ্লাদ মেটানো হয়ে ওঠে না। কোনও বন্ধুর আর্থিক সাহায্য, ভালবেসে স্বাদ-আহ্লাদ মিটিয়ে দেওয়া জন্ম দিতে পারে অবাঞ্ছিত সম্পর্কের। দু’জনের বেড়ে ওঠা, পছন্দ-অপছন্দের ফারাক অনেক সময়ই দূরত্ব গড়ে দেয়। শুধু সম্বন্ধ করে বিয়ের ক্ষেত্রে নয়, নিজের পছন্দে বিয়ের ক্ষেত্রেও পরবর্তীকালে এটা হতে পারে। বহু দিন ধরে মনের মিল না হলে স্বাভাবিক ভাবেই বিয়ের বাইরে নিজের মনের মতো মানুষটিকে খুঁজে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

কারণ হয়তো আরো খুঁজে নেয়া যাবে। কিন্তু সব পরিস্থিতিতেই নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা কখনই উচিৎ নয়। দাম্পত্য জীবনে যেমন, এর বাইরের সম্পর্কেও বিশ্বাসভঙ্গ আর অপমানে শেষ হয়ে যেতে পারে প্রতারিত হওয়া একটা মানুষের জীবন।

আন্জুমান রোজী
প্রবাসী, লেখক

পরকীয়া একটি নিষিদ্ধ শব্দ

পরকীয়া একটি নিষিদ্ধ সম্পর্কের নাম। নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি মানুষের অমোঘ আকর্ষণ থাকে। বলতে গেলে এটি মানুষের প্রকৃতিজাত বা স্বভাবচারিত অভ্যাস। নিষেধ করলেই আকর্ষণ বেড়ে যায়। নিষিদ্ধ বলেই পরকীয়া সম্পর্ককে অসামাজিক, অনৈতিক, অধর্মীয়, অবৈধ বলে আখ্যায়িত করা হয়। কে কিভাবে এই শব্দটি আবিস্কার করেছিল তা বলতে পারবো না। তবে নিষিদ্ধ শব্দটি ঘরে বাইরে কান ঝালাপালা করে রাখে। কেউ পরকীয়া সম্পর্কের মধ্যে পড়ুক আর না পড়ুক বিষয়টা নিয়ে বিস্তর ঘাটাঘাটি চলে। ঠিক যেভাবে ক’দিন আগে  বিষয়টি ফেইসবুক মাতিয়ে রেখেছে। শব্দটির প্রতি মানুষের উৎসাহ এতো বেশি থাকে যে, জানা্র আগ্রহ বেড়ে যায় দ্বিগুণ থেকে ত্রিগুণ। এই জানাজানির আগ্রহ থেকে পরকীয়া বিষয়  আশয়গুলো হীতে বিপরীতে ঘটতে থাকে। বাস্তবতা বলে, এর সুন্দর কোনো সমাধান কখনো কেউ দিতে পারেনি। শুধু ভাঙ্গনের মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরকীয়া সম্পর্কে জড়ানোর অনেক যৌক্তিক কারণ থাকে। সেগুলো মনোবিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করে আসছেন। যার মূল কারণই হলো মানসিক এবং শারীরীক ক্ষুধার তাড়না। স্বামী স্ত্রীর মাঝে যখন মানসিক এবং শারিরিক সম্পর্কের বৈষম্য দেখা দেয় তখনই কেউ না কেউ অন্য নারী বা পুরুষের উপর আসক্ত হয়। বিষয়টিকে অনেকে মানবিক দিক থেকে মূল্যায়নের চেষ্টা করে থাকেন। এদিক থেকে বিচার করলে মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি অন্যায় বা অবৈধ নয়। এক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা বা ভণ্ডামির দরকার পড়ে না। পশ্চিমা উন্নতদেশে মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে কোনো বিবাহিত নারী বা পুরুষ যদি অন্য বিবাহিত নারী বা পুরুষের কাছে ধরা দেয়, তখন তারা প্রকাশ্যে ঘোষণার মাধ্যমে জানিয়ে দেয়। কারণ, মন বলে কথা। তার উপরে আর কোনো কথা নেই। এমন কি আইন-ও এমন সম্পর্ককে সমর্থন করে থাকে। সংসার ভেঙ্গে তারা নতুন সংসার শুরু করে। এখানে এসব দিবালোকের মতো প্রকাশ্যে হচ্ছে। যেখানে ভণ্ডামি বা প্রতারণার কোনো অবকাশ নেই। ক্রিস্টাল ক্লিয়ারের মতোই সম্পর্কের বাতাবরণগুলো জ্বলজ্বল করতে থাকে। তাই সংসার ভাঙ্গার পরেও কেউ কাউকে অপরাধী বা দোষী সাব্যস্ত করছে না, কিংবা প্রতিশোধ পরায়নও হচ্ছে না। এমন কি সন্তানেরাও বাবামায়ের সম্পর্কগুলো মেনে নেয়। সংসার ভাঙ্গার পরেও প্রাক্তন স্বামী স্ত্রী একে অপরের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করে থাকে।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিত্রটা ভিন্ন। এখানে পরকীয়া নিয়ে  অনেক আলোচনা। বলতে গেলে সবরকম পরকীয়া সম্পর্ক গোপনে, মিথ্যা আর প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে চলে। এর শেষমেশ ভোগান্তিটা হয় একজন নারীর। পুরুষাতান্ত্রিক সমাজে পুরুষেরাই ভোগ করবে আর নারী হবে তার ভোগের সামগ্রী। এই মানসিকতা থেকেই বেশিরভাগ পুরুষ পরকীয়া সম্পর্কের জন্য অন্য বিবাহিত নারীকে প্ররোচিত করে আসছে। আর না্রী যদি হয় দুখী, তখন সে পরম আশ্রয় মনে করে ঝাপিয়ে পড়ে পর পুরুষের বুকে। পরিণতিতে নারীর কপালে জোটে হতাশা, গঞ্জনা, প্রবঞ্চনা আর কত অমানবিক, অমানসিক অত্যাচার। আবার অনেক বিবাহিত নারীপুরুষের সহজাত প্রবৃত্তিই আছে একের অধিক নারীপুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো। বলতে গেলে অতিরিক্ত আনন্দের নেশায় এরা বিভোর হয়ে এমন অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকে যার মধ্যে কোনো নৈতিকতা বা আদর্শের স্থান নেই। সেখানে শুধু আনন্দ আর উপভোগ।

পরকীয়া সম্পর্ককে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে  ধর্মীয় আনুশাসন বেঁধে দেওয়া হলো, আইন তৈরি হলো। সামাজিকভাবে ধিক্কার জানানোর ব্যবস্থা করা হলো। তারপরেও কি মানুষ এমন সম্পর্ক থেকে বিরত থেকেছে, না থাকতে পেরেছে! এক বিবাহিত নারী অন্য বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু অনৈতিক, অবৈধ বললে কম বলা হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমন সম্পর্ক আসলে চূড়ান্তভাবে প্রতারণার সামিল বলে গণ্য করা হয়। যে বিশ্বাসের উপর স্বামী স্ত্রী সম্পর্কের ভীত তৈরি হয় তা ভেঙ্গে যায় কাঁচের টুকরার মতো। সংসার ভেঙ্গে যাচ্ছে। সেই সংসারের বেশিরভাগ সন্তানেরা বিপথে যাচ্ছে কিংবা বাবা মায়ের পরকীয়া সম্পর্কের জন্য অনেক সন্তান অকালে প্রাণ বলিদান করছে। বাংলাদেশে পরকীয়া সম্পর্কের পরিনতি কখনই সুখকর নয় বরঞ্চ এটি দেশের সামাজিক অবক্ষয়ের প্রধান ধাপ। বর্তমান ঢাকা শহরে এমন অবস্থাই পরিলক্ষিত হচ্ছে বেশি। আজকের তরুণ প্রজন্মের সামনে নেই কোনো আদর্শিক আইকন বা সামাজিক অবকাঠামো যা খুবই দুঃখজনক। কারণ, এখানে পরকীয়া প্রেমের যৌক্তিক গ্রহনযোগ্যতা সবার বিবেচনায় থাকেনা ।

সবশেষে পরকীয়া বলি আর প্রেম বলি, বিষয়টি যদি হয় মানসিক, সেখানে কিছু বলার বা ভাবনার থাকে না। ভালোলাগার অনেক রকম রকমফের আছে। তা যদি সততা আর বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে হয় , তাহলে কারোরেই কোনো কিছু করার নেই।যে কোনো সম্পর্কের খাতিরে সততার জায়গাটা হোক স্বচ্ছ এবং সূর্যের মতো জ্বলজ্বল। ভালোলাগা আর ভালোবাসা দুটি পবিত্র শব্দ , সেটা যেই সম্পর্কের মধ্যেই গড়াক না কেন,তা সত্য, সুন্দর, পবিত্র হয়ে রক্ষা পাক। পৃথিবীতে সত্যিকারের প্রেম সবসময় কালজয়ী হয়েছে আর সেই প্রেমই পরকীয়ার হাত ধরে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। পরকীয়া নিষিদ্ধ সম্পর্ক হলেও এর আবহ চিরকাল থাকবে। তাই প্রেম শব্দটিকে যদি নেতিবাচক বা নিষিদ্ধ অর্থে পরকীয়া নামে ব্যাবহার করা হয় তবে, ‘পরকীয়া’ শব্দটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক।

রুদ্রাক্ষ রহমান
যুগ্ম বার্তা সম্পাদক
ডিবিসি টিভি

তাকে ‘আপনকীয়া’ বলি
কথা হলো এই যে, সমস্যায় জর্জরিত এই দেশে হঠাৎ হৈ হৈ, চৈ চৈ করে ‘পরকীয়া’ বিষয়টি আলোচনায় এলো কেনো? আলোচনায় আনলোই বা কারা? বেনোজলে ভেসে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। একটি বড় বন্যার আশঙ্কা লক লক করছে বিষধর সাপের জিবের মতো। প্রায় প্রতিদিন ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন অসহায় নারী, অবুঝ শিশু। ধর্ষকের বিকৃত কামের আগুন থেকে রেহাই পায়নি প্রতিবন্ধী, বাউল-ভিখেরিও; ঠিক সেই কালে আলোচনায় পরকীয়া! কারণ নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও আছে।
মানুষ থাকলে প্রেম থাকবে। কখনো কখনো হয়তো হতে পারে; তাই বলে প্রেম ছাড়া নতুন একজন মানুষের জন্ম; অসম্ভব! গভীর আকাঙ্খা আর নিবীড় প্রেম থেকেই নতুন একজন মানুষ আসে পৃথিবীতে। সেই মানুষ একটু একটু করে বড় হতে হতে যখন স্পর্শ করতে শেখে বোধের সমুদ্র, তখন আবার সে প্রেমে পড়তে শেখে। প্রেমটা এমনি যে সে প্রেম ছাড়া অন্যকিছুকে ভ্রক্ষেপই করে না। প্রেমতো একটা সাহসের নাম, সৃষ্টির নাম। আর ‘নৈতিকতা’-ধর্মগ্রন্থ, নীতিশাস্ত্রের বিধি-বিধান জাগরুক রেখে কে কবে কোথায় প্রেমে পড়েছে? প্রাচীনতম কথা- ‘নাথিং আনফেয়ার ওয়ার অ্যান্ড লাভ’। যে রাধা সাপের নাম শুনলে মুর্ছা যেতেন, সেই রাধা যখন কৃষ্ণপ্রেমে কূলহারা; গভীররাতে অভিসারে যাওয়ার পথে ফনাতোলা সাপের মাথা চেপে ধরতেন পাছে কেউ সর্পমণির আলোয় তাকে দেখে না ফেলে।
মানুষের ইতিহাসে, পুরানের পাতায় পাতায় প্রেমকথন আছে। আর পৃথিবী যদি কোনো উন্মাদের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে না যায় যুদ্ধ-বিগ্রহে, তাহলে প্রেম থাকবে, তাকে ডাকা হোক যে নামেই। এটাতো ঠিক যে খুনের চেয়ে প্রেম মহত্তর-উত্তম! মানুষ অবশ্য কখনো কখনো প্রেমের জন্য খুনের পথ বেছে নেয়; আখেরে তাতে ফল হয় বিষাদময়। প্রেমের জন্য খুনি হয়ে শেষ-মেষ জেলবাসে কাটাতে হয় বাকি জীবন অথবা নিতে হয় মৃত্যুদন্ড। তারচেয়ে এই ভালো নয় কি, দূরে থাকুক তবু বেঁচে থাকুক প্রেমিক। অন্যের হোক তবুও বেঁচে থাক প্রেমময় মানুষটি।
বাংলাগানের সম্রাট হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ঢংয়ের অবিকল আরেকজন আছেন, তিনি শিবাজী চট্টোপাধ্যায়। তার কণ্ঠের একটা গান হলো এই-‘তুমি অপরের আমি জানতাম/ ভালোবাসলাম তবু তোমাকেই/ আমার ফেরার উপায় নেই আর।’ ভালোবাসলে, প্রেমে পড়লে ফেরার উপায় থাকে না। সেই প্রেমের আবার আপন-পর কী? প্রথম-দ্বিতীয় কী? বাংলা সাহিত্যের দ্যুতিছড়ানো মানুষ হুমায়ুন আজাদের কথায় ‘দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম প্রেম ব’লে কিছু নেই। মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, তখন প্রতিটি প্রেমই প্রথম প্রেম।’
তাই, মানুষ যখন প্রেমে পড়ে তখন সে সুন্দর হয়ে ওঠে। জগত সেজে ওঠে প্রেমের আপন আলোতে। প্রেমে পড়ে মানুষ দ্রোহের কাল কাটায়। প্রেমে পড়ে মানুষ যুদ্ধজয় করে, কবিতা লেখে। প্রেমে পড়েই মানুষ বিদ্রোহী হয়, হয় শান্ত-স্থির। মায়াকোভস্কিকে বিপ্লবীরা তোপের মুখে ফেলে জানতে চেয়েছিলো যুদ্ধকালে তিনি কেনো অমন শান্ত-স্নিগ্ধ প্রেমের কবিতা লিখছেন? মায়াকোভস্কি স্নিগ্ধ হাসি ছড়িয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়েছিলেন- ‘এই যুদ্ধ, রক্তপাতের পর কী?’ বিপ্লবীরা উত্তর দিলো, ‘শান্তি-প্রেম।’ মায়াকোভস্কি হেসে বললেন, ‘আমিতো সেই কাজটাই এগিয়ে রাখছি।’
তো এই হলো প্রেমের শক্তি। সেই প্রেমকে আমি বরাবর ‘আপনকীয়া’-ই বলতে চাই। যে প্রেম আপনার চেয়ে আপন হয়ে যায়, তাকে ‘পরকীয়া’ কেনো বলবো?

কাশফিয়া ফিরোজ, নারী উন্নয়ন কর্মী

 

পরকীয়া !

পরকীয়া ?

বিগত দিনগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে রগরগে এবং উত্তেজনাবর্ধক বিষয় হিসেবে আলোচনার শীর্ষে স্থান করে নিয়েছে“পরকীয়া” নামক নারী-পুরুষের এক অপ্রকাশিত সম্পর্ক।

অপ্রকাশিত ? কেন ? তবে কি আমি ভুল ভেবেছি ?

প্রথমে চেষ্টা করেছি “পরকীয়া” সংক্রান্ত লেখা বাদ দিয়ে নিউজ ফেডে প্রকাশিত অন্য লেখা পড়তে।ভাবছিলাম দেশে কি তবে আলোচনার বিষয়বস্তুর সংকট চলছে? কিন্তু ক্রমাগত পোস্ট আমাকে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাষাতে প্রলুব্দ্ধ করে , পাছে আমি অজ্ঞ থাকি।পক্ষে-বিপক্ষে মতামত থাকবে এটাই স্বাভাবিক।আর তাই মিলিয়ে দেখার একটা তাগিদও অনুভব করছিলাম ভেতর থেকেই। এই খোঁজ করতে করতে বেশ অনেকগুলো লেখাপড়েও ফেললাম।

লেখাগুলোতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে , সহমত।

শারীরিক এবং মানসিক সম্পর্ক এবং ভাবের আদান প্রদানের কথা বলা হয়েছে , অবশ্য কাম্য।

জীবনকে উপভোগ করতে চাওয়ার যে বাসনা তার উল্লেখ করা হয়েছে , অস্বীকার করার কোন উপায় নাই।

রাষ্ট্রযন্ত্রর এবং পুঁজিবাদ কিভাবে প্রেমও ভালবাসার পথে অন্তরায়- তার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে , কথাতো সত্য।

তবে কেন তাল কেটে যাচ্ছে?

আমি ভালবাসায় বিশ্বাসী একজন মানুষ।তাই জীবনে প্রেম ভালবাসার আর্বিভাবকে আমি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখে থাকি।ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ যুগল স্বপ্ন দেখে, এটাই স্বাভাবিক।কিন্তু “পরকীয়া” এমন এক অপ্রকাশিত সম্পর্ক যেখানে ইতিবাচক পরিবর্তনতো দূরের কথা আগামীকালের পরিকল্পনারও কোন অস্তিত্ব নেই।

“পরকীয়া”তে এক ধরণের লুকোচুরি খেলা করে।সবসময় ধরা পড়ে যাবার ভয় তাড়া করে ফেরে।কোন ভবিষ্যৎ নেই, কোন স্বপ্ন নেই, ব্যক্তিগত কোন সময় নেই।ভালোবাসাতো এখানে অলীক কল্পনা মাত্র।তবে কেন আমরা চৌর্যবৃত্তির পক্ষে-বিপক্ষে দিনের পর দিন সময় নষ্ট করছি?

দ্বিতীয়ত, আমি মানছি , আমাদের সমাজে এমন অনেক নারী এবং পুরুষ আছে যাদের দাম্পত্য জীবন ততটা মসৃণ নয় যতটা আমরা দূর থেকে দেখে থাকি ।মানসিক দুরত্ব আর শারীরিক অতৃপ্তি তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত।এরই মাঝে , অনেক নারী পুরুষ আছে যারা নিজেদের এই ছোট্ট জীবনের সঙ্গে কোন সমঝোতা করেননি বরং বেছে নিয়েছেন তার মনের মানুষকে।স্বপ্ন দেখেছেন , স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কিন্তু ক্ষণিকের সুখের আশায় মিথ্যাকে উপজীব্য করে যে সম্পর্ক আদতে কি সেখানে সুখ আছে? রুবিস্কিউব মেলানোর এক অক্লান্ত প্রয়াস।সারাক্ষণ হিসাব কষা – কখন যাবো, কোথায় যাবো, কে দেখলো , বউকে/বরকে কি বুঝ দিবো, বসকে কি বলবো , আজ দশ মিনিটের জন্য তো কাল একঘন্টা।এতো টেনশন নিয়ে কি প্রেম হয়? মানসিক নির্ভরশীলতা কিংবা যৌনসুখ ? আমার অনেক বন্ধুর মতে , পরকীয়া শারীরিক আত্মতৃপ্তির এক বহিঃপ্রকাশ মাত্র।সত্যি ? সুখ খোঁজার রিলেরেসে আত্মতুষ্টি কিংবা শারীরিক/যৌন তৃপ্তি পাওয়া এতো সহজ?

সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে নারী তার জীবনের ভালো মন্দের বিচার বিশ্লেষণ নিজেই করবে, এটাই কাম্য। সম্পত্তিতে এবং উপার্জনে থাকবে তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু আমার মনে হয় না আজ নারীও কিশোরীরা যে ভাবে শেকল ভেঙে বেরিয়ে আসছে, “পরকীয়া” তাতে কোন মুল্য সংযোজন করবে।বরং লুকোচুরির খেলায় “পরকীয়া” নারীকে আরও বেশি কোণঠাসা করে দিবে।পরনির্ভরশীলতা বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করবে।

এরই মাঝে আমারই একদল বন্ধু “পরকীয়া” কে নারীবাদের ফ্রেমে ফেলে ইউরেকা ইউরেকা বলে চিৎকার করতে করতে আজ স্বঘোষিত ‘ফেমিনিস্ট’।তারা বিশ্বসাহিত্যে নারী নিয়ে যে সব ভাবনার কথা বলা হয়েছে সে সবের পাঠ নেননি। নিজের জীবনের কিছু বাজে অভিজ্ঞতাকে উপজীব্য করে আইডোলজির বারোটা বাজাচ্ছেন।যুগ যুগ ধরে সংগ্রামের মাধ্যমে আজ নারীর যে অবস্থান তাকে হেয় প্রতিপন্ন করছে প্রতি মূহূর্তেই।বিষয়টা অনেকটা এমন যে, সমাজ , রাস্ট্র , নীতিনির্ধারণ আর ধর্মের পাঠ দিবে পুরুষ।আর নারী – হেঁসেলের গান গাইবে , বিছানায় ঝড় তুলবে , খুব বেশি হলে ফেসবুকে পরকীয়ার মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দিনের পর দিন পার করে দেবে।

আমার দেখা মতে :

পরকীয়াতে – মর্যাদা নেই

পরকীয়াতে – প্রেম নেই

পরকীয়াতে – যৌনসুখ নেই

পরকীয়াতে – সত্যের কোন স্থান নেই

পরকীয়াতে – ব্যক্তিগত সময় নেই

পরকীয়াতে – সামাজিক স্বীকৃতি নেই

পরকীয়াতে – মানসিক নির্ভরতা নেই

পরকীয়াতে – অধিকার নেই

তবে কেন এই পরকীয়া ?

শামীমা জামান
লেখক

পরকীয়া তো ডরনা কিয়া।।

পরকীয়া ভাল না খারাপ, এই আলাপে সরগরম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা পোর্টালের পাতাগুলো। জন্ম থেকে অন্ধকারকে কালোই জেনে এসেছেন হঠাৎ করে কেউ একজন বলল অন্ধকার কালো নয় আসলে ওটা সাদা। এই আলাপটা অনেকটা সেরকমই।

 জীবনের যে কোন বয়সে প্রেমে পড়াকে মানবিকতার চোখ দিয়ে দেখে অনেক বিদগ্ধজনই বললেন পরকীয়া হতেই পারে,সেক্ষেত্রে সঙ্গীকে ছেড়ে আসাই মঙ্গল প্রতারণা না করে। কিম্বা নতুন সঙ্গীটি যেন বিবাহিত না হন সেটা দেখে নেয়া ভাল। বলি, তাহলে কি আর পরকীয়া হল? আর দেখে শুনে কি পরকীয়া হয়?

 পরকীয়া কে নারীবাদের প্যাকেজে যুক্ত করতে নারীদের উদাত্ত আহবান জানিয়ে বলা হলো ‘’যদি কোন সম্পর্কে জড়িয়ে যাও জীবনের যে কোন প্রান্তে সে সম্পর্ক স্বীকার করে নেয়ার সাহস অর্জন করো মেয়ে। ঘুরে দাঁড়াও। চিৎকার করে বল ‘’আমি স্বকীয়া করি, কোন সমস্যা ? এই কথাগুলো নারী নয় ,পুরুষের বেলায় প্রযোজ্য। নারী তার ভালবাসার সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠাই করতে চায়। আর এ ধরনের সম্পর্কে পুরুষ আসলে আম খেয়ে আঁটি ছুঁড়ে ফেলার মতই নারীকে পরিত্যাগ করে। দিন শেষে নারী ওই মন্দের ভাল হিসেবে তার অপছন্দের স্বামীতেই ফিরে আসতে বাধ্য হয় পরকীয়া প্রেমিক থেকে প্রতারিত হয়ে। এমন কাহিনী ভুরি ভুরি। বলা হচ্ছে প্রতিটা প্রেম,প্রতিটা সম্পর্কই তো বাস্তবতা। তাই পরকীয়া দোষের নয়। ঠিক তাই প্রতিটা নিপীড়ন ,প্রতিটা খুনই তো বাস্তবতা। তাই মানুষ হত্যাও দোষের নয়। আমি মানুষ হত্যা করি ,কোন সমস্যা ?

   নারী দর্শনে পুরুষের কাম জাগে। ওটাওতো বাস্তবতা। তাই ধর্ষণ কোন দোষের নয়। বাংলার দামাল ছেলেরা ধর্ষণ করে। কোন সমস্যা? কেউ কেউ বললেন, বিয়ে থাকলে পরকীয়া থাকবে তাই পরকীয়া কে ঘৃণা করতে হলে আগে বিয়েকে ঘৃণা করতে হবে। বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানই থাকা উচিৎ নয়। বাহ! এভাবে এত স্মার্টলি চিন্তা করলে তো আর কোন সমস্যাই থাকে না। খুব সহজেই তবে হাঁটা যাক সভ্যতার উল্টোপথে আদিম যাত্রায়। পশু সমাজের আদলে গড়ে তোলা যাক সমাজ ব্যবস্থা। বাবা মেয়েকে,ভাই বোনকে ,যার যেমন খুশি ইচ্ছা বাঁচুক। শুধু নিজের খুশি মত বাঁচুক। পরকীয়া করুক,পরকীয়ার পথে বাঁধা আসলে খুন করুক, কি খুব অস্বাভাবিক লাগছে শুনতে ? পরকীয়ার অশুভ পরিনতির উদাহরণ কি কম রয়েছে আমাদের সমাজে ? সেই মনির খুকুর পরকীয়া প্রেমের কথা মনে আছে? যে কারণে জীবন দিতে হয়েছিল নিরপরাধ শারমীন রীমাকে ? পরকীয়ার নেশায় মত্ত হয়ে নিজের সন্তানকে টুকরো টুকরো কেটে পাঁচতলা থেকে ফেলে দিলেন এক মা এইতো বছর কয়েক আগের কথা।( সেই মায়ের মানসিক রোগ ছিল এমন ভাবার কোন কারন নেই, যেখানে পরকীয়া নিজেই এক মনোসামাজিক ব্যাধি)।কিম্বা সাম্প্রতিক সময়ের নতুন করে আলোচিত  বিষয় স্বপ্নের নায়ক সালমান শাহ্‌ মৃত্যু রহস্য। এসবই যে পরকীয়ার বলি। শুধুমাত্র পরকীয়ার কারনেই ঘর ভাঙ্গে অসংখ্য মানুষের। কারন কোন মানুষই সঙ্গীর হাজারো অন্যায় আচরণ মেনে নিতে পারলেও পরকীয়াকে মানতে পারে না ।ফলাফল বিচ্ছেদ। মিষ্টি প্রেমের জনপ্রিয় জুটি দুজন ভালো মানুষ তাহসান মিথিলাও পারলেন না সংসারকে জয় করতে। ভিতরে অনেকে পরকীয়ার মৃদুমন্দ উপস্থিতির গন্ধই পেয়েছেন। তারকাদের বেলায় এমন উদাহরণ অনেকই দেয়া যায়। তাই পরকীয়াকে উত্তরাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি তে দেখে মানবতার দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা কোন ভাল কথা নয়। এ ব্যাধি এমনিতেই সমাজে বিদ্যমান। বরং একে নিরুৎসাহিত করার দায়বদ্ধতা শিল্পের মানুষদের থাকা উচিত। যেমনটা দেখিয়েছেন করন জোহর তার ‘কাভি আল বিদা না ক্যাহেনা ‘ ছবিতে। সেখানে দেখা যায় অভিষেক বচ্চন তার স্ত্রী রানী মুখার্জীকে দিন শেষে বিশেষ মুহূর্তে আবিষ্কার করেন নাক ডেকে ঘুমন্ত অবস্থায়। অথচ এই রানীই অভিষেকের ব্যস্ততায় নিজের জীবনের হতাশার গল্প শেয়ার করে বন্ধুত্ত্ব করে প্রীতি জিনতার স্বামী শাহরুখ এর সঙ্গে। তাদের যত্ন নেওয়া বন্ধুত্ব প্রেমে গড়িয়ে শারীরিক আবেগেও অংশ নেয়, অপরাধবোধ গ্লানিকে সাথী করেও। করন যে মেসেজটি এই ছবির মাধ্যমে দিয়েছেন তা হল সম্পর্কের যত্ন। যে অযত্ন আপনাকে বা আপনার সঙ্গীকে পরকীয়ায় ঠেলে দিল সেখানে গিয়ে কিন্তু আপনি একটি সম্পর্কের যত্নই করছেন। প্রেমান্ধ বেপরোয়া হয়ে সন্তান বা সঙ্গীকে খুন না করেই হয়ত নতুন সম্পর্কে পা বাড়াতে পারলেন। কিছুদিন তুমুল বাঁচলেন। তারপর সেই সম্পর্কও কিন্তু একদিন পুরনো হয়ে যত্ন চাইবে! তখন কি তাকে যত্ন করে আগলে রাখবেন না আবারো নতুন ভাল লাগাকে প্রশ্রয় দিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠবেন?

    চিত্রনায়িকা শাবানা অভিনীত চরিত্র গুলোর মত সব নিপীড়ন সয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে কাউকে বলিনা। কিন্তু সেখান থেকে বের হতে পরকীয়া কোন সমাধান হতে পারে না। পরকীয়ার মত নেতিবাচক বিষয়গুলোকে উৎসাহ দেয়ার জন্য আমাদের রিপুগুলোই যথেষ্ট। কলম কে তাই আবেগ নয় বিবেকের জন্যই না হয় রাখি।

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী
লেখক

পরকীয়াঃ আর যাই হোক একে প্রেম বলে না

বেশ কিছুদিন ধরে অনলাইন সরগরম ” পরকীয়া ” নিয়ে।সেই সূত্রে বহুবছর আগের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমি তখন খুব ছোট। একদিন এক পরিচিত ভদ্রলোক আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলেন। সঙ্গে একজন ভদ্রমহিলা আর চার / পাঁচ বছর বয়সী এক ছেলে। মায়ের সঙ্গে কী যেন কথাবার্তা বলে ভদ্রলোক চলে গেলেন। কিন্তু শিশুসন্তান সহ আন্টি মানে সেই ভদ্রমহিলা রয়ে গেলেন আমাদের বাড়িতে। শুনলাম উনি কিছুদিন থাকবেন এখানে। অনেক পরে জেনেছিলাম, আন্টির বর বড় সরকারি চাকুরে, একমাত্র বাচ্চা নিয়ে গোছানো সংসার। হঠাৎ ফোনে পরিচয় হয় এই ভদ্রলোকের সঙ্গে। কথা বলতে বলতে দুজনে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে পুরনো সম্পর্ক ভেঙে নতুন করে ঘর বাঁধবেন বলে বাড়ি ছাড়েন ছোট্ট বাচ্চাটিকে সঙ্গে নিয়ে। প্রেমিক পুরুষটি বয়সে তার চেয়ে বছর পাঁচেকের ছোট। অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী নন। তারপরও তাকে বিয়ে করবেন বলে ঘর ছেড়েছেন। সপ্তাহ খানেক হয়ে গেল আমাদের বাড়িতে আছেন। দামি শাড়ি, গহনা, কাজল টানা চোখ আর সুগন্ধিতে বেশ সুন্দরী মনে হতো উনাকে। আমাদের দিক থেকে যত্নআত্তিতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিলো না। তারপরও আন্টিকে খুব অস্থির মনে হতো। বাচ্চাটাও মুখ মলিন করে বেড়াত, খাওয়াদাওয়া করতে চাইতো না। এখন মনে হয় , বাচ্চা ছেলে – বাড়িতে ওর খাওয়া – ঘুম – খেলা, সবকিছুর একটা নিজস্ব পরিবেশ ছিল। এখানে নতুন পরিবেশে তার কিছুতেই মন বসছিলো না। বাবাকেও মিস করছিলো। এ অবস্থায় কয়েকদিন পার হলে আমার মা এগিয়ে এলেন তাদের সহযোগিতায়। সপ্তাহ খানেক পর ভদ্রলোক এলে দুজনকে নিয়ে আলোচনায় বসলেন। মায়ের কথায় তারা দুজনেই একমত হন যে, পরিবার ভেঙে, বাচ্চাকে অনিশ্চিত জীবনে টেনে আনাটা ঠিক হচ্ছে না। তাই সিদ্ধান্ত পাল্টান এবং পরদিন যে যার জায়গায় ফিরে যান। এখনো ভেবে শান্তি পাই যে, তারা এমন একজন মানুষের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন, যিনি তাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিলেন।

মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন তার একজন প্রকৃত বন্ধুর পরামর্শ দরকার হয়। এক্ষেত্রে তারা সেই বন্ধুর দেখা পেয়ে গেছিলেন। কিন্তু এমন অনেক সম্পর্কই ভুল পথে চলে যায়, যা থেকে অশান্তিতে, প্রতিহিংসায় আত্মহত্যা, খুন পর্যন্ত হয়ে যায়। একটি ভুল সম্পর্ক, আবেগে বা মোহে পড়ে নেয়া সিদ্ধান্তে অনেকগুলো জীবনকে বিপন্ন করে তোলে, একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। এই ঘটনাই আমাকে প্রথম একটি ভিন্ন সম্পর্কের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল যাকে আমরা বলি Extra marital affair বা বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক বলে থাকি। সোজা ভাষায় যাকে বেশিরভাগ মানুষ পরকীয়া বলে। আমি মানবিক সম্পর্কে বিশ্বাসী। দিনক্ষণ মেনে প্রেম হয়না তাও জানি। তারপরও মনে করি প্রত্যেকটি সম্পর্কের মধ্যে কিছু দায়বদ্ধতা, প্রতিশ্রুতি থাকে। সেগুলোর প্রতি যখন মানুষ আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে সেক্ষেত্রে হয়ত সম্পর্কটা সবার পক্ষে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়না। তবুও বলবো, একজন পরিণত বয়সের মানুষের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার যেন একজন মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত তার আশেপাশের মানুষগুলোকে জ্বালিয়ে ছারখার না করে। নতুন সঙ্গীকে গ্রহণ করার আগে, চলমান সম্পর্কে ইতি টানা অনিবার্য কী না, হলেও তা কেন একবার ভেবে দেখা উচিৎ। ইতি টানতে চাইলে সঙ্গীর প্রতি সম্মান, স্বচ্ছতা বজায় রেখে সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে, যদিও এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাবেই বহু দাম্পত্য সম্পর্কের শেষটা সুখকর হয়না। সন্তান থাকলে বাবা – মা উভয়েরই তাকে সুরক্ষিত রাখা সবচেয়ে জরুরী। কেননা, বাবা- মায়ের সম্পর্কের অস্থিরতা বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। ক্ষণিকের মোহে একটি সম্পর্ক ছিন্ন করার আগে চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে বৈকি। মোহগ্রস্ত মানুষই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয় বেশিরভাগ সময়। ফলে অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাদের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা রয়ে যায়। প্রত্যেক দম্পতির সম্পর্ক ভাঙা – গড়ার আড়ালে গল্পগুলো আলাদা আলাদা। তাই না জেনে দূর থেকে মন্তব্য করা অন্যায়। শুধু এটুকু অনুরোধ রাখতে চাই, যে সম্পর্কে জড়িয়ে আছি তা নিজেকে সুস্থতা দিচ্ছে কি না, স্বস্তি দিচ্ছে কি না দিনশেষে তা যেন একবার অন্তত ভাবি। নিজেদের বিবেকের কাছে যেন ছোট না হয়ে যাই। প্রেম এক ঐশ্বরিক অনুভূতি। যখন তা আমাদের বিপথগামী করে তোলে – স্বকীয়া না পরকীয়া জানিনা, তবে আর যাই হোক তাকে প্রেম বলে না।

মেহেরুন্নেছা
শিক্ষক,লেখক

বিয়ে বনাম পরকীয়ার ইতিবৃত্ত

সভ্যতার ইতিহাস; যেমন মায়া সভ্যতা, ইনকা সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা ইত্যাদি ঘাটলে এ বার্তাটি পাওয়া যায়, বিভিন্ন সভ্যতা বিভিন্নভাবে মানব- মানবীর সম্পর্কের প্রেক্ষাপট নির্ধারণ করে দিয়েছে। যখনই মানব- মানবী উদ্দাম জীবন-যাপন বেছে নিয়েছে তখনই সমাজ শক্ত হাতে তা নিয়ন্ত্রণ করেছে। জন্ম থেকেই মানুষ সামাজিক শৃঙ্খলে বন্দি।প্রকৃত অর্থে মানুষ কখনও তার মন যা চায় তা করতে পারে না। স্বেচ্ছাচার কোনো সমাজই কামনা করে না বা বরদাশত্ করে না। বাক্- স্বাধীনতার নামে যা ইচ্ছে তা উচ্চারণ করা যাবে না। মানুষ নিজেকে যতই সভ্য দাবী করুক না কেনো নারী- পুরুষের সম্পর্ককে কিন্তু ধর্মীয়- সামাজিক বলয়ে আবদ্ধ রাখতে মানুষ শতভাগ সফল হয় নি। ফলে বিয়ের পাশাপাশি পরকীয়া, লিভ টুগেদার- এ সম্পর্কগুলোও সমাজে বিস্তার লাভ করেছে।যদিও বিয়ে, পরকিয়া, লিভ টুগেদার-এর মতো সম্পর্কগুলো দুজন নর-নারীর পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠে। তথাপি ধর্ম ও সমাজের দৃষ্টিকোন থেকে অনুমোদিত সম্পর্ক হলো বিয়ে। অবশ্যই এটি একটি ধর্মীয় ও সামাজিক চুক্তি।

এই গ্রহের সেরা প্রজাতি হলো মানুষ।মর্যাদাসম্পন্ন প্রজাতি হিসেবে ধর্ম ও সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত ‘বিয়ে’-র মাধ্যমে দুজন নর-নারী তাদের জৈবিক চাহিদা মেটায়। মনুষ্য প্রজাতি হিসেবে টিকে থাকার জন্য ‘বিয়ে’ অপরিহার্য এবং তার যাপিত জীবন ধর্ম ও সমাজের গন্ডীর মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিতে হয়। ‘বিয়ে’ এমন একটি সম্পর্ক যা শুধুমাত্র দুজন মানুষের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি বিয়ে মানে একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্রের কাছে দায়বদ্ধতা। তারপরেও যদি বিবাহিত জীবন দম্পতির নিকট যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে তবে তারা ‘ডিভোর্স’-এর মাধ্যমে এই অসহ্য পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে পারে। বিয়ের মত ডিভোর্সও ধর্ম ও সমাজ কর্তৃক অনুমোদিত। সামাজিক জীব হিসেবে এভাবেই ধর্ম ও সমাজ মানবকে নৈতিকতা ও বৈধতার মধ্যে ব্যাপ্ত রাখে। এরপরেও কিছু মানুষ সমাজকে ফাঁকি দিয়ে বিয়ে-বহির্ভূত জীবন যাপন করতে চায়। এরা প্রথার বাইরে বিচরণ করতে ভালোবাসে এবং নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। নিষিদ্ধ সম্পর্কের অনেক কারণের মধ্যে রয়েছে দাম্পত্য ক্লান্তি, দাম্পত্য সংঘর্ষ, সঙ্গীর প্রতি অনীহা, সঙ্গীর শারীরিক অক্ষমতা, ব্যক্তির নৈতিকতার স্খলন, স্বামী বা স্ত্রীর দীর্ঘ বা স্বল্প সময়ের অনুপস্থিতি, নৈতিকতা ও বিশ্বস্ততার অভাব, আর্থিক অনটন, সঙ্গীর অসততা এবং অল্প বয়সে বিয়ে। যে বা যারা এই অনৈতিক- নিষিদ্ধ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যায় তারা যতই সম্পর্কের ভালোবাসা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করুক না কেনো ধর্ম ও সমাজ তা মেনে নিতে চায় না বা আদৌ মেনে নেয় না। জীব মাত্রই তার জৈবিক চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে মিলনে রত হয় এবং এই চাহিদা মেটানোর প্রকল্পে কোনো মর্যাদা বা নৈতিকতার বালাই নেই।কিন্তু মানুষ জীব হলেও তার ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য নয় এবং মানুষের জীবন যাপনের উদ্দেশ্য শুধু জৈবিক চাহিদা মেটানো নয়। মানুষের ক্ষেত্রে প্রধান কথাই হলো সে সামাজিক পরিসীমায় ন্যস্ত। তাই বিয়ে, পরকীয়া ও লিভ টুগেদারের মাঝে বিস্তর তফাৎ বিদ্যমান। যদিও সব সম্পর্কই ভালোবাসার ভিত্তিভূমিতে দাঁড়িয়ে সে সম্পর্কের জয়গান করতে চায়; তথাপি উচ্চস্বরে ভালোবাসার জানান দিতে পারে শুধু বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে থাকা দুজন নর- নারী।

এখন পরকীয়া নিয়ে চলছে অনেক বাদানুবাদ ও তর্ক। সে তর্ক অনেক সময় অতিক্রম করছে শালীনতার সীমানাও। সমালোচনা, আলোচনা সমাজে থাকবেই। যে কোন মত নিয়ে, ভাবনা নিয়ে, খোলামনে আলোচনা তো হতেই পারে। কিন্তু সে আলোচনা যদি সমাজের ওপরে, মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, নিয়ে যায় বিভ্রান্তির দিকে তাহলে সে বিতর্ক নিয়ে দ্বিতীয়বার অবশ্যই ভেবে দেখার অবকাশ আছে বলেই মনে হয়। কারণ আমরা কেউ-ই নেতির পথে এগিয়ে যেতে চাই না।

কিন্তু বাকীরা ভালোবাসার জানান দিতে স্বর উঁচু করা মাত্র সমাজ তাদের শাসন করে। সেই আদিকাল থেকে সমাজ এভাবেই মানুষের সম্পর্কগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে পৃথিবীকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। সম্পর্কের নৈতিকতা- বৈধতার খাতিরে এবং সমাজের ভারসাম্য রক্ষার খাতিরে মানব ক্লোনিং যেমন নিষিদ্ধ তেমনি সামাজিক অভিধানে পরকিয়া, লিভিং টুগেদারও নিষিদ্ধের আওতাধীন। প্রথা বিরোধী এসব নর-নারী যখন পরকিয়া বা নিষিদ্ধ সম্পর্কের পক্ষে উচ্চবাচ্য করে, সীমা লংঘন করে এবং আক্রমনাত্মক বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয় তখন ধরে নিতে হবে তারা ভুল পথে অগ্রসর হচ্ছে। আসলে কোনো সুস্থ নারী বা পুরুষ যে কোনো ধরণের অনাকাঙ্খিত সম্পর্কের পক্ষে সাফাই গাইবে না। একথা সত্য যে কোনো নারী যদি এসব নিষিদ্ধ সম্পর্কের ব্যাপারে বেপরোয়া মত দেয় এবং চরম অপমানজনক মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়ে পুরুষকে ঘায়েলের চেষ্টা চালায় তবে তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তেমনি এই গুটিকতক নারীর জন্য যদি কোনো পুরুষ অশ্রাব্য ভাষায় সমগ্র নারী সমাজকে আক্রমন করে তবে তার মানসিক সুস্থতাও প্রশ্নবিদ্ধ। নারীর প্রতি নেতিবাচক আচরণ কিংবা পুরুষের প্রতি নেতিবাচক আচরণের সুদূরপ্রসারী কালো থাবার ছোবল থেকে আমরা কেউই রেহাই পাবোনা। সুতরাং…